Sunday, November 10, 2019

ঘাটশিলা >

নিরুদ্দেশের যাত্রা .......


ঘাটশিলা স্টেশন 

ভ্রমণ সব সময়ই আনন্দদায়ক। তা সে নিকটবর্তী স্থান  বা দুর ভ্রমণ হোক।  একঘেয়ে জীবনযাত্রার থেকে বেরিয়ে  একটু বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য দু দিনের ছুটি নিয়ে বেড়িয়ে পড়া। ব্যস্ত জীবনে বা সংসারের যাঁতাকল থেকে একটু মুক্তি,  একটু অন্যরকম আনন্দ খুঁজে নেওয়ার জন্য দুই বন্ধু অজানার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম। কোথায় যাবো, কোন ঠিকানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেব, কিছুই ঠিক না করে সকাল সকাল  হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।  স্টেশনের বোর্ডে দেখলাম ৬.৫৫ মিনিটে ইস্পাত এক্সপ্রেস ছাড়বে। মলয় বললো চলো এটাতে করে টাটানগর যাই, ফেরার পথে গালুডি বা ঘাটশিলা যাবো।  কিছু না ভেবে টাটানগর পর্যন্ত দুটো টিকিট কেটে দুজনে ট্রেনে উঠে পড়লাম। মলয় বললো টাটানগর প্রথম যাই, ওখানে একরাত্রি থেকে পরের দিন  গালুডি বা ঘাটশিলা ঘুরে হাওড়া ফিরে আসবো।  ওর মতামতে আমি রাজি হতে পারলাম না।  ওকে বললাম,  মাত্র দুটো দিন অর্থাৎ  ৪০ ঘন্টা ভ্রমণের সময়, তার মধ্যে তিন -সাড়ে তিন ঘন্টা করে ট্রেনে যাওয়া ও আসা,  ঘন্টা আট -নয় রাতে ঘুমোনো বাদ দিলে  হাতে ঘোরার জন্য থাকলো মাত্র ২৪-২৫ ঘন্টা। এতো কম সময় দু-জায়গায় ঘুরতে গেলে কোনোটাই ভালোভাবে দেখা হবে না, ঘোরার  আনন্দটাই বিফলে যাবে। আমার মনে হয় তার চেয়ে ভালো  আমরা ঘাটশিলাতেই নেমে মেঠো পথ ও পাহাড়ি ঝর্ণা দেখে দুটো দিন কাটিয়ে দেবো।  মলয় আমার কথা ফেলতে পারলো না। দুজনের মতের মিলে অবশেষে পথের ঠিকানা মিলল। ঠিক হলো আমরা ঘাটশিলাতেই এবারের ছুটিটা উপভোগ করবো। আমরা সাড়ে দশটা নাগাদ ঘাটশিলা পৌঁছলাম। স্টেশনের পাশেই একটা হোটেল ঠিক করে ব্যাগ পত্তর রেখে, একটু  ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

ঘাটশিলা পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত ছিল।  বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের সিংভূম জেলার একটি সুন্দর ছোট্ট শহর। শহরটি সুবর্ণরেখা নদীর তীরে অবস্থিত পাহাড়ে ঘেরা বনভূমি অঞ্চল। বাঙালিদের কাছে বরাবর খুবই আকর্ষণীয়, বর্তমানে বাঙালি পর্যটকদের কাছেও সমান আকর্ষণীয় স্থান। চারধারে অনুচ্চ পাহাড়, মাঝে আপনবেগে বয়ে চলা পাগলপারা সুবর্ণরেখা  নদী। তার সাথে বিখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের স্মৃতিমাখা পথ ঘাট। অতীতে বহু বাঙালি স্বাস্থ্যউদ্ধারের উদ্দেশ্যে এখানে এসে বেশ কিছুদিন করে বসবাস  করতো।  অতীতে এখানেই ধলভূম রাজ্যের রাজধানী ছিল।

ঘাটশিলা রামকৃষ্ণ মিশন 
আমরা প্রথমে রাস্তায় একটু জলখাবার ও চা খেয়ে একটা অটো ভাড়া করে চললাম দাহিঘরা অঞ্চলে অবস্থিত রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আশ্রমে। বেশ সুন্দর নিরিবিলি স্থানটি। মিশনের অন্যান্য আশ্রমগুলির পরিবেশ যেরকম থাকে,  এখানেও ঠিক সেরকম পরিবেশই বজায় রয়েছে। আশ্রমটি ১৯৩৫ সালে তৈরী করা হয়।  ২০০৪ সালে এটি বেলুড় মঠ ও মিশনের  অধীনে আসে।  ঢুকতেই সামনে একটি ছোট্ট সুন্দর মন্দির পড়ল, মন্দিরে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের মূর্তি বিরাজ করছে।  এদের কর্মযজ্ঞের মধ্যে দেখলাম বিনামূল্যে দুস্থদের চিকিৎসা কেন্দ্র, গদাধর অব্যুধ্যয় প্রকল্পে তৈরী কম্পিউটার শিক্ষা কেন্দ্র, ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র রয়েছে।  এছাড়া এখান থেকে নানারকম অনুষ্ঠান করা হয়। গরিব দুঃখীদের  কম্বল, ঔষধ, জামাকাপড় ইত্যাদি প্রয়োজনে বিনামূল্যে দান  করে  থাকে। এবার আমাদের যাওয়ার কথা গৌরীকুঞ্জ।

পৌঢ়  বয়সে বিভূতিভূষণ রমাদেবীকে বিবাহ করলেও তাঁর প্রথমা  স্ত্রী গৌরীদেবীকে তিনি ভুলতে পারেননি। ঘাটশিলার সুবর্ণরেখা নদীর কূলে তিনি একটা ছোট্ট কুটির কিনে তার নাম রেখেছিলেন গৌরী দেবীর নামে।  তিনি কুটিরটির  নাম "গৌরীকুঞ্জ" রেখেছিলেন।
বিভূতিভূষণের বাড়ি 
গৌরীকুঞ্জ হলো সেই বাড়ি যেখানে বিভূতিভূষণের স্মৃতিমাখা সংগ্রহশালাটি রয়েছে  আমাদের অটো ঘুরিয়ে নিয়ে কিছুটা পথ এগোতেই একটা ছোট রাস্তা একটু নিচের দিকে নেমে গেছে, এই রাস্তাটির নামটা ভারী সুন্দর। বিভূতিভূষণের স্মৃতিজড়ানো নাম "অপুর পথ", নামটা আমার বেশ লাগলো। গৌরীকুঞ্জে ঢোকার পর প্রথমেই দেখলাম পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা।  ভিতরে ঢোকার জন্য একটা বড় প্রবেশদ্বার তৈরী করা আছে।  প্রবেশদ্বারের ভিতরে সাহিত্যিকের  একটা মর্মর মূর্তি  স্থাপন করা আছে। বাড়ির শেষ প্রান্তে "অপুর পাঠশালা" নামে  একটা বাংলা শিক্ষার পাঠশালা গড়ে তুলেছে গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি। ঝাড়খণ্ডের বাঙালি সন্তানদের বাংলা শেখার কোনো সুযোগ না থাকার কারণে পাঠশালাটি গড়ে তোলা হয়েছে।  এটা ঠিক প্রথাগত শিক্ষা কেন্দ্র নয়, বাংলাশিক্ষার কোনো কোর্স নেই। বাচ্ছারা যাতে মনের আনন্দে বাংলা শিখতে পারে সেটাই লক্ষ্য পাঠশালাটির। এখানে বর্ণপরিচয়, সহজ পাঠ যেমন শেখানো হয় তেমন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, এরকম দিক্পালদের রচিত উপন্যাস  ও ছোট গল্পও গল্পের মাধ্যমে পড়ে শোনানো হয়। পাঠশালার আসল উদ্দেশ্য হলো  বাংলা সাহিত্যের প্রতি উৎসাহ তৈরী করা। এই পাঠশালার পাশেই  সাহিত্যিকের পুত্র তাড়াদাসের  নামে নামাঙ্কিত একটা মঞ্চ রয়েছে। ভিতরে দুটি ঘর নিয়ে তৈরী  সংগ্রহশালায়  দেখলাম সাহিত্যিকের ব্যৱহৃত সব সামগ্রীগুলোকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে। তাঁর ব্যৱহৃত জামা-কাপড়, কলম, পাণ্ডুলিপি অনেককিছু রয়েছে। দুটি ঘর, প্রশস্থ বারান্দা, গাছ-গাছালিতে ঘেরা সুনিবিড় এক শান্তির নীড়। সংগ্রহশালার ঘর  দুটিতে পা
অপুর পাঠশালা ও তারাদাস মঞ্চ 
ছোঁয়াতেই বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা আমার অজান্তেই নুইয়ে পড়ল। প্রকৃতির সাধক ব্যক্তিগত জীবনে কত অনাড়ম্বরভাবে জীবন কাটাতেন, তাই লক্ষ্য করছিলাম। অপু-দুর্গার স্রষ্টা, প্রকৃতি প্রেমিক, প্রকৃতির বুকেই কিভাবে জীবন পরিচালনা করতেন, তাই দেখছিলাম।  তাঁর কলম তুলিতে আঁকা প্রকৃতিকে তো আমরা চিনতে শিখেছি তাঁরই গল্পের মাধ্যমে।  জীবনের অনেকটা সময় তিনি এখানে অতিবাহিত করেছেন।  এখানেই ১৯৫০ সালে তাঁর জীবন সংগ্রামের ইতি ঘটেছে।

এখান থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম এখানকার বিখ্যাত  রঙ্কিনী মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে। এখান  থেকে মন্দির যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে একটা হোটেলে দুপুরের আহারটা সেরে নিলাম।  বিস্তীর্ণ একটা চত্বরের মধ্যে লাল রঙের একটা মন্দির। গর্ভগৃহে অষ্টভুজা মূর্তি বিরাজ করছে, পাদপ্রদীপে শিবমূর্তি রয়েছে।   চত্বরের মধ্যে বেশ কয়েকটা জায়গায় হাড়িকাঠ রয়েছে।  বেশ জাগ্রত মন্দির। ভয়ঙ্করী দেবী বলে সকলে তাঁকে ভয় করেন আবার বিপদে আপদে তাঁকেই স্মরণ করেন।  জন্মাষ্টমীতে বাৎসরিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।  শুনলাম অষ্টমী ও নবমীতে এখানে খুব ঘটা  করে মোষ বলি দেওয়া হয়।  বর্তমানে পশুবলি সারা দেশে যখন আইনত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে,  তখন  কি করে এখানে পশুবলি দেওয়া হয়, ঠিক বুঝতে পারলাম না ও বিশ্বাসও  করতে পারলাম না।  যাই  হোক, মন্দিরটা খুব ভালো লাগলো। আনুমানিক তেরোশো খ্রীষ্টাব্দের  কথা, তখন পরম শক্তিশালী রাজা ছিলেন জগৎ দেব। কোনো অজ্ঞাত কারণে তিনি তাঁর রাজধানী এখানকার জঙ্গলে স্থানান্তরিত  করেন। এখানেই তিনি তাঁর গড় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নাম দেন ধলভূমগড়।  কথিত আছে দেবী রঙ্কিনীর স্বপ্নাদেশ  পেয়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত  নিয়েছিলেন।  তিনি গালুডির শালবনে  রঙ্কিনী দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।  পরবর্তীকালে সেই মন্দির স্থানান্তরিত করা হয় ঘাটশিলায়।

গালুডি বাঁধের রাস্তা 
ওখান থেকে এবার আমাদের গন্তব্য গালুডি বাঁধ। ঘাটশিলা থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে এই বাঁধ।  প্রকৃতির বৈচিত্রে ভরা অঞ্চল হল গালুডি। এটাও বাঙালিদের স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য আদর্শ জায়গা, প্রকৃতির কোলে দু-একদিন থাকলে স্বাস্থ্য  ও মন দুটোই ভালো হতে বাধ্য।   গালুডি স্টেশন পার হয়ে কিছুটা এগোতেই এই বাঁধের ধারে  আমরা পৌঁছে গেলাম। সূর্যিমামা তখন সুবর্ণরেখার জলে ডুব দিয়ে দিয়েছে। শক্ত পোক্ত বাঁধের ওপর বেশ চওড়া রাস্তা এপার থেকে ওপার  চলে গেছে।  সুবর্ণরেখা ফুঁসছে তাকে বেঁধে রাখার
গালুডি বাঁধে সূর্যাস্ত 
ক্ষোভে। তারই  মাঝে একদল লোক খেপলা জাল দিয়ে মাছ  ধরতে ব্যস্ত।  পাহাড়ের লাল আভা মাখা রূপ ও প্রকৃতির অপরূপ রূপ আমাকে মুগ্ধ করে দিল।  প্রকৃতি ও আধুনিক সভ্যতা যেন এখানে অঙ্গাঙ্গিভাবে একে  অপরকে জড়িয়ে রেখেছে।মন ভোলানো দৃশ্য কিছুক্ষন হারিয়ে যাওয়ার জন্য যেন অপেক্ষা করে রয়েছে। এবার আজকের মত আমাদের ঘোরা শেষ হয়ে গেলো এবার ফেরার পালা।

হোটেলে ফিরে  একটু বিশ্রাম নিয়ে  আবার বেরোলাম। প্রথমে একটু চা ও সিঙ্গারা খেলাম। তারপর এখানকার জনবাসীদের জীবনযাত্রার একটা ছবি মনে গেঁথে  রাখতে বাজার  এলাকাটা একটু ঘুরলাম। নানারকম পসরার দোকান রয়েছে, তবে দোকানগুলো কয়েকটা ছাড়া খুব একটা সাজানো নয়, তবে ক্রেতার কোনো অভাব আছে বলে মনে হলো না। বেশিরভাগ দোকানগুতেই অল্প হলেও  ক্রেতা রয়েছে। বাড়িগুলো বেশ পুরোনো।  একটা বেশ বড় বাড়ি ( সাত কি আট তলা হবে ) দেখতে পেলাম, সেই বাড়িটার তলায় বেশ বড় একটা জামা-কাপড়ের দোকান ঝলমল করছে।  বাজারে বেশ কিছুক্ষন কাটানোর পর আমরা স্টেশনে অনেকটা সময় কাটালাম।  স্টেশনটা পুরোনো আমলের বাড়ি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, তবে স্টেশন চত্বরে আলোর বড়োই অভাব রয়েছে। রাতের খাবার খেয়ে দশটার মধ্যে হোটেলে ঢুকে গেলাম।

পরেরদিন সকাল ৯ টার মধ্যে হোটেল ছেড়ে দিতে হল।  হোটেল ছেড়ে জলখাবার খেয়ে আবার একটা অটো ভাড়া নিয়ে চললাম ছোটবেলায় পড়া ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের ফুলডুঙরি পাহাড়ে পাণ্ডবদের অভিযান গল্পের কথা ভাবতে ভাবতে ফুলডুঙরির পথে। ঘাটশিলার কাছেই রহস্য বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে

প্যাডেল বোর্ড ও বুরুডি জলাশয় 
আছে এই ফুলডুঙরি পাহাড়।  শাল, পিয়াল, মহুয়া ও কত জানা অজানা বিশাল বিশাল গাছে পরিবেষ্টিত এই মাঝারি মাপের পাহাড়টি। বেশ একটা আরণ্যক পরিবেশ। ছায়ামাখা পথ টিলা ঘিরে উঠেছে, সঙ্গী করেছে সবুজ বনানীকে। পাহাড়ের ওপর থেকে শহরটি দেখা মনোমুগ্ধকর লাগলো। এই পাহাড় সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের  খুবই প্রিয় ছিল।  তাঁর অনেক সৃষ্টির মধ্যে পাহাড়টিও অমর  হয়ে রয়েছে। এবার ঘাটশিলার সবচেয়ে মনোরম জায়গা বুরুডি  লেক ও ধারাগিরি ঝর্ণা দেখতে চললাম।


বুরুডি লেক 
পাকা রাস্তা ছেড়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তা এঁকে বেঁকে চলেছে, রাস্তাটিতে অজস্র গরু, মোষ, ছাগলের চলাফেরা রয়েছে, তাদের কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। তিনদিকে পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে এই সৌন্দর্য্যে মোড়া  জলাশয়টি। পাহাড়ি ঝোরার জল ধরে তৈরী হয়েছে সরোবরটি। নীলচে-সবুজ জল। বিস্তীর্ণ উপত্যকা, চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা।  রোদে ঝলমল করছে জলরাশি, তার মধ্যে পাহাড়ের ছায়া, পাহাড়ের ছায়াগুলো জলে পড়ায় দারুন লাগছে।  প্রথম দেখাতেই এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।  কি সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য।  কি অপূর্ব জলরাশি, পাহাড়ের কোলে বাতাসে দুলে দুলে উঠছে।  তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রঙিন প্যাডেল বোট  চলাফেরা করছে।  বহু পর্যটক এই বোটগুলো ভাড়া করে কিছুক্ষন ঘুরে ঘুরে সমগ্র প্রাকৃতিক পরিবেশটা উপভোগ করছে।  আমরাও একটা বোট ভাড়া নিয়ে কিছুক্ষন পরিবেশের সাথে নিজেদের শহুরে শরীরটাকে একটু মানিয়ে নিতে চেষ্টা করলাম  এবার ধারাগিরির  ধারা দেখবো।

গিরিখাতের মাঝ দিয়ে জলের ধারা এসে এক অপরূপ ঝর্ণার সৃষ্টি করেছে। বুরুডি থেকে ধারাগিরি রাস্তাটা পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে বলে অটো চালক ভাইয়া জানালো।  দুপাশে পাহাড় আর মাঝখানে ঝর্ণার মৃদু মন্দ জলের আওয়াজ আর মাঝে মাঝে পাহাড়ি পাখিদের ডাক এক কথায় অসাধারণ।  যাওয়ার পথে দেখছিলাম পাহাড়ের গায়ে আদিবাসীরা চাষ করছে। এখানকার জল সরকারিভাবে পরিশুদ্ধ করে কাছের গ্রামগুলোতে সরবরাহ করা হয়।  অটো ভাইয়া আমাদের বললো পেট ভরে জল পান করে নিন, এই জল হজমের পক্ষে খুবই ভালো। আমরা পেট ভরে জল পান করে নিলাম।   এবার আমাদের ফেরার পালা, কারণ দুপুর সাড়ে তিনটের সময় আমাদের ট্রেন তার মধ্যে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হবে। সেই কারণে হাতে আর সময় নেই।  তাড়াতাড়ি করে ফিরে আসলাম।

দুটো দিন কোথা দিয়ে কেটে গেলো বুঝতে পারলাম না , নির্ভেজাল অক্সিজেন দুদিন ধরে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসলাম। মনে এক রোমাঞ্চকর আবেগ  বেশ কিছুদিন ধরে রাখার চেষ্টা করলাম।  এখানকার স্মৃতি সত্যিই ভোলার নয়।   এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা।


কিভাবে যাবেন : 

হাওড়া থেকে প্রতিদিন সকাল ৬-৫৫ মিনিটে ছাড়ছে হাওড়া-তিতলাগড় ইস্পাত এক্সপ্রেস।ঘাটশিলায় পৌঁছয় বেলা ৯-৫৪ মিনিটে। ১২৮৬৫ আপ লালমাটি এক্সপ্রেস মঙ্গল ও শনিবার সকাল ৮-৩০ মিনিটে ছেড়ে ঘাটশিলায় পৌঁছয় ১১-৩৮ মিনিটে। ১২৮১৩ স্টিল এক্সপ্রেস বিকাল ১৭-৩০ মিনিটে হাওড়া ছেড়ে ঘাটশিলায় পৌঁছয় রাত ২০-৩৬ মিনিটে। এ ছাড়াও সকাল ৯-৩০ মিনিটে হাওড়া ছেড়ে একটি লোকাল ট্রেন ঘাটশিলা যাচ্ছে ১৩-৪০ মিনিটে। খড়্গপুর থেকেও ট্রেনে ঘাটশিলা যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন:
ঘাটশিলা স্টেশনের কাছে অজস্র হোটেল রয়েছে।  দরদাম করে একটাতে উঠে পড়লেই হল। তবে আমার মতে সবথেকে ভালো হয় যদি রামকৃষ্ণ মিশনে আগে থেকে ব্যবস্থা করে থাকা যায়। 



ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ ১০- ১১-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, October 27, 2019

কেওড়াতলা শ্মশান ও শ্মশানকালী>

কেওড়াতলা শ্মশান ও শ্মশানকালী



শ্মশান মানে শবদেহ দাহ করার স্থান। এ এমনি এক স্থান যেখানে প্রত্যেক মানুষকে কারোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার জন্য বা নিজের আন্তষ্টির সময় মৃত অবস্থায় যেতেই হয়। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই বেশিরভাগ শ্মশানেরই অবস্থান কোনো না কোনো নদীর তীরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে দ্বারকা নদীর তীরে তারাপীঠের মহাশ্মশান, কোপাই নদীর তীরে কঙ্কালীতলার মহাশ্মশান। তেমনি কেওড়াতলা মহাশ্মশানটিও আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত। বহু সাহিত্যিকের কলমে শ্মশানের কথা বার বার উঠে এসেছে।  যদিও শ্মশানের চরিত্র বর্তমানে  সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। কাঠের বদলে এসে গেছে বৈদ্যুতিক চুল্লি। আগের আলো-আঁধারি ভয়াবহ পরিবেশও পাল্টে হয়ে উঠেছে আলো ঝলমলে। মৃত্যু মানে জীবনের শেষ, তারপর দাহ পদ্ধতির মাধ্যমে পঞ্চভূতে বিলীন হওয়া। এখানে আসলে মনে হবে যেন এটাই বুঝি পৃথিবীর শেষ স্টেশন। 'শ' শব্দটির অৰ্থ শব অর্থাৎ মৃতদেহ আর 'শ্মান' শব্দটির অর্থ হলো শান বা বিছানা।  শ্মশানে আসলেই সব সময় শোনা যায় "বল হরি, হরি বোল" বা "রাম নাম সত্য হ্যায়" কথাগুলো। "হরি" বলতে বোঝায় যিনি জন্ম-মৃত্যু, জড়া-ব্যাধি হরণ করেন। হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে ভগবান রাম যিনি সমস্ত অশুভ শক্তিকে পরাভূত করতে সক্ষম। তাই বিশ্বাস অনুযায়ী রামের নাম করলে আত্মার মুক্তি মেলে। পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ শ্মশানেই কালী মন্দির দেখা যায় বা শ্মশান কালীর পুজোও  হতে দেখা যায়।




রাসবিহারী মোড় থেকে একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে সেতু পার হয়ে চেতলার দিকে। ওই সেতুতে ওঠার ঠিক আগে একটা মোড় পড়বে।  এই মোড়ের ডানদিকে পড়ে কালীঘাট অঞ্চল ও বিখ্যাত কালীমন্দিরটি আর বামদিকে পড়ে টালিগঞ্জ অঞ্চল ও বিখ্যাত কেওড়াতলা মহাশ্মশানটি।

কথিত আছে, এই বাঁদিকের অঞ্চলটিতে  পূর্বে কেওড়া গাছের জঙ্গল ছিল, সেই থেকে অঞ্চলটির নাম কেওড়াতলা হয়।  কেওড়াতলা শ্মশানটি বৃহৎ ও কলকাতার অন্যতম প্রাচীন শ্মশান। শ্মশানটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আদি গঙ্গা। শ্মশানটি পূর্বে এই স্থানে ছিল না, কালীঘাট মন্দিরসংলগ্ন ঘাটে এর অবস্থান ছিল। শবদেহ দাহ করার সময় কালো ধোঁয়ায় মন্দিরটি ও অঞ্চলটি ভরে যেত। সমগ্র  অঞ্চলটিতে একটা অস্বাস্থ্যকর  পরিবেশ তৈরী হচ্ছিল। কলকাতা পৌরসংস্থা গঠন হওয়ার পর কালীঘাট মন্দিরের কাছে বর্তমান জায়গায় অর্থাৎ কেওড়াতলায় দুই বিঘা জমি নিয়ে শ্মশানটিকে স্থানান্তরিত করা হয়। শ্মশানটির ডান দিকে মায়ের ৫১ পীঠের এক পীঠ (কালীর মন্দির) ও নকুলেশ্বর ভৈরব মন্দির  থাকায়  জায়গাটা খুবই পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। শ্মশানটিকে তাই মহাশ্মশান বলা হয়।

বহুদিন যাবৎ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় ছিল। দহনের পোড়া কাঠ ও ভষ্মে জায়গাটা সব সময় অপরিষ্কার হয়ে থাকতো।  শ্মশানযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য কোনো ভালো জায়গা  ছিল না। কালীঘাট মন্দিরের সেবায়েত গঙ্গানারায়ণ হালদারের পত্নী শ্রীমতি বিশ্বময়ী দেবী শ্মশানঘাটটিকে বাঁধিয়ে দেন এবং পরবর্তীকালে তিনি শবযাত্রীদের বসার জন্য বিশ্রামাগার ও প্রবেশপথে একটা সুবিশাল তোরণ তৈরী করে দেন।  স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় কিছুটা  আধুনিকরণ ও সংস্কার করেন।  ২০০৪  ও ২০০৫ সালে পৌরসংস্থা বেশ কিছু টাকা ব্যয় করে আরো কিছু সংস্কার করে দেয়।  সেই টাকাতে নতুন  বৈদ্যুতিক চুল্লি বসানো ও চত্বরটি সাজানোর কাজ করা হয়।  শবযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত একটি বিশ্রামাগার তৈরী করা হয়।  পরবর্তীকালে পৌরসংস্থা বিশ্রামাগারটিকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত করে দেয়। তার ফলে পুরোনো কাঠের শ্মশানটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। শ্মশান সংলগ্ন স্থানে ভারী সুন্দর, মনোরম একটা  বাগান তৈরী করা হয়েছে। গার্ডেনটির নাম "মাইসোর  গার্ডেন"। পৌরসংস্থা বর্তমানে আরো  সুন্দরভাবে গার্ডেনটিকে  সাজিয়ে দিয়েছে।

কলকাতার বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বের শব এখানে দাহ করা হয়েছে। তাঁদের কয়েক জন যেমন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখ্যোপাধ্যায় প্রমুখের স্মৃতিসৌধ করা আছে। এছাড়া জীবনানন্দ দাশ, সত্যজিৎ রায়, মৃনাল সেন, নেলী সেনগুপ্ত, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু,  হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন প্রমুখ ও আরো কত গন্যমান্য ব্যাক্তিত্বের দেহ এখানেই দাহ করা হয়েছে। এটি কলকাতা শহরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা শ্মশান বলে বিবেচনা করা হয়।

স্বজন হারানোদের কান্নায় যাদের দিন অতিবাহিত হয়, সেই ডোমরাই কেওড়াতলা শ্মশানে কালীপূজার রাতে  মায়ের আরাধনায় মত্ত হয়ে ওঠেন। সারা বছর শবদেহ ঘেটে যাদের জীবন চলে তারাই এই পুজোর মূল উদ্যোক্তা। পূজার রাতেও ওদের ছুটি নেই, শবদেহ আসলেই দাহ করার জন্য ওদের ছুটতে হয়। কর্তব্য পালন করেই তারা পরিবার নিয়ে উৎসবে সামিল হন। শববাহী যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার চাঁদা তোলা হয় না, স্থানীয় ব্যবসাদার ও  নিজেদের রোজগারের পয়সায় সম্পূর্ণ আয়োজন করা হয়। সমস্ত নিয়ম নীতি মেনেই ব্রাহ্মণ পূজা করে থাকেন। বাংলার অন্যান্য শ্মশানের মতো এখানেও খুব ঘটা করে পূজা করা হয়ে থাকে। কথিত আছে ১৮৭০ সালে একজন কাপালিক দুজন স্থানীয় ব্রাহ্মণের সাহায্যে শ্মশানকালী প্রতিষ্ঠা করেন। কাপালিক নিজের আনা  প্রতিমাতেই  পূজা করেন এবং পূজার পর প্রতিমা নিয়ে তিনি ফিরে যান। সেই প্রতিমা ছিল দুই হাত বিশিষ্ট ও প্রতিমার কোন জিহ্বা ছিল না। সেই থেকে এখানে ওই ধরনের মূর্তিই পূজিত  হয়ে চলেছে।  এখানকার মূর্তির দুটো হাত অর্থাৎ দেবী দ্বিভূজা। এক হাতে মাটির তৈরী নরমাংস থাকে  আর এক হাতে কারণবারি থাকে। দেবী ,মূর্তি উচ্চতায় ২২ ফুট। প্রতিবছর নিয়ম করেই শ্মশানকালীর পূজা করা হয়, যা আজও সমানভাবে চলে আসছে। দীপান্বিতা অমাবস্যায় মহাসমারোহে নিষ্ঠাভরে এই পূজার আয়োজন করা হয়। এখানে তান্ত্রিক মতে পূজা করা হয়। এখানে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। দেবীকে মুড়ি, চানাচুর, সিঙ্গারা, আট কড়াই ভাজা, ১৪ রকম মাছ, খিচুড়ি, পোলাও, সাদা ভাত ভোগ হিসেবে দেবীকে নিবেদন করা হয়।  এছাড়া বলির মাংসও মেক ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। ১৯২৪ সাল থেকে একটা সর্বজনীন পূজাকমিটির তত্ত্বাবধানে পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর ভাইফোঁটার দিন শ্মশানকালির বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখার মত হয়।  অঞ্চলের অধিবাসীরা এই শোভাযাত্রা চাক্ষুষ করা "খুবই পবিত্র" বলে মনে করে থাকে। আমি দেখেছি, এই শোভাযাত্রার সময় অধিবাসীরা  যাত্রা পথে নিজ নিজ বাজী পুড়িয়ে শোভাযাত্রাটির শোভা আরও বাড়িয়ে তোলে। শোভাযাত্রা যাওয়ার সময় দর্শনার্থীরা সবাই মিলে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি  দিয়ে থাকে। শোভাযাত্রা থেকে ফুল ও বাতাসা দর্শকদের উদ্দেশ্যে ছোড়া হয়, সেই ফুল ও বাতাসা নেওয়ার জন্য বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। সত্যিই এক অনবদ্য শোভাযাত্রা হয়ে থাকে।


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :২৭-১০-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Wednesday, October 23, 2019

ভালোপাহাড় >

ভালোপাহাড়  
রূপকথা না বাস্তব  





প্রবেশ দ্বার 

সেদিন মলয়ের দোকানে একটু আড্ডা মারার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম। মলয় মানে আমার বন্ধু  মলয় সোম।  আড্ডা দিতে দিতে ও হঠাৎ বললো ভালোপাহাড় যাবে নাকি, আমি ২০ তারিখে যাচ্ছি। তখন ভালোপাহাড় সম্বন্ধে আমার কিছুই জানা ছিল না। মলয় জানালো পাহাড় বলতে আমাদের যা ধারণা তার সাথে এখানে কোনো মিল নেই, এটা একটা ম্যান মেড অরণ্য। তবে ছোট ছোট পাহাড়তো অবশ্যই দেখতে পাবে। পাহাড় ও অরণ্যের মাঝে মানুষের তৈরী আর এক অরণ্য।  এই সামান্য কথাতেই রাজি হয়ে গেলাম। যাই হোক ২০ তারিখে সকাল ৭ টায় ইস্পাত  এক্সপ্রেসএ টিকিট কাটা হলো। মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন কিলবিল করতে লাগলো ভালোপাহাড়টা কে বা কারা তৈরী করেছে, কোথায় এর অবস্থান। সেই মানুষটার বা মানুষগুলোর নামই বা  কি? মলয় কোনোটারই উত্তর দিতে রাজি হলো না, বললো আগে থেকে সব বলে দেওয়া যাবে না, ওখানে গিয়ে সব কিছু চাক্ষুষ করে মজা উপভোগ করবে। মনে মনে বললাম তবে তাই হোক।

পরের রবিবার ২০ তারিখে ইস্পাত এক্সপ্রসে টিকিট কাটা হল। যথারীতি ২০ তারিখ সকাল ৬ টার মধ্যে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।  ট্রেন প্রায় দেড় ঘন্টা দেরিতে ছাড়লো।  আমরা ১২টা  নাগাদ গালুডি স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।  ওখান থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভালোপাহাড়।  অটো রিক্সা বলা ছিল। দীপকের অটো করে মিনিট ৪৫-এর মধ্যে আমরা ভালোপাহাড়ে পৌঁছে গেলাম।

শ্রদ্ধেয় শ্রী কমল চক্রবর্তী 

ওখানে পৌঁছে দেখলাম রাস্তার ধারে বিশাল একটা লোহার দরজা, দরজার ওপরে বড় বড় হরফে "ভালোপাহাড়" কথাটা লেখা আছে, গেটের পাশের দেওয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ  ও বিদ্যাসাগরের বাণী লেখা রয়েছে। ভিতরে  ঢুকে কি দেখবো তাই নিয়ে আমার মনটা ছটফট করছে। ভিতরে ঢুকে সবুজ অরণ্য দেখে মনটা স্নিগ্ধ ও শান্ত হয়ে গেলো।  ভালোপাহাড় হলো পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ানে অবস্থিত একটা সোসাইটি। এক পঞ্চপাণ্ডবের সোসাইটি। যাদের মূলমন্ত্র প্রচুর গাছ লাগানো ও মানব সেবা। ভিতরে গিয়ে আলাপ হল এক বিশাল মজার মানুষ বৃক্ষের পূজারী শ্রদ্ধেয় শ্রী কমল চক্রবর্তী   মহাশয়ের সঙ্গে।  প্রথম আলাপেই কথার ভাঁজে  উনি আমাদের মাতিয়ে দিলেন ।


বাচ্ছারা স্কুলে যাচ্ছে 

ভালোপাহাড় সম্বন্ধে জানতে হলে বছর পঁচিশ আগে ফিরে যেতে হবে।  সালটা ছিল ১৯৯৬।  পাঁচ বন্ধু মিলে  তখন টাটা বাবাজির শহরে বসে সাহিত্য চর্চা করতেন। "কৌরব" নামে  একটা বাংলা পত্রিকা চালাচ্ছিলেন। সবাই তখন বেকার। আড্ডা, কবিতা, গল্প, নাটক, গান ও বিখ্যাত সাহিত্যিকদের নিয়ে সাহিত্য সভা করতেন। ১৯৬৮ সাল  নাগাদ কমল চক্রবর্তী, সুভাষ ভট্টাচার্য, অরুন আইন, শক্তিপদ হালদার ও বারীন ঘোষাল জামশেদপুরের এই পাঁচজন একত্রিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে দেবজ্যোতি দত্ত এঁদের সাথে যুক্ত হন। এরা সেই সময় কবিসঙ্গ লাভ ও প্রকৃতিকে দেখার জন্য সারা পশ্চিমবঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন।  শান্তিনিকেতনের পান্নালাল দাসগুপ্তের তৈরী "টেগোরে সোসাইটি" দেখে তাঁরা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, পঞ্চপাণ্ডবের  মাথায় তখন  কিছু একটা করার জন্য বাসনা জাগলো।  ঠিক করলেন কিছু একটা করতেই  হবে। ১৯৭১ সালে তারা প্রথম কৌরব নামে পত্রিকাটি বের করেছিলেন, যা আজও চলে আসছে।

ভালোপাহাড়ের পিছনের দৃশ্য 

এই পঞ্চপান্ডবের দল একটা ভালো জমি কিনতে চান, যেখানে চাষ বাস করা যাবে।  তাঁদের পরিচিত শচীন দত্ত মহাশয় জানালেন জামশেদপুর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে বান্দোয়ানে  ৪০ বিঘা জমি তাঁর রয়েছে যেটা তিনি বিক্রি করতে চান।  জমিটি বড় রাস্তার ধারে অনাবাদি পাথুরে জমি।  জমিটি তাঁদের পছন্দও না হলেও তাঁরা কষ্ট করে জমিটি কিনলেন। ১৯৯৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর "ভালোপাহাড়" নাম দিয়ে একটা সোসাইটি গঠন করা হলো। সেই থেকে দলমা  ও রুমাই পাহাড়ের পাদদেশে ভালোপাহাড়ের চলা শুরু হল। "ভালোপাহাড়" আসলে একটা নন-প্রফিট এনজিও। পরবর্তীকালে তাঁরা  আরো  প্রায়  ৮০ - ৯০ বিঘে জমি কেনে।

ধানক্ষেত 

পুরুলিয়ার রুক্ষ - পাথুরে ভূমিকে  অনেক কষ্ট করে পাথর কেটে জমির মাটি বের করে গাছ লাগানো হয়েছিল। বর্তমানে যেন এক সবুজ মন্দির, যেখানে বাস করে বৃক্ষনাথ, আর বৃক্ষের পূজারীরা। এক স্বাধীন বাঁধনহারা  অরণ্য যেখানে গাছেদের  লম্বা লম্বা হাত যেন জড়িয়ে ধরে।   চারদিকে প্রচুর গাছ। কয়েক লক্ষ গাছ হবে। বর্ষার শেষে  ডালে ডালে কচি পাতার ঝালর। জানা ও অজানা কতরকম  ফুলে ভর্তি।  গঙ্গাফড়িং লাফিয়ে বেড়াচ্ছে।  গাছে গাছে নানারকম পাখির দল  খেলে বেড়াচ্ছে।  পাতি হাঁস, রাজ হাঁস ও মুরগিও খেলে বেড়াচ্ছে। সূর্যদেবতা পাটে  গেলে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া খেলে বেড়ায়। 

গোয়াল ঘর 

চারদিকে একটা জমজমাট নিঃশব্ধতা বজায় রয়েছে। গাছের পাতায় পাতায় শুধু জোনাকির আলো মিটিমিটি করে জ্বলছে। বৃক্ষগুলো জোনাকির আলোতে যেন  জলসার আসর বসিয়েছে। হওয়ার দোলায় তাদের মৃদুমন্দ আওয়াজ মন ভরিয়ে তুলছে।  এ যেন বৃক্ষ দেবতা, বৃক্ষনাথের মন্দির। দিব্য দর্শনে অনুভব করা  বৃক্ষনাথের শোভা। ঘুম ভাঙতে ভোরের আলোতে পাখিদের গান মনে উদ্দীপনা তৈরী করে দিল। সোনাঝুরি, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, অশ্বত্থ, বট, শাল, সেগুন, শিমুল, গামার, তেতুল, কাঁঠাল, রুদ্রাক্ষ, চেরি, আপেল, আমলকি, আমড়া, চালতা, কারিপাতা এরকম কত শত বড় বড় সব গাছ রয়েছে। কয়েক বিঘে জমিতে চাষের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে  প্রায় ২৮ রকমের দেশীয় ধান চাষ করা হয়, যেগুলো আজ প্রায় অবলুপ্ত। তাছাড়া বহু রকমের সবজি চাষ করা হয়। এইসব চাষে কোনোরকম রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না, সম্পূর্ণ জৈব সার ব্যবহার করে চাষ-আবাদ করা হয়।  গোয়াল ঘরে প্রায় ৪০ টা দেশি গরু রয়েছে ।  জল ধরে রাখার জন্য একটা কয়েক বিঘের  পুকুর কাটা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুমোদিত একটা বাচ্ছাদের স্কুল রয়েছে। স্কুলটি ২০০৪ সালে তৈরী করা হয়।   এই স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ানো হয়। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত আদিবাসীদের গ্রামগুলো থেকে বাচ্ছারা এখানে পড়তে আসে।  স্কুলে প্রায় ২০০ টি বাচ্ছা  নিয়মিত লেখা-পড়া করে। বাচ্ছাদের শিক্ষার মধ্যে নিজেদের সমাজ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে চেনানোও এদের শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে রয়েছে।  বাচ্ছাদের স্কুলে আনা নেয়ার জন্য দুটো স্কুল বাস রয়েছে।  স্কুলে পাঁচজন মাস্টারমশাই রয়েছেন।  মাস্টারমশাই  ও বাচ্ছাদের জন্য নিয়মিত দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। হলুদ - মেরুন ইউনিফর্মে বাচ্ছাগুলো যখন দল বেঁধে স্কুলে আসে, তখন দেখতে  খুব সুন্দর লাগে। বাচ্ছাগুলোর মধ্যে দেখলাম খুবই শেখার অগ্রহ রয়েছে। স্কুলে খুবই ডিসিপ্লিন বজায় আছে। শুনলাম কোনো এক বছরে এই স্কুলটা সামগ্রিক বিচারে পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিরোপা পেয়েছিল। এছাড়া কমিউনিটি ডেভেলপমেনন্টের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। গ্রামের বহু গরিবদের বিনামূল্যে জামা-কাপড় ও কম্বল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।   ২০০৬ সালে একটা দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। দু-একজন দক্ষ চিকিৎসক নিয়মিত চিকিৎসা করে থাকেন।  গ্রামের হতদরিদ্র্যদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয়। সল্পমূল্যে ঔষধ দেওয়া হয়ে থাকে।

খাবার জায়গা 
রান্নাঘর 

সবুজায়ন প্রধান হলেও এখানে  দু-একদিন থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।  এখানে রান্না করা হয়ে থাকে খোলা উনুনে কাঠের আগুনে। রান্নাও সম্পূর্ণ ঘরোয়া পদ্ধতিতে করা হয়, কোনোপ্রকার আড়ম্বর এখানে দেখা যায় না।  থাকার জন্য চার-পাঁচটি ঘর রয়েছে।  ঘরগুলো খুবই সুন্দর। এদের নিজস্ব সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানকার দিলীপ মাহাতো, প্রদীপ পাত্র, দীপক দত্ত, শিবু তন্তুবায়, জয়তীদেবী  ও দেবেনের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে দিলো। সবাই সদা হাস্যময়, সেবায়  সবসময় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে।
টটকো বাঁধে সূর্য্যাস্ত 

 ভালোপাহাড়ের থেকে তিন কিলোমিটার দূরে একটা সুন্দর গ্রাম রয়েছে।  এছাড়া এখন থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে টটকো বাঁধ (ভেলু  ড্যাম) রয়েছে। এই ড্যামে সূর্যাস্তের দৃশ্য খুবই মনোরম। ঝাড়খণ্ডের সাতগুরুং নদী ও মনোরম দলমা পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে বেশ ভালো লাগে। পশ্চিমবঙ্গের দুয়াসিনি পেরিয়ে বান্দোয়ানে যেতে হয়।  দুয়ারসিনির কাছেই সাতগুরুং নদীটি তির তির করে বয়ে চলেছে। আপনি ইচ্ছে করলে এই নদীর তীরে বা দলমার কোলে কিছুক্ষন সময় অতিবাহিত করতে পারেন।  প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যেতে চাইলে এখানে অবশ্যই দুটো দিন কাটিয়ে যেতে পারেন। ভালোপাহাড় হলো একটা নেশা।  এখানে আসলে আপনিও এই নেশায় বুদ্ হয়ে যাবেন। নেশার টানে বার বার এখানে আসতে মন চাইবে। রাস্তার নৈসগ্রিক দৃশ্য আপনাকে বারবার হাতছানি দেবে।

জয় বৃক্ষনাথের জয় 


কিভাবে যাবেন :
 সকলের ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরে গালুডি স্টেশনে এসে নামুন।  ওখান থেকে ভালোপাহাড় যাওয়ার অটো পেয়ে যাবেন। তবেএখানে থাকতে হলে আগে থেকে নীচের ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করে আসতে হবে, না হলে থাকার জন্য কোনো ঘর পাওয়া যাবে না।

ঠিকানা :
কমল চক্রবর্তী , "ভালোপাহাড়", কুঁচিয়া, বান্দোয়ান, পুরুলিয়া, পিন ৭২৩১২৯

ফোন নাম্বার :
৯৪৭৪৪৬২২৩৮ এবং  ৯৪৩১১৮৬২৫০


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :২৩-১০-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, October 6, 2019

কলকাতার প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপূজা >

বলরাম বসু ঘাট ও কলকাতার প্রথম বারোয়ারী  দুর্গাপূজা 



ঠাকুরদালানের প্রবেশদ্বার 

দক্ষিণ কলকাতার এক অভিজাত অঞ্চলের নাম ভবানীপুর।  এককালে বর্ধিষ্ণু বাঙালির বাস ছিল এই অঞ্চলে,  তবে বর্তমানে অঞ্চলটি সর্বধর্মের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। অঞ্চলটিতে রয়েছে বাঙালির সাথে বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন মানুষের সহাবস্থান।  এই অঞ্চলের সাথে যেমন জড়িয়ে আছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, আশুতোষ মুখার্জী, উত্তমকুমার, সত্যজিৎ রায়ের নাম, তেমন কলকাতার বিখ্যাত দু-দুটি হাসপাতাল এস, এস, কে এম ও শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালও এই অঞ্চলেই অবস্থিত। এই অঞ্চলেই একটা ছোট্ট গলিপথ রয়েছে। বলরাম বসু ঘাট রোড। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড থেকে আদি গঙ্গার তীর পর্যন্ত বিস্তিত এই ছোট্ট গলিটি। কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এই ছোট্ট গলিটার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

২০১৯ এর  পুজোর বিজ্ঞাপন 

বলরাম বসু ঘাট আদি গঙ্গার বুকে গড়ে ওঠা এক বহু সুপ্রাচীন ঘাট।  সতী ঘাট। এই ঘাটেই সতীদাহ প্রথা বন্ধের শেষ সময় মুখার্জী বাড়ির দুই বঁধূ  সতী  হয়েছিলেন।  ঘাটে এখনো একটা সতীদাহের স্মৃতি ফলক রয়েছে, যা গঙ্গা থেকে উদ্ধার হয়েছিল বলে কথিত রয়েছে। তাই এই ঘাটকে সতীস্থানও বলা হয়ে থাকে। খুবই পুন্য ঘাট।
 
গঙ্গা থেকে উদ্ধার হয় ফলক 
রানী রাসমণি এই ঘাটে স্নান করে কালীঘাটের কালী মন্দিরে পূজা দিতে যেতেন।  রানী রাসমণির সময় স্বর্গীয় বলরাম বসু ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি। ঘাটটি প্রথম কে সংস্কার করেছিলেন এই নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।  কেউ বলেন রানী রাসমণি সংস্কার করে দিয়েছিলেন আবার কারো কারো মতে বলরাম বসু মহাশয় সংস্কার করেছিলেন। ঘাটেই রয়েছে দুটি শিবমন্দির ও একটা জগন্নাথ মন্দির।  সরকারি সাহায্যে ও পল্লীবাসীদের অনুদানে ঘাটের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে একটা বিশাল ঠাকুর দালান। পরবর্তীকালে স্বর্গীয় নন্দদুলাল ঘোষ মহাশয় ঘাটটি ও ঠাকুরদালানটিকে সংস্কার করে দিয়েছিলেন। 

ঘাটের জগন্নাথ মন্দিরের বিগ্রহ 

এই ঠাকুর দালানে প্রতিবছর দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা ও অন্নপূর্ণা পূজা বেশ ঘটা  করে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সব পূজাতেই ভক্তরা গঙ্গা স্নান করে খালি পায়ে শিবমন্দিরে পূজা দেওয়ার পর দূর্গা বা অন্যপূজার অঞ্জলি দিয়ে থাকেন।

ঘাটের শিব মন্দিরের বিগ্রহ 

তারপর মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করার পড়েই  উপবাস ভঙ্গ করেন। জনশ্রুতি আছে যে এই সতীস্থানে কেউ কোনো মানদ  করলে তা সফল হয়।

দেবী মূর্তি 

আজ থেকে ১১০  বছর আগে অর্থাৎ ১৯১০  সালে আদি গঙ্গার তীরে এই ঘাটের পাশে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে কয়েকজন (১২ জন) বাঙালি ব্রাহ্মণ পল্লীবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এখানকার দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। এই বারোজনের মধ্যে কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। সেই থেকে আজও সমগ্র পূজাটি পরিচালনা করে থাকে  "ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা"। জমিদার বাড়ি, ধনী পরিবারের বেড়া ভেঙে এখানেই তিলোত্তমার বুকে  সর্বপ্রথম সকল পল্লীবাসীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমগ্র পূজা পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যা আজও স্বমহিমায় সৌভাতৃত্ত্ব ও সৌহার্দ্য পরিবেশ বজায় রেখে অনুষ্ঠিত হয়ে চলছে। যা কলকাতার বুকে সর্বপ্রথম সর্ব্বজনীন বা বারোয়ারি পূজা বলে স্বীকৃত। 

আমরা জানি বাংলায় সর্বপ্রথম বারোয়ারি বা সর্বজনীনভাবে পুজো হয়েছিল হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালে। সেখানে বারোজন  যুবক বিন্দুবাসিনীতলার জঙ্গল পরিষ্কার করে সকলের আর্থিক সাহায্যে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিল, সেটাই বাংলার বুকে প্রথম বারোয়ারি বা সর্বজনীন পুজো হিসেবে পরিচিত।

বলরাম বসু ঘাট 
  
সুবৃহৎ পাকা ঠাকুরদালান, ঠাকুরদালানের প্রবেশপথটি মন্দিরের মতো করে তৈরী, মেঝেতে পাথর বসানো,  বৃহৎ হল ঘরেতে একচালার দেবী মূর্তি বিরাজ করছে।  দেবী মূর্তিটি স্বর্ণলংকারের সজ্জিত  পুজোর কটাদিন পাড়ার পুরুষ, মহিলারা ও সেবাইতরা ঠাকুর দালানে উপস্থিত থাকেন। এই সময় বহু দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা উপস্থিত হয়। একজন বয়স্ক কর্মকর্তা শ্রী অরুন মুখোপাধ্যায় জানালেন যে  ষষ্ঠীতে বোধন,  সপ্তমীতে নবপত্রিকার প্রবেশ ও স্থাপন, অষ্টমীতে অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, নবমীতে হোম ও কুমারী পূজা, দশমীতে দশমী পূজার পর অপরাজিতা পূজা ও সিঁদুর খেলা অনুষ্ঠিত হয়।  তারপর সাতজন ব্রাহ্মণ মিলে দেবীকে প্রদক্ষিণ করেন, তারপর সন্ধ্যায় দেবীকে পল্লীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরিয়ে এই ঘাটেই বিসর্জন দেওয়া হয়। এখানে গুপ্ত প্রেসের পঞ্জিকা মতে পূজা হয়ে থাকে। পঞ্জিকার  প্রতিটি নিয়ম বেশ কঠোরভাবে পালিত হয়ে থাকে। এখানে কোনোরূপ বলি দেওয়া হয় না। দেবীর সব অস্ত্রই পিতলের। জনৈক ভক্ত অস্ত্রগুলো দান করেছিলেন। প্রতিবছর এই অস্ত্রই দেবীর হাতে বিরাজ করে। পাঁচজন প্রধান পুরোহিত ও সাথে দশজন সহযোগী পুরোহিত সমগ্র পুজোটি পরিচালনা করে থাকেন।  পাঁচজন প্রধান পুরোহিতের মধ্যে একজন তন্ত্রসাধক, একজন চন্ডীপাঠ বিশেষজ্ঞ ও আরেকজন জপ বিশেষজ্ঞ থাকেন।  এই পুরোহিতরা বংশ পরম্পরায় এখানে পূজা করে আসছেন।  ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে দেবীকে খিচুড়ী ভোগ আর দশমীর দিন পান্তা ভাত ও কঁচুশাক উৎসর্গ করা হয়। বিভিন্ন পূজা ছাড়াও সংগঠকরা সারাবছরই নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে  যেমন রক্তদান শিবির, চক্ষু পরীক্ষা শিবির ও বস্ত্রদান ইত্যাদি। পূজার দিনগুলোতে সানাই বাদনের ব্যবস্থা থাকে, এখানে কোনোরূপ মাইকের বা কোনোরূপ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হয় না।  পূজার কটাদিন খুবই শান্ত পরিবেশ বজায় থাকে।  
  
আদি গঙ্গার  বুকে বলরাম বসু  ঘাটের  বিপরীত ঘাট 


থিম পূজা যতই চিত্তাকর্ষক হোক বা যতই দৃষ্টিনন্দন হোক, সেখানে যতই মানুষের ঢল আছড়ে পড়ুক। এখানকার পুজোর কর্তাব্যক্তিদের কিন্তু তাতে কোনো আগ্রহ নেই। বাজারের থিমের দৌড়ে শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া এই পূজা কোনোদিন যোগ দেয়নি। ভবিষ্যতে কোনোদিন যোগ দেওয়ার কোনোরূপ ইচ্ছেও তাদের নেই। শুধু তাই নয়, শহরের অন্যান্য পুজোগুলির মতো কোনো পুরস্কারের দৌড়ে সামিল হওয়ার কথাও এরা কোনোদিন ভাবেনি। ঐতিহ্য ও চিরাচরিত আচার অনুষ্ঠানই এই পুজোর বৈশিষ্ট। পল্লীবাসীদের জন্য  বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই এরা  প্রধান কর্তব্য বলে মনে করে।





ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :০৬-১০-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Thursday, October 3, 2019

মূর্তিপূজা >

 মূর্তিপূজা



হিন্দু দৃষ্টিতে একমাত্র পরম আরাধ্য দেবতা হলেন ভগবান বা ঈশ্বর। আমাদের  ধারণা ঈশ্বর সর্বব্যাপী ও সর্বশক্তিমান। ঈশ্বরের বা পরমেশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতার বলে এই বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে বলে ধরা হয়। তাঁরই করুণায় বিশ্বের জীবের  অস্তিত্ত্ব বিদ্যমান ও অন্তিমে বিলীন হওয়া। হিন্দুদের বিশ্বাস ঈশ্বরই দেবতারূপে বিভিন্ন সময় বিভিন্নরূপে পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হন। ঈশ্বরই আমাদের পথ প্রদর্শক। আমরা জানি যে মূর্তি ঈশ্বর নয়, ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে আমরা মূর্তিকে পূজা করে থাকি। মূর্তি একটা মাধ্যম মাত্র। মূর্তিকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে প্রকৃতপক্ষে আমরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উপসনা করি। মূর্তিপূজা হল উৎসবের আনন্দ, জনসমাবেশ ও জন্যসংযোগের উপায়। মূর্তিপূজার প্রচলনের বর্ণনা ঘটলে আমরা দেখতে পাই যে সুপ্রাচীনকালে মূর্তিপূজার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।   

আদিম যুগে শুধু ভারতবর্ষেই নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশে প্রাণস্পন্দন ও প্রাণস্পন্দনহীন প্রাণী ও পদার্থের পূজা আরাধনার প্রচলন ছিল।  আদিম ও অনুন্নত যুগে বিদেহী আত্মা, ভূত-প্রেত প্রভৃতি অপদেবতাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পূজার প্রচলন ছিল।  প্রাচীনকালে বৃক্ষকে কল্পনা করা হত  সূর্যের আশ্রয়রূপে। আকাশের সাথে বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হত।  যেসব বৃক্ষগুলি সুউচ্চ ও সুপ্রসারিত যেমন, বট, অশ্বথ, বেল, নিম এগুলোকে আকাশ বা সূর্যের অশ্রয়স্থল হিসেবে ধরা হত।  এই সুউচ্চ বৃক্ষগুলোকে পূজা করার রীতি চালু ছিল।

বৃক্ষ পূজার পর এল যূপ ও স্তুপ পূজা। এগুলো বৈদিক যাগ যজ্ঞে ব্যৱহৃত হত। যূপ থেকেই ক্রমে শিবলিঙ্গের উৎপত্তি এবং বিকাশ হয়েছে।   যূপ ও বৃক্ষ পূজা আর্য সভ্যতার নিদর্শন। দেবী দুর্গার পূজা গোড়ার দিকে বট, অশ্বথ, বেল, নিম ইত্যাদি বৃক্ষে করা হত।  বেল বৃক্ষকে দেবী দূর্গা ভাবা হত। ষষ্ঠী তিথিতে বিল্ল বৃক্ষের পূজার পর সপ্তমীর প্রাতঃকালে বৃক্ষরূপিণী দেবী দুর্গার স্নান  করা হয়।  শাঁখ , ঘন্টা কাঁসর, ও ঢাক বাজিয়ে সেই শাখাদেবীকে পূজা মণ্ডপে আনা হয়। বৈদিক সম্প্রদায়ের অনুকরণে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে মূর্তি পূজা প্রবর্তিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। মূর্তিপূজা ভারতবর্ষের সকল প্রদেশেই প্রচলিত আছে।  তবে পশ্চিমবঙ্গে আর প্রচলন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

দুর্গার দ্বিভূজা, চতুর্ভূজা, অষ্টভূজা, দশভূজা, দ্বাদশভূজা ও অস্টাদশভূজা মূর্তির কথা পূরাণে বলা আছে।  এই সকল মূর্তির সমস্ত মূর্তিই সকল দেশে পূজ্য নয়। তবে বাংলায় আমরা দশভুজা মূর্তি পূজা করে থাকি।

আমরা যখন কোনো বিদ্বান ব্যক্তিকে সম্মান জানাই তখন তাঁর বিদ্যাকেই সম্মান জানাই, কখনোই তাঁর রক্তমাংসের শরীরটাকে সম্মান জানাই না। তেমনি আমরা যখন কোনো মূর্তিকে পূজা করি তখন আসলে ঈশ্বরকেই সম্মান জানিয়ে থাকি। কোনো মূর্তিকে সম্মান জানাই না। মূর্তিতো ঈশ্বরের প্রতীকরূপে আমাদের কাছে আসে।

বাঙালি সমাজ দেবী মূর্তির মধ্যেই মায়ের ভালোবাসা খুঁজে পায়। ঈশ্বরের প্রতিরূপ মূর্তিই সকল জীবের মা হয়ে বিরাজ করেন। তাই তো বলা হয়ে থাকে "যা দেবী  সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা"।

 ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :০৩-১০-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Friday, September 27, 2019

মহালয়া অমাবস্যা >

মহালয়া অমাবস্যা 

মহালয়া এই শব্দটি বলতে আমরা বুঝি সাত সকালে উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে শোনা চন্ডীপাঠ আর মায়ের মর্ত্যে আগমনের বার্তাকে।  কিন্তু এই দিনই পিতৃপক্ষের শেষদিন।  পরদিন দেবীপক্ষের শুরু।  দেবীপক্ষের শুরু মানেই দূর্গা দুর্গতিনাশিনীর আরাধনার শুরু, বাঙালির শারদীয়া উৎসবের শুরু।  পিতৃপক্ষের শেষ দিন অর্থাৎ মহালয়ার দিন গঙ্গার ঘাটে ঘাটে দেখা যায় ষোলো শ্রাদ্ধ উৎযাপন হতে। হিন্দু রীতি অনুসারে মহালয়া হল প্রয়াত পূর্ব পুরুষদের তর্পনের মাধ্যমে স্মরণ করে তাদের শান্তি কামনার উদ্দেশ্যে জলদান করা হয়।  পিতৃপক্ষ নিয়ে আত্মার মোক্ষলাভের কথা মার্কন্ডেয় পূরণে বলা আছে।  দেবীপক্ষের সাথে যেমন  দুর্গাপুজোর যোগ আছে, তেমন পিতৃপক্ষের সাথে মহাভারতের যোগ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে মহাভারতে একটি আখ্যান রয়েছে।

মহাভারতে কর্ণকে আমরা সবাই জানি দাতা কর্ণ হিসেবে। কর্ণ সারাজীবন সোনা, রুপা, হীরে, জহরত দান করে এসেছেন। তিনি কোনো মানুষকে কোনোদিন কোনো খাবার বা পোশাক দান করেননি।  কর্ণের দাতার  ভূমিকা অর্থাৎ তার এইসব ভালো কাজের জন্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর  তিনি স্বর্গরাজ্যে পৌঁছতে পেরেছিলেন।  স্বর্গরাজ্যে যখন তার  আত্মার ক্ষিদে পেল, সে খেতে চাইল, তখন তাকে খাদ্য-পানীয়ের বদলে সোনা, রুপা, হীরে, জহরত খেতে দাওয়া হল।  কর্ণ অবাক হয়ে যমরাজের (মতান্তরে দেবরাজ ইন্দ্র ) কাছে জানতে চাইলেন, এগুলোর মানে কি? যমরাজ তাকে বলল দাতা হিসেবে তুমি খুবই ভালো কাজ করেছ, তাই তোমার স্বর্গলাভ হয়েছে।  কিন্তু তুমি দান হিসেবে সবাইকে সোনা, রুপা, হীরে, জহরত দান করেছ। কোনদিন কোন  বুভুক্ষ মানুষকে কোন খাবার দান করোনি। নিজের পূর্বপুরুষদের কথা কখনো ভাবোনি, তাদের কখনো খাবার বা জলদান করোনি। পূর্বপুরুষদের গমন পথে কোনোদিন আলোক প্রজ্জলিত করোনি। দাতার পুণ্যলাভের জন্য তুমি  স্বর্গে এসেছ ঠিকই, কিন্তু তুমি  খাদ্য-পানীয় পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হওনি।  তাই  তোমার এই পরিণতি হয়েছে।

কর্ণ যমরাজকে জানালেন তার পূর্ব পুরুষদের তিনি চেনেন না।  জন্ম মুহূর্ত থেকেই আমার মা আমায় ত্যাগ করে চলে গেছেন। সুত বংশজাত অধিরথ ও তাঁর পত্নী আমায় প্রতিপাল্ন করেন। আমার  বীরত্ত্ব ও শৌয্য  দেখে দুর্যোধন আমায় আশ্রয় দেন।  কুরুক্ষেত্ত্রের  যুদ্ধ শুরুর  আগে দিন প্রথমে কৃষ্ণ ও পরে মাতা কুন্তী আমায় আমার জন্ম ও বংশ পরিচয় জানান। এরপর যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেলো। পূর্ব পুরুষদের জল দেওয়ার সময় পাইনি তো।  তাহলে এখন উপায় কি? আমি কি কোনোদিনই খাদ্য বা পানীয় পাবো না। যমরাজ তাকে বললেন খাদ্য-পানীয় পেতে হলে তোমাকে আবার মর্ত্যে ফিরে  যেতে হবে এবং পূর্ব পুরুষদের জলদান করতে হবে।

যমরাজ তখন তাকে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ প্রতিপদ  তিথিতে ১৪ দিনের  জন্য আবার মর্ত্যে পাঠালেন। কর্ণ মর্ত্যে এসে এই ১৪ দিন সমস্ত বুভুক্ষ মানুষকে পেটভরে খাওয়ালেন, বুভুক্ষ মানুষদের আত্মার শান্তি ঘটালেন, মনের পরিতৃপ্তি পূরণ করলেন। পূর্ব পুরুষদের তিল ও জল দান  করলেন।  ১৪ দিন পর তিনি আবার স্বর্গে ফিরে আসলেন।  স্বর্গে এবার তাকে নানা পদের নানারকম খাবার খেতে দেওয়া হল।  কথিত আছে কর্ণের এই ১৪ দিনের  মর্ত্য সফরকে  পিতৃপক্ষ এবং মহালয়ার সময়কাল বলা হয়।  সেই থেকেই মহালয়ার দিন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পিতৃ  পুরুষদের উদ্দেশ্যে তিল ও জলদান করার রীতি প্রচলিত হয়েছে।  মহালয়ার অমাবস্যাকে সর্বপিতৃ অমাবস্যা, পিতৃ অমাবস্যা, পেডালা অমাবস্যা, মহালয়া অমাবস্যা বলেও অভিহিত করা হয়। তর্পনকারী প্রথমে ব্রহ্ম, বিষ্ণু ,ও মহাদেবকে জলদান করে। তারপর মানব শ্রেণীকে জলদান করে। মহালয়া অমাবস্যা তিথি থেকে পরের অমাবস্যা অর্থাৎ কালী পূজার অমাবস্যা পর্যন্ত পূর্ব পুরুষরা মর্ত্যে থাকেন বলে শাস্ত্রকারদের বা মানুষের অনুমান। 

মহালয়া পিতৃ পুরুষদের জলদান করার তিথি। মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপূজার কোনো যোগ নেই, যোগ নেই আকাশবাণীর প্রচারিত "মহিষাসুরমর্দিনী" গীতিআলেখ্যটিরও।


 ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :০৩-০৯-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Sunday, September 22, 2019

ফুলের বাজারে পূজার গন্ধ >

ফুলের বাজারে পূজার গন্ধ 


আমাদের তিলোত্তমায় বাজারের সংখ্যা প্রচুর।  বিচিত্র রকমের বাজার দেখা যায়।  শহরের জনবহুল ব্যস্ততম বাজারগুলির মধ্যে অন্যতম হল গঙ্গাতীরবর্তী মল্লিকঘাটে অবস্থিত ফুলের বাজারটি।  এটি এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজার।


ফুল হল বিশ্ব ভালোবাসার সর্বজনীন এক অনন্য উপহারের উপকরণ।  ফুলের আদান প্রদানের মত  নান্দনিক সুন্দর কাজ আর নেই।  ফুল শুধু নান্দনিকতার উপকরণ নয়, পূজার অন্যতম উপকরণও বটে।  বিশ্ব পেক্ষাপটে আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভীত গড়তে  সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হতে দেখা গেছে।  বাংলার আবহাওয়া, মাটি ফুল চাষের জন্য খুবই সহায়ক।  এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাচীনকাল থেকেই ফুলের চাষ হয়ে আসছে। সজ্জায় বা পূজাপার্বনে ফুল সবসবসময়েই গ্রহণযোগ্য সামগ্রী।  পদ্ম, অপরাজিতা, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, শ্বেতচাঁপা, স্বর্ণচাঁপা , দোলনচাঁপা, গাঁদা,  বকুল, রজনীগন্ধা, জবা, কদম, কৃষ্ণচূঁড়া, রাধাচূঁড়া, মাধবীলতা, নয়নতারা, পলাশ, শিউলি, টগর, শালুক, শাপলা প্রভৃতি কত শত  ফুলের নাম শোনা যায়।  এদের গন্ধে মানুষ মাতোয়ারা।  বিয়ে বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতেও ফুলের যথেষ্ট কদর আছে।  যদিও বর্তমানে গন্ধহীন প্লাস্টিকের ফুল গৃহসজ্জা ও অনুষ্ঠানাদিতে বেশ কিছুটা জায়গা দখল করে নিয়েছে।  কিন্তু পূজা পার্বনে এইসব আর্টিফিশিয়াল ফুলগুলো এখনো কোনো দাঁত ফোটাতে পারেনি।  তবে দিনকে দিন যেভাবে আসল ফুলের  দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে কি হবে বলা মুশকিল। যতই প্লাস্টিকের ফুল ঘরে ঘরে সৌন্দর্যের প্রতীক হোক, কিন্তু আসল ফুলের গন্ধে মানুষ সব সময়ে মুগ্ধ থাকবেই। সেই স্থান কোনোদিনই নকল ফুলগুলো পূরণ করতে পারবে না। এজন্যই যেন বলা হয়  "ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায়"।


গঙ্গার ধারে  হাওড়া ব্রিজের তলায় অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম ফুলের বাজার। হাওড়া ব্রিজের তলায় গড়ে ওঠা এই ফুলের বাজারে ভোর হয় সূর্য ওঠার অনেক আগেই।  রাত থাকতেই ট্রেন বা ট্রাক বোঝাই  করে ফুল আসে।  আসেন খদ্দরেরা।  কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে ও  বিয়েবাড়ি থেকে নিত্যপূজার  সমস্ত ফুলের  যোগান এই বাজার দিয়ে থাকে। শহর ও শহরতলি থেকে ভোর তিনটে থেকে রাত  দশটা পর্যন্ত প্রতিদিন ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ভিড়ে গমগম করে এই সরু একফালি জায়গাটা। বর্তমানে ক্রেতা বিক্রেতার চাপে বাজারটা আর ওই এক ফালি জায়গাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।  বাড়তে বাড়তে তা স্ট্র্যান্ড রোডে এসে উপস্থিত হয়েছে।  প্রতিদিন কয়েক হাজার ক্রেতাকে যেমন দেখা যায় তেমন  প্রায় হাজারখানেক  বিক্রেতাকেও দেখা যায়।  দিনকে দিন চাহিদা বেড়েই চলেছে।  বিয়ে বা পূজা পার্বনের দিনগুলোতে তিলধারণের জায়গা থাকে না।  এখান  থেকে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ ও বেশ কয়েকটি দেশেও ফুল রপ্তানি হয়ে থাকে।  এখানে প্রায় ২৫০ টি স্থায়ী দোকান ও ৩০০ টির মত ভেন্ডার রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় লাখ  দশেক টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। অবস্থানগত কারণেও বাজারটি সকলকে বিস্মিত করে।  বাজারটির ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পুন্য সলিলা  গঙ্গা নদী আর ঠিক বিপরীত পাড়ে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে ব্যস্ততম হাওড়া স্টেশনটি রয়েছে।




 পচা ফুল-পাতায় জায়গাটা যেন এক নরককুন্ড।  এই নরককুণ্ডতেই প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা বিক্রেতার সমাগম হয়, চলে লাখ লাখ টাকার লেনদেন। এইভাবেই অস্বাস্থকর পরিবেশে বাজারটি চলে প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘন্টা ধরে।  দুপাশে স্তূপাকার ফুল ও ফুলের মালা মাঝের সরু জায়গাটা দিয়ে লোক  চলাচল ও ফুলবোঝাই ম্যাটাডোর চলাচল করে। এখানকার ক্রতা বিক্রতাদের ইচ্ছা ফুল বাজারটি "আধুনিক ফ্লাওয়ার মার্কেট"এ  পরিণত হোক। মল্লিকঘাট ফুলবাজারের অবস্থার উন্নতি ঘটানোর দু-একবার  চেষ্টা হলেও তা  এখনো পর্যন্ত সফল হয়নি। কয়েক বছর আগে সরকারি তরফ থেকে কিছু  পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা বিভিন্ন যাঁতাকলে আটকে রয়েছে। সংস্কারের কথা বহুবার শোনা গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাজার সেই পূর্বের মতো হতশ্রী অবস্থাতেই রয়ে গেছে। বিপজ্জনকভাবে দুলতে দুলতে চলা ম্যাটাডোরের আঘাতে প্রতিদিন ছোটোখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে।

সংস্কার হোক বা না হোক এই নরককুন্ডতেই দিকে দিকে  কিন্তু ফুলের সুবাস ছড়িয়ে  আছে, গেলে শুধু ফুলেরই নানারকম সুবাস নাকে আসে। রাশি রাশি ফুলের  স্তুপের পাশ দিয়ে আপনার হেঁটে  যাওয়াটা ভারী মনোরম লাগবে, আর আপনার জীবনে একটা দৃষ্টিনন্দন উপলব্ধি হয়ে উঠতে বাধ্য।

একজন বয়স্ক লোক গাঁদা, রজনীগন্ধার স্টিক  ও গোলাপ বিক্রি করছেন।  ওনার কাছ থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে দুটো রজনীগন্ধার স্টিক ও কিছু গোলাপ কিনে বাড়ির পথ ধরলাম। আমার মতো নগন্য একজন ক্রেতা যখন তার সামনে এসে দরদাম করছে তখন তার মুখে খেলে যাওয়া অনাবিল হাসি যা  দেখে আমার মনটা ভরে উঠেছিল, এই হাসি আমার জীবদ্দশায় সত্যি কোনোদিন  ভুলতে পারবো না। সারা রাস্তাটা রজনী গন্ধা ও গোলাপের সুবাস নিতে নিতে চললাম। স্মৃতির পাতায় এক মনরোম অনুভূতি  যোগ হলো, যা হয়তো কোনোদিন বিস্মৃতি হবে না।








ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :২২-০৯-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Tuesday, September 10, 2019

কলকাতার দুর্গাপূজা >

কলকাতার দুর্গাপূজা 




দুর্গাপূজা বাঙালিদের প্রধান উৎসব। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা।  এই শহর হিন্দু প্রধান বাঙালি শহর হওয়ায় দুর্গাপূজার আধিক্য অন্যান্য জায়গার তুলনায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ১৬১০ সালে দক্ষিণ কলকাতার বেহালা অঞ্চলের বড়িশায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের শ্রী লক্ষীকান্ত রায়চৌধুরী শহরে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা প্রচলন করেন, যা পারিবারিক পূজা ছিল।  এই পূজা তাঁদের পরিবারের আটচালায় আজও আড়ম্বরের সাথে অনুষ্ঠিত হয়।  তবে বর্তমানে পরিবারের আরও সাত  শরিকের বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়ে থাকে।  আটচালাসহ ছয়টি পূজা বড়িশা অঞ্চলে আর একটি পূজা বিরাটি অঞ্চলে ও একটি বেলঘরিয়াতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।  ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব তাঁদের  পারিবারিক দুর্গাপূজা শুরু করেন।  এই পূজায় সেই আমলে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ অধিকারিক  ও  শহরের অন্যান্য বিশিষ্টজনরা আমন্ত্রিত থাকতেন।   বাইজি নাচ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান ও তার সাথে মদ্যপানের আসর বসত। শহরে বাবু সম্প্রদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে পূজাটি। পূজাটিতে  শাস্ত্রাচার গৌণ ছিল, আনন্দানুষ্ঠানাদি প্রধান হিসেবে দেখা যেত।

পরবর্তীকালে রানী রাসমণি দেবী জানবাজারে তাঁদের বসতবাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেন। তিনি সম্পূর্ণ শুদ্ধাচারে পূজা করতেন।  তিনিও ইংরেজ অতিথি ও দেশীয় প্রজাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা রাখতেন। তাঁর পূজায় যাত্রানুষ্ঠান প্রধান ছিল।  রানীর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতাগণ নিজ নিজ বাসভবনে পূজার প্রচলন করেন।  ধীরে ধীরে শহর কলকাতার অন্যান্য ধনী পরিবারগুলোতেও দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়।

বিংশ  শতাব্দীর প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলের বলরাম বসু ঘাট রোডে "সনাতন হিন্দু ধর্মোৎসহিনী সভার" সদস্যরা পাড়ার সকলকে নিয়ে দুর্গাপূজা আরম্ভ করে। এই পূজাটিই তিলোত্তমার বুকে প্রথম বারোয়ারী পূজা হিসেবে পরিচিত। আজও কঠোর নিয়মানুসারে পূজাটি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯১১ সালে শ্যামপুকুর আদি সার্বজনীন, ১৯১৩ সালে শ্যামবাজারের শিকদার বাগানে, ১৯১৯ সালে বাগবাজারে, ১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতি বারোয়ারীভাবে পূজা শুরু করে। বর্তমানে শহরের অলিতে-গলিতে পূজা হতে দেখা যায়। শহরে প্রায় হাজার তিনেক বারোয়ারী  দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

১৯৮৫ সালে বারোয়ারী পূজাগুলোতে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের প্রচলন হতে দেখা যায়।  এই বছরই এশিয়ান পেইন্টস বারোয়ারী পূজাগুলোতে "শারদ সম্মান" চালু করে। তিলোত্তমার বুকে  চালু হয়ে যায় থিম পূজা। মণ্ডপ সজ্জার  বদল দ্রুত গতিতে ঘটতে আরম্ভ করলো।  সাবেকিয়ানার বদলে চাকচিক্য ও আড়ম্বর বেড়ে যেতে দেখা গেলো। মানুষের মধ্যেও মণ্ডপের শিল্প নিয়ে তৈরী হতে লাগলো উৎসাহ ও উদ্দীপনা। পূর্বে বাঁশ-কাপড়ের মণ্ডপ আর সাবেকি প্রতিমাতে পূজা হতো। বর্তমানে পূজাকে ঘিরে শিল্পউৎসব শুরু হয়ে গেছে।

পরবর্তীকালে এশিয়ান পেইন্টসকে দেখে অন্যান্য বাণিজ্যিক সংস্থাও দুর্গাপূজায় শিল্প উৎকর্ষে নানারকম সম্মানের ডালা সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। থিম পূজাগুলোতে শুরু হয়ে গেছে তুমুল থিমের লড়াই। পূজা ঘিরে শুরু হয়ে গেছে প্রতিযোগিতা। থিম পূজাগুলোতে উঠে আসতে লেগেছে নানারকম শিল্প উৎকর্ষ। পূজার দৌলতে বহু বিলুপ্ত শিল্পও প্রাণ পেতে আরম্ভ করেছে।  উঠে আসতে  লাগলো আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা ও চলচ্চিত্রের প্রতিষ্ঠিত আর্ট ডিরেক্টররা থিম মেকার হিসেবে। এইসব থিম মেকারদের হাত ধরে পূজা মণ্ডপগুলো উদ্ভাষিত হতে লাগলো শিল্প উৎকর্ষে। বহু ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়েও অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি হতে লাগলো।  বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মন্ত্রীরা এক একটি পূজার সাথে নিজেদের জড়িয়ে নিতে শুরু করলো। পূজাগুলোকে তাঁরা তাঁদের জনসংযোগের হাতিয়ার করলো।  তাঁদের পূজাগুলোতে  ও অন্যান্য নামি পুজোগুলোতে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো দরাজ হাতে টাকা দিয়ে পূজাকে আরো সমৃদ্ধ করতে লাগলো।  বহু দুস্থ শিল্পী এই থিম পূজায় মণ্ডপ সজ্জার কাজ করে আর্থিকভাবে উন্নত হতে লাগলো। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়তে লাগলো। থিমের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে আলোকসজ্জা করা শুরু হলো। আলোকসজ্জাতে পূর্বে চন্দননগরের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে তাদের সাথে হাতে হাত রেখে বহু নবীন ও প্রবীণ আলোকশিল্পী তাদের আলোর খেলা দেখাচ্ছে।  থিমের পুজোয় মণ্ডপে আর পুরানো দিনের মতো চটুল গান শোনা যায় না।  সেই গানের বদলে থিম অনুযায়ী গান বা শব্দ ব্যবহার করা হয়।  এই কাজেও অনেক সংগীতশিল্পী ও সুরকার কাজ পাচ্ছে।

এখন কলকাতার দুর্গাপূজা সারা বিশ্বে একটা আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত।  পূজার কটাদিন ভারত তথা বিশ্বের বহু শহর থেকে বহু পর্যটক তিলোত্তমায় এসে ভীড় জমান। ইউনেস্কো প্রতি বছর তাদের বিশ্ব সংস্কৃতি বিভাগে বেশ কয়েকটি নতুন শিল্পকে সংযোজিত করে।  ২০২০ সালের দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কো তাদের মনোনয়নে রেখেছে। এটা দুর্গাপূজার ইতিহাসে একটা নতুন পালক হিসেবে দেখা দেবে। বাংলা তথা বাঙালির শিল্প নতুনভাবে বিশ্ব স্বীকৃতি লাভ করবে। পুজোর শিল্প সজ্জা নিয়ে সত্যিই আজ বাঙালির গর্বের দিন।



ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :১০-০৯-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 







Monday, September 2, 2019

শহীদ মিনার >

কলকাতা

শহীদ মিনার 


শহীদ মিনার 


ময়দানের এক কোনে  মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।  বয়স তার প্রায় দুই শতক হতে চলল। এখানে দাঁড়িয়ে সে দীর্ঘদিন ধরে শহরের কত ইতিহাস, কত ঘটনাকে চাক্ষুষ করে চলেছে।  কত সুখ দুঃখের সাথী।  তারই পদতলে কত নেতা কত মিটিং করেছে বহুকাল ধরে।  সে যে আমাদের তিলোত্তমার হাটথ্রম, সে যে আমাদের প্রাণের মিনার, আমাদের শহীদ মিনার। 

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলা। এই প্রাণকেন্দ্রের প্রাণবিন্দু হল অক্টালোরি মনুমেন্ট (Octerloney  Monument).বা শহীদদের  স্মরণে মিনার। দেখতে দেখতে প্রায় ১৯০ টা বছর পার হয়ে গেলো।  ১৫৮ ফুট উচ্চতা নিয়ে এখনো একপায়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার অন্যতম স্মৃতিস্তম্ভটি।  বিখ্যাত মার্কিন লেখক মার্ক টুইন তাঁর কলকাতা ভ্রমণের  সময়  বলে গিয়েছিলেন "Cloud Kissing Monument"।

১৮০৪ সালে ইন্দো-নেপাল যুদ্ধে গোর্খাদের বিরুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিযা  কোম্পানির কমান্ডার মেজর জেনারেল স্যার ডেভিড অক্টালনি।  তিনি এই যুদ্ধে কোম্পানির পতাকাকে বিজয় পতাকাতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর অক্লান্ত লড়াই ও কোম্পানি বাহিনীর বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে ব্রিটিশ সরকার এই স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করেছিল।  সৌধটির নকশা তৈরী করে দিয়েছিলেন জে পি পার্কার। ১৯২৮ সালে সরকারি কোষাগারের অর্থ সাহায্যে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সৌধটি নির্মিত হয়েছিল। কলকাতা ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোণে মিনারটি অবস্থিত।  সৌধটি উচ্চতায়  ১৫৮ ফুট, ভিতরে ২২৩ টি কুন্ডলি আকারের সিঁড়ি রয়েছে।গম্বুজটির ওপরে দুটি বারান্দা রয়েছে।  মিনারটির নিচের অংশ মিশরীয় স্থাপত্যে আর উপরের অংশটি সিরীয় এবং গম্বুজটি তুর্কি শৈলীতে তৈরী।  বার্ন এন্ড কোম্পানি মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন।  মিনারটির দক্ষিণ দিকে একটা বিরাট মাঠ রয়েছে।  এককালে এই মাঠটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশ ও নানারকম মেলা আয়োজিত হতো। ১৯৩১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিজলি জেলে তরুণ বন্দিদের হত্যার প্রতিবাদে এই মাঠেই এক সভায় পৌরোহিত্য করেছিলেন।  ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে তদকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকার সৌধটিকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিহত শহীদদের স্মরণে উৎসর্গ করে, তখন তারা সৌধটির নাম পরিবর্তন করে "শহীদ মিনার" করে। ব্রিটিশ সরকারের এক অসাধারণ নিদর্শন।

শহীদ মিনারের মাঠ 


পূর্বে লন্ডন আইয়ের মতো মিনারটির উপরে উঠে তিলোত্তমার দৃশ্য দেখতে দেওয়া হতো।  বর্তমানে কলকাতা পুলিশ উপরে ওঠার আর অনুমতি দেয় না। ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ  সরকার ৫০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে সৌধটির সংস্কারে হাত দিয়েছিল। সৌধটির ভিতর ও বাইরে সুন্দরভাবে আলোকিত করেছে।  সমগ্র সৌধটিকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে।  শোনা যাচ্ছে সংস্কারের কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এও শোনা যাচ্ছে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেলে দর্শকদের আবার উপরে ওঠার অনুমতি দিতে পারে। ডেভিড অক্টালোনি (১২ই ফেব্রুয়ারি ১৭৫৮-১৫ই জুলাই, ১৮২৫) ছিলেন একজন ব্রিটিশ সেনা আধিকারিক।  তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।  বিভিন্ন যুদ্ধে তার অসামান্য পারদর্শিতার জন্য তিনি মেজর জেনারেল পদে (১৮০৪ সালে) উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি দিল্লির রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৮০৩ সালে।  এই সময় তিনি যশোবন্ত রাও হোলকারের আক্রমণ, পিন্ডারী যুদ্ধে (১৮১৭-১৮১৮) দস্যু দমনে তিনি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন।  তার হস্তক্ষেপে বিখ্যাত অমৃতসর চুক্তি সাক্ষর হয়েছিল।  পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিংকে তিনি ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য করেছিলেন।  ১৮১৬ সালে নেপাল যুদ্ধে (১৮১৪-১৮১৫) জয়লাভ করে তিনি খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেছিলেন। নেপাল যুদ্ধের স্মারক হিসেবে কলকাতায় প্রসিদ্ধ "অক্টালোনি মনুমেন্ট" নির্মিত হয়।

শহীদ মিনার কলকাতার একটা আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান, যার সাথে ইতিহাস ও রাজনীতি জড়িয়ে রয়েছে।  কলকাতা দর্শন করতে আসলে  অবশ্যই এই স্মৃতিস্তম্ভটি দর্শন করা উচিত।


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :০৩-০৯-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।