Sunday, June 23, 2019

নদীর বাঁকে টাকী >


নদীর বাঁকে টাকী

ইছামতী 
নৌকো তার পাল তুলে ভেসে চলেছে, কারো মাথার ওপর ভারতের পতাকা, আবার কারো মাথায় উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা।  ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছুটা খামখেয়ালীভাবে তারা ইছামতীর বুকে ভেসে চলেছে। মাতাল হাওয়ায় পতাকাগুলো পত্ পত্ করে উড়ছে। ওপারে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা আর এপারে আমাদের টাকী। দুই দেশকে ভাগ করেছে ইছামতীর বিস্তীর্ণ জলরাশি। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক শ্রী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইছামতীকে দেখেছিলেন এক প্রকৃতি প্রেমিকের চোখে আর আমি শহুরে চোখে নীল আকাশের নীচে তার  অপরূপ শোভা দেখছি।  বহমান জলের  শোভা দেখতে দেখতে নদীর পাড় ধরে বাঁধানো রাস্তায় হেঁটে চলেছি। প্রকৃতির অপরূপ শোভা চাক্ষুষ করে মনটা আনন্দে ভড়ে  উঠছে। আমাদের বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে আর এক  বাংলার দৃশ্য দেখা যেন এক পরম পাওনা হিসেবে ধরা দিচ্ছে। রোদের ঝলকানি আজ বড়ই কম, মেখলা আকাশে, মিষ্টিমধুর বাতাসে, মাটির সোঁদা গন্ধে ক্রমশ নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। এখানে এক শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। চারদিকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স আমাদের সুরক্ষা বর্ধন করে চলেছে। খেয়াল করিনি হাঁটতে হাঁটতে কখন যে আমরা  পৌঁছে গিয়েছি টাকীর বিখ্যাত  পিকনিক স্পটে। শীতের সময় জায়গাটা বেশ জমজমাট থাকে।  আজ কোনো মানুষের দেখা নেই, নেই কোনো কোলাহল, একদম শান্ত নিরিবিলি। কত দূর দূরান্ত থেকে শীতের সময় লোকেরা এখানে পিকনিক করতে আসে। টাকী  পুরসভা বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে স্পটটি তৈরী করেছে। কয়েকটি চেয়ার ও একটা সুন্দর ভিউ পয়েন্ট তৈরী করে দিয়েছে।

ঘোষ বাবুদের ঠাকুর দালান 
ওখান থেকে আমরা ঘোষবাবুদের  পাড়ায় ঢুকে গেলাম। টাকীর জমিদার ছিলেন হরিনারায়ণ ঘোষ। তাঁর নামেই ঘোষ বাবুদের পাড়া।   কিছুটা এগোতেই টাকীর বিখ্যাত ঠাকুর দালানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। প্রসঙ্গক্রমে  জানাই ১৯২৪  সালে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও  নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ঘোষবাবুদের আমন্ত্রণে এনাদের বসতবাড়িতে এসেছিলেন।  এই দালানে ঢোকার জন্য একটা বিশাল কালো রঙের দরজা রয়েছে, সিংহ দরজা বলা চলে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে দরজাটিতে বহুকাল কোনো রঙের পোঁচ পড়েনি, তবে দরজাটি ঐতিহ্যের ম্মারক হয়ে এখনও  বিরাজ করছে। দরজাটি দিয়েই ভিতরে আমরা চারজন অর্থাৎ আমি, বিনীতদা, সৌম্য ও তন্ময় ঢুকে পড়লাম। জনমানব শূন্য জায়গাটা। অসাধারণ কারুকাজ করা এক ঠাকুর দালান।  রন্ধে রন্ধে তার প্রাচীনতার প্রমান দিচ্ছে।  বয়স নাকি চার শতক পেরিয়ে গেছে। রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে বড়ই ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে।  উপরের ছাদ ধসে গেছে, দেওয়ালের গায়ে বট বৃক্ষ  তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে, ঘুঘু তার বাচ্ছা নিয়ে বেশ সুখে-শান্তিতেই সংসার যাপন করছে। তবে প্রতিবছর এই দালানে দুর্গাপুজো হয়, সেই সময় অবশ্য বংশের সদস্যদের দেখা মেলে। এতো সুন্দর সৃষ্টির এই করুন অবস্থা দেখে মনটা বেশ বিমর্ষ হয়ে গেলো। এটাও হয়তো কালের বিবর্তনে একদিন হারিয়ে যাবে। একটু এগোতেই বাঁদিকে একটা পানাপুকুর আর ডানদিকে ঘোষবাবুদের বসত বাড়িটি রয়েছে। এই 
ঘোষবাবুদের ঠাকুর দালানের নকশা 
বাড়িটিও  প্রায় কয়েক  শত বছরের পুরোনো। বড় একটা সদর দরজা রয়েছে। দরজাটি বন্ধ থাকায় ভিতরে ঢুকে বাড়িটির বর্তমান  অবস্থাটা পর্যবেক্ষন করতে পারলাম  না, ভালো করে দেখাও হলো না। তবে বাইরে থেকে দেখে মনে হলো বেশ গাছ গাছালিতে ঘেরা একটা দোতলা বাড়ি। এখান থেকে বেরিয়ে একটু হাটঁতেই টাকীর বিখ্যাত রাষ্ট্রীয়  মহাবিদ্যালয়টির সামনে এসে পৌঁছলাম। মহাবিদ্যলয়ের সামনে ছাত্রদের  সাইকেল রাখার একটা  জায়গা করা আছে। আজ রবিবার, তাই বন্ধ রয়েছে। ১৯৫০ সালে মহাবিদ্যালয়টি  তৈরী হয়েছে।  এবার একটা টোটো ভাড়া করে টাকীর  বাকি দর্শনীয় স্থানগুলো দেখে নেবো।

রায়চৌধুরিদের বসতবাড়ি ও ঠাকুর দালান 
কলকাতা থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের কোলে  অবস্থিত  টাকী উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার   গ্রাম্যতায় মোড়া  এক ছোট্ট গ্রাম্য শহর।  এই শহরের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে রয়েছে কত কথা, কত কাহিনী, কত কিংবদন্তী, কত  ঘটনা। জমিদার প্রধান শহর টাকীতে আজ আর ঝাড়বাতির রোশনাই নেই। প্রাচীন রীতি মেনে সাবেকিয়ানায় শহরের জমিদার বাড়িগুলোতে আজও দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। টাকীর ইতিহাস ও জমিদার বৃত্তান্ত প্রায় সমার্থক। চারশো বছরের প্রাচীন শহরের মাটি এখানকার জমিদারির নীরব সাক্ষী।

জোড়া শিব মন্দির 
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সেই সময়কার জমিদারি প্রথা আজ মাটিতে বিলীন হয়ে গেছে।কয়েকটা পোড়ো বাড়ি শুধু আজ ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এখনো এখানকার বাতাসে জমিদারি মেজাজের গল্প ভেসে বেড়ায়। পঞ্চদশ শতকে ইছামতীর তীরে, সুন্দরবনের দ্বারপ্রান্তে গড়ে ওঠে প্রাচীন জনপদ টাকী। ইছামতীর গর্ভেই চাপা পড়ে আছে টাকীর অজানা ইতিহাস। ট্যাঁক শব্দটি থেকে টাকী নামের উৎপত্তি। ট্যাঁক মানে সরু মুখযুক্ত নদীর তীর।  টাকীর ইতিহাসে জমিদারদের প্রভাব ছিল বরাবর।  টাকীর স্রষ্টা বলে ধরা হয় রায়চৌধুরী পরিবারকে।  বিরাট গুহ ছিলেন এই পরিবারের আদিপুরুষ। রায়চৌধুরী তাঁদের পাওয়া পদবী। অষ্টাদশ শতকে রায়চৌধুরী পরিবারের কৃষ্ণদাস রায়চৌধুরী
ত্রিমূর্তি মন্দির 
শ্রীপুর থেকে এসে টাকীতে বসবাস করতে আরম্ভ করেন। এই বংশের কালীনাথ একজন সমাজসংস্কারক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি বারাসাত-টাকী এই ৩৩ মাইল রাস্তাটি ও টাকীতে একটা স্কুল তৈরী করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় টাকীর শিক্ষা ও সংষ্কৃতি বৃদ্ধিতে তিনি  অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই বংশেরই অষ্টাদশ পুরুষ  রামসন্তোষের পুত্রগণ টাকীতে চারটি বাড়ি বানান। দয়ারাম করেন পুবের বাড়ি, শ্যামসুন্দর করেন পশ্চিমের বাড়ি, রামকান্ত করেন দক্ষিনের বাড়ি এবং গোবিন্দপ্রসাদ করেন উত্তরের বাড়ি। প্রায় সব কটা বাড়ির বেশিরভাগ অংশই আজ  নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানের পুবের বাড়িটি নতুনভাবে তৈরী করেন সূর্যকান্ত রায়চৌধুরী। এই পুবের বাড়িটিও অর্ধ ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। ঘোষবাবুরাও  টাকীর অন্যতম জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঘোষবাবুদের আদিপুরুষ ছিলেন শ্রীশচন্দ্র ঘোষ। এই বংশের  হরিনারায়ণ ঘোষের হাত ধরেই ঘোষ পরিবারের জমিদারির উন্নতি শুরু হয়। পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরিরা জমিদারির  আরো  উন্নতি ও সম্প্রসারিত করেন। শুনলাম বর্তমানে তাঁদের বসতবাড়ী  আর বসবাসযোগ্য নেই , ঠাকুর দালানের অবস্থার বর্ননা আগে জানিয়েছি। অন্যান্য জায়গার মত টাকীতেও সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ, বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র, মামলা-মোকদ্দমা সবই চলেছে। টাকীর জমিদারি বৃত্তান্তে প্রগতি ও প্রতিক্রিয়া দুই ধারার মেলবন্ধন  ঘটতে  দেখা গেছে। শহরবাসীদের মুখে একটা প্রবাদ শোনা যায় "টাকীর লাঠি, সাতক্ষীরার মাটি, গোবরডাঙার হাতি" -  যা এক সময় গল্পগাথায় পরিণত হয়েছিল। টাকীর জমিদারদের বিখ্যাত লেঠেল বাহিনী, গোবরডাঙার জমিদারদের প্রচুর সম্পদ ও সাতক্ষীরার জমিদারদের প্রচুর ভূসম্পত্তি  ছিল। বর্তমানে টাকী পুরসভা এই গ্রামটিকে দেখাশোনা করে। এখানকার পুরসভাও খুব প্রাচীন। ১৮৬৯ সালের ১লা এপ্রিল টাকী পুরসভাটি  গঠিত হয়েছিল। পুরসভাটি ঘোষবাবুদের বসদবাড়িটি ভাড়া নিয়েও  কিছুদিন  চালানো হয়েছিল।

কুলেশ্বরী কালীবাড়ি 
টোটো গাড়ি প্রথমে আমাদের রাজবাড়ী ঘাটে নিয়ে এল।  টাকী পৌর সংস্থা বেশ সুন্দর করে ঘাটটিকে সাজিয়ে দিয়েছে। ঘাটটিতে ঢোকার জন্য একটা বড় প্রবেশ তোরণ করা আছে।  ভিতরে বসে ইছামতীর শোভা উপভোগ করার জন্য অনেক বড় জায়গা নিয়ে অনেকগুলো চেয়ার পাতা আছে। নদীর ধার বরাবর লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা রয়েছে।  এই ঘাটটির পাশেই এককালে শ্যামসুন্দর বাবুর তৈরী পশ্চিমের বাড়িটি ছিল,  যা আজও টাকীবাসীর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। পুরসভা পুরো বাড়িটি ভেঙে সামান্য অংশ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছে। এখান থেকে আমরা চলে এলাম টাকীর বিখ্যাত জমিদার রায়চৌধুরীবাবুদের বসতবাড়ি ও ঠাকুর দালান দেখতে। এই বাড়িটি বেশ বড় জায়গার মধ্যে একটা সাধারণ দোতালা বাড়ির মতো, জমিদার বাড়ির গন্ধ এখানে মিলবে না।  সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত এখানে প্রতিবছর নিয়ম করে দুর্গাপুজো করা হয়।  বাড়িটির ভিতর দিকে ঠাকুর দালানটি রয়েছে। বাড়িটির সামনে ও পাশে বিরাট জমি রয়েছে।  জমিটিতে অনেক গাছ রয়েছে। পরিবেশটা বেশ শান্ত ও একদম নিরিবিলি।  শুনলাম  বংশের লোকেরা মাঝে মাঝে আসেন।  কেয়ারটেকারের পরিবার এখানে দেখাশোনা ও বসবাস করে। মিনি সুন্দরবন যেতে গিয়ে পথে পড়ল "বিসর্জন" সিনেমার বাড়িটি। কি আশ্চর্য সিনেমাতে বাড়িটি দেখেছিলাম বাংলাদেশে কিন্তু এখানে এসে দেখলাম বাড়িটি ভারতবর্ষেই অবস্থিত। যাই হোক, টোটো থেকে নেমে বাড়িটি পর্যবেক্ষণ করে নিলাম। ভাঙা চোরা একটা কুঁড়ে বাড়ি।  পর্ণ কুটিরও বলা চলে। বাড়িটিতে কেউ বাস করে বলে মনে হলো না। এবার আমাদের দেখতে যাওয়ার পালা টাকীর মিনি সুন্দরবন। এটা নাকি টাকীর মুখ্য আকর্ষণ। আমাদের পৌঁছতে প্রায়  মিনিট কুড়ি লেগে গেলো। সীমান্ত সুরক্ষাকারীদের কাছে আধার কার্ড দেখিয়ে ভারতীয়  বলে প্রমান করতে হলো। প্রমাণিত হওয়ার পর তবে  ভিতরে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া গেলো। বিএসফের এই চেকপোস্টের একদম কাছেই নন্দদুলাল জীউর মন্দিরটি অবস্থিত। দেবকীনন্দনের প্রতিষ্ঠিত আসল মন্দিরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।  তারপর এখানকার  সেবাইতরা একটি চালাঘরে বিগ্রহ রেখে সেবা কার্য চালাচ্ছিলেন, একবার এক প্রবল ঝড়ে কাঁঠাল গাছ থেকে একটি ডাল ভেঙে মন্দিরের চালায় এসে পরে, এই ডালের আঘাতে ঘরটির সাথে বিগ্রহটির কিছু অংশ ভেঙে যায়। ভাঙা বিগ্রহ মন্দিরে রাখলে গ্রামের অমঙ্গল হবে বলে গ্রামবাসীরা মনে  করলেন । বর্তমানের এই মন্দিরটি  ও বিগ্রহটি গ্রামবাসীরা চাঁদা তুলে নির্মাণ করে দিয়েছেন। সেটা দেখে আর একটু এগোনোর পর মিনি সুন্দরবনে এসে পৌঁছলাম। টোটো রেখে দশ টাকার টিকিট কেটে হাঁটতে  শুরু করলাম ।   বেশ সুন্দর গ্রাম্য
বিসর্জন চলচ্চিত্রের শুটিং এই বাড়ীতে হয়েছিল 
পরিবেশ, পাকা সুন্দর সেতু রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গেছে, রাস্তার দুধারে গোলপাতার গাছ ভর্তি রয়েছে, সাথে অনেক সুন্দরী গাছও আছে দেখলাম।  চারদিকে নিঃস্তব্ধ, পাখির ডাক শুনতে শুনতে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললাম।  রাস্তার শেষে একটা বিশ্রামাগার করা আছে।  এখান থেকে কাঁচা পথ নেমে গেছে ইছামতীর বুকে। জায়গাটা ভালোই লাগল। গোলপাতার জঙ্গল বা মিনি সুন্দরবন দেখে আবার রওনা দিলাম জোড়া শিব মন্দির দেখতে। টাকীর জমিদার রামকান্তের পুত্র গোপীনাথ রায়চৌধুরী প্রায় তিনশো বছর আগে উত্তরপল্লী অঞ্চলে  একটা বিরাট পুকুর খনন করেন। এই পুকুরের পাড়েই  তিনি শিব মন্দির দুটি প্রতিষ্ঠা করেন। পুকুরের এপার থেকে মন্দিরগুলো দেখলাম। মন্দির দুটিকে নতুনভাবে পুরসভা সংস্কার করে রঙ করে দিয়েছে। ওই মন্দির দুটো শিবানন্দ মন্দির নামে  পরিচিত।  শিব চতুর্থীতে এখানে মেলা বসে। এবার আমরা চললাম মোহনা। পদ্মা, কালিন্দী ও ইছামতীর মিলনস্থান। মোহনার একটু আগে দেখলাম একটা বিশাল হোটেল তৈরী হচ্ছে। আমাদের টোটো
মোহনা ও বাংলাদেশের গোলপাতার জঙ্গল 
চালকভাইয়া জানালো এই হোটেলটি ইটিসি কোম্পানি বানাচ্ছে। মোহনার কাছ থেকে বাংলাদেশের গোলপাতার জঙ্গলটা দেখা যাচ্ছে।  এই জায়গাটি থেকে ইছামতী ও বাংলাদেশের দৃশ্য দেখতে মন্দ লাগলো না।  ফেরার পথে ইকো পার্কে ৩০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ঢুকলাম। পার্কটি বেশ সুন্দর।পার্কে  বোটিং করার সুব্যবস্থা রয়েছে। একটু এগোতে দেখতে পেলাম ত্রিমূর্তি মন্দিরটি। মন্দিরটি বেশী পুরোনো নয়। সুন্দরভাবে রঙ করা এক অপরূপ মন্দির। ত্রিমূর্তি মন্দিরটি দেখে চার শত বছর পুরনো  টাকীর কুলেশ্বরী কালীবাড়িতে  এলাম। টাকীর পাশ দিয়ে কোনো এক সময়  ইছামতী ছাড়াও নাকি যমুনা নামে একটা নদী প্রবাহিত হতো বলে অনুমান করা হয়।  সেই নদীর কুলেই এই কালিবাড়িটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। নদীর ঢেউয়ে পূর্বতন মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে  যায়। জলের স্রোতে মূর্তিটি এই স্থানে চলে আসে।  বর্তমানের সিমেন্টের মন্দির ও মূর্তিটি অমর রায়চৌধুরী তৈরী করে দিয়েছেন। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এখানে মেলা বসে।  এই মেলায় অনেক লোকের সমাগম হয়।   এবার আমরা চললাম টাকীর
রামকৃষ্ণ মন্দির ও আশ্রম  
বিখ্যাত রামকৃষ্ণ মিশনের মন্দিরটি দেখতে।  বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে মিশনটি গড়ে উঠেছে।  মিশনের ভিতরে মন্দির ছাড়াও একটা আবাসিক স্কুল ও গ্রন্থাগার রয়েছে। মিশনটি ও স্কুলটি সম্ভবত ১৯৩১-৩২ সাল নাগাদ স্থাপিত হয়েছে।

সবশেষে টাকীর বিসর্জনের কথা না বললে টাকী ভ্রমণের কথা পরিপূর্ণতা পায় না। আমি বছর পাঁচেক আগে একবার দশমীর দিন বিসর্জন দেখতে  এখানে এসেছিলাম। টাকীর পুজোর ইতিহাস প্রায় তিন-চারশো বছরের। শোনা যায় জমিদার জগৎবন্ধু রায়চৌধুরী প্রথম টাকীতে দুর্গাপুজোর প্রচলন  করেছিলেন।  সেই ধারা এখনো বজায় আছে, তবে আগেকার সেই জৌলুশ আর নেই।  একচালা ডাকের সাজের প্রতিমাই এখানে পুজো হয়ে থাকে। শুনেছি বংশ পরম্পরায় পুরোহিত, ঢাকি ও মৃৎশিল্পী কাজ করে চলেছে। দশমীর দিন এখানে সম্প্রীতি বন্ধনের এক মিলনমেলার প্রচলন ছিল।  হিন্দু মুসলমান সব একাকার হয়ে যেত, ভারত বাংলাদেশ মিলেমিশে এক হয়ে যেত। বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক এই দিন বিএসফের অনুমতি নিয়ে টাকী বেড়াতে  আসত। বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে আর তাদের আসার অনুমতি দেওয়া হয় না।  ইছামতীর বুকে টাকীর বিসর্জন বিশ্ব বিখ্যাত। বিজয়া দশমীর দিন টাকী ও সাতক্ষীরায় দেবীকে বিসর্জন দেয় দুই বাংলার মানুষ। টাকীতে দেখেছি সকালে দুটি নৌকোর মাঝে বাঁশ বেঁধে দেবীকে বসানো হয়, সারাদিন ধরে মাকে নিয়ে নৌকো দুটি ইছামতীতে পরিক্রমা করে।  সন্ধ্যের  সময় অশ্রুসিক্ত চোখে মাকে বিসর্জনের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয়। এই দিন বিসর্জনের দৃশ্য চাক্ষুষ করতে প্রায় হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়ে থাকে  . এই দিন  টাকী শহর  ও ইছামতীকে কঠোর নিরাপত্তায় বেঁধে ফেলা হয়।
ভাসানের উদ্দেশ্যে দেবীকে নৌকোয় তোলা হচ্ছে 
নদীজুড়ে বিএসফের বেশ কয়েকটি স্পীট  বোর্ড,  পুলিশের ও পুরসভার আরো কয়েকটি নৌকো নিরাপত্তায় থাকে।  ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের দল ও মেডিকেল দলকেও  প্রস্তুত রাখা থাকে।


আজকের মতো আমাদের ঘোরা শেষ হয়ে গেলো, এবার ফেরার পালা।  টোটো করে আমরা হাসনাবাদ স্টেশনে চলে এলাম।  তখন সূর্য ডুবতে অনেকটা সময় বাকি।  একটা ট্রেন স্টেশনে অপেক্ষা করছে, ছাড়ার সময় ৪-১৫ মিনিটে। আমরা উঠে পড়লাম। ট্রেনটি একদম ঠিক সময় ছেড়ে দিলো।

কিভাবে যাবেন :
শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকাল ট্রেন ধরুন। সময় মোটামুটি ঘন্টা দুয়েকে লাগবে,   টাকী রোড স্টেশনে নামবেন। স্টেশনের বাইরে প্রচুর টোটো গাড়ি দেখতে পাবেন, ওই টোটো গাড়ি করে রাজবাড়ী ঘাটে চলে আসুন। ভাড়া লাগবে জনপ্রতি ২০ টাকা। এছাড়া আপনি স্টেশন থেকেই সমগ্র টাকী বেড়ানোর জন্য টোটো গাড়ি ভাড়া নিয়ে নিতে পারেন। তাতে ভাড়া মোটামুটি  চার-পাঁচ জনের জন্য ৫০০ টাকা লাগবে। একটু দরদাম করে নেবেন। পর্যটক দেখলে অনেক ভাড়া বেশি চাইবে। এছাড়া ধর্মতলা থেকে বাসে করে এখানে পৌঁছানো যায়। নিজস্ব গাড়ি করে এখানে খুব সহজেই আসতে পারবেন এবং সময়ও অনেকটা কম লাগবে।

ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ২৪-০৬-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Friday, June 21, 2019

মাহেশের রথ>

মাহেশের রথ

দেখতে দেখতে প্রায় পাঁচ পাঁচটা শতক পেড়িয়ে গেছে।  ওখানকার মন্দিরের সেবাইতরা অবশ্য দাবি করেন ৬০০ বছর উর্ত্তীর্ন হয়ে গেছে। গত সোমবার তাঁর  প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেলো স্নানযাত্রার মাধ্যমে।  প্রথাগতভাবে জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রাকে স্নান করিয়ে  সুন্দরভাবে সাজিয়ে মন্দিরে এনে রাখা হয়। তারপর কিছুক্ষন মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হয়।  পরে ভক্তদের দেখার জন্য মন্দির খোলা হয়।  আমার খুব পরিচিত শেওড়াফুলি রাজবংশের সদস্য শ্রী আশীষ রায় মহাশয় রুপোর ছাতা ঠাকুরের মাথায় ধরার জন্য প্রতিবছরের  ন্যায় এবছরেও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর এই ছবি দেখে বছর তিনেক আগে আমার দেখা মাহেশের রথযাত্রার কথা মনে পড়ছিল। আজ তার কিছু স্মৃতিকথা বলার চেষ্টা করছি। 

রথযাত্রা মানে উৎসব। রথযাত্রার কথা বললে সবাই আগে পুরীর রথযাত্রাকে মনে করে।  ওড়িশার মতো বাংলায় এই রথযাত্রা খুবই প্রাচীন উৎসব।  হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের মাহেশের রথ বাংলার সবচেয়ে প্ৰাচীন রথ উৎসব।  শোনা যায় কমলাকার পিপিলাই ১৫৩৩ সালে এখানকার জগন্নাথ মন্দিরের সেবাইত হন এবং তিনি নাকি প্রায় পাঁচ শত বছর পূর্বে প্রথম রথ উৎসবটি শুরু করেছিলেন। আষাঢ় মাসের শুক্লা পক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। সনাতন হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান উৎসব হল এই রথযাত্রা উৎসব। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বর্তমানে এই উৎসব এক মিলনোৎসবে পরিণত হয়েছে।  এইদিন জগন্নাথ তাঁর ভাই বলরাম আর বোন সুভদ্রাকে নিয়ে মাসির বাড়ি যান। সাত দিন পরে অর্থাৎ উল্টোরথের দিন তাঁরা সকলে মাসি বাড়ি থেকে ফিরে আসেন।  এই উৎসব নিয়ে নানারকম পৌরাণিক গল্প রয়েছে, আজ আমি সেই গল্পের উপস্থাপন করে লেখাটিকে দীর্ঘায়িত করবো না।  আজ শুধু আমার স্মৃতিকথাই  আপনাদের জানাবো।

২০১৬ সালে রথের দিন সকালে বাজারে আমার বন্ধু  শঙ্করের সাথে দেখা হল।  দেখা হওয়ার পর ও মহেশের রথ দেখতে যেতে বলল।  আমি ওর কথায়  রাজি হয়ে গেলাম।  সকাল ১১টা  নাগাদ দুজনে যাত্রা শুরু করলাম।  সাড়ে বারোটা নাগাদ হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই শ্রীরামপুর যাওয়ার একটা ট্রেনও পেয়ে গেলাম। আধ ঘন্টার মধ্যে শ্রীরামপুরে পৌঁছে গেলাম। স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটু চা খেয়ে একটা অটো রিক্সা ধরে মাহেশে এলাম।  তখনও  রথের সাজগোছ চলছে। চারদিকে লোকে লোকারন্য।  অল্প সময়ের মধ্যেই রথ সাজানো শেষ হয়ে গেলো। ওখানকার সাংসদ শ্রী কল্যাণ ব্যানার্জী মহাশয় রথের দড়ি টেনে যাত্রার উদ্বোধন করলেন। একবার  উড়িষ্যার পুরীর রথ উৎসব দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।  এখানেও দেখলাম প্রায় সেরকম লোকের ভিড়, ঠ্যালা-ঠেলি চলছিল। মাঝে মাঝে দড়ির প্রাচীর গড়ে লোকের ভীড়কে সামাল দেওয়া হচ্ছিল। লোকের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে যাচ্ছিল। কিছু করার ছিল না, এভাবেই এই নিয়ম মেনেই সবাইকে রথ দেখতে হচ্ছিলো। আমরাও এই ভাবেই নিয়ম মেনে রথের সাথে এগিয়ে চলতে থাকলাম। রথের কাছাকাছি পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। ভীড়ের কাছে হার মানতে হলো আমাদের। রথের ধারে-কাছে ঘেঁষতে পারলাম না। রথের দড়িও টানা হলো না।  সুউচ্চ রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা বিরাজ করছেন।  অপরূপভাবে রথটিকে সাজানো হয়েছে। রথে উপবিষ্ট পুরোহিতরা মাঝে মাঝে বাতাসা ছুড়ে দিচ্ছিলেন ভক্তদের উদ্দেশ্যে।  আমাদের ভাগ্যেও একটা বাতাসা জুটে গিয়েছিল।   এইভাবে চলতে চলতে রাস্তার ধারে নির্মীয়মান একটা বাড়ির দোতলায় উঠে সব কিছু দেখছিলাম। জি টি রোড ধরে  প্রায় এক  কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে মাসির বাড়ি পৌঁছলো। রথের সমস্ত পরিক্রমাটা বেশ ভালোভাবে দেখলাম। বেশ ভালোই লাগলো।  এবার একটু মেলাটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।  খুবই ছোট্ট মেলা।  রাস্তার দুধারে নানারকম সরঞ্জাম নিয়ে দোকান করা হয়েছে। খেলনা, জামাকাপড়, গৃহস্থালী সামগ্রী আর প্রচুর পাঁপড়, ফুচকা ও জিলিপির দোকান রয়েছে দেখলাম। রাস্তার ধারে বেলুন বিক্রি হচ্ছে, বাচ্ছাদের বায়না মেটাতে অভিভাকরা কিনছেন।   মেলাটা দিন সাতেক চলে। উল্টোরথের পর আর কারোকে বসতে দেওয়া হয় না। আমরাও প্রথমে গরম গরম জিলিপি ও পরে পাঁপড়ভাজা খেলাম।  বেশ কিছুক্ষন ঘুরে ঘুরে সমগ্র মেলাটা উপভোগ করলাম। মেলা দেখে একটু ফাঁকা জায়গায় একটা চায়ের দোকানে চা খেতে ঢুকলাম। বেশ বয়স্ক ও অভিজ্ঞ দোকানদারকে দেখে মেলার ইতিহাস জানার লোভ সামলাতে পারলাম না। ওনার নাম বললেন গোবিন্দ সরকার। ওনার কাছে ইতিহাস জানতে চাইতে উনি বেশ আনন্দ সহকারে সব কিছু জানাতে আরম্ভ করলেন।

জনৈক বাঙালি সাধু ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী চতুর্দশ শতকের কোনো এক সময় পুরীতে জগন্নাথ দর্শনের জন্য গিয়েছিলেন। জগন্নাথদেবকে দেখে তিনি খুবই প্রীত হয়েছিলেন।  তিনি মাহেশের গঙ্গার ধারে জগন্নাথ,  বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ একটা ছোট্ট কুটিরে স্থাপন করেন।  শেওড়াফুলির জমিদার শ্রী মনোহর রায় পরবর্তীকালে ওই স্থানে একটা মন্দির নির্মাণ করে দেন।  জমিদারের নির্মিত মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে কলকাতার নিমাইচাঁদ মল্লিকের  সহায়তায় ১৭৫৫ সালে একটা নতুন মন্দির তৈরী করা হয়। গোবিন্দবাবু বললেন জগন্নাথ মন্দিরের সাথে যেমন  কলকাতার নাম জড়িয়ে আছে ঠিক এখানকার রথের সাথেও কলকাতার নাম জড়িয়ে আছে। মাহেশের প্রথম রথটি কলকাতার জনৈক ব্যক্তি তৈরী করে দিয়েছিলেন।  তাঁর নামটা উনি মনে  পারলেন না।  এই রথটা জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় কলকাতার কৃষ্ণরাম বসু পঞ্চচূড়াবিশিষ্ট একটা কাঠের রথ তৈরী করে দিয়েছিলেন।  ১৮৮৪ সালে ওই রথটি এক  বিভৎস্য অগ্নিকান্ডে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এই ঘটনায় শহরবাসীরা খুবই ভেঙে পড়েছিলেন। কলকাতার কৃষ্ণচন্দ্র বসু, যিনি সেইসময় হুগলির দেওয়ান ছিলেন, তিনি এক লক্ষ টাকা ব্যয় করে মার্টিন বার্ন কোম্পানিকে দিয়ে সম্পূর্ণ লোহার তৈরী একটা রথ শ্রীরামপুরবাসীদের উপহার দিলেন।  ৫০ ফুট উচ্চতার রথটির ওজন প্রায় ১২৫ টন ও রথটিতে ১২টি চাকা রয়েছে। সেই রথ আজও চলছে। প্রতিবছর নিয়ম করে রথটিকে মেরামত এবং রঙ করা হয়। তিনি আরো জানালেন এই রথ দেখতে নাকি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব , মা সারদা দেবী, নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পদধূলি  মাহেশে পড়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস "রাধারানী"  এখানকার মেলার পেক্ষাপটে লিখেছিলেন। গোবিন্দবাবু বলছিলেন এই রথকে কেন্দ্র করে সেকালে যেমন  উৎসাহ ছিল একালেও সমানভাবে  রয়ে গেছে। প্রতিবছর কত দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই রথ দেখতে আসে। শুধু তাই নয় আমি অনেক বিদেশিকেও এই রথ দর্শনে আসতে দেখেছি। মাহেশ এখন আর গ্রাম নয়, শহর। ঐতিহ্যে এই রথের মেলা  যতটা প্রাচীন বর্তমানে আয়তনে ততটাই ছোট।  গোবিন্দবাবু বলছিলেন আগে এই মেলা বিরাট আকারে হতো, এখন নগরায়নের চাপে স্থান সংকুলানের  জন্য তা  দিনকে দিনকে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ওনাকে প্রণাম জানিয়ে আমরা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম।

মাহেশের পর বাংলায় পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথযাত্রা খুব প্রাচীন রথ উৎসব।এছাড়া বর্ধমানের গুপ্তিপাড়া, কলকাতার ইস্কনের রথও খুব জনপ্রিয় রথ উৎসব। কিছুটা  হেঁটে  রিষড়া স্টেশান যাওয়ার জন্য একটা রিক্সা ঠিক করলাম। রিষড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে হাওড়া এলাম।




ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ২৩-০৬-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০



➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Monday, June 3, 2019

স্মরণিকায় কিছুক্ষন >

 কলকাতা 

স্মরণিকায় কিছুক্ষন........

স্মরণিকা মিউজিয়াম 
ট্রাম এই নামটার সাথে জড়িয়ে আছে শহরবাসীর নানারকম স্মরণীয় মুহূর্তের কত কথা।  আমাদের শহরের সাথে ট্রামের একটা নাড়ির টান রয়ে গেছে, এ যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। "চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন" - এরকম কত গানে বা কবিতায় ট্রামকে নিয়ে কত ভালোলাগার কথা সেই ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি । বাস্তবেও এই ধীর গতির ট্রাম শুধু একটা পরিবহনের বস্তু নয়, এ তিলোত্তমার এক আবেগ। ট্রাম ছাড়া আমাদের শহরকে ভাবা যায় না। শহরের ঐতিহ্যের সাথে যানটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বের অনেকগুলো শহরেই ট্রাম চলাচল করত। যা আজ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন  ও  মাত্র দু একটি শহরে চলতে দেখা যায়।  আমাদের শহরে ২৪শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৭৩ সালে সর্বপ্রথম ট্রাম পরিষেবা চালু করা হয়। আর্মেনিয়ান ঘাট থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত প্রথম ট্রামটি চালানো হয়েছিল। প্রথম ট্রামটি ঘোড়ায় টানা ট্রাম ছিল।  এটাই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ট্রাম পরিষেবা ছিল। কিছুদিন পরে এই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১লা নভেম্বর, ১৮৮০ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড রিপন আবার ট্রাম যাত্রার  উদ্বোধন করেন। এরপর "ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি" নামে  একটি সংস্থা তৈরী করা হয়।  এই সংস্থা তখন থেকেই কলকাতাতে  ট্রাম চালানোর দায়িত্ব নেয়। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ট্রামের  কোম্পানিটিকে অধিগ্রহণ করে। প্রথমদিকে ঘোড়ায় টানা ট্রাম বেশ কিছু বছর চালানো হয়েছিল  পরবর্তীকালে স্টিম ইঞ্জিনের মাধ্যমে ট্রামকে চালানোর ব্যবস্থা করা হয়। ১৯০২ সালে ট্রামকে বৈদ্যুতিকরণ করা হয়। এটাই এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবা ছিল।

গত ৩১শে মে গ্রীষ্মের এক তপ্ত দগ্ধ দুপুরে খিদিরপুর অঞ্চলে একটা কাজের জন্য যাই। কাজটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ায় হাতে অঢেল সময় উৎবিত্ত হয়ে যায়।  মনটাও বাড়ি ফিরে আসতে  চাইছিল না। বাস স্টপেজে এসে ভাবছিলাম কোথায় যাওয়া যায়।  সামনে দিয়ে একটা ট্রাম চলে গেলো। সেই ট্রাম দেখে আমার  ট্রাম চড়ার শখ জন্মালো। বহুকাল ট্রাম  চড়া হয়নি। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর সুন্দর চাকচিক্য মার্কা একটা ট্রাম এল।  ট্রামটি ধর্মতলাতে যাচ্ছে। দেরী  না করে ট্রামটির প্রথম কামরাতে উঠে পড়লাম। জানলার ধারে একটা বসার সিটও মিলে গেলো। ব্রিজ পাড় করে গড়ের মাঠের সবুজকে চিড়ে দুরক্ত গতিতে ট্রামটি চলছিল। এই রাস্তায় ট্রামে করে গেলে "ধীর গতির যান" এই কথাটা ভুলে যেতে হবে। বাঁদিকে সুন্দর রাস্তা আর ডানদিকে সবুজ মাঠ। মাঠে বাচ্ছা ও  যুবকদের ফুটবল খেলা দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম, বেশ উপভোগও করছিলাম। মাঝে মাঝে কন্ডাক্টারের বেলের টুং টুং শব্দের আওয়াজে  মনটাও ভরিয়ে তুলছিল। এইভাবেই চলতে চলতে ট্রাম ধর্মতলাতে এসে পৌঁছল। ট্রাম থেকে নেমে পড়লাম।  মনটা  তখন একটু চা চা করে ডাক পাড়ছিল।  চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম, কিছুটা এগোনোর পরই  হঠাৎ করে রাস্তায় আমার এক পুরোনো স্কুলের বন্ধু শুভাশিসের  সাথে দেখা হয়ে গেলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। আমি ওকে বললাম চল একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে কথা  বলি। শুভাশিস আমায় বললো এখানকার কোনো চায়ের দোকানের চা খেয়ে মন ভরবে না।  বরঞ্চ চল স্বরণিকাতে যাই। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল স্মরণিকা হয়তো কোনো রেস্টুরেন্ট  হবে। পৌঁছে দেখলাম ও আমায় ট্রামের মিউজিয়ামে নিয়ে এসেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এরকম একটা ক্যাফেটেরিয়া সমেত ট্রামের মিউজিয়াম আছে বলে  আমার জানা ছিল না। স্মরণীয় যানের সংগ্রহশালার নাম "স্মরণিকা" আমার মনে হলো একদম সার্থক নামকরণ। যাই হোক ২০ টাকা দিয়ে ও দুটো টিকিট কাটলো। টিকিট দেখিয়ে আমরা একটা বাতানুকূল দু-কামরার ট্রামের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। তপ্ত গরম থেকে এসে এই বাতানুকূল পরিবেশ মন্দ লাগছিল না।

এক কামরা বাতানুকুল ট্রাম 
ধর্মতলা ট্রাম ডিপোর সাথেই  ট্রামের দুটি কামরাকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই মিউজিমটিকে। ভিতরে প্রবেশ করার পর দেখলাম প্রথম কামরাটিতে  একটা ক্যাফেটেরিয়া  আর দ্বিতীয় কামরাটিতে একটা মিউজিয়াম তৈরী করা হয়েছে। প্রথম কামরার ক্যাফেটেরিয়াতে অনেকগুলো বসার জায়গা রয়েছে, বেশিরভাগ জায়গাতেই অনেকে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমরাও একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। ক্যাফেটেরিয়াতে বিস্কুট, চিপস ও কফি পাওয়া যায়।  আমরা একটা চিপসের প্যাকেট ও দুটো কফির অর্ডার দিলাম।  কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের খাবার পরিবেশন করা হলো। বেশ কিছুক্ষন আমি আর শুভাশিস কফি খেতে খেতে নানারকম সুখ-দুঃখের গল্প করছিলাম। কফি খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর আমরা দ্বিতীয় কামরায় মিউজিয়ামটি দেখতে
প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম 
গেলাম।  ট্রামের ইতিহাসকে খুব সুন্দর করে  এখানে দেখানো হয়েছে নানারকম আলোকচিত্রের মাধ্যমে। পুরোনো কলকাতা ও ট্রামের বিবর্তন সবটাই এইসব আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু। নীচের দিকে ছোট ছোট কাঁচের বাক্সের মধ্যে ট্রাম গাড়ির বিবর্তনের রেপ্লিকা করে রাখা আছে।  এছাড়া পণ্য পরিবহন ট্রামের রেপ্লিকাও আছে। ট্রামের জন্মলগ্ন থেকে ব্যৱহৃত  বিভিন্ন রকমের মুদ্রা ও টিকিট রাখা আছে। ট্রাম কোম্পানির কোষাগারে রাখা স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তরকালের ব্যৱহৃত টিকিট ও আনা পয়সা, টাকা, নয়া পয়সার বাতিল করা নমুনা এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। ট্রাম কোম্পানিতে ব্যৱহৃত ডোবানো নিবের কলম, ফাউন্টেন পেন , কাঁচের কলম ও দোয়াতদানও রাখা আছে।  ১৯২০ সালে ট্রাম কোম্পানি বাস চালু করেছিল। বাসগুলো সবই ট্রনিক্রফ্ট এন্ড কোম্পানির তৈরী ছিল।  ১৯২৫ সাল পর্যন্ত এই বাস পরিষেবা চালু ছিল।  সেই বাসের  একটা নমুনা মডেল হিসেবে রাখা আছে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ টিকিট নানা সময় ব্যৱহৃত হয়েছিল যেমন দৈনিক টিকিট, মাসিক টিকিট ও তার হোল্ডার, ছাত্রদের জন্য
 বিভিন্ন রকমের ব্যাজ 
বিশেষ ছাড়ের কুপন, খুচরোর পরিবর্তে ডিউ  কুপন ইত্যাদির নমুনা প্রদর্শিত হয়েছে। দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে কন্ডাক্টরদের টুপি, বাহুবন্ধ, ব্যাজ, বেল্ট ইত্যাদি। এগুলো দেখতে দেখতে পড়ন্ত বিকেলে আমি কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে পড়ছিলাম। মনের জানালা দিয়ে পুরোনো স্মৃতিগুলো উঁকি দিচ্ছিল।

বাঙালির নস্টালজিক আবেগটাকেই ট্রাম কোম্পানি তুরুপের তাস করেছে। শুনলাম এই মিউজিয়ামে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫ থেকে ১০০ জন দর্শক   আসে। কোম্পানি এই জাদুঘরটিকে আয়তনে ও বৈচিত্রে আরো বাড়াবার পরিকল্পনা করছে। ট্রাম তো শুধু আবেগ নয়, বাঙালির অহংকার, তিলোত্তমার গর্ব। এখানে এসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে ইতিহাসের সঙ্গে কিছু মুহূর্ত কাটাতে মন্দ লাগলো না।


সময়সূচি ও টিকিট :
বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিকটা দিন মিউজিয়াম খোলা থাকে দুপুর ১টা থেকে রাত  ৮টা পর্যন্ত।  টিকিটের মূল্য ১০ টাকা জন প্রতি।

ঠিকানা :
৬ নং সিদু কানু ডহর, ধর্মতলা, কলকাতা ৭০০ ০৬৯

কিভাবে যাবেন :
যেকোনো গাড়ি ধরে ধর্মতলায় চলে আসুন।  ধর্মতলা ট্রাম ডিপোর মধ্যেই এই সুন্দর মিউজিয়ামটি রয়েছে।

কিছু তথ্য :
এখানে কোনো ক্যামেরা ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, তবে আপনি আপনার মোবাইলের ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি তুলতে পারবেন।  মোবাইল ব্যবহারের উপর কোনো বাঁধা নিষেধ নেই।  এখানকার ক্যাফেটেরিয়াতে শুধু চা, কফি, বিস্কুট ও চিপস কিনতে পারবেন, অন্য কিছু এখানে পাওয়া যায় না। খাবার সামগ্রীগুলো পয়সা দিয়ে কিনতে হবে।


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ০৩-০৬-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Saturday, June 1, 2019

গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন >

গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন 


একটা বীজের মধ্যেই থাকে একটা সম্ভাবনাময় জীবন, ভালো প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভালো পরিচর্যা পেলে সেই বীজই একদিন এক মহীরুহে পরিণত হয়। আজ আমি সেরকমই এক প্রতিষ্ঠানের কথা বলবো, যা ভালো সংগঠকদের হাতে পরে সামান্য থেকে আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। জন্মের পর থেকে আশিটা বছর পাড় করে যা আজও বিশ্বজনীন ঐক্যসাধনের এক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। যার পঠন-পাঠন প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের জ্ঞানী-গুণী জনের সম্মান অর্জন করে চলেছে।

১৯৩৬ সাল, ভারত তথা বিশ্বের নানা জায়গাতেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্ম শতবর্ষ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আমাদের মহনগরেও বেশ আড়ম্বরের সাথেই ঠাকুরের  জন্ম শতবর্ষ পালন করা হচ্ছিল। সেই অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ ও জনসাধারণের কাছ থেকে বহু অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল। সমাপ্তি অনুষ্ঠানের পর উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে কলকাতাতেই একটা আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। আজ যে বাড়িতে অর্থাৎ ১৫নং কলেজ স্কোয়ারে তৈরী হয়েছে কলকাতার অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ভারতীয় কফি হাউস, সেই আলবার্ট হলেই ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ছিল শ্রী রামকৃষ্ণ জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটির কার্যালয়। সেই সময় "রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার" নামে একটি শাখাকেন্দ্র তৈরী করা হয়েছিল।  ২৯শে জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে এই আলবার্ট হলের তিনতলায় সকলের উপস্থিতিতে রামকৃষ্ণ মিশনের শাখা কেন্দ্র "রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার"-এই উদ্বোধন করা হয়।

এই কেন্দ্রটির জন্মলগ্নে কোনো আর্থিক সঙ্গতি ছিল না।  জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি প্রথমে ২৬৫৯ টাকা ও পরবর্তীকালে পুস্তক প্রকাশনার জন্য আরো ৩০১৮ টাকা শাখা কেন্দ্রটিকে দান করে। স্থান সংকুলানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে আলবার্ট হল থেকে ১৯ নং কেশব চন্দ্র সেন স্ট্রিটে উঠে যায়।  ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির কর্মের পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে।  পাঠাগার, ছাত্রাবাস, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, ও প্রকাশনার কাজ শুরু হয়।  এই স্থানও প্রয়োজনের তুলনায় ছোট হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি আবার স্থান পরিবর্তন করে ৪এ, ওয়েলিংটন স্কোয়ারে একটা তিন তলা বাড়িতে উঠে আসে। এই বাড়িতে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির সংবিধানে কিছু রদ-বদল করা হয়। সেই সময় রামকৃষ্ণ মিশন এই প্রতিষ্ঠাটিকে স্বয়ং সম্পূর্ণ একটা  প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দান করে।  ১৯৪৩ সালে কর্নেল ডি এন ভাদুড়ী ও তাঁর সহধর্মিনী শ্রীমতি হিমাংশুবালা দেবী ১১১ নং রসা রোডে প্রাসাদোপম একটি বাড়ি প্রতিষ্ঠানটিকে দান করেন। ২৯শে ডিসেম্বর, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ কলকাতার এই বাড়িতে উঠে আসে। ১৯৫০ সালে ইন্সটিটিউটটি UNESSCO-এর সাথে যৌথভাবে কাজ আরম্ভ করে। দিন কে দিন প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধি বেড়ে চলতে থাকে। এই বাড়িতে আসার পর প্রকাশনার কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সেই সময় কর্মকর্তারা একটা নিজস্ব বাড়ির প্রয়োজন অনুভব করতে থাকেন।

কলকাতা ইম্প্রুমেন্ট ট্রাস্টের কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আর্থিক সাহায্যে সাত লক্ষ টাকার বিনিময়ে সাদার্ন এভিনিউ ও গড়িয়াহাট রোডের সংযোগস্থলে একটা বিরাট জমি ক্রয় করা হয়।  কলকাতার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান "মেসার্স ব্যালাডি থম্পসন এন্ড ম্যাথু" বাড়িটির নকশা তৈরী করে দেয়। "মেসার্স মার্টিন এন্ড বার্ন কোম্পানি" বাড়িটি তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৯৫৫ সালের ৩০শে  জুন শাস্ত্রীয় মতে বাড়িটির  ভিত্তিস্থাপন করা হয়।  ১৯৬১ সালের ১লা নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী জওহরলাল নেহেরু এই সুরম্য অট্টালিকাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।  এই উদ্বোধন অনুষ্ঠান মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন ভারতের  উপ-রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল শ্রীমতি পদ্মজা নাইডু, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়,  ও ইনস্টিটিউটের সম্পাদক স্বামী নিত্যস্বরূপানন্দজী। এছাড়া এই অনুষ্ঠানে দেশ ও বিদেশের বহু গন্যমান্য ব্যক্তিত্ব  অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীকালে স্বামী লোকেশ্বরানন্দ মহারাজের ঐকান্তিক চেষ্টায় পার্শবর্তী আরো ৪০ কাটা জমি ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায় ক্রয় করা হয়। এই জমিতে নতুন একটা বাড়ি তৈরী করে মূল ভবনের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই বাড়িটি তৈরী করে "কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং" বলে একটি ভারতীয় সংস্থা।  ২০০৫ সালের ২০শে মে নতুন বাড়িটির গৃহপ্রবেশ করা হয়। কলকাতা পৌরসভা ১৯৯৬ সালের ২৭শে নভেম্বর  রামকৃষ্ণ মিশনের এই শাখাকেন্দ্রটির বাড়িটিকে "ঐতিহ্যশালী ভবন"-এর স্বীকৃতি প্রদান করে। বাড়িটি সত্য়ি খুবই দৃষ্টিনন্দনকারি একটি বাড়ি।

এই ইনস্টিটিউটিতে  ধীরে ধীরে বিভিন্ন বিভাগ চালু করা হয়।  এই বিভাগগুলোর কথা নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করলাম।

পত্রিকা :
১৯৫০ সালে প্রথম একটা কুড়ি পাতার পত্রিকা ইংরেজিতে প্রকাশ করা হয়। তারপর থেকে নিয়মিতভাবে এই পত্রিকা আজও প্রকাশ করা হয়ে থাকে।  এই পত্রিকার সাহায্যে দেশ বিদেশের মানুষকে ইনস্টিটিউটের কর্মধারা ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবহিত করা হয়। এই পত্রিকাটিতে দেশ বিদেশের বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষ তাঁদের মূল্যবান লেখা লিখে থাকেন।

প্রকাশনা বিভাগ :
১৯৩৮ সালের ২৯শে জানুয়ারি এই বিভাগটি আলবার্ট হলে চালু করা হয়েছিল। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি এই তিনটি ভাষাতেই প্রচুর মূল্যবান পুস্তক এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে।   "The Heritage of India" (আটটি খন্ডে প্রকাশিত) এই বইটি সর্ব প্রথম এখান থেকে প্রকাশিত হয়। স্বামী সুপর্ণানন্দজী মহারাজের সম্পাদনায় "History of Science in India" (আটটি খন্ডে প্রকাশিত) নামে  এক বিরল গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। এছাড়া "Swami Vivekananda in Contemporary Indian News", "SwamiVivekananda and Indian Nationalism", "The Universal Mother", "বেদান্ত ও রামকৃষ্ণ", "পূর্ণযোগী রামকৃষ্ণ" "শব্দকোষের ইতিহাস", "শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা", "বিশ্ববরেন্য রামকৃষ্ণ", "স্বামীজী ও তাঁর বাণী", ইত্যাদি বিখ্যাত গ্রন্থগুলি এখান থেকে প্রকাশিত হয়।  স্বামী শিবদানন্দ ও স্বামী সুবত্তমানন্দজীর তত্ত্বাবধানে এই বিভাগটি প্রভূত উন্নতি করে।

গবেষণা বিভাগ :
মূল ভবনের চতুর্থ তলে বিস্তীর্ণ জায়গা নিয়ে এই বিভাগটি রয়েছে।  দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও অধ্যাপকরা এই বিভাগের সাথে যুক্ত রয়েছে। এখানে বহু ছাত্র-ছাত্রী গবেষণার কাজ করে থাকে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিষয়কে নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে গবেষণা করা হয়।

সংগ্রহশালা :
এই সংগ্রহশালাটি মূল ভবনের তৃতীয় তলে অবস্থিত। এই  সংগ্রহশালাটিতে বহু মূল্যবান চিত্র, শিল্প নিদর্শন, সুচিশিল্প, লোকশিল্প, পুঁথি ও নানারকম ধাতু মূর্তি রয়েছে।  এছাড়া পটচিত্র, বস্ত্রশিল্প ও আলোকচিত্রও দেখতে পাওয়া যায়।  সংগ্রহশালার প্রদর্শনকক্ষে বাৎসরিক  ও সাময়িক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক অতিথিশালা ও ছাত্রাবাস:
১৯৫৪ সালে ছাত্রাবাসটি প্রথমে রসা  রোডের বাড়িতে চালু করা হয়েছিল।  পরবর্তীকালে এটিকে গোলপার্কের বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়।  ১৯৬১ সালে ছাত্রাবাসটির সাথে আন্তর্জাতিক অতিথিশালাটি যুক্ত হয়।  পঠন-পাঠন ও গবেষণার কাজে লিপ্ত এবং ভারতবর্ষকে জানবার জন্য যারা দেশ-বিদেশ থেকে গবেষণার কাজে এখানে আসেন, তাঁদের জন্য এখানে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু ব্যাক্তিত্বের এখানে আগমন ঘটেছে।

যুব বিভাগ :
স্বামীজী ভারত নির্মাণের কারিগর হিসেবে যুবশক্তিকে চিহ্নিত করেছিলেন।  জন্মলগ্ন থেকেই স্বামীজীর আকাঙ্খিত যুবশক্তির উন্নতি সাধনের কাজ করে চলেছে এই বিভাগটি।  দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের অনুদান, বৃত্তি ও পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। নিয়মিত কলকাতা ও বিভিন্ন জেলায় যুবসম্মেলনের আয়োজন করা হয়। স্বামীজীর আদর্শকে যুব শক্তির মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।

সাধারণ পাঠাগার :
জন্মলগ্নের  সময় থেকেই এই বিভাগটি চালু করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে ডাঃ বারিদবরণ মুখার্জী তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ৩০ হাজার গ্রন্থ এখানে দান করেছিলেন।  ইনস্টিটিউটের নানাবিধ কর্মের মধ্যে লাইব্রেরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান কর্ম।  বর্তমানে এখানে প্রায় চার লক্ষাধিক  গ্রন্থ সংগৃহিত রয়েছে। ১০,০০০ দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ এখানে রয়েছে।  প্রায় ৩০,০০০ ই-সাময়িক পত্র-পত্রিকার সুবিধা সদস্যরা পেয়ে থাকেন। এছাড়া কম্পিউটারাইসড ক্যাটালক ,ফটোকপি, ইন্টারনেট পরিষেবা, ম্যাপ, ল্যাপটপ  ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য সুবিধাও সদস্যদের দেওয়া হযে থাকে। সম্পূর্ণ বাতানুকূল বিশাল একটা পাঠকক্ষ রয়েছে,  যেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০০ জন বসে পড়তে পারে।

শিশু ও কিশোর গ্রন্থাগার :
সাধারণ গ্রন্থাগারের মতো শিশু ও কিশোরদের জন্য আলাদা করে আর একটা গ্রন্থাগার রয়েছে। সাধারণ গ্রন্থাগারের সব রকম সুবিধা এই গ্রন্থাগারে পাওয়া যায়।  এছাড়া ইনডোর গেম, মাল্টিমিডিয়ার সুবিধাও রয়েছে। প্রতি মাসের শেষ শনিবার সদস্যদের জন্য নানারকম শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া বাৎসরিক অঙ্কন ও অন্যান্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

পুস্তক বিপনী :
এই বিপনীতে এখানকার প্রকাশনা বিভাগের সমস্ত গ্রন্থ পাওয়া যায়।  এছাড়া অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থার রামকৃষ্ণ, সারদাদেবী, বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা সংক্রান্ত সমস্ত গ্রন্থ  ও অন্যন্য আধ্যাত্মিক  গ্রন্থও পাওয়া যায়। প্রত্যেকটা  বই ক্রয়ে এখানে  ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হযে থাকে।

এখানে ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় বেশি ছবি দিতে পারলাম না। গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশনের এই শাখা কেন্দ্রটিতে ঢুকলে অবাক হয়ে যেতে হয়। এটা বাড়ি না প্রাসাদ, আসলে এটা একটা জ্ঞানমন্দির, বিরাট কর্মকেন্দ্রের ভান্ডার। বেশিরভাগ লোকের ধারণা রামকৃষ্ণ মিশনের এই বাড়িটি একটি ধর্মীয় কালচারের প্রতিষ্ঠান।  এখানে না আসলে, বা এঁনাদের কাজের পরিধি সম্বন্ধে না জানলে বাইরে থেকে কোনো ধারণা করা যায় না।  এখান থেকে যে কি বিশাল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় তা জানলে বোঝা যায় কেন সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠানটি এতো জনপ্রিয়। এই প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে আমার নিয়মিত যাতায়াত আছে বলে এঁনাদের  কাজের পরিধি সম্বন্ধে সামান্য জ্ঞানার্জন করতে পেরেছি। আমাদের কল্লোলিনীতে বহু গর্বের জিনিস আছে। এই প্রতিষ্ঠানটি শহরবাসীর কাছে এক পরম অহংকার এবং অবশ্যই গর্বের প্রতিষ্ঠান।

তথ্যসূত্র : চিরন্তনে পঁচাত্তর

ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ০১-০৬-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 







Sunday, May 19, 2019

রবীন্দ্রনাথের আদি নিবাস >

রবীন্দ্রনাথের আদি নিবাস.....





পুরোনো কলকাতার গল্পে কলকাতার নানারকম কাহিনীর কথা বলা হয়। সেইসব কাহিনীর বেশিরভাগই কলকাতার স্থাপত্যের ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। কলকাতার ঐতিহ্য শুধুই তার স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই সময়কার কলকাতার পরিবহন, রাস্তাঘাট এবং কলকাতাবাসীদের জীবনধারণ, খ্যাদ্যাভাস সবই এই ইতিহাসের সামিল হয়ে আছে। কলকাতার আদি যুগে প্রচুর বর্ধিষ্ণু পরিবার এখানে বসবাস করত। তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে বজায় করে চলত। এইরকমই এক ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিখ্যাত  পরিবারের আদি নিবাসের কথা আজ  বলব। আমার এক বন্ধুর অনুরোধে এই বিষয় নিয়ে লেখা। এই কাহিনী হয়তো বেশিরভাগ মানুষের জানা আছে,  মবে হয়  কিছু মানুষের বা বর্তমান প্রজন্মের জানা নেই। তাই আজ আমার লেখার বিষয়বস্তু উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস নিয়ে।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি সর্বজন পরিচিত এক ঐতিহ্যশালী বাড়ি। এই ঠাকুর পরিবারের সন্তান দর্পনারায়ণ ঠাকুর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম বিশ্বজোড়া। এই পরিবারের ইতিহাস প্রায় তিনশো বছরের ইতিহাস। বাংলার নবজাগরণে এই পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর ছিল। সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজ-সংস্কার, শিল্পকলা ও সংগীতে এই পরিবারের নাম বাংলার ইতিহাসে প্রথম সারিতে রয়েছে। ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস কিন্তু জোড়াসাঁকো বা পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে ছিল না। তাঁদের পূর্ব পুরুষদের পদবিও ঠাকুর ছিল না।

এই ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস সম্বন্ধে নানাজনের নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন বর্ধমান জেলার কুশগ্রামে আদি নিবাস ছিল, কেউ বলেন অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার পিঠভোগ গ্রামে ছিল। আবার কেউ বলেন যশোর জেলা থেকেই এই পরিবারের উদ্ভব।  ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল। বর্ধমানের কুশগ্রাম থেকেই এই বংশের পদবি "কুশারী" হয়েছিল।  বর্ধমানের কুশগ্রামের কুশারীরাই বাংলাদেশের খুলনা ও যশোরে এসে বসবাস শুরু করে।  এই বংশের আদি পুরুষ ছিলেন জগন্নাথ কুশারী। তিনি খুলনা  থেকে যশোরে এসে বাস করেন। তিনি যশোরের পিরালী ব্রাহ্মণ শুকদেব রায়চৌধুরীর কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। জগন্নাথের পুত্র পুরুষোত্তম ও প্রপৌত্র ছিলেন পঞ্চানন কুশারী। এই পঞ্চানন কুশারী ভাগ্য অন্নেষণে গোবিন্দপুর গ্রামে এসে গঙ্গা তীরবর্তী স্থানে বসবাস শুরু করেন।  সেই আমলে যারা ভাগ্য অন্নেষণে কলকাতা, সুতানুটি বা গোবিন্দপুরে আসতেন, তারা বেশিরভাগই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কেউ কেউ আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে লিপ্ত হতেন। পঞ্চানন কুশারী কিন্তু ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন।  তিনি কোম্পানির জাহাজের ক্যাপ্টেন ও খালাসীদের বিভিন্নরকম মাল সরবরাহ করতেন। জাহাজে মাল ওঠানো-নামানোর কাজও তিনি করতেন।

 আমাদের দেশে বহু প্রাচীনকাল থেকেই ব্রাহ্মণ সন্তানদের "ঠাকুরমশাই" বলে সম্বোধন করা হতো। ইংরেজরা এই ঠাকুর কথাটিকে বিকৃত করে টেগোর বলতো। ঠাকুর মশাই খেতাবের আড়ালে তাদের আসল পদবি  হারিয়ে যেতে দেখা যেত। পঞ্চানন কুশারীকে ইংরেজরা পঞ্চানন টেগোর  বলে ডাকত। ব্যবসার কাজে যেসব নীচু শ্রেণীর মানুষের সাহায্য তিনি নিতেন, তারাও তাঁকে ঠাকুরমশাই বলে সম্বোধন করত। এইভাবে পঞ্চানন কুশারীও ধীরে ধীরে পঞ্চানন ঠাকুর হয়ে যান। ইংরেজরাও তাদের নথিপত্রে কুশারী পদবিটা পাল্টে ঠাকুর পদবি লেখা শুরু করে। এই পরিবার এইভাবে  কুশারী পরিবার থেকে  ঠাকুর পরিবারে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

পঞ্চানন ঠাকুরের দুই  পুত্র ছিল।  তাঁদের নাম জয়রাম,  রামসন্তোষ। পঞ্চানন তাঁর জীবদ্দশায় ইংরেজ কালেক্টর রালফ শেলডন সাহেবকে ধরে তাঁর দুই পুত্র জয়রাম ও রামসন্তোষকে  কোম্পানিতে আমিনের চাকরি করে দেন। তাঁরা দীর্ঘদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে আমিনের কাজ করেছিলেন। তাঁরা তখন গোবিন্দপুর নিবাসী ছিলেন। পরবর্তীকালে কোম্পানি গোবিন্দপুরে একটা দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। এই দুর্গই বর্তমানের ফোর্ড উইলিয়াম দুর্গ।  এই দুর্গ নির্মাণের জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন হয়ে পরে। কোম্পানি গোবিন্দপুরে বসবাসকারীদের এখানকার জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তখন জয়রামদের  এই জমির মায়া ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল। তাঁরা সেই সময় পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে চলে আসেন। জয়রামের চার পুত্র ছিল তাঁরা হলেন আনন্দরাম , দর্পনারায়ণ, নীলমনি ও গোবিন্দরাম। ১৭৫৬ সালে জয়রামের মৃত্যু হয়।  তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আনন্দরাম অকালে মারা যান। জয়রাম ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র গোবিন্দরাম নিঃসন্তান ছিলেন। চারজনের মধ্যে সুযোগ্য পুত্র ছিলেন দর্পনারায়ণ ও নীলমনি। দর্পনারায়ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। দর্পনারায়ণ ঠাকুরই ঠাকুর বংশের প্রথম পুরুষ হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। নীলমনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে সেরেস্তার কাজ করতেন। তাঁরা পাথুরিয়াঘাটাতে একটা বিশাল বাড়ি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে পারিবারিক বিবাদ শুরু হয়।। এই বিবাদের ফলে নীলমনি ঠাকুর পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ত্যাগ করেন। তাঁরা এক সালিশি সভা করে ঠিক করেন দর্পনারায়ণ নীলমনিকে এক লক্ষ টাকা প্রদান করবেন এবং গৃহদেবতা লক্ষীনারায়ানের ভার নীলমনিকে নিতে হবে। দর্পনারায়ানকে পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি দিয়ে নীলমনি তাঁদের গৃহদেবতা লক্ষীনারায়ণ ও এক লক্ষ টাকা নিয়ে পাথুরিঘাটার বাড়ি ত্যাগ করেন।। এই সময় বৈষ্ণবদাস শেঠ নামে এক ব্যবসায়ী নীলমনিকে চিৎপুরের মেছোবাজারে বাড়ি নির্মাণ করার জন্য কয়েক বিঘা জমি প্রদান করেন। নীলমনি ওই জমির উপর আলাদাভাবে নিজের বসতবাড়ি গড়ে তুললেন। নীলমনি ঠাকুরের তৈরী এই বাড়িই হলো আজকের জগৎবিখ্যাত "জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি"। মেছোবাজার অঞ্চলটি পরবর্তীকালে জোড়াসাঁকো নাম হয়েছিল। নীলমনি ঠাকুরের পুত্র দ্বারকানাথ। তিনি প্রথমে ল এজেন্ট ও.পরবর্তীকালে তিনি চব্বিশ পরগনার জেলার কালেক্টর ছিলেন। দ্বারাকানাথ পরবর্তীকালে রাজসাহীর কালিগ্রামের বিশাল জমিদারি কিনে জমিদার হয়ে যান। দ্বারকানাথের হাত ধরেই ঠাকুর পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।  বাঙালি সমাজ থেকে ইংরেজি সমাজ সর্বত্রই তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। ঠাকুর পরিবার জমিদার পরিবারে পরিণত হয়। প্রিন্স দ্বারকানাথের পাঁচ পুত্র ছিল যথাক্রমে দেবেন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ এবং নগেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন  কবি, সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও সমাজ-সংস্কারক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।  তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত।

এইভাবেই খুলনা থেকে গোবিন্দপুর, গোবিন্দপুর থেকে পাথুরিয়াঘাটা  হয়ে ঠাকুর পরিবার  জোড়াসাঁকোয় চলে আসেন। বিশ্ববিখ্যাত ঠাকুরবাড়ি তৈরী হয়।  কুশারী পদবি থেকে তাঁরা  ঠাকুর পদবি লাভ করে।

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


Tuesday, May 14, 2019

ব্যারাকপুর ভ্রমণ>

ঝটিকা সফরে ঐতিহাসিক শহরে


ব্যারাকপুর পশ্চিমবঙ্গের  এক সুপ্রাচীন শহর।  ব্যারাকপুরকে সাধারণত শিল্প নগর  বলা হয় কিন্তু এই নগরের নামের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস। জড়িয়ে আছে সেই প্রাচীন লাটসাহেবের বাংলো, এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা, বিখ্যাত ঘোড়দৌড়ের বিলুপ্ত ইতিহাস। যে মাটিতে ইংরেজরা  তাদের  ভারী বুটের আস্ফালন দেখিয়েছিল। সিপাহী মঙ্গল পান্ডে যে আস্ফালন সহ্য করতে পারেননি। মহিয়সী নারী লর্ড ক্যানিংয়ের ভালোবাসার শহর ছিল এই ব্যারাকপুর। শহরটি  উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গঙ্গা তীরবর্তী এক মহকুমা শহর। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্যারাকপুরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এই শহরেই দেশের প্রাচীনতম  বিমানঘাঁটি রয়েছে।  রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, সীমান্ত গান্ধী বাদশা খান, ও ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের পদধুলিমাখা শহর হল ব্যারাকপুর।

 ব্যারাকপুরের ইতিহাস :

ব্যারাকপুরের ইতিহাস জানা থাকলে আমার ধারণা এই সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক শহর ভ্রমণের আনন্দ লাভ করা যাবে। তাই আমি প্রথমে আমি ব্যারাকপুরের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত আকারে একটু ধরার চেষ্টা করছি।

ব্যারাকপুরের একসময় নাম ছিল "চানক"। ১৪৯৫ সালে বিপ্রদাস পিপিলাই রচিত "মনসামঙ্গল কাব্যে" এই "চানক" নামটা প্রথম পাওয়া যায়।  ১৮৭১ সালে কবি দীনবন্ধু মিত্র তাঁর "সুরধূনী" কাব্যেও "চানক"  নামটি ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা এখানে ব্যারাক অর্থাৎ সেনা ছাউনি তৈরী করে, সেই সময় ব্যারাক শব্দটি থেকেই চানক নামটা পরিবর্তিত হয়ে ব্যারাকপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। কারো কারো মতে ব্যারাকপুর একসময় সপ্তগ্রাম পরগনার অধীনে ছিল।  সেই সময় এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন রুকউদ্দিন বারবক শাহ। তাঁর স্মৃতিকে  স্মরণ করে লোকে  চানককে বরাবকপুর বলত। পরে অপভ্রংশ হয়ে ব্যারাকপুর হয়।   ১৭৬৫ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করেছিল।

২৫৪ বছর পূর্বে ব্যারাকপুরে যে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী হয়েছিল সেটাই ভারতবর্ষের ৬২টা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে সর্বপ্রথম ক্যান্টনমেন্ট ছিল। ১৮৫৭ সালের ২৯শে মার্চ ব্রিটিশ অবিচারের বিরুদ্ধে ব্যারাকপুরে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। দাঁত দিয়ে কার্তুজ কাটা নিয়ে অসন্তোষের স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে শুরু হয়। এই স্ফুলিঙ্গের আগুন জ্বলতে জ্বলতে এক মহাবিদ্রোহের রূপ নেয়। এখানকার সিপাহীরা  প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।  এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন ৩৪ নং রেজিমেন্টের ৫নং কোম্পানির সিপাহী মঙ্গল পান্ডে (সিপাহী নং ১৪৪৬)। ৩৪ নং রেজিমেন্টের দেশীয় বাহিনীর সার্জেন্ট মেজর হিউসন সাহেব জমাদার ঈশ্বরী পান্ডেকে হুকুম করেছিলেন বিদ্রোহী সিপাহীদের বন্দী করার জন্য।  ঈশ্বরী পান্ডে সেই হুকুম পালন করেননি। মঙ্গল পান্ডে সেই সময় লুকিয়ে হিউসন সাহেবকে লক্ষ্য করে বিদ্রোহের প্রথম গুলিটি চালিয়েছিলেন। যদিও গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। এই খবর পেয়ে ওই রেজিমেন্টের লেফটেনান্ট বি  এইচ বগ ঘোড়ায় চড়ে প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। মঙ্গল পান্ডে তাকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় গুলি চালিয়েছিলেন। বগ ঘোড়া সমেত মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। মাটি থেকে উঠে তিনি  মঙ্গল পান্ডেকে গুলি করেছিলেন, কিন্তু সেই গুলিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। মঙ্গল পান্ডের  ভাই মাতাদিন  বাল্মীকি, ঈশ্বরী পান্ডের সাথে আরো বেশ কিছু সিপাহী এই মহাবিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে এই অংশগ্রহণ করেছিল। এইভাবে বেশ কিছুক্ষন প্যারেড গ্রাউন্ডে বন্দুক ও তরোয়ালের লড়াই চলেছিল। বেগতিক দেখে মঙ্গল পান্ডে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি। তিনি ধরা পরে  গিয়েছিলেন।  ঈশ্বরী পান্ডেকেও সেইসময় ধরা হয়েছিল। অবশেষে ৮ই এপ্রিল ১৮৫৭ সালে মঙ্গল পান্ডে ও তাঁর ভাই মাতাদিন বাল্মীকিকে এখানকার ধোবি ঘাটে  ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

ব্যারাকপুর লাটভবন :
কলকাতার লাটভবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল ব্যারাকপুরের লাটভবনটিকে।  ১৮০১ সালে  লর্ড ওয়েলেসলি এই বিশাল  বাড়িটি  নির্মাণ শুরু করেছিলেন। বাড়িটি নির্মাণ করার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ হওয়ার জন্য বোর্ড অফ ডিরেক্টরস ওয়েলেসলিকে দেশে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। ১৮০৫ সালে ওয়েলেসলি বাড়িটি  অসমাপ্ত রেখে দেশে ফিরে  গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে যত গভর্নর এখানে এসেছিলেন সকলেই এই লাটভবন ও ব্যারাকপুর পার্কের উন্নতিসাধন করেছিলেন। সেই পার্কই আজকের মঙ্গল পান্ডে পার্ক।

এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা :
যখন বোর্ড অফ ডিরেক্টরস ওয়েলেসলিকে দেশে ফেরাবার জন্য করার ব্যবস্থা করছে, তখন ওয়েলেসলি একজন পরিবেশপ্রেমী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন।  তারই ফল স্বরূপ তিনি ১৮০০ সালে ব্যারাকপুরে তিনি এক পশুশালা তৈরী করেন। যেটা ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছিল। এই  চিড়িয়াখানায়  বাঘ, সিংহ, হরিণ, ভালুক, বানর, ক্যাঙ্গারু, গন্ডার ও  উট এইসব পশু ছিল বলে শোনা যায়। পরবর্তীকালে আলিপুর চিড়িয়াখানা তৈরী হওয়ার পর এইসব পশু ওখান থেকে আলিপুর চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরিত করা হয়।

বিখ্যাত ঘোড়দৌড় :
১৮০৬ সালে ব্যারাকপুরে ঘোড়দৌড় শুরু হয়েছিল। ঘোড়  দৌড়ের মাঠ  সেই সময় জমজমাট ছিল।কলকাতা থেকেও জনপ্রিয় ছিল এই ঘোড় দৌড়। সেই সময় তৈরী করা হয়েছিল একটা নতুন স্টেডিয়াম। কলকাতা থেকে ঘোড়দৌড় দেখতে আসার সুবিধার জন্য ১৮২৭ সাল নাগাদ রেল লাইন পাতা হয়েছিল। সেনানিবাসের ভিতরেই একটা রেলওয়ে স্টেশনও তৈরী করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য এই ঘোড়দৌড় বন্ধ হয়ে যায়।

ব্যারাকপুরের ইতিহাসের গল্পতো মোটামুটি জানালাম এবার আমার ঘোরার কথায় আসি। গত বছর লক্ষ্মী পুজোর পরের রবিবারে ফেসবুকের "সহযোগী" নামের  একটা গ্রুপের বিজয়া উপলক্ষে দুপুরে  এক মিলন উৎসব ব্যারাকপুরের গঙ্গার পাড়ের একটা বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই গ্রুপের কর্মকর্তা শ্রী বিশ্বজিৎ গুপ্তর অনুরোধে আমায় ওই অনুষ্ঠানে যোগদান করতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানে যোগদানের আগে ও পরে আমি ব্যারাকপুরের কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে নিয়েছিলাম। আজ সেইসব জায়গার কথা আপনাদের জানাব। ব্যারাকপুরের সব দর্শনীয় স্থানই  ইতিহাসের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ।  তা সে  আঠারো - উনিশ শতকের ইতিহাস হোক বা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস হোক। ইতিহাসকে বাদ  দিয়ে এই  শহরের কথা বলা সম্ভব নয়। আমি শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে ব্যারাকপুর স্টেশনে এসে নামলাম।

ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৬২ সালে শিয়ালদহ থেকে অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেল লাইন পেতেছিল। ব্যারাকপুর স্টেশনটা সেই সময়ই চালু করা হয়েছিল। ১৮৬২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ব্যারাকপুরের উপর দিয়ে প্রথম ট্রেন চলেছিল। স্টেশনটা আজ দেখতে দেখতে  ১৫০ টা  বছর অতিক্রম করে ফেলেছে। স্টেশনটা সত্যিই দর্শনীয়। শুধু দর্শনীয় নয়, খুবই সুন্দর। পুরোনো আমলের বাড়ি, দেখলাম স্টেশনটিকে খুব সুন্দরভাবে রক্ষনাবেক্ষন করা হয়। স্টেশনের বাইরে রয়েছে অটো, টোটো ও রিক্সা স্ট্যান্ড রয়েছে। স্টেশন চত্বরেই একদিকে কয়েকটি লস্যির দোকান আর একদিকে ফার্স্ট ফুডের দোকান আছে।  এই স্ট্যান্ড থেকে একটু এগোলে হরেক রকমের দোকান আছে , তার মধ্যে মন হরণ করা বেশ কিছু খাবারের দোকানও রয়েছে দেখলাম। ব্যারাকপুরের বিখ্যাত দাদা-বৌদির বিরিয়ানির দোকানটাও একবার ভালো করে দেখে নিলাম। এইসব খাবারের দোকানের দিকে না তাকিয়ে মনটাকে  শক্ত করে আমি অটো স্ট্যান্ডে ফিরে এলাম। অন্নপূর্ণা মন্দির দর্শনের জন্য এখান থেকে একটা অটো রিক্সা ধরে প্রথমে তালপুকুরে এসে নামলাম।

শিবশক্তি অন্নপূর্ণা মন্দির :
অন্নপূর্ণা মন্দির 
এক মন্দিরটি খুবই প্রাচীন এক মন্দির। মন্দিরটি রানী রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বা দেবী ১৮৭৫ সালে তৈরী করেছিলেন। মন্দিরটি  অবিকল দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের আদলে তৈরী। এই মন্দিরে দেবী অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠিত আছেন। এছাড়া মহাদেবও গর্ভগৃহে বিরাজ করছেন। মন্দিরটির পিছনদিকে ৬ খানা ছোট আকারের শিবমন্দির রয়েছে। একটা সুন্দর নাটমন্দির ও নহবৎখানাও রয়েছে। মন্দিরের পিছনের দ্বার দিয়ে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে। ঘাটটিও খুব সুন্দর করে বাঁধানো। ঘাটটির নাম "রাসমনি ঘাট"। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব চারবার এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন।  ঠাকুরের পদধূলিমাখা মন্দিরটি খুবই সুন্দর। এটি বঙ্গীয় স্থাপত্য শৈলীতে তৈরী নবরত্ন মন্দির। এখানে বেশ শান্ত  ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রয়েছে। মন্দিরটিতে ঢোকার জন্য একটা বিশাল প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রবেশদ্বারের উপরে একটা বিশাল সিংহের মূর্তি রয়েছে। মন্দিরটি দর্শনার্থীদের জন্য সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০ ও বিকেল ৪টা  থেকে রাত্রি ৮টা খোলা রাখা হয়। এখানে কিছুটা সময় কাটাতে মন্দ লাগলো না। তবে  দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের পরিবেশের সাথে এখানকার পরিবেশের  আসমান-জমিন ফারাক রয়েছে।


জগন্নাথ মন্দির 
জগন্নাথ মন্দির:  অন্নপূর্ণা মন্দির যাওয়ার পথে সুন্দর উজ্জ্বল কমলা রঙের একটা মন্দির দেখতে পেলাম। এই মন্দিরটি প্রভু জগন্নাথদেবের মন্দির। মন্দিরটির কারুকার্য খুবই আকর্ষণীয়। মন্দিরটির গেটের উপরে দেবী লক্ষ্মী ও বিষ্ণুর মূর্তি আর নীচের দিকে বিষ্ণুর দশাবতার মূর্তি স্থাপিত রয়েছে।  মন্দিরটির ভিতরে একটা নাটমন্দির ও গর্ভগৃহ রয়েছে। গর্ভগৃহে প্রভু জগন্নাথদেবের সাথে বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তিও  রয়েছে ।

শতবর্ষ অতিক্রান্ত  ব্যারাকপুর পুরসভা :
রিক্সা করে যেতে যেতে পথে পড়ল ব্যারাকপুরের আর এক ইতিহাসের সাক্ষর ব্যারাকপুর পুরভবন। এটা কোনো দ্রষ্টব্যস্থান নয়, তবে অবশ্যই  এক ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান।নবাবী আমলে ব্যারাকপুর ছিল সপ্তগ্রামের অধীন। ১৭৯১ সালে ইংরেজরা এখানে জমি কেনেন।  ১৮৬৯ সালে ব্যারাকপুরে দুটি  পৌরসভা (উত্তর ও দক্ষিণ) গঠিত হয়েছিল।  পরবর্তীকালে সাউথ ব্যারাকপুর পৌরসভা ভেঙে খড়দহ, পানিহাটি, টিটাগড় পৌরসভা গঠিত হয়েছিল। ১৯১৬ সালের ১লা এপ্রিল ব্যারাকপুর পুরসভা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা আজ শতবর্ষ অতিক্রম করে গেছে। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও ব্যারাকপুরের মণিরামপুরে তাঁর পৈতৃক বাসভবনে দীর্ঘদিন বাস করেছিলেন। তিনি প্রায় ৩৪ বছর উত্তর ব্যারাকপুর পুরসভার পুরপ্রধান ছিলেন। তিনি ১লা মে ১৯৮৯ সাল থেকে ১৫ই  অক্টবর, ১৯২১ সাল পর্যন্ত পুরপ্রধান ছিলেন। তারপর তাঁর পুত্র ভবশঙ্কর ব্যানার্জী ৫ই জুন ১৯২২ সাল থেকে ৩রা নভেম্বর ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এখানে পুরপ্রধান হিসেবে কাজ করেছিলেন। ১৯২৫ সালের ৬ই আগস্ট রাষ্ট্রগুরু ব্যারাকপুরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সেই কারণে ব্যারাকপুর পুরসভা খুবই ঐতিহ্যপূর্ণ এক পুরসভা।

বার্থোলোমিউ চার্চ : 
এই চার্চটি তৈরী করা হয়েছিল আঠারো শতকে। ১৮৩১ সালে চার্চটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের ২৬শে আগস্ট ব্যারাকপুর ডায়োসিস আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।  সেই সময় রোনাল্ড উইনস্টন ব্রায়ান বিশপরূপে এখানে  নিযুক্ত হন। তিনি চার্চটির প্রভূত উন্নতি করেন।  সেই সময় থেকেই এই চার্চটি ক্যাথিড্রাল চার্চ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীকালে এখানে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা থাকত। চার্চটি ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত। চার্চটির স্তাপত্যটিও  বেশ সুন্দর।

গান্ধী ঘাট :
গান্ধী ঘাটের প্রবেশদ্বার 
জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত ঘাট হল এই গান্ধী ঘাট। যখন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ গুরুতর  অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন মহাত্মা গান্ধী তাঁকে দেখতে ১৯২৫ সালের ৬ই মে ব্যারাকপুরে আসেন। ১৯৪৮ সালের ৩০শে  জানুয়ারী যখন মহাত্মা গান্ধী নিহত হন, তখন শাস্ত্র অনুযায়ী ভারতবর্ষের বিভিন্ন নদীতে তাঁর চিতাভস্ম অর্পণ করা হয়েছিল। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী এই ঘাটে জাতির জনকের চিতাভস্ম অর্পণ করেছিলেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ই জানুয়ারী তদকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই ঘাটটির উদ্বোধন করেন। এখানকার দ্রষ্টব্য হল ক্যান্টিলিভার প্রজেকশন, মণ্ডপ ও বিখ্যাত ভাস্কর  সুনীল পালের তৈরী গান্ধী জীবন নিয়ে পোড়ামাটির আলেখ্যটি। ঢোকার মুখেই একটা সুন্দর দ্বার রয়েছে।  দ্বার দিয়ে প্রবেশ করার পর একটু এগোলেই
গান্ধী ঘাট 
গঙ্গার তীরে বেশ সুন্দর একটা মিনার করা আছে।  মিনারটির  সাথে আড়াআড়িভাবে একটা বেশ প্রশস্থ ছাদ রয়েছে।  মিনারটির থেকে ধাপে ধাপে গঙ্গায় যাওয়ার সিঁড়ি নেমে গেছে।  মিনারটি ও সামনের দ্বার দুটিই শ্বেত শুভ্র রঙে রাঙানো রয়েছে।  এই সুন্দর পরিবেশে বসে গঙ্গার মনোরম হাওয়া খেতে বেশ ভালো লাগলো। এখানে কিছুক্ষন বসে এবার জওহরলাল নেহেরুর নামাঙ্কিত পার্কটি দেখতে গেলাম।


জওহরকুঞ্জ  পার্ক :
এই পার্কটি গান্ধী ঘাটের পাশেই অবস্থিত। তিরিশ টাকা টিকিটের মিনিময়ে পার্কটিতে  ঢুকতে হলো। গঙ্গার একদম পাশে ছোট বড় নানারকম গাছে সজ্জিত পার্কটি বেশ নিরিবিলি। পার্কটির ভিতরে একটা ছোট পুকুর আছে। কোথাও উঁচু,  কোথাও নীচু এইভাবে রাস্তাটিকে তৈরী করা হয়েছে।  ভিতরে একটা পাহাড়ি পরিবেশ তৈরী করার চেষ্টা করা হয়েছে। পার্কটিতে কয়েকটা ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা রয়েছে। গঙ্গার ধারে এই রকম একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। নদীর মৃদু-মন্দ স্নিগ্ধ হাওয়া আর সাথে পাখিদের কলতানে  কিছুক্ষন বিশ্রাম করে নিলাম। পরিবেশটা বেশ ভালোই লাগছিল। এর পর মঙ্গল পান্ডের নামাঙ্কিত উদ্যানে যাবো।

মঙ্গল পান্ডে উদ্যান :
মঙ্গল পান্ডে উদ্যানটি ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত। এই উদ্যানে ঢোকার জন্য প্রত্যেকের জন্য ১৫ টাকা আর ক্যামেরার জন্য ৫০ টাকা দিতে হয়।  আমি কড়কড়ে ৬৫টা টাকা গচ্চা দিয়ে উদ্যানটিতে ঢুকলাম। উদ্যানটি  সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যে ৬.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। ভ্রমণার্থীদের  জন্য একদম আদর্শ জায়গা।  উদ্যানটি বেশ সুন্দর।  পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য খুব ভালো জায়গা। উদ্যানটির  মধ্যে কয়েকটি খাবারের স্টলও আছে। একটা বেশ বড় প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখলাম বেশ খোলা মেলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গাটা। উদ্যানের পুরো রাস্তাটি খুব সুন্দর করে বাঁধানো রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে একটু এগোতেই দেখলাম মঙ্গল পান্ডের একটা মূর্তি বসানো আছে। এক জায়গায় দেখলাম দুটি জিরাফের মূর্তি আর এক জায়গায় দেখলাম বাচ্ছাদের জন্য স্লিপ, দোলনা ও আরো কয়েক রকম খেলনা আছে।  দোলনার উল্টোদিকে একটা কামান রাখা আছে।  গঙ্গার ধার বরাবর বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা রয়েছে।  ওই চেয়ারে  বসে কিছুক্ষন সময় কাটানো খুব স্বাদ ছিল, কিন্তু পূরণ হলো না।  সবকটা চেয়ারই  যুবক-যুবতীরা দখল করে রেখেছে। যাইহোক সবুজে মোড়া এক অসাধারণ উদ্যান দেখলাম, মন ভরে গেল।

গান্ধী স্মারক সংগ্রহশালা :
ব্যারাকপুর রিভার সাইড রোডে একদম গঙ্গার ধারে প্রায় আট-নয় বিঘা জায়গা নিয়ে সংগ্রহশালাটি তৈরী করা হয়েছে।  ১৯৬৬ সালের ৭ই মে এটির উদ্বোধন করা হয়েছিল। গান্ধীজি সম্পর্কিত প্রায় হাজার খানেক আলোকচিত্র, বেশ কিছু চিঠিপত্র আছে। সংগ্রহশালাটিতে পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। একটি কক্ষে বেশ বড় একটা দেওয়াল চিত্র রয়েছে, একটি কক্ষে গান্ধীজির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনাকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে  ধরা হয়েছে, একটি কক্ষে গান্ধীজির ব্যৱহৃত বেশ কিছু সামগ্রী রয়েছে, একটি কক্ষে সুন্দর একটা গ্রন্থাগার আছে আর একটা কক্ষে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র রয়েছে দেখলাম। সংগ্রহশালাটি বেশ ফাঁকা। এখানকার এক কর্মচারী বললেন রবিবার সাধারণত একটু ফাঁকা থাকে, অন্যান্য দিন স্কুল -কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড় থাকে। রবিবার সাধারণত বাইরের দর্শনার্থীরা আসে।

যখন মানুষ রোজকার জীবনের যাতাকলে হাঁপিয়ে  ওঠে, তখন সে একটু মনের খোরাক খুঁজতে চায়।  মানুষভেদে মনের খোরাক বিভিন্ন হয়, তবুও বলবো এখানে একদিনের জন্য ঘুরতে  আসলে আপনার মন  অবশ্যই আনন্দে ভরে উঠবে, বিদ্রোহী সিপাহীদের জন্য  শ্রদ্ধায় মাথা নত  হবে।

কিভাবে যাবেন : 
 শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ব্যারাকপুরগামী ট্রেন ধরে সোজা ব্যারাকপুর স্টেশনে এসে নামুন।  স্টেশনের বাইরে অটো, টোটো ও রিকশার স্ট্যান্ড রয়েছে।  এই স্ট্যান্ড থেকে শহরের সবকটা  দ্রষ্টব্যস্থানগুলো ঘোরার  জন্য অটো বা অন্য কোনো গাড়ি ভাড়া করে নিন।  ভাড়া মোটামুটি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো লাগবে। এছাড়া কলকাতা থেকে ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড ধরে সড়কপথেও ব্যারাকপুর আসা যায়।

কোথায় থাকবেন :
যদিও কলকাতা থেকে এখানে ঘোরার জন্য রাত্রিবাসের কোনো প্রয়োজন নেই, তবুও আপনি যদি এখানে রাত্রিবাস করতে চান তাহলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের  মালঞ্চ অতিথি নিবাসে থাকতে পারেন। এই অতিথি নিবাসটি কলকাতা থেকে বুক করতে হবে।


তারিখ : ১৪-০৫-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০



➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো  লাগে, তাহলে   অবশ্যই   আপনার  মূল্যবান  মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Thursday, May 9, 2019

নবাবহাট ১০৮ শিব মন্দির ভ্রমণ >

নবাবহাটে ২৩০ বছরের ইতিহাস 




পশ্চিমবঙ্গের একটি ঐতিহাসিক জেলা হল বর্ধমান জেলা।  এই জেলার প্রতিটি  ইটের গায়ে  জড়িয়ে আছে কত ইতিহাসের গল্প, রাজা-রানীদের নানান কীর্তি। জেলার নানান স্থানে নানারকম স্থাপত্যকীর্তি ছড়িয়ে আছে। এখনো তার কিছু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়, আবার কিছু জরাজীর্ণ ও কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা সর্বমঙ্গলা। তবে রাজ পরিবারের শিব ঠাকুরের প্রতি একটা আলাদা মোহ ছিল। এই জেলাকে শিব ঠাকুরের জেলা বললে ভুল বলা হয় না। সমগ্র জেলাজুড়ে অসংখ্য  শিব মন্দির রয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে  শিবঠাকুর বা মহাদেব পূজিত হয়ে থাকেন। কোথাও প্রতাপেশ্বর, কোথাও রাজেশ্বর, কোথাও পঞ্চানন, কোথাও বুড়োশিব, কোথাও বৈদ্যনাথ, কোথাও বুড়োরাজ নামে শিবঠাকুর পূজিত হন। শিবঠাকুরই এই জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা বলে মনে হয়। বর্ধমান জেলার সবচেয়ে বড় শিব ঠাকুর রয়েছে আলমগঞ্জের মোটা শিব নামে। এই শিবলিঙ্গটিকে বর্ধমানেশ্বর  বলে অভিহিত করা হয়। এই শিব লিঙ্গটির উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট আর ওজন প্রায় ৩৬০ কিলোগ্রাম (৯ টন)।  শোনা যায় ১৯৭২ সালে মাটি খোঁড়ার সময় এই বিশালাকৃতি শিবলিঙ্গটি পাওয়া গিয়েছিল।

বর্ধমান জেলার বর্ধমান শহরের খুব কাছের  একটা ছোট্ট গ্রাম  হল নবাবহাট।  নবাবহাট অঞ্চলেই মুঘলদের সাথে নবাবদের যুদ্ধ হয়েছিল। মুঘল আমলে বর্ধমানের নাম ছিল শরিফাবাদ। আবুল ফজলের  লেখা "আইন ই আকবরী" বইতে এই নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

বর্ধমান জেলা হল  ভারতবর্ষের একমাত্র জেলা যেখানে দু-দুটো ১০৮ শিব মন্দির রয়েছে। ভারতবর্ষের আর কোথাও এরকম শিব মন্দিরের সারিকে দেখা যায় না। বর্দ্ধমানের মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবী সর্বপ্রথম নবাবহাটে ১৭৮৮ সালে একটি ১০৮ শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ধমানের মহারাজ তেজবাহাদুর ১৮০৯ সালে জেলার কালনা শহরে আর একটা ১০৮ শিবমন্দির নির্মাণ করেন। কালনার এই শিবমন্দিরের সারিকে "নব-কৈলাশ শিবমন্দির" বলা হয়। আজ আমি নবাবহাটের শিবমন্দিরগুলোর কথা আপনাদের বলবো। প্রকৃতপক্ষে দুটি স্থানেই ১০৯ টি  করে শিবঠাকুরের মন্দির আছে।

একদা নাবাবহাট গ্রামে ভীষণ দুর্যোগ হয়, মন্বন্তরে  গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। এই সময় মহারাজ তিলকচাঁদের মৃত্যু হয়। তাঁর পুত্র নাবালক থাকায় তিলকরাজের বিধবা পত্নী মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবী কিছুদিন রাজ সিংহাসনে বসেন। মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবীর সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ বাঁধে। ইংরেজরা রানীর বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র করতে থাকে। মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবীর অনুগ্রহে নাবাবহাট গ্রামটি মন্বন্তরের হাত থেকে রক্ষা পায়। তিনি সর্বতোভাবে গ্রামবাসীদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এই সময় অর্থাৎ ১৭৮৮ সালে তিনি মহারাজ তেজপালের দাক্ষিণ্যে গ্রামবাসীদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে নাবাবাহাটে  একটা ১০৮ শিবমন্দির নির্মাণ শুরু করেন। নবাবহাটের মন্দিরগুলোর  নির্মাণ কাজ ১৭৯০ সালে শেষ হয়েছিল।

আমি যখন গতবছর  এই মন্দির দর্শনের জন্য গিয়েছিলাম তখন এরকমই মে মাসের এক ভীষণ গরমের দিন ছিল। মন্দিরের চাতালে পা দেওয়া যাচ্ছিল না। খালি পায়ে ওই গরম পাথরের চাতালেই হেঁটে মন্দিরগুলো দর্শন করতে হল।   মূল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে জুতো  রাখার লোহার একটা সুন্দর রেক রাখা আছে।  এই রেকে  জুতো রেখে তবে মূল মন্দিরে প্রবেশ করলাম।  এখানে জুতো রাখার জন্য সামান্য খরচা বহন করতে হয়।  জুতা রাখার পর একটা কল আছে সেখানে হাত ধুয়ে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হল। মন্দিরে প্রবেশ করার পর দেখলাম ডানদিকে একটা দোতলা বাড়ি আছে, এই বাড়িতে তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়িটির এক তলায় একটা ছোট্ট অফিস ঘর রয়েছে। মন্দিরগুলোর বামদিকে একটা সুন্দর বাগান রয়েছে। সমগ্র মন্দির চত্বরটি সুন্দরভাবে ঘেরা রয়েছে। মন্দির চত্বরের পিছনদিকে পুবদিক ঘেঁষা একটা সুন্দর জলাশয় রয়েছে। জলাশয়ের জল অতটা  স্বচ্ছ বা  পরিষ্কার নয়, একটু হলদেটে ঘোলা জল। জলাশয়টির  জলে গাছপালা ও মন্দিরের প্রতিফলন পড়ছে দেখলাম। প্রতিফলনটা দেখতে মন্দ লাগলো না।  সমগ্র জলাশয়টি লোহার জাল  দিয়ে ঘেরা রয়েছে। সামনের দিকে শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। পুরো  জলাশয়টির  পাড় সুন্দর করে বাঁধানো আছে।  জলাশয়ে  প্রবেশ করার জন্য কয়েকটা লোহার গেট করা আছে। জলাশয়টি ঠিক  একদম গোলাকৃতি  নয়, একটু লম্বাটে ধরনের। জলাশয়টির গেটের পাশে একটা বিজ্ঞপ্তি লাগানো আছে "জল নেওয়ার প্রয়োজন হলে মালির কাছ থেকে চাবি আছে, চাবি চেয়ে নিয়ে জল নেবেন এবং চাবি যথাস্থানে ফেরত দেবেন"। দুটি সারিতে ১০৮টি ও আর একটা আলাদাভাবে শিব মন্দির রয়েছে। এখানে মোট ১০৯টি শিব মন্দির রয়েছে। একটা নাটমন্দিরও রয়েছে দেখলাম। একটা মন্দিরের সাথে আর একটা মন্দির গায়ে  লাগানো, দুটি মন্দিরের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই।  সারা বছরই এখানে প্রচুর ভক্তের সমাগম হতে দেখা যায়।  মন্দির চত্বরের ভিতরে অফিস  ঘরের কাছে একটা জায়গায় লোহার ফ্রেমে ১০৮টি  ঘন্টা রাখা আছে। ঘণ্টাগুলো সম্পূর্ণ পিতলের তৈরী। ঘন্টাগুলি খুব বড় আকারের নয়, আবার একদম ছোটোও  নয়, মাঝারি মাপের।  সবাইকে দেখলাম  মন্দির দর্শন করার পর এখানে এসে এই  ঘণ্টাগুলো বাজাচ্ছে। ঘন্টা বাজনোয় অঞ্চলটিতে একটা মিষ্টি সুরেলা আবহাওয়া তৈরী করছে। কথিত আছে মন্দির দর্শনের পর এই ঘন্টা বাজালে নাকি মনস্কামনা পূরণ হয়।

কালনার নব কৈলাশ শিবমন্দিরের মতো এখানকার মন্দিরগুলো বৃত্তাকারে নয়, এখানে দুটি লম্বা সারিতে মন্দিরগুলোকে সাজানো হয়েছে। কালনার শিবমন্দিরগুলি যেন ফুলের মালায় ১০৮টি ফুলকে গেঁথে একটা মন্দিরমালা তৈরী করা হয়েছে। নবাবহাটের মন্দিরগুলো ঠিক ওইভাবে তৈরী নয়। এখানকার মন্দিরগুলো দুটি সারিতে সারিবদ্ধভাবে তৈরী করা হয়েছে।  মন্দিরগুলো আকারে বেশ ছোট। মন্দিরগুলোর উচ্চতা মোটামুটি পনেরো ফুটের মত হবে বলে আমার মনে হল। নাবাবাহাটের মন্দিরগুলি বাংলার আটচালা শিল্পরীতিতে তৈরী। সব কটা মন্দিরেই সামান্য টেরাকোটার কাজ রয়েছে। মন্দিরগুলির কোনোটাতে কোনো দরজা নেই। প্রত্যেকটা মন্দিরে শিব লিঙ্গ বিরাজ করছে। প্রতিটা শিবলিঙ্গই  কালো রঙের কোষ্ঠী পাথরের তৈরী।মন্দিরগুলো দেখলে বোঝা যায় সত্যিই  এক অসাধারণ শিল্পকীর্তি। মহারানী বিষ্ণুকুমারী দেবীর এক মহান কীর্তি এই শিবমন্দিরগুলো।  মন্দিরগুলো বর্ধমানের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

 এককালে এই মন্দিরগুলো জরাজীর্ন অবস্থায় চলে গিয়েছিল। ১৯৬৫ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সহযোগিতায় মন্দিরগুলোকে সংস্কার করা হয়েছে।  ১৯৭৪ সালে একটা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।  বর্তমানে মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষন থেকে নিত্যপূজা সবকিছুই এই ট্রাস্টিবোর্ড দেখাশোনা করে থাকে। প্রতিবছর শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে একটা বিশাল মেলা বসে।  সেই সময় এখানে নানান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে।  এই মেলায় প্রায় লাখ খানেক লোকের সমাগম হয়।

মন্দিরের প্রবেশদ্বারের পাশেই বাইরের দিকে কৃত্রিম পাহাড় তৈরী করা হয়েছে। এই  পাহাড়ের  উপর শিব-পার্বতী ও হনুমানজির মূর্তি রয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গনটি ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।  আমি যখন এই মন্দির দর্শনে যাই তখন একজন পুরোহিত মহাশয়কে দেখছিলাম অনেক খুঁজেও অন্যান্য মন্দিরের মত  কোনো পান্ডাকে এখানে  দেখতে পাইনি। পুরোহিত মহাশয় অন্যের পুজোয় ব্যস্ত থাকায় নিজের পুজো নিজেকেই দিতে হয়েছিল। এখানকার পরিবেশ আমার খুবই ভালো লেগেছিল। আপনারা বর্ধমান স্টেশন থেকে মাত্র দু-তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দিরটি দেখে আসতে পারেন। আশাকরি আমার মতো আপনাদেরও ভালো লাগবে।  মন্দির দেখার পর অবশ্যই বর্ধমানের বিখ্যাত মিহিদানা-সীতাভোগ খাবেন। বর্ধমানের এই  স্বাদ নিতে  ভুলবেন না।

মন্দিরগুলো সকাল আটটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত আর দুপুর তিনটে থেকে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত সর্ব সাধারণের  জন্য খোলা থাকে। দেখছিলাম একটা বোর্ডে কিছু নিয়মকানুন লেখা আছে। মন্দিরের ভিতরে কোথাও বসবেন না। মন্দিরের ভিতরে বা আশপাশে কোনোরূপ অশালীন আচরন করবেন না বলে বোর্ডটিতে লেখা আছে। তবে কোথাও ছবি তোলায় কোনো বারণ আছে, এই ধরণের কোনো বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়লো না।  আমি তো ইচ্ছে-খুশী মতো এখানে ছবি তুলেছিলাম। মন্দিরগুলো ২৫০ বছর ধরে বর্ধমানের ঐতিহ্যকে  বহন করে চলেছে।


কিভাবে যাবেন :
হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে করে বর্ধমান স্টেশনে এসে নামুন। স্টেশনের বাইরে প্রচুর অটো ও টোটোগাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে।  একটা গাড়ি বুক করে এখানে খুব সহজেই পৌঁছানো যাবে। গাড়ি করে আসলে বর্ধমান থেকে  জি টি রোড ধরে কিছুটাএগোলে ডানদিকে সিউড়ি রোড পড়বে।  এই সিউড়ি রোড ধরে সামান্য পথ এগোলেই এই মন্দিরগুলিকে দেখা যায়।




তারিখ : ১০-০৫-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো  লাগে, তাহলে   অবশ্যই   আপনার  মূল্যবান  মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।