Friday, September 27, 2019

মহালয়া অমাবস্যা >

মহালয়া অমাবস্যা 

মহালয়া এই শব্দটি বলতে আমরা বুঝি সাত সকালে উঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বজ্র গম্ভীর কণ্ঠে শোনা চন্ডীপাঠ আর মায়ের মর্ত্যে আগমনের বার্তাকে।  কিন্তু এই দিনই পিতৃপক্ষের শেষদিন।  পরদিন দেবীপক্ষের শুরু।  দেবীপক্ষের শুরু মানেই দূর্গা দুর্গতিনাশিনীর আরাধনার শুরু, বাঙালির শারদীয়া উৎসবের শুরু।  পিতৃপক্ষের শেষ দিন অর্থাৎ মহালয়ার দিন গঙ্গার ঘাটে ঘাটে দেখা যায় ষোলো শ্রাদ্ধ উৎযাপন হতে। হিন্দু রীতি অনুসারে মহালয়া হল প্রয়াত পূর্ব পুরুষদের তর্পনের মাধ্যমে স্মরণ করে তাদের শান্তি কামনার উদ্দেশ্যে জলদান করা হয়।  পিতৃপক্ষ নিয়ে আত্মার মোক্ষলাভের কথা মার্কন্ডেয় পূরণে বলা আছে।  দেবীপক্ষের সাথে যেমন  দুর্গাপুজোর যোগ আছে, তেমন পিতৃপক্ষের সাথে মহাভারতের যোগ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে মহাভারতে একটি আখ্যান রয়েছে।

মহাভারতে কর্ণকে আমরা সবাই জানি দাতা কর্ণ হিসেবে। কর্ণ সারাজীবন সোনা, রুপা, হীরে, জহরত দান করে এসেছেন। তিনি কোনো মানুষকে কোনোদিন কোনো খাবার বা পোশাক দান করেননি।  কর্ণের দাতার  ভূমিকা অর্থাৎ তার এইসব ভালো কাজের জন্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর  তিনি স্বর্গরাজ্যে পৌঁছতে পেরেছিলেন।  স্বর্গরাজ্যে যখন তার  আত্মার ক্ষিদে পেল, সে খেতে চাইল, তখন তাকে খাদ্য-পানীয়ের বদলে সোনা, রুপা, হীরে, জহরত খেতে দাওয়া হল।  কর্ণ অবাক হয়ে যমরাজের (মতান্তরে দেবরাজ ইন্দ্র ) কাছে জানতে চাইলেন, এগুলোর মানে কি? যমরাজ তাকে বলল দাতা হিসেবে তুমি খুবই ভালো কাজ করেছ, তাই তোমার স্বর্গলাভ হয়েছে।  কিন্তু তুমি দান হিসেবে সবাইকে সোনা, রুপা, হীরে, জহরত দান করেছ। কোনদিন কোন  বুভুক্ষ মানুষকে কোন খাবার দান করোনি। নিজের পূর্বপুরুষদের কথা কখনো ভাবোনি, তাদের কখনো খাবার বা জলদান করোনি। পূর্বপুরুষদের গমন পথে কোনোদিন আলোক প্রজ্জলিত করোনি। দাতার পুণ্যলাভের জন্য তুমি  স্বর্গে এসেছ ঠিকই, কিন্তু তুমি  খাদ্য-পানীয় পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হওনি।  তাই  তোমার এই পরিণতি হয়েছে।

কর্ণ যমরাজকে জানালেন তার পূর্ব পুরুষদের তিনি চেনেন না।  জন্ম মুহূর্ত থেকেই আমার মা আমায় ত্যাগ করে চলে গেছেন। সুত বংশজাত অধিরথ ও তাঁর পত্নী আমায় প্রতিপাল্ন করেন। আমার  বীরত্ত্ব ও শৌয্য  দেখে দুর্যোধন আমায় আশ্রয় দেন।  কুরুক্ষেত্ত্রের  যুদ্ধ শুরুর  আগে দিন প্রথমে কৃষ্ণ ও পরে মাতা কুন্তী আমায় আমার জন্ম ও বংশ পরিচয় জানান। এরপর যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেলো। পূর্ব পুরুষদের জল দেওয়ার সময় পাইনি তো।  তাহলে এখন উপায় কি? আমি কি কোনোদিনই খাদ্য বা পানীয় পাবো না। যমরাজ তাকে বললেন খাদ্য-পানীয় পেতে হলে তোমাকে আবার মর্ত্যে ফিরে  যেতে হবে এবং পূর্ব পুরুষদের জলদান করতে হবে।

যমরাজ তখন তাকে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ প্রতিপদ  তিথিতে ১৪ দিনের  জন্য আবার মর্ত্যে পাঠালেন। কর্ণ মর্ত্যে এসে এই ১৪ দিন সমস্ত বুভুক্ষ মানুষকে পেটভরে খাওয়ালেন, বুভুক্ষ মানুষদের আত্মার শান্তি ঘটালেন, মনের পরিতৃপ্তি পূরণ করলেন। পূর্ব পুরুষদের তিল ও জল দান  করলেন।  ১৪ দিন পর তিনি আবার স্বর্গে ফিরে আসলেন।  স্বর্গে এবার তাকে নানা পদের নানারকম খাবার খেতে দেওয়া হল।  কথিত আছে কর্ণের এই ১৪ দিনের  মর্ত্য সফরকে  পিতৃপক্ষ এবং মহালয়ার সময়কাল বলা হয়।  সেই থেকেই মহালয়ার দিন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পিতৃ  পুরুষদের উদ্দেশ্যে তিল ও জলদান করার রীতি প্রচলিত হয়েছে।  মহালয়ার অমাবস্যাকে সর্বপিতৃ অমাবস্যা, পিতৃ অমাবস্যা, পেডালা অমাবস্যা, মহালয়া অমাবস্যা বলেও অভিহিত করা হয়। তর্পনকারী প্রথমে ব্রহ্ম, বিষ্ণু ,ও মহাদেবকে জলদান করে। তারপর মানব শ্রেণীকে জলদান করে। মহালয়া অমাবস্যা তিথি থেকে পরের অমাবস্যা অর্থাৎ কালী পূজার অমাবস্যা পর্যন্ত পূর্ব পুরুষরা মর্ত্যে থাকেন বলে শাস্ত্রকারদের বা মানুষের অনুমান। 

মহালয়া পিতৃ পুরুষদের জলদান করার তিথি। মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপূজার কোনো যোগ নেই, যোগ নেই আকাশবাণীর প্রচারিত "মহিষাসুরমর্দিনী" গীতিআলেখ্যটিরও।


 ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :০৩-০৯-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Sunday, September 22, 2019

ফুলের বাজারে পূজার গন্ধ >

ফুলের বাজারে পূজার গন্ধ 


আমাদের তিলোত্তমায় বাজারের সংখ্যা প্রচুর।  বিচিত্র রকমের বাজার দেখা যায়।  শহরের জনবহুল ব্যস্ততম বাজারগুলির মধ্যে অন্যতম হল গঙ্গাতীরবর্তী মল্লিকঘাটে অবস্থিত ফুলের বাজারটি।  এটি এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজার।


ফুল হল বিশ্ব ভালোবাসার সর্বজনীন এক অনন্য উপহারের উপকরণ।  ফুলের আদান প্রদানের মত  নান্দনিক সুন্দর কাজ আর নেই।  ফুল শুধু নান্দনিকতার উপকরণ নয়, পূজার অন্যতম উপকরণও বটে।  বিশ্ব পেক্ষাপটে আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভীত গড়তে  সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হতে দেখা গেছে।  বাংলার আবহাওয়া, মাটি ফুল চাষের জন্য খুবই সহায়ক।  এশিয়ার দেশগুলোতে প্রাচীনকাল থেকেই ফুলের চাষ হয়ে আসছে। সজ্জায় বা পূজাপার্বনে ফুল সবসবসময়েই গ্রহণযোগ্য সামগ্রী।  পদ্ম, অপরাজিতা, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, শ্বেতচাঁপা, স্বর্ণচাঁপা , দোলনচাঁপা, গাঁদা,  বকুল, রজনীগন্ধা, জবা, কদম, কৃষ্ণচূঁড়া, রাধাচূঁড়া, মাধবীলতা, নয়নতারা, পলাশ, শিউলি, টগর, শালুক, শাপলা প্রভৃতি কত শত  ফুলের নাম শোনা যায়।  এদের গন্ধে মানুষ মাতোয়ারা।  বিয়ে বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতেও ফুলের যথেষ্ট কদর আছে।  যদিও বর্তমানে গন্ধহীন প্লাস্টিকের ফুল গৃহসজ্জা ও অনুষ্ঠানাদিতে বেশ কিছুটা জায়গা দখল করে নিয়েছে।  কিন্তু পূজা পার্বনে এইসব আর্টিফিশিয়াল ফুলগুলো এখনো কোনো দাঁত ফোটাতে পারেনি।  তবে দিনকে দিন যেভাবে আসল ফুলের  দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে কি হবে বলা মুশকিল। যতই প্লাস্টিকের ফুল ঘরে ঘরে সৌন্দর্যের প্রতীক হোক, কিন্তু আসল ফুলের গন্ধে মানুষ সব সময়ে মুগ্ধ থাকবেই। সেই স্থান কোনোদিনই নকল ফুলগুলো পূরণ করতে পারবে না। এজন্যই যেন বলা হয়  "ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায়"।


গঙ্গার ধারে  হাওড়া ব্রিজের তলায় অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম ফুলের বাজার। হাওড়া ব্রিজের তলায় গড়ে ওঠা এই ফুলের বাজারে ভোর হয় সূর্য ওঠার অনেক আগেই।  রাত থাকতেই ট্রেন বা ট্রাক বোঝাই  করে ফুল আসে।  আসেন খদ্দরেরা।  কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে ও  বিয়েবাড়ি থেকে নিত্যপূজার  সমস্ত ফুলের  যোগান এই বাজার দিয়ে থাকে। শহর ও শহরতলি থেকে ভোর তিনটে থেকে রাত  দশটা পর্যন্ত প্রতিদিন ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ভিড়ে গমগম করে এই সরু একফালি জায়গাটা। বর্তমানে ক্রেতা বিক্রেতার চাপে বাজারটা আর ওই এক ফালি জায়গাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।  বাড়তে বাড়তে তা স্ট্র্যান্ড রোডে এসে উপস্থিত হয়েছে।  প্রতিদিন কয়েক হাজার ক্রেতাকে যেমন দেখা যায় তেমন  প্রায় হাজারখানেক  বিক্রেতাকেও দেখা যায়।  দিনকে দিন চাহিদা বেড়েই চলেছে।  বিয়ে বা পূজা পার্বনের দিনগুলোতে তিলধারণের জায়গা থাকে না।  এখান  থেকে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ ও বেশ কয়েকটি দেশেও ফুল রপ্তানি হয়ে থাকে।  এখানে প্রায় ২৫০ টি স্থায়ী দোকান ও ৩০০ টির মত ভেন্ডার রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় লাখ  দশেক টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। অবস্থানগত কারণেও বাজারটি সকলকে বিস্মিত করে।  বাজারটির ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পুন্য সলিলা  গঙ্গা নদী আর ঠিক বিপরীত পাড়ে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে ব্যস্ততম হাওড়া স্টেশনটি রয়েছে।




 পচা ফুল-পাতায় জায়গাটা যেন এক নরককুন্ড।  এই নরককুণ্ডতেই প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা বিক্রেতার সমাগম হয়, চলে লাখ লাখ টাকার লেনদেন। এইভাবেই অস্বাস্থকর পরিবেশে বাজারটি চলে প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘন্টা ধরে।  দুপাশে স্তূপাকার ফুল ও ফুলের মালা মাঝের সরু জায়গাটা দিয়ে লোক  চলাচল ও ফুলবোঝাই ম্যাটাডোর চলাচল করে। এখানকার ক্রতা বিক্রতাদের ইচ্ছা ফুল বাজারটি "আধুনিক ফ্লাওয়ার মার্কেট"এ  পরিণত হোক। মল্লিকঘাট ফুলবাজারের অবস্থার উন্নতি ঘটানোর দু-একবার  চেষ্টা হলেও তা  এখনো পর্যন্ত সফল হয়নি। কয়েক বছর আগে সরকারি তরফ থেকে কিছু  পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা বিভিন্ন যাঁতাকলে আটকে রয়েছে। সংস্কারের কথা বহুবার শোনা গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাজার সেই পূর্বের মতো হতশ্রী অবস্থাতেই রয়ে গেছে। বিপজ্জনকভাবে দুলতে দুলতে চলা ম্যাটাডোরের আঘাতে প্রতিদিন ছোটোখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে।

সংস্কার হোক বা না হোক এই নরককুন্ডতেই দিকে দিকে  কিন্তু ফুলের সুবাস ছড়িয়ে  আছে, গেলে শুধু ফুলেরই নানারকম সুবাস নাকে আসে। রাশি রাশি ফুলের  স্তুপের পাশ দিয়ে আপনার হেঁটে  যাওয়াটা ভারী মনোরম লাগবে, আর আপনার জীবনে একটা দৃষ্টিনন্দন উপলব্ধি হয়ে উঠতে বাধ্য।

একজন বয়স্ক লোক গাঁদা, রজনীগন্ধার স্টিক  ও গোলাপ বিক্রি করছেন।  ওনার কাছ থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে দুটো রজনীগন্ধার স্টিক ও কিছু গোলাপ কিনে বাড়ির পথ ধরলাম। আমার মতো নগন্য একজন ক্রেতা যখন তার সামনে এসে দরদাম করছে তখন তার মুখে খেলে যাওয়া অনাবিল হাসি যা  দেখে আমার মনটা ভরে উঠেছিল, এই হাসি আমার জীবদ্দশায় সত্যি কোনোদিন  ভুলতে পারবো না। সারা রাস্তাটা রজনী গন্ধা ও গোলাপের সুবাস নিতে নিতে চললাম। স্মৃতির পাতায় এক মনরোম অনুভূতি  যোগ হলো, যা হয়তো কোনোদিন বিস্মৃতি হবে না।








ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :২২-০৯-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Tuesday, September 10, 2019

কলকাতার দুর্গাপূজা >

কলকাতার দুর্গাপূজা 




দুর্গাপূজা বাঙালিদের প্রধান উৎসব। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা।  এই শহর হিন্দু প্রধান বাঙালি শহর হওয়ায় দুর্গাপূজার আধিক্য অন্যান্য জায়গার তুলনায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ১৬১০ সালে দক্ষিণ কলকাতার বেহালা অঞ্চলের বড়িশায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের শ্রী লক্ষীকান্ত রায়চৌধুরী শহরে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা প্রচলন করেন, যা পারিবারিক পূজা ছিল।  এই পূজা তাঁদের পরিবারের আটচালায় আজও আড়ম্বরের সাথে অনুষ্ঠিত হয়।  তবে বর্তমানে পরিবারের আরও সাত  শরিকের বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়ে থাকে।  আটচালাসহ ছয়টি পূজা বড়িশা অঞ্চলে আর একটি পূজা বিরাটি অঞ্চলে ও একটি বেলঘরিয়াতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।  ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব তাঁদের  পারিবারিক দুর্গাপূজা শুরু করেন।  এই পূজায় সেই আমলে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ অধিকারিক  ও  শহরের অন্যান্য বিশিষ্টজনরা আমন্ত্রিত থাকতেন।   বাইজি নাচ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান ও তার সাথে মদ্যপানের আসর বসত। শহরে বাবু সম্প্রদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে পূজাটি। পূজাটিতে  শাস্ত্রাচার গৌণ ছিল, আনন্দানুষ্ঠানাদি প্রধান হিসেবে দেখা যেত।

পরবর্তীকালে রানী রাসমণি দেবী জানবাজারে তাঁদের বসতবাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেন। তিনি সম্পূর্ণ শুদ্ধাচারে পূজা করতেন।  তিনিও ইংরেজ অতিথি ও দেশীয় প্রজাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা রাখতেন। তাঁর পূজায় যাত্রানুষ্ঠান প্রধান ছিল।  রানীর মৃত্যুর পর তাঁর জামাতাগণ নিজ নিজ বাসভবনে পূজার প্রচলন করেন।  ধীরে ধীরে শহর কলকাতার অন্যান্য ধনী পরিবারগুলোতেও দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়।

বিংশ  শতাব্দীর প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলের বলরাম বসু ঘাট রোডে "সনাতন হিন্দু ধর্মোৎসহিনী সভার" সদস্যরা পাড়ার সকলকে নিয়ে দুর্গাপূজা আরম্ভ করে। এই পূজাটিই তিলোত্তমার বুকে প্রথম বারোয়ারী পূজা হিসেবে পরিচিত। আজও কঠোর নিয়মানুসারে পূজাটি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯১১ সালে শ্যামপুকুর আদি সার্বজনীন, ১৯১৩ সালে শ্যামবাজারের শিকদার বাগানে, ১৯১৯ সালে বাগবাজারে, ১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতি বারোয়ারীভাবে পূজা শুরু করে। বর্তমানে শহরের অলিতে-গলিতে পূজা হতে দেখা যায়। শহরে প্রায় হাজার তিনেক বারোয়ারী  দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

১৯৮৫ সালে বারোয়ারী পূজাগুলোতে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের প্রচলন হতে দেখা যায়।  এই বছরই এশিয়ান পেইন্টস বারোয়ারী পূজাগুলোতে "শারদ সম্মান" চালু করে। তিলোত্তমার বুকে  চালু হয়ে যায় থিম পূজা। মণ্ডপ সজ্জার  বদল দ্রুত গতিতে ঘটতে আরম্ভ করলো।  সাবেকিয়ানার বদলে চাকচিক্য ও আড়ম্বর বেড়ে যেতে দেখা গেলো। মানুষের মধ্যেও মণ্ডপের শিল্প নিয়ে তৈরী হতে লাগলো উৎসাহ ও উদ্দীপনা। পূর্বে বাঁশ-কাপড়ের মণ্ডপ আর সাবেকি প্রতিমাতে পূজা হতো। বর্তমানে পূজাকে ঘিরে শিল্পউৎসব শুরু হয়ে গেছে।

পরবর্তীকালে এশিয়ান পেইন্টসকে দেখে অন্যান্য বাণিজ্যিক সংস্থাও দুর্গাপূজায় শিল্প উৎকর্ষে নানারকম সম্মানের ডালা সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। থিম পূজাগুলোতে শুরু হয়ে গেছে তুমুল থিমের লড়াই। পূজা ঘিরে শুরু হয়ে গেছে প্রতিযোগিতা। থিম পূজাগুলোতে উঠে আসতে লেগেছে নানারকম শিল্প উৎকর্ষ। পূজার দৌলতে বহু বিলুপ্ত শিল্পও প্রাণ পেতে আরম্ভ করেছে।  উঠে আসতে  লাগলো আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা ও চলচ্চিত্রের প্রতিষ্ঠিত আর্ট ডিরেক্টররা থিম মেকার হিসেবে। এইসব থিম মেকারদের হাত ধরে পূজা মণ্ডপগুলো উদ্ভাষিত হতে লাগলো শিল্প উৎকর্ষে। বহু ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়েও অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি হতে লাগলো।  বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মন্ত্রীরা এক একটি পূজার সাথে নিজেদের জড়িয়ে নিতে শুরু করলো। পূজাগুলোকে তাঁরা তাঁদের জনসংযোগের হাতিয়ার করলো।  তাঁদের পূজাগুলোতে  ও অন্যান্য নামি পুজোগুলোতে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো দরাজ হাতে টাকা দিয়ে পূজাকে আরো সমৃদ্ধ করতে লাগলো।  বহু দুস্থ শিল্পী এই থিম পূজায় মণ্ডপ সজ্জার কাজ করে আর্থিকভাবে উন্নত হতে লাগলো। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়তে লাগলো। থিমের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে আলোকসজ্জা করা শুরু হলো। আলোকসজ্জাতে পূর্বে চন্দননগরের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে তাদের সাথে হাতে হাত রেখে বহু নবীন ও প্রবীণ আলোকশিল্পী তাদের আলোর খেলা দেখাচ্ছে।  থিমের পুজোয় মণ্ডপে আর পুরানো দিনের মতো চটুল গান শোনা যায় না।  সেই গানের বদলে থিম অনুযায়ী গান বা শব্দ ব্যবহার করা হয়।  এই কাজেও অনেক সংগীতশিল্পী ও সুরকার কাজ পাচ্ছে।

এখন কলকাতার দুর্গাপূজা সারা বিশ্বে একটা আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত।  পূজার কটাদিন ভারত তথা বিশ্বের বহু শহর থেকে বহু পর্যটক তিলোত্তমায় এসে ভীড় জমান। ইউনেস্কো প্রতি বছর তাদের বিশ্ব সংস্কৃতি বিভাগে বেশ কয়েকটি নতুন শিল্পকে সংযোজিত করে।  ২০২০ সালের দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কো তাদের মনোনয়নে রেখেছে। এটা দুর্গাপূজার ইতিহাসে একটা নতুন পালক হিসেবে দেখা দেবে। বাংলা তথা বাঙালির শিল্প নতুনভাবে বিশ্ব স্বীকৃতি লাভ করবে। পুজোর শিল্প সজ্জা নিয়ে সত্যিই আজ বাঙালির গর্বের দিন।



ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :১০-০৯-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 







Monday, September 2, 2019

শহীদ মিনার >

কলকাতা

শহীদ মিনার 


শহীদ মিনার 


ময়দানের এক কোনে  মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।  বয়স তার প্রায় দুই শতক হতে চলল। এখানে দাঁড়িয়ে সে দীর্ঘদিন ধরে শহরের কত ইতিহাস, কত ঘটনাকে চাক্ষুষ করে চলেছে।  কত সুখ দুঃখের সাথী।  তারই পদতলে কত নেতা কত মিটিং করেছে বহুকাল ধরে।  সে যে আমাদের তিলোত্তমার হাটথ্রম, সে যে আমাদের প্রাণের মিনার, আমাদের শহীদ মিনার। 

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলা। এই প্রাণকেন্দ্রের প্রাণবিন্দু হল অক্টালোরি মনুমেন্ট (Octerloney  Monument).বা শহীদদের  স্মরণে মিনার। দেখতে দেখতে প্রায় ১৯০ টা বছর পার হয়ে গেলো।  ১৫৮ ফুট উচ্চতা নিয়ে এখনো একপায়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার অন্যতম স্মৃতিস্তম্ভটি।  বিখ্যাত মার্কিন লেখক মার্ক টুইন তাঁর কলকাতা ভ্রমণের  সময়  বলে গিয়েছিলেন "Cloud Kissing Monument"

১৮০৪ সালে ইন্দো-নেপাল যুদ্ধে গোর্খাদের বিরুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিযা  কোম্পানির কমান্ডার মেজর জেনারেল স্যার ডেভিড অক্টালনি।  তিনি এই যুদ্ধে কোম্পানির পতাকাকে বিজয় পতাকাতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর অক্লান্ত লড়াই ও কোম্পানি বাহিনীর বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে ব্রিটিশ সরকার এই স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করেছিল।  সৌধটির নকশা তৈরী করে দিয়েছিলেন জে পি পার্কার। ১৯২৮ সালে সরকারি কোষাগারের অর্থ সাহায্যে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সৌধটি নির্মিত হয়েছিল। কলকাতা ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোণে মিনারটি অবস্থিত।  সৌধটি উচ্চতায়  ১৫৮ ফুট, ভিতরে ২২৩ টি কুন্ডলি আকারের সিঁড়ি রয়েছে।গম্বুজটির ওপরে দুটি বারান্দা রয়েছে।  মিনারটির নিচের অংশ মিশরীয় স্থাপত্যে আর উপরের অংশটি সিরীয় এবং গম্বুজটি তুর্কি শৈলীতে তৈরী।  বার্ন এন্ড কোম্পানি মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন।  মিনারটির দক্ষিণ দিকে একটা বিরাট মাঠ রয়েছে।  এককালে এই মাঠটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমাবেশ ও নানারকম মেলা আয়োজিত হতো। ১৯৩১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিজলি জেলে তরুণ বন্দিদের হত্যার প্রতিবাদে এই মাঠেই এক সভায় পৌরোহিত্য করেছিলেন।  ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে তদকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকার সৌধটিকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিহত শহীদদের স্মরণে উৎসর্গ করে, তখন তারা সৌধটির নাম পরিবর্তন করে "শহীদ মিনার" করে। ব্রিটিশ সরকারের এক অসাধারণ নিদর্শন।

শহীদ মিনারের মাঠ 


পূর্বে লন্ডন আইয়ের মতো মিনারটির উপরে উঠে তিলোত্তমার দৃশ্য দেখতে দেওয়া হতো।  বর্তমানে কলকাতা পুলিশ উপরে ওঠার আর অনুমতি দেয় না। ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ  সরকার ৫০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে সৌধটির সংস্কারে হাত দিয়েছিল। সৌধটির ভিতর ও বাইরে সুন্দরভাবে আলোকিত করেছে।  সমগ্র সৌধটিকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে।  শোনা যাচ্ছে সংস্কারের কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এও শোনা যাচ্ছে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেলে দর্শকদের আবার উপরে ওঠার অনুমতি দিতে পারে। ডেভিড অক্টালোনি (১২ই ফেব্রুয়ারি ১৭৫৮-১৫ই জুলাই, ১৮২৫) ছিলেন একজন ব্রিটিশ সেনা আধিকারিক।  তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।  বিভিন্ন যুদ্ধে তার অসামান্য পারদর্শিতার জন্য তিনি মেজর জেনারেল পদে (১৮০৪ সালে) উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি দিল্লির রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৮০৩ সালে।  এই সময় তিনি যশোবন্ত রাও হোলকারের আক্রমণ, পিন্ডারী যুদ্ধে (১৮১৭-১৮১৮) দস্যু দমনে তিনি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন।  তার হস্তক্ষেপে বিখ্যাত অমৃতসর চুক্তি সাক্ষর হয়েছিল।  পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিংকে তিনি ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য করেছিলেন।  ১৮১৬ সালে নেপাল যুদ্ধে (১৮১৪-১৮১৫) জয়লাভ করে তিনি খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করেছিলেন। নেপাল যুদ্ধের স্মারক হিসেবে কলকাতায় প্রসিদ্ধ "অক্টালোনি মনুমেন্ট" নির্মিত হয়।

শহীদ মিনার কলকাতার একটা আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান, যার সাথে ইতিহাস ও রাজনীতি জড়িয়ে রয়েছে।  কলকাতা দর্শন করতে আসলে  অবশ্যই এই স্মৃতিস্তম্ভটি দর্শন করা উচিত।


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ :০৩-০৯-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Thursday, August 15, 2019

দুর্গা কথা>

দুর্গা কথা




দূর্গা হলেন একজন জনপ্রিয় হিন্দু দেবী। হিন্দুরা তাঁকে মহাশক্তির একটি উগ্র রূপ হিসেবে মনে করেন। পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী তিনি মহাদেবের স্ত্রী পার্বতী এবং কালীর অন্যরূপ।  দুর্গাপূজা  বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পূজা। দেবী দুর্গা আবির্ভূত হন শক্তিরূপে।  হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মন্দ দেবতাদের ধ্বংস করার জন্যই তিনি আবির্ভূত হন এবং মন্দ দেবতাদের প্রধান মহিষাসুরকে বধ করেন।  স্কন্দ পূরাণে আছে রুরু দৈত্যের পুত্র দুর্গাসুরকে বধ করে দেবী জগতে দুর্গা নামে পরিচিত হন। আবার শ্রী শ্রী চণ্ডীতে আছে দুর্গম নামক মহাসুরকে বধ করে দুর্গা নামে প্রতিষ্ঠিত হন। বেশিরভাগ জায়গায় দেবী দূর্গা "মহিষাসুরমর্দিনী" নামে পূজিতা হন। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী দুর্গা শব্দের আক্ষরিক ব্যাখ্যা হল -

'দ'  হল  =  দৈত্যনাশক 
'উ '-কার হল  =  বিঘ্ননাশক 
'রেফ'  =  রোগ ক্ষয়ের অর্থ বহন করে 
'গ'  হল  =  পাপনাশক 
'আ'  হল  =  শত্রূর বিনাশ 

সকল বিঘ্ন, রোগ, ভয়, শত্রূ  হতে যিনি আমাদের রক্ষা করেন,  তিনিই হলেন দেবী  'দুৰ্গা'
দেবী দুর্গা হিন্দু সমাজে নারীর প্রতিচ্ছবি। নারী শুধু মমতাময়ী মা, প্রেমময়ী স্ত্রী, স্নেহময়ী কন্যা নয়, নারীর ভিতরের যে শক্তি, যে তেজ, যে ক্ষমতা তারই বহিঃপ্রকাশ দেবী দুর্গার মধ্যে প্রকাশিত।
কখনও তিনি মহামায়া কখনও  তিনি দুর্গতিনাশিনী  আবার কখনও  তিনি মহিষাসুরমর্দিনীরূপে মর্ত্যে  পূজিত হন। বসন্তকালে বাসন্তীপূজা আর শরৎকালে অকালবোধন দুর্গাপুজো সাধারণত  করা হয়ে থাকে। শরৎকালের পুজো সবচেয়ে জনপ্রিয়।   সমস্ত অশুভশক্তিকে পরাজিত করে অশ্বিনের শারদপ্রাতে মর্ত্যলোকে আবির্ভূত হন।  
.


দেবীর সৃষ্টি

সকল দেবতার শরীর থেকে নির্গত তেজোরাশি একত্রিত হয়ে এক দশভুজা নারীমূর্তি ধারণ করে।  

মহাদেবের তেজে তৈরী হয় দেবীমুখ
বরুণের তেজে জংঘা ও উরুদ্বয়
বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ
যমের তেজে কেশপাশ 
ইন্দ্রের তেজে শরীরের মধ্যভাগ 
চন্দ্রের তেজে স্তনযুগল 
পৃথিবীর তেজে নিতম্ব
 ব্রম্ভার তেজে পদযুগল
 সূর্যের তেজে পদ আঙ্গুলিসমূহ
 অষ্টবসুর তেজে হাতের আঙ্গুলিসমূহ 
কুবেরের তেজে নাসিকা,
সন্ধ্যাদেবীদ্বয়ের তেজে ভ্রূযুগল
 বায়ুর তেজে কর্ণদ্বয়
এবং বিশ্বকর্মা ও অন্যান্য দেবতাগণের তেজঃপুঞ্জ থেকে দশভুজা দেবী দুর্গা সৃষ্টি হলেন।
অনন্তর সমস্ত তেজোরাশিসম্ভূত মহাদেবীকে দেখে মহিষাসুরপীড়িত অমরগণ আনন্দিত হলেন।

দেবীকে  অস্ত্র প্রদান 

দেবতারা তাঁদের তেজরাশি  দিয়ে দশভুজা নারীকে তৈরী করলেন, এবার  তাঁকে অস্ত্র ও অলংকারে সজ্জিত করার পালা। দেবতারা দেবী দুর্গাকে নানারকম অস্ত্র ও অলংকার দিয়ে সজ্জিত করলেন।  ত্রিশূলধারী মহাদেব স্বীয় শুল থেকে শুলান্তর,  বিষ্ণু স্বীয় সুদর্শনচক্র থেকে চক্রান্তর উৎপাদন করে দেবীকে দিলেন , বরুণদেব দিলেন শঙ্খ , অগ্নিদেব দিলেন শক্তি , পবনদেব দিলেন একটি ধনু ও দুটি বানপূর্ণ  তূনীর,  ইন্দ্র তাঁর বজ্র থেকে বজ্রান্তর এবং ঐরাবত নামক স্বর্গগজের গলদেশস্থ ঘন্টা থেকে ঘন্টান্তর  উৎপাদন করে দিলেন, যমরাজ দিলেন কালদন্ড থেকে একটি দণ্ড, জলদেবতা বরুণ নিজের পাশ থেকে একটি পাশ, প্রজাপতি ব্রম্ভা রুদ্রাক্ষমালা থেকে একটি মালা ও কমণ্ডলু থেকে সৃষ্ট একটি  কমণ্ডলু,  নিমেষাদিকালাভিমানিনী দেবতা একটি প্রদীপ্ত খড়গ ও একটি ঢাল, ক্ষিরোদসমুদ্র দিলেন উজ্জ্বল মুক্তাহার, বজ্রযুগল ,দিব্যচূড়ামণি, দুইটি কুণ্ডল , হস্তসমূহের বলয়গুলি, শুভ্র ললাটভূষণ, সকল বাহুতে অঙ্গদ (বাজু), পায়ের নুপুর, কণ্ঠভূষণ ও অঙ্গুলিগুলির অঙ্গুরী, বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার, নানাপ্রকার অস্ত্র, অভেদ্য কবচ, সমুদ্র তাঁর শিরে অম্লান পদ্মের একটি মালা, বক্ষের একটি মালা ও হস্তে একটি পদ্ম দান করলেন ,গিরিরাজ হিমালয় দিলেন বাহনস্বরূপ সিংহ ও বিবিধ রত্ন, কুবের দিলেন পানপাত্র ,নাগরাজ বাসুকি মহামণিশোভিত একটি নাগাহার  প্রদান করলেন। অন্যান্য দেবগন কর্তৃক অস্ত্র ও অলংকারে ভূষিত হয়ে জগন্মাতা দেবী দূর্গা বারংবার অট্টহাস্য ও হুঙ্কার করতে লাগলেন। 

ক্রমবিকাশের পথে দেবী দূর্গা 


আদিম যুগে শুধু ভারতবর্ষেই নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশে প্রাণস্পন্দন ও প্রাণস্পন্দনহীন প্রাণী ও পদার্থের পূজা ও আরাধনার প্রচলন ছিল।  আদিম ও অনুন্নত যুগে বিদেহী আত্মা, ভূত-প্রেত প্রভৃতি অপদেবতাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পূজার প্রচলন ছিল। প্রাচীনকালে বৃক্ষকে কল্পনা করা হতো সূর্যের আশ্রয়রূপে। আকাশের সাথে বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হত। যেসব বৃক্ষগুলি সুউচ্চ ও সুপ্রসারিত যেমন বট, অশ্বত্থ, বেল, নিঁম এগুলিকে আকাশ বা সূর্যের আশ্রয় বলা হত এবং পূজা করার রীতি চালু ছিল। বৃক্ষ পূজার পর এলো যূপ ও স্তুপ পূজা। এগুলো বৈদিক যাগযজ্ঞে ব্যৱহৃত হত।  যূপ থেকেই ক্রমে শিবলিঙ্গের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়েছে। যূপ ও বৃক্ষ পূজা আর্যসভ্যতার নিদর্শন। দেবী দুর্গার পূজা গোড়ার দিকে অশ্বত্থ, নিম, বেল প্রভৃতি বৃক্ষে করা হত।  বিল্ল বৃক্ষকে  সেখানে দেবী দূর্গা ভাবা হত। ষষ্ঠী তিথিতে বিল্ব বৃক্ষের পূজার পর সপ্তমীর প্রাতঃকালে বৃক্ষরূপিণী দেবী দুর্গার আরোহন করা হয়। শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসর  ও ঢাক বাজিয়ে সেই শাখাদেবীকে পূজামণ্ডপে আনা হয়। বৈদিক সম্প্রদায়ের অনুকরণে বৌদ্ধসম্প্রদায়ে মূর্তি পূজা প্রবর্তিত হয়েছিল বলে ধরা হয়। মূর্তিপূজা ভারতের সকল প্রদেশেই প্রচলিত আছে তবে পশ্চিমবাংলায় এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দুর্গার দ্বিভূজা, চতুর্ভূজা, অষ্টভুজা, দশভুজা, দ্বাদশভূজা ও অস্টাদশভূজা মূর্তির কথা পূরণে বলা আছে। এই সকল মূর্তির সমস্ত মূর্তিই সকল দেশে পূজ্য নহে, বাংলায় আমরা দশভুজা মূর্তি পূজা করে থাকি।


স্বজন-পরিজন

দেবী দুর্গার স্বজন পরিজন বলতে সাধারণতভাবে তাঁর দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে ধরা হয়। আমাদের দূর্গা প্রতিমায় মা দুর্গার দক্ষিণপাশে লক্ষ্মীর মূর্তি এবং বামপাশে সরস্বতীর মূর্তি থাকে। লক্ষ্মী মূর্তির উপরে  গণেশ আর সরস্বতী মূর্তির উপরে কার্তিকের মূর্তি থাকে।

দেবী সরস্বতী -  ভারতীয় পূরাণে দেবী সরস্বতী বহুমাত্রিক দেবী হিসেবে পরিচিত।  দেবী সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বুদ্ধি, শিল্পকলা ও বিদ্যার দেবী।  শ্রী শ্রী চন্ডীতে মহাত্মা অম্ভুন ঋষির বিদুষী কন্যার নাম ছিল "বাক" এবং সেই "বাক" বিদ্যারূপিণী দেবী সরস্বতী নামে পরিচিত হয়েছিলেন।  সরস্বতী নামের পৌরাণিক ব্যাখ্যায় "নদীরূপা" ও "দেবতারূপা" দু রকমই  পাওয়া যায়। পদ্মপুরাণে তিনি দক্ষকন্যা এবং কশ্যপ পত্নী হিসাবে স্বীকৃত এবং ব্রম্ভবৈবত  পুরান মতে  তিনি নাযায়নের পত্নী। আদিতে তিনি উত্তর ভারতের সপ্তনদীর (গঙ্গা, যমুনা, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা, সরস্বতী ও শতদ্রু ) অন্যতম নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।  সরস্বতী দেবী দুর্গার বামদিকে অধিষ্ঠিত থাকেন। দেবীর বাহন শ্বেতহংস।

দেবী লক্ষ্মী - দেবী লক্ষ্মী হলেন ধনদেবী।  তবে দেবী লক্ষ্মীর রূপ বা মূর্তি বর্তমানকালে যেভাবে কল্পনা করা হয় বৈদিক যুগে সেরকম ছিল না। তখন লক্ষ্মীকে কখনও শুভ, আবার কখনও অশুভদায়িনীরূপে পাওয়া যায়।  দেবী মা দুর্গার দক্ষিণদিকে অধিষ্ঠিত থাকেন।  দেবীর বাহন পেঁচা।

সিদ্ধিদাতা গণেশ - সিদ্ধিদাতা গণেশ হলেন আসলে মিত্রদেবতার (সূর্যের) একটি ভিন্নরূপ।  সমস্ত পূজানুষ্ঠানে, ধর্মীয় ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে সর্বাগ্রে গণেশের পূজা বিধেয়। দক্ষিনভারতে গণেশের সমাদর ও পূজা অধিকতর ব্যাপক এবং গুরুত্বপূর্ণ।  সিদ্ধিদাতা গণেশ মা দুর্গার ডানপাশে দেবী লক্ষ্মীর পরে অধিষ্ঠিত থাকেন।  গণেশের বাহন ইঁদুর।

কার্তিকেয় - কার্তিক বা কার্তিকেয় সাধারণতভাবে দেব সেনাপতি হিসেবে পরিচিত। কার্তিকের অপর নাম স্কন্দ।  কৃত্তিকা নক্ষত্রে কার্তিকের জন্ম। কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলীর ছয় কৃত্তিকার  দ্বারা পুত্ররূপ গৃহীত ও প্রতিপালিত হওয়ায় তিনি কার্তিক বা কার্তিকেয় নামে অভিহিত হইয়াছেন। কার্তিকের অর্থ কৃত্তিকাতনয়।  দেবী দুর্গার বামপাশে দেবী সরস্বতীর পরে অধিষ্ঠিত থাকেন। কার্তিকের বাহন ময়ূর।

আগমনী


আগমনী শব্দটি কন্যারুপী দেবীদুর্গার শরৎকালে মর্ত্যে আগমন বার্তাকেই প্রকাশ করে।  মায়ের আগমনী বার্তা আকাশ, বাতাস, হৃদয়-মন ভড়িয়ে তোলে।  হালকা হিম হিম  ভাব, ঘাসের গায়ে লক্ষ শিশিরের কোহিনুর, দোয়েল শ্যামার ডাক, সফেদ শুভ্র কাশের গুচ্ছ,  ঘন নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা এভাবেই প্রকৃতি  যেন তার বরণডালা নিয়ে আমাদের কাছে শরৎ ঋতুতে উপস্থিত হয়।  প্রকৃতির হাত ধরেই চারদিকে মায়ের আগমনের বার্তা মানুষের মনে আনন্দের পূর্বাভাসের হিন্দোল তোলে।


মহালয়া


"বাজলো তোমার আলোর ধ্বনি"- এর সুর আর স্বর্গীয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বজ্র গম্ভীর কণ্ঠের "আশ্বিনের  শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জরী" এই চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়েই মহালয়ার দিনটা শুরু হয়। শ্রী শ্রী চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়েই দেবী দুর্গাকে মর্ত্যলোকে  আবাহন জানানো হয়। শারদীয় দুর্গাপুজোর সাথে মহালয়ার কোনো সম্বন্ধ নেই। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে মহালয়ার পরের দিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। গঙ্গার ঘাটগুলোতে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পন করার জন্য মানুষের ঢল নামে। পুণ্যস্নান আর মন্ত্রচারণে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়।


পূজার পাঁচটা দিনের নিয়ম 

মহাষষ্ঠী

এই দিন দেবী সপরিবারে মর্ত্যে আবির্ভূত হন। বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মায়ের মূর্তির উন্মোচন করা হয়। সকালে বিল্ব বৃক্ষে দেবীর মঙ্গল বোধন করা হয়। বোধন অর্থ জাগরণ অর্থাৎ বোধনে দেবী জাগরিত হন।  আমন্ত্রণ মানে দেবীকে নিয়ে আসা। বোধন, আমন্ত্রনের পর সন্ধ্যায় অধিবাস করা হয়। অধিবাস মানে দেবীর অবস্থান করা।  মহাষষ্ঠীর দিন নয়টি কোলস্ঘট জলপূর্ণ করে দেবীর নবশক্তিকে আহ্বান করা হয়। এই দিনই বাঙালীর শ্রেষ্ঠ উৎসবের শুভারম্ভ হয়।

মহাসপ্তমী


মহাসপ্তমী তিথিতে মৃন্ময়ী প্রতিমায় চক্ষুদান, প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও আবাহন মন্ত্রে মা মৃন্ময়ী হতে  চিন্ময়ীরূপে পূজিতা হন। সকালে নব পত্রিকা স্নানের মাধ্যমে দুর্গাপূজার সূচনা হয়। নব পত্রিকা হল দেবী দুর্গার প্রতিনিধি।  নয় ধরণের উদ্ভিদের পুজোর প্রাচীন প্রথা হল নবপত্রিকা স্নান। নবপত্রিকার চারদিকে শ্বেত অপরিজিতা লতা ও হরিদাক্ত ডোর (সুতা) দিয়ে বাঁধার নিয়ম আছে।  নবপত্রিকার আর এক নাম কুলবৃক্ষ। এই কুলবৃক্ষের প্রধান অধিষ্ঠিত দেবতা ও যোগিনীরা হলেন দেবীর সহচরী। জলপূর্ণ কলস বা ঘটকে  দেবীর প্রতীকরূপে কল্পনা করা হয়। ঘটের গায়ে সিঁদুরের পুত্তলিকা, ঘটের  মাথায় চালপূর্ণ  সরা ও নারিকেল, ঘটে জল ও ঘটের মুখে পঞ্চপল্লব রাখা হয়। নবপত্রিকা প্রবেশের পরেই দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। ঘটে, প্রতিমায় দেবীর আবির্ভাব হয়।  মৃন্ময়ী প্রতিমা চিন্ময়ী রূপে আবির্ভত হন বলে ধরা হয়।

মহাঅষ্টমী


ভক্তবৃন্দের সমবেত পুষ্পাঞ্জলীর  মাধ্যমে মহাঅষ্টমীর সূচনা হয়ে থাকে। সকাল থেকে উপবাস করে তারপর পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার নিয়ম। এইদিন বহু হিন্দু পরিবারে অন্নভোগ রান্না হয় না, পরিবর্তে নিরামিষ খাবারের চল রয়েছে। অষ্টমী পূজার পরই হয় সন্ধিপূজা।

সন্ধিপূজা 


 সন্ধিপূজা হলো দুর্গাপূজার সবচেয়ে মাহাত্ম্যপূর্ণ পূজা। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট আর নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট হল সন্ধিক্ষণ। এই সন্ধিক্ষণেই মা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন।  অসুরশক্তির বিনাশকালের এই শুভক্ষনেই সন্ধিপূজা করা হয়। এইদিন  কোথাও কোথাও কুমারী পূজাও করা হয়। বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কুমারী পূজা চালু করেছিলেন।



                                      কুমারী পূজা 



কুমারী পুজো শারদীয়া দুর্গোৎসবের এক বর্ণাঢ্য পর্ব।  তান্ত্রিক মতে কুমারী পুজো চলে আসছে বহু প্রাচীন কাল থেকে। কিন্তু এই পুজোর পরিচিতি সেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কুমারী পুজোর আয়োজন করার পর থেকে এই পুজো নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। তন্ত্র শাস্ত্র অনুযায়ী কুমারী পুজো বলতে বোঝায় এক থেকে ষোলো বছরের কম বয়সী অরজঃসলা কুমারী মেয়ের পুজো। বয়স অনুসারে কুমারীর বিভিন্ন নামকরণ করা হয়।

এক বছরের কন্যার নাম =  সভ্যা 
দুই বছরের কন্যার নাম  =  সরস্বতী 
তিন বছরের কন্যার নাম  =  ত্রিধমূর্তি 
চার বছরের কন্যার নাম  =  কালিকা 
পাঁচ বছরের কন্যার নাম =  সুঙ্গা 
ছয় বছরের কন্যার নাম  = উমা 
সাত বছরের কন্যার নাম = মাতঙ্গিনী 
আট বছরের কন্যার নাম = কুষ্টিকা 
নয় বছরের কন্যার নাম  =  কাল সন্দভা 
দশ বছরের কন্যার নাম = অপরাজিকা
এগারো বছরের কন্যার নাম  = রুদ্রাণী 
বারো বছরের কন্যার নাম = ভৈরবী 
তেরো বছরের কন্যার নাম = মহালক্ষ্মী 
চোদ্দ বছরের কন্যার নাম = পঠনায়িকা 
পনেরো বছরের কন্যার নাম  = ক্ষেত্র 
ষোলো বছরের কন্যার নাম  = অম্বিকা 


মহানবমী

মহানবমী হল দুর্গা পূজার শেষ দিন।  সন্ধিপূজার পর শুরু হয় মহানবমীর পূজা। এই  দিন ষষ্ঠী থেকে যত দেবদেবীর পূজা করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আহুতি দিতে হয়। এই দিনের অন্যতম অঙ্গ হচ্ছে বলিদান।  শাস্ত্রমতে ছাগ বা মহিষাদি বলির রীতি আছে।  কিন্তু বর্তমানে পশুবলি করা যায় না, তার পরিবর্তে কুস্মান্ড, ইক্ষুদান বলি দেওয়া হয়।

দশমী

তিনদিনের পুজোর পর  বিষাদের দিন।  দশমীর পুজো শেষ করে মহাস্নানের যে দর্পণ ছিল সেটিতে মাকে  চিন্ময়ীরূপে বিসর্জন দেওয়া হয়।  বেজে ওঠে বিসর্জনের বাদ্যি। মানুষের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। নবমীর উচ্ছ্বাস-আনন্দের পরই বিদায়ের সুর নিয়ে আসে দশমী।

দেবীবরণ


দশমী পুজোর পর শুরু হয় দেবীকে বরণ করার পালা।  এই দেবীবরণের মাধ্যমে মাকে জানানো হয় মনের সব কামনা। বলা হয় "মা তুমি  আবার এসো, তুমি আমাদের রূপ দাও, যশ দাও, শত্রূকে জয় করার শক্তি দাও।  তোমার আশীর্বাদ আমাদের  নিত্য পাথেয় হোক "।

সিঁদুর খেলা


বিজয়ার বিষাদের  সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে সিঁদুর খেলার নিয়ম। এটা হল স্ত্রী আচার। মানুষের বিশ্বাস দুর্গামায়ের সিঁথির সিঁদুর নিয়ে মাথায় ঠেকালে সধবাদের সিঁথির সিঁদুর দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাকে সিঁদুর দানের পর একে অন্যের সিঁথি সিঁদুরে রাঙিয়ে দেয়। দেবীবরণের মাধ্যমে আনন্দময় সমাপন ঘটে। চারদিনের প্রানঢালা আনন্দস্রোত পৌঁছে যায় শেষ লগ্নে। বিষাদসিন্ধুতে ডুবে যাওয়ার আগে সিঁদুরখেলার মাধ্যমেই  অন্তরের সব আবেগ উজাড় করে দেওয়া হয়।

বিসর্জন


 শাস্ত্র মতে পুরোহিত মায়ের বিসর্জনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ করেন। তারপর মণ্ডপে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা অনুষ্ঠিত হয়।  সাধারণত সন্ধ্যায় শোভাযাত্রা সহকারে মাকে  নিরঞ্জনের জন্য কাছাকাছি কোন নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই শেষ হয় হিন্দু ধর্মের পরম কাঙ্খিত শারদোৎসব।  উত্তর চব্বিশ পরগনার টাকিতে এই বিসর্জন একটু অন্যভাবে পালন করা হয়ে থাকে। সেখানে সকালে দুটো নৌকোর মাঝখানে মাকে বসিয়ে সারাদিন ইছামতী নদীতে প্রদক্ষিণ করানো  হয়।  তারপর সন্ধ্যের সময় মাকে  ইছামতীতে ভাসানো হয়।

বিজয়া দশমী

শিবসহ শিবানী কয়েকদিনের জন্য ছিলেন কৈলাশের বাইরে। বিজয়া মুহূর্তে তাঁদের কৈলাসে ফিরে  আসাকে আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।  মর্ত্যেও  মিষ্টি মুখের সাথে অশুভের উপর শুভের বিজয়া উদযাপিত হয়।  সবাই মেতে ওঠে এই মিষ্টতার উৎসবে।  পূর্বে এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ ছিল "কোলাকুলি" করা, যা বর্তমানে খুব একটা দেখা যায় না।

দুর্গাপূজা আনন্দময় মহামিলনের  উৎসব। যা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিয্যের প্রতীক।  এই পুজো এখন আর শুধু হিন্দুদের জন্য আনন্দ বয়ে আনে না, সব  জাতির মধ্যেই আনন্দ, শান্তি ও ভালোবাসা বয়ে নিয়ে আসে।  এ যেন এক সৌভ্রাতৃত্বের মিলনোৎসব। তাই দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় কৃত্য নয়, তা সার্বজনীন উৎসবও বটে




তথ্যসূত্র : মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা , স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ

ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ১৫-০৮-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Monday, August 5, 2019

কসবার গর্ব: শতাব্দী প্রাচীন কসবা সাধারণ পাঠাগার >

কসবার গর্ব: ১১৬ বছরের প্রাচীন পাঠাগার 



                            কসবা সাধারণ পাঠাগার 

শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে মানব সভ্যতার সকল জ্ঞান জমা হয়ে আছে গ্রন্থের ভিতর। অন্তহীন জ্ঞানের ভান্ডারই হল গ্রন্থ। গ্রন্থগুলি আজকের পৃথিবীকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেছে।  এই গ্রন্থের আবাস্থল হল গ্রন্থাগার বা পাঠাগার। সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে গ্রন্থাগারই দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ তথ্যাদি সংগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে সেবা প্রদান করে আসছে। দক্ষিণ কলকাতার এক প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু অঞ্চল হল কসবা।  এখানে ১১৬ বছর আগে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি পাঠাগার, যা আজও  স্বমহিমায় বিরাজ করছে। 

১৯০৪ সালে কসবার মত এক গ্রামে কয়েকজন উৎসাহী যুবক জুলাই মাসের ২৪ তারিখে স্বর্গীয় নবীনকৃষ্ণ ঘোষাল  মহাশয়ের জমির এক পর্ণকুটিরে স্বদেশী আন্দোলনের পটভূতে "রেনু কুটির লাইব্রেরী" প্রতিষ্ঠা করে।  যুবকদের মধ্যে সর্বশ্রী নিরঞ্জন ঘোষাল, ক্ষীরোদ প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, বঙ্কিমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শৈলেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যাযের  নাম উল্লেখযোগ্য। পাঠাগারের উদ্বোধন সভায় বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক রায় সাহেব বিহারীলাল সরকার পৌরোহিত্য করেছিলেন।  ১৯০৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের উপস্থিতিতে বসন্তউৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বছর চারেক চলার পর ১৯০৮ সালে পরিচালকদের মতপার্থক্যের কারণে সাময়িক অচলাবস্থা হয়েছিল। পরবর্তীকালে "শান্তি লাইব্রেরী" নামে স্থান পরিবর্তন করে বঙ্কিমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে চলে আসে। এই সময় পাঠাগারে শ্যামলাল চক্রবর্তী মহাশয় দুইশত বই এবং নিত্যগোপাল ঘোষাল মহাশয় ৫০ টাকা দান করেন।

১৯১৭ সালের ১৯শে অক্টোবর আবার নাম পরিবর্তন করে "কসবা পাবলিক লাইব্রেরী" করা হয়। মন্মথনাথ রায় মহাশয়ের ঐকান্তিক চেষ্টায় ও আর্থিক সহাযতায় লাইব্রেরীটি রেজিস্ট্রিকৃত হয়। ১৯১৯ সালে বঙ্কু বিহারী  চট্টোপাধ্যায় ও অমূল্য চট্টোপাধ্যায় পাঠাগারের বর্তমান জমিটি দান করেন।

পাঠাগারের প্রথম সারস্বত উৎসবে সভাপতি হিসেবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, এছাড়া পন্ডিত হরিদেব শাস্ত্রী ও বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্যার সি ভি রমন উপস্থিত ছিলেন।  ১৯২২ সালে হরিশ্চন্দ্র চৌধুরী ও গিরিশচন্দ্র চৌধুরী মহাশয়দের আর্থিক সাহায্যে পাঠাগারের গৃহনির্মাণের কাজ শুরু হয়। বীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে গৃহনির্মাণ কার্য সুসম্পন্ন হয়।  ১৯২৮ সালে ইংরেজ সরকারের ৫০ টাকা অনুদানে বিজলি বাতির সংযোগ করা হয়।

১৯৩১ সালে পাঠাগারের উন্নতিকল্পে এক বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উক্ত অনুষ্ঠানে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম, স্বনামধন্য কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী, নির্মল চন্দ্র চন্দ্র সহ আরো বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সেই দিনে বিদ্রোহী কবি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করেছিলেন।

১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৮০০ টাকার পুস্তক এবং ১৯৫২ সালে ৫৫০ টাকার পুস্তক প্রদান করে। চিত্তরঞ্জন জাতীয় বিদ্যালয় সোসাইটি পাঠাগারের আসবাব কেনার জন্য ২০০ টাকা প্রদান করে।

১৯৫৪ সালের ১৪ই নভেম্বর উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে পাঠাগারের ৫০ বছরের সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করা হয়। ৫০ বছরের গৌরবময় তথ্যসম্বলিত পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। এই সময় কৃষ্ণচন্দ্র পাল মহাশয় একখণ্ড জমি দান করেন। পাঠাগারের গৃহকে দ্বিতল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।  ১৯৫৮ সালে পাঠ্যপুস্তক বিভাগটি খোলা হয়।  ১৯৫৯ সালের ৪ঠা অক্টোবর পাঠাগারের দ্বিতল গৃহটি উদ্বোধন করেন তদকালীন পৌরপ্রধান শ্রী বিজয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়। এই বছরেই পাঠাগার শিশু বিদ্যালয় "আলোর পরশ"-র পরিচালনভার গ্রহণ করে।

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাঠাগারের ৭৫তম বর্ষ পূর্তির উৎসব পালন করা হয়।  ১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৭৫০০ টাকা, ১৯৮৭ সালে  স্বর্গীয় ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষ মহাশয়ের জন্মদিনে তাঁর পুত্রগণ ৫০০০ টাকা দান করেন।  ১৯৯৬ সালে ডি এন ঘোষ জনকল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় পাঠাগারের ত্রিতল কক্ষ নির্মাণ শুরু হয়। এই সময় উচ্চশিক্ষার ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আলাদা পাঠ্যপুস্তক বিভাগ খোলা হয়। ২০০৪ সালে মহা সাড়ম্বরে শতবর্ষ অনুষ্ঠান পালন করা হয়।  শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এম পি ল্যাড থেকে ৯৯,৫০০ টাকা, শ্রী দীনেশ ত্রিবেদীর এম পি ল্যাড থেকে ৫৬,০০০ টাকা এবং বিধায়ক শ্রী রবিন দেবের কাছ থেকে ১,০০,০০০ টাকা পাওয়া যায়।  উক্ত টাকায় পাঠাগারের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়।

আজকের যুগে সমস্ত তথ্যই কম্পিউটারের সাহায্যে পাওয়ার জন্য মানুষের বই পড়ার আগ্রহ অনেকটা কমে গেছে, তা সত্ত্বেও এখানে প্রায় শতিনেক পাঠক-পাঠিকা ও হাজার তিরিশেক বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে। বর্তমান পরিচালকদের নিরলস চেষ্টায় দিন কয়েক আগে বেশ ঘটা করে ১১৬তম বর্ষ পালন করা হয়।  এই অনুষ্ঠানে কলকাতার নামী দুজন প্রকাশনা সংস্থাকে নিয়ে একটা বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। আমি এই মেলায় উপস্থিত থেকে দেখেছি এখনো বইয়ের প্রতি মানুষের একটা  আগ্রহ রয়েছে, তা মেলার ভীড় দেখে বুঝেছিলাম।

পাঠাগারের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সরণি বেয়ে ও কর্মীদের নিরলস চেষ্টায় এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় শতাব্দী পেরোনো এই পাঠাগার আজও যেন যৌবনের ছটায় উজ্জ্বল।  পাঠাগারটি কসবার গর্ব, এলাকাবাসীর কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।  আশাকরি সকলের যে উদ্দ্যমে আজ পাঠাগারের এই বাড়বাড়ন্ত, তা যেন কোনদিন থেমে না যায়। আমি সবার কাছে আবেদন রাখছি পাঠাগারের উন্নতির জন্য গরিব ছাত্র ছাত্রীদের কথা ভেবে পুস্তক ও আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া জন্য। কসবার এই গর্বকে আরো গৌরবের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।




ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ০৫-০৮-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Friday, August 2, 2019

শ্রী শ্রী রামঠাকুর ও কৈবল্যধাম>

শ্রী শ্রী রামঠাকুর ও কৈবল্যধাম



"গুরু" এই শব্দটি বাঙালি জীবনের চলার পথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে।  যাঁর তুলনায় আমি লঘু তিনিই হলেন গুরু। গুরুই আমাদের চিত্তকে লঘুতার থেকে গুরুতার দিকে আকর্ষণ করেন। যুগে যুগে ভারতের মাটিতে বহু গুরুর আবির্ভাব ঘটেছে। বহু সদ্গুরু এসেছেন এই পুণ্যভূমিতে। তেমনই এক গুরু ১৮৬০ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরের  ডিঙ্গামানিক গ্রামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মানবসত্তার অবমাননা, ধর্মের গ্লানি দূর করতে শ্রী শ্রী রামচন্দ্রদেবের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনিই অপরমারাধ্য শ্রী শ্রী কৈবল্যনাথ বা শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ। দিব্যপুরুষ শ্রী শ্রী রামচন্দ্রদেবই সকলের পূজনীয় শ্রী শ্রী রামঠাকুর।


পিতা শ্রী রাধামাধব বিদ্যালঙ্কার ছিলেন একজন তন্ত্রাচারী সিদ্ধযোগী। মাতা শ্রীমতি কমলাদেবী আচার, নিষ্ঠা ও ধর্মপরায়ণ নারী ছিলেন।  তাঁদের চার পুত্র ও এক কন্যা ছিলেন।  তাঁদের তৃতীয় পুত্র শ্রী রামচন্দ্রদেব বাল্যকাল থেকেই অন্তর্মুখী ও ভাবুক প্রকতির ছিলেন।  পড়াশুনায় কোনো মন ছিল না, বনে-জঙ্গলে সবসময় ঘুরে বেড়াতেন।  মা চিন্তা করতেন পন্ডিতের ছেলে মূর্খ হয়ে থাকবে।  যদি তাঁর মনের পরিবর্তন হয় সেই কারণে অল্প বয়সেই তাঁর উপনয়ন দিয়ে দিলেন। উপনয়নের কিছুকাল পরেই রামচন্দ্র নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়ালেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করলেন। তিনি স্বপ্নে এক গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা পেয়েছিলেন।  ভারত ও অধুনা বাংলাদেশের বিভিন্নপ্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন। ঘুরতে ঘুরতে একদিন তিনি কামাখ্যা মন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন।  এখানেই সেই তেজময় পুরুষের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হল যিনি তাঁকে স্বপ্নে দীক্ষা দিয়েছিলেন। গুরুর সাথে নিরুদ্দেশের পথে চলে গিয়েছিলেন, প্রায় আট-দশ বছর পরে তিনি গৃহে ফিরে আসেন। গুরুর সান্নিধ্যে থেকে তিনি হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ও অন্যান্য জায়গায় পরিভ্রমণ করেন। নানা তীর্থ দর্শনের সৌভাগ্যও তাঁর জীবনে ঘটেছিল। অল্প কিছুদিন বাদে তিনি আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যান।  ১৯০২-০৩ সাল নাগাদ আবার তাঁর পুনরাবির্ভাব হয়  কলকাতায়। ১৯০৩ সালে তাঁর মাতৃদেবীর মৃত্যুর সময় তিনি কালীঘাটে ছিলেন, তারপর কয়েক বছর হুগলির উত্তরপাড়াতে কাটান। ওখান থেকে আবার তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। শোনা যায় এই সময় তিনি দক্ষিণ ভারতে কাটান এবং ১৯০৭ সালের শেষের দিকে তিনি আবার গৃহে ফিরে  আসেন। এই সময় থেকে তাঁর মহাপ্রয়াণ পর্যন্ত তিনি মানবসেবায় ব্রতী ছিলেন। তিনি কোনোদিন সন্ন্যাসীদের মতন গৈরিক বস্ত্র পড়েননি। গলায় মালা পরে,  অতি সাধারণ একটা ধুতি ও চাদর পরে সারাজীবন লোক শিক্ষা দিয়ে গেছেন।  তিনি অসীম আধ্যাত্মশক্তির আধার ছিলেন। ক্রমে ক্রমে একজন দুজন করে তাঁর ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। ভক্তগণ তাঁর দর্শন ও অমৃতবাণী শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলো। ভক্তগণ তাঁর সেবা করার জন্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করার আগ্রহ প্রকাশ করল। তারা চট্টগ্রামের কাছে জঙ্গলঘেরা পাহাড়ের তলায় আশ্রম করার নির্দেশ পেলেন ঠাকুরের কাছ থেকে।  জরাজীর্ণ এক বটবৃক্ষকে ঘিরে আশ্রমটি ও যাত্রীনিবাস গড়ে তোলা হল। ঠাকুরের নির্দেশে শ্রী শ্রী কৈবল্যনাথের পট  প্রতিষ্ঠিত হল এবং শ্রীমৎ হরিপদ বন্দ্যেপাধ্যায় আশ্রমের প্রথম মোহন্ত নিযুক্ত হলেন। ঠাকুরের ইচ্ছানুসারে সত্যনারায়ণ সেবাই হল কৈবল্যধামের প্রধান লক্ষ্য ও কর্তব্য। এছাড়া এখানকার ক্রিয়াকর্মের অভিমুখ হল জনকল্যাণমুখী এবং মানুষের হিতসাধন।

ঠাকুরের নির্দেশেই কলকাতার যাদবপুরে কৈবল্যনাথ শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৪২ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি। এটাই ভারতবর্ষের একমাত্র ঠাকুরের আশ্রম। এই আশ্রমে একটা পরিচালন কমিটি আছে।  কমিটির সদস্যরাই এখানকার কাজকর্ম ও উৎসবগুলি পরিচালনা করে থাকেন। প্রতিদিন ভোরবেলা মঙ্গলারতি, মধ্যাহ্নে ভোগ, সন্ধ্যায় সত্যনারায়ণ সেবা, পাঁচালি পাঠ, সিন্নি হয়।  এখানে গ্রন্থাগার ও দাত্যব্য চিকিৎস্যালয় আছে। এখানে সমাজের আর্থিকভাবে দুর্বল ও আর্ত মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয়। এখানে এলোপ্যাথি ও হোমিওপ্যাথিক দুরকমের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া এম্বুলেন্স পরিষেবার ব্যবস্থাও রয়েছে।   দুস্থদের দান ধ্যান করা হয়। দুস্থ ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বইপত্তর ও স্কুল-কলেজের বেতন ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা করা হয়। ২০০৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর গ্রহাগারটির উদ্বোধন করা হয়। অধ্যাত্মবিষয়ক ও ভক্তিমুলকগ্রন্থে গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ। নাটমন্দিরের পাশে মূলমন্দিরে কৈবল্যনাথ বিজড়িত।  ভক্তদের মুক্ত হস্থের দনে এই বিশাল কর্মকান্ড চলে আসছে। "সত্যের সন্ধ্যানে" নামক একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

ঠাকুর বলতেন আশ্রমই আমার প্রাণ, আশ্রমই হরিনামের লীলাভূমি ও নামযজ্ঞের স্থান।  এই স্থানের মাধ্যমে সর্বধর্ম সমন্বয় হবে এবং কালক্রমে কোন মহাপুরুষ এই পবিত্র ধামের মাহাত্ম্য প্রচার করবে। ঠাকুরের এই বাণী আজ সত্য বলে প্রমাণিত। দিনে দিনে যেমন ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে তেমন এই সত্যধামের কথা লোকমুখে প্রচারিত হচ্ছে।  ঠাকুরের দিব্য জীবনের সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা উপলব্ধি করেছেন ঠাকুরের যোগমাহাত্ম্যকে। অপরিসীম আধ্যাত্মিক শক্তির মূর্ত প্রতীক শ্রী শ্রী ঠাকুর সর্বদা বিনয়ী থেকে মানুষের হিতসাধন করার চেষ্টা করে গেছেন। ঠাকুরের জীবদ্দশাতেই  বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে প্রথমটি,  ভারতবর্ষের কলকাতার যাদবপুরে দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়, এই দুটি আশ্রম "কৈবল্যধাম" নামে প্রতিষ্ঠিত। তৃতীয়টি তাঁর পবিত্র জন্মভূমি বাংলাদেশের ডিঙ্গামানিক  গ্রামে  "সত্যনারায়ণ শিবমন্দির" নামে  প্রতিষ্ঠিত। ১৯৮৯ সালের ১লা মে শ্রী শ্রী ঠাকুর জীবন রাখেন। তাঁর নশ্বর দেহের  অধুনা বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার চৌমুহনী গ্রামে ঠাকুরের মহাসমাধি হয়েছিল। যে স্থানে তাঁর দেহ সমাহিত হয় সেই স্থানে ঠাকুরের ইচ্ছা অনুযায়ী "সমাধি মন্দির" নির্মাণ করা হয় ও একটা আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই আশ্রমটি ঠাকুরের চতুর্থ আশ্রম।

শ্রী শ্রী ঠাকুর ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় অবিভক্ত বঙ্গদেশে মানবজীবন ধারণ করে এসেছিলেন।  তিনি একান্তভাবে প্রচারবিমুখ ছিলেন।  একজন পরমপুরুষ হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষ তাঁর  সম্বন্ধে অজ্ঞ।

ঠিকানা : ৩৪,  রামঠাকুর সারণি, যাদবপুর, কলকাতার ৭০০০৩২

পথনির্দেশিকা : কলকাতার যে কোনো স্থান থেকে বাসে করে যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ডে এসে রিক্সা বা পায়ে হেঁটে পৌঁছানো যায়। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে যাদবপুর স্টেশানে নেমে রিক্সা বা পায়ে হেঁটেও  পৌঁছানো যায়।


তথ্যসূত্র : সময়-এসময় পত্রিকা, ১৪২২ মাঘ সংখ্যা

ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ০২-০৮-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, July 21, 2019

অকালে ঝরে যাওয়া তারা >

অকালে ঝরে যাওয়া তারা 






জুলাই মাসটা বাংলা সিনেমার দুই নক্ষত্রের পতন ঘটেছিলো। ২২ তারিখে অসাধারণ অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর আর ২৪ তারিখ মহানায়ক উত্তমকুমারের। 
 
 ২২শে জুলাই বাঙালির এক বেদনার দিন। এইদিন এক লেলিহান শিখা কেড়ে নিয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রের এক প্রতিভাবান নায়িকাকে। সালটা ছিল ১৯৮৬।  দিনটি বাঙালি দর্শকদের কাছে খুবই দুঃখের দিন। তাঁর অকাল প্রয়াণে বাংলা তথা বাঙালির জীবনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। তাঁর আসল নাম ছিল শিপ্রা, বিখ্যাত পরিচালক শ্রী তরুণ মজুমদার শিপ্রা নামটা বদলে  "মহুয়া" নামটা দিয়েছিলেন। বাংলায় বহু অভিনেত্রী এসেছিলেন তার মধ্যে কেউ অসামান্যা  সুন্দরী, কেউ গ্ল্যামারাস ছিলেন।  আবার কেউ কেউ নিজ অভিনয় দক্ষতায় দর্শকদের মন ছুঁয়ে গিয়েছিলেন। মহুয়া সুন্দরী তো ছিলেন তার সাথে তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় দক্ষতাও  ছিল। দর্শকরা তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় দক্ষতা দেখে চমকে গিয়েছিলেন।

২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৮ সালে কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী উদয়শঙ্করের দলে নাচ করতেন। তিনি পরে মুম্বাই পাড়ি দেন।  কিন্তু তিনি সেখানে সফলতার মুখ দেখতে পাননি।  কিছুটা বাধ্য হয়েই আবার কলকাতায় ফিরে আসেন।  ছোট্ট শিপ্রা ততদিনে সহজাত দক্ষতায় নাচের তালে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। নীলাঞ্জনবাবু তাঁর এই ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগলেন।  কন্যার মাধ্যমেই তিনি সফলতায় পৌঁছতে চাইলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে  তিনি পাড়ার জলসায় শিপ্রার নাচের ব্যবস্থা করলেন।  শিপ্রাও বহু গন্যমান্য শিল্পীদের সাথে একই মঞ্চে নেচে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো। তিনি সেদিন "সোনালী রায়" নামে নেচেছিলেন। শিপ্রা নামটি ব্যবহার করেননি। তাঁর নাচের তালে দর্শক ও আয়োজকরা স্থম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন, গন্যমান্য শিল্পীরাও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে কলকাতা ও তার আশপাশের  পাড়ার জলসার  মঞ্চগুলোকে তিনি মাতিয়ে দিতে লাগলেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মেয়ে শিপ্রা হয়ে উঠলো নৃত্যশিল্পী সোনালী রায়। শিপ্রা বা সোনালির লেখাপড়ায় ছেদ পড়ল। তাঁর স্কুল জীবনের এই সময়ই ইতি ঘটল।

১৯৭২ সালে তরুণ মজুমদার "শ্রীমান পৃত্থিরাজ" সিনেমার জন্য একটা অল্প বয়সী মেয়ে খুঁজছিলেন। শিপ্রাকে দেখে তাঁর পছন্দ হয়। তিনি স্ক্রিন টেস্ট নেন, শিপ্রাও স্ক্রিন টেস্টে উত্তীর্ণ হন।  মাত্র চোদ্দ  বছর বয়সের শিপ্রাকে তিনি অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে নির্বাচিত করলেন।  সন্ধ্যা রায় নিজ হাতে ছোট্ট শিপ্রাকে সিনেমার উপযোগী করে গড়ে তুললেন। ১৯৭৩ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর ছবিটা মুক্তি পায়। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর শিপ্রাও হয়ে উঠলো অভিনেত্রী মহুয়া। শুরু হলো তাঁর অভিনয় জীবন আর দর্শকরাও খুঁজে পেলো একজন প্রতিভাবান অভিনেত্রীকে। এই সিনেমার পর তিনি আরো অনেক সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন।  তারমধ্যে মহানায়ক উত্তমকুমারের সাথে "সেই চোখ" ও "বাঘ বন্দী খেলা", "সূর্যসাক্ষী", :ইমন কল্যাণ", "প্রতিশোধ"  উল্লেখযোগ্য ছিল।  উত্তমকুমার থেকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত বহু বিখ্যাত নায়কের সাথে তিনি অভিনয় করেছিলেন।  বহু সুপার ডুপার হিট সিনেমা তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ২রা মে ১৯৭৬ সালে অভিনেতা তিলক চক্রবর্তীকে বিবাহ করেন।

১৯৮০ সালে তরুণবাবু দাদার কীর্তি সিনেমায় আবার মহুয়াকে দেবশ্রী রায়ের দিদির  ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য নির্বাচিত করলেন।  মহুয়াও খুবই দক্ষতার সঙ্গে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুললেন। সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৮০ সালের ২৮শে নভেম্বর। এই সিনেমাটি মহুয়াকে সফলতার উচ্চাসনে বসালো। এই সিনেমার জন্য তিনি সেরা নায়িকা  হিসেবে বি. এফ. জে  পুরস্কার পেয়েছিলেন। দাদার কীর্তির পর তাঁকে  আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।  তিনি আপামর বাঙালির মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে ১৯৮২ সালে "মাটির স্বর্গ", ১৯৮৩ সালে "লাল গোলাপ", রণজিৎ মল্লিকের সাথে ১৯৮২ সালে "শাঠে শাঠ্যাং", ১৯৮৪ সালে "প্রায়শ্চিত্ত" ও 'শত্রু', দীপঙ্কর দের সাথে ১৯৮২ সালে "পিয়াসা", ১৯৮৫ সালে "আমার পৃথিবী" ও "শাপমুক্তি", তাপস পালের সাথে ১৯৮১ সালে "সাহেব", ১৯৮৪ সালে "পারাবত প্রিয়া", ১৯৮৫ সালে "আশীর্বাদ" ও "জীবন", প্রসেনজিতের সাথে তিনি একটাই সিনেমা করেছিলেন ১৯৮৫ সালে "মধুময়"। এছাড়া তাঁর আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হলো  "অনুরাগের ছোঁয়া", "সুবর্ণলতা", "দাদু-নাতি-হাতি", "কেনারাম বেচারাম", "পাকা দেখা", "সৎমা", "শুভরজনী" প্রভৃতি। এছাড়া তিনি  তপন সিনহার  "আদমি আউর আওরাত" হিন্দি টেলিফিল্মে আমল পালাকারের সাথে অভিনয় করেছিলেন। তিনি বেশিরভাগ সিনেমায় নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। মাত্র বারো বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তিনি প্রায় পঞ্চাশটির মত সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। তাঁর  নাচ, অভিনয়ের সাথে ফুটবলের প্রতিও  খুবই আগ্রহ ছিল। মহুয়া যখন খ্যাতির মধ্যগগনে তখন তিনি তমালের সাথে প্রেমে লিপ্ত হন।  "আনন্দমেলা" সিনেমার শুটিংয়ের সময় তাদের প্রেম দিঢ় হয়। ১৯৭৬ সালের ২রা মে তিনি তিলকের ঘরণী হন। টালিগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায়  ও  বেহালাতেও এই দম্পত্তি ভাড়াটে হিসেবে কাটিয়েছেন।  পরবর্তীকালে টালিগঞ্জের করুণাময়ী অঞ্চলে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করেন কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই বাড়ির গৃহপ্রবেশের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর অভিনয় জীবনের সফলতার মধ্যগগনেই চরম বিপত্তিটি ঘটেছিলো। ১৯৮৫ সালের জুলাই মাসের ১২ তারিখে মধ্যরাত্রে স্টোভ ফেটে আগুনে পুড়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।  দশদিন ধরে যমে মানুষে লড়াই চালিয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি।  স্বামী তিলক  ও সাত বছরের পুত্র গোলাককে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।  যদিও তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তাঁর  মৃত্যু যে ভাবেই হোক তিনি কিন্তু এই সামান্য সময়ের মধ্যে বাঙালির মনে স্থান করে নিয়েছিলেন। বাঙালি আজও তাঁকে ভুলতে পারে না। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৩৪ বছর পরেও তাঁর নাম শুনলে বাঙালি নস্টালজিয়ায় ভোগে।


তথ্যসূত্র : ১)  গুগল
                ২)  A Directory of Bengali Cinema - Parimal Ray & Kazi Anirban

ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ২১-০৭-২০১৯



যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Saturday, July 20, 2019

মেট্রোপলিটন বিল্ডিং >

মেট্রোপলিটন বিল্ডিং





কলকাতার ময়দান অঞ্চলটি অতীতে ছিল জঙ্গল এলাকা। পরবর্তীকালে এই জঙ্গলের উত্তর অংশটিকে পরিষ্কার করে এসপ্ল্যানেড বা ধর্মতলা নাম দেওয়া হয। ধর্মতলা বা এসপ্ল্যানেড হল কলকাতার একদম কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটা বাণিজ্যিক এলাকা। শহরের খুবই ব্যস্ততম এলাকা। এই এলাকাতেই একদিকে রয়েছে শহীদ মিনার, বাস ও ট্রামের গুমটি আর একদিকে আছে বিখ্যাত মেট্রো সিনেমা হল (বর্তমানে শপিং মল) এই মেট্রো সিনেমা হালের পাশেই আছে শিল্পকলায় ও সৌন্দর্যেমোড়া একটি বৃহৎ বাড়ি, যার ওপরে  তিন কোনে তিনটি গম্বুজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এই বৃহদাকার ভবনটি জওহরলাল নেহেরু রোড ও সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত।  

বাড়িটি ব্রিটিশ আমলে তৈরী করা হয়েছিল। বর্তমান নাম "মেট্রোপলিটন বিল্ডিং" কিন্তু পূর্বে অবশ্য নাম ছিল Whiteway Laidlaw department store"হোয়াইওয়ে লেডলও এন্ড ডিপার্টমেন্ট স্টোর" (Whiteway, and Laidlaw Department Store)  হোয়াটওয়ে লেডলও এন্ড ডিপার্টমেন্ট স্টোর হলো একটি ব্রিটিশ সংস্থা।  দুজন স্কটিশ ১৮৮২ সালে এই সংস্থাটির গোড়াপত্তন করেন। কলকাতাতেই তাদের প্রধান কার্যালয় ছিল।  এছাড়া ভারতবর্ষের মুম্বাই, চেন্নাই, ও সিমলায় তাদের শাখা ছিল, ভারতের বাইরে লাহোর, কলম্বো, বার্মা, সাংহাই এরকম কয়েকটি জায়গাতেও  তাদের শাখা ছিল।  হোয়াইওয়ে লেডলও এন্ড ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ডাকনাম ছিল "Right-away""Paid-for"। সংস্থাটিতে কোনোরকম ধার-বাকি পাওয়া যেত না, তারা সম্পূর্ণ নগদে ব্যবসা করত।  

 ১৯০৫ সালে সংস্থাটি তাদের প্রধান কার্যালয় তৈরী করে দেওয়ার জন্য ম্যাকিনটোশ এন্ড বার্ন কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। জমিটি কলকাতার ধর্মতলা অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ একটা জায়গা ছিল। সংস্থাটিও চেয়েছিলো খুবই আকর্ষণীয়ভাবে বাড়িটি তৈরী করতে, যাতে ক্রেতাদের সহজেই আকর্ষণ করা যায় । ম্যাকিনটোশ সংস্থাও খুব সুন্দরভাবে ও আকর্ষনীয়রূপ দিয়ে বাড়িটি তৈরী করে দিয়েছিল। এক একটি তলা বেশ বড় আকারের ও সিঁড়িও বেশ চাওড়া করে তৈরী করেছিল। ভিতরে মার্বেল পাথরের ও কাঠের সুন্দর কাজ করে দিয়েছিল। হোয়াইওয়ে লেডলও এন্ড ডিপার্টমেন্ট স্টোর নীচের ও প্রথম তলটিতে  তাদের দোকান খোলে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা দুটো আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংস্থাকে ভাড়া দেয়। বাণিজ্যিক জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছি "ভিক্টরিয়া চেম্বার"  এটি আবাসিক ও বিণিজ্যিক ভবন। বাড়িটি নিও ব্যারোক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী। ভবনটির মাথায় তিনটি গম্বুজযুক্ত মিনার আছে।, তার মধ্যে একটি ক্লক টাওয়ার। বাড়িটির জানালাগুলো  খিলানযুক্ত জানালা। 

সেই সময় ব্রিটিশদের কলকাতা শহরে আরো দুটি ডিপার্মেন্ট স্টোর ছিল। লোয়ার চৌরঙ্গী রোডে "আর্মি এন্ড নেভি স্টোর" আর একটি "হল এন্ড এন্ডারসন" নামে পার্ক স্ট্রীটে। হোয়াইওয়ে লেডলও এন্ড ডিপার্টমেন্ট স্টোরটি ক্রমে ক্রমে কলকাতার প্রধান ও উৎকৃষ্টতম স্টোরে রূপান্তরিত হয়েছিল।  

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার পর কলকাতা থেকে ব্রিটিশরা তাদের দেশে ফিরে যেতে শুরু করল, তখন থেকে ক্রেতার এভাবে স্টোরটিতে কেনা-বেচাও কমতে থাকলো।  ধীরে ধীরে স্টোরটি বন্ধ হয়ে গেলো।  তখন মেট্রোপলিটন লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানি সম্পূর্ণ বাড়িটা ভাড়ায় নিলো। বাণিজ্যিক জায়গাটির নাম তারা পরিবর্তন করে রাখলো "সাচিন্দ নন্দ চেম্বার" আর  বাড়িটার নাম তারা পাল্টে করলো "মেট্রোপলিটন বিল্ডিং"। 

বর্তমানে বাড়িটির একতলায় বিগবাজার নামে একটি সংস্থাকে  ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ওপরের তলাগুলোতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক কার্যালয় এখনো রয়েছে। ১৯০৫ সালে নির্মিত ভবনটির মালিকানা এখন রয়েছে ভারতীয় জীবন বীমা নিগমের হাতে। ২০০৩ সালে ভারতীয় জীবন বীমা নিগম বাড়িটিকে সংস্কার করেছে। বাড়িটির বাইরের দেওয়াল সাদা করে দিয়েছিলো। ২০১০ সালে বিখ্যাত শিল্পী গণেশ পাইনের কথা অনুযায়ী তারা সাদা রঙের সাথে সোনালী রঙের প্রয়োগ ঘটায়। বর্তমানে সাদা ও সোনালী রঙে রঙ্গীন করা আছে। ভবনটি কলকাতার ঐতিহ্য বহন করছে। ধর্মতলার সৌন্দর্য্য বর্ধন করছে।


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ২০-০৭-২০১৯


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Tuesday, July 9, 2019

মইছাড়া >

মইছাড়া 

গরুর দৌড় 
আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ক্ষেতে-খামারে গেলে দেখা যায় বেশিরভাগ সময় চাষিরা লাঙ্গল দিয়ে চাষাবাদের কাজে ব্যস্ত। বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি এই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। একসময় চাষাবাদে বাঁশের তৈরী মই দিয়ে জমিকে উৎকর্ষ করা হত। বর্তমানে চাষের কাজে যান্ত্রিক উপকরণের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে।  লাঙ্গল, মই, হালের গরু বা বলদের বদলে ঢুকে পড়েছে আধুনিক ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ইত্যাদি। সময় ও শ্রমের সাশ্রয় করতে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে কৃষকেরা বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে।  ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে ঐতিহ্যবাহী লাঙ্গল, মই  বা হালের গরু-বলদেরা।

আলোকচিত্রীরা অপেক্ষা করছে 
কদিন ধরেই আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে বর্ষা পশ্চিমবঙ্গে  প্রায় ঢুকে পড়েছে। বর্ষা ঢোকা মানেই গ্রামে গঞ্জে চাষ শুরু হওয়া।  বর্ষা ঢোকার আগেই চাষিরা তাদের কৃষিজমির উৎকর্ষতা বাড়াবার জন্য "মইছাড়া" উৎসব পালন করে থাকে।  মইছাড়া হচ্ছে গরুর দৌড়। এই উৎসবটি সাধারণভাবে জুন মাসের শেষের দিকে অথবা  জুলাই মাসের শুরুতে করা হয়ে থাকে অর্থাৎ   বর্ষা ঢোকার ঠিক আগে বলদ বা গরুকে দিয়ে জমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তোলা হয়। মোদ্দাকথা হল মইছাড়া উৎসবটির মূল উদ্দেশ্য হল গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুরে জমিগুলো যখন বেশ শক্ত ফুটি-ফাটা হয়ে ওঠে, তখন সেই জমিগুলোতে চাষ করা যায় না। তাই বর্ষার আগে জমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তুলতে হয়। 

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটা জায়গায় এই উৎসব বেশ আড়ম্বরের সাথে উৎযাপন করা হয়।  আমাদের কলকাতার কাছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং-এর হাড়াভাঙ্গা গ্রামে প্রতিবছর বেশ ঘটা করে দুইদিন ধরে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই উৎসবের মাধ্যমে তারা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। প্রতিযোগীদের জন্য নানারকম মূল্যবান পুরস্কারেরও ব্যবস্থা থাকে। এই উৎসব এখানে যেন এক মিলনমেলা। সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। আশপাশের গ্রাম থেকে প্রতিযোগীরা অংশগ্রহণ করে।  ক্যানিং-এর বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন প্রতিযোগিতাটি দেখতে আসে।  শুধু ক্যানিং কেন কলকাতা, হাওড়া, হুগলী  ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকেও বহু মানুষ
ভালো ছবির আশায় মাঠে নেমে পড়েছে 
দেখতে আসে। মইছাড়ার মাধ্যমে  প্রধানত কৃষিজমির উন্নতি করা হলেও  এখানে কিন্তু  মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্যই এই প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ প্রায় তিরিশ বছর ধরে এখানে এই উৎসব বা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।  জলাকীর্ণ জমিতে সাধারনভাবে এই প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।  টান টান  উত্তেজনায় গরুর দৌড় শুরু হয়।  গরুর সাথে গরুর লড়াই বেশ জমে ওঠে। গরুর সাথে গরুর মালিকরাও সমানভাবে গরুকে সামলানোর জন্য দৌড়তে থাকে। মইছাড়ার ছবি তোলার জন্য কলকাতা বা তার আশেপাশের জেলাগুলো থেকে প্রচুর আলোকচিত্রীও উপস্থিত হয়।

২০১৮ সালে আমি এই উৎসবে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম, অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে ওখানে পৌঁছে দেখলাম
গরুর দৌড় 
খান তিরিশেক প্রতিযোগী গরু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, আর  ওই তিরিশটা গরুর ছবি তোলার জন্য প্রায় শখানেকের বেশি  ছবিপ্রেমী আলোকচিত্রী অপেক্ষা করছে।  বিরাট বিরাট লেন্স ও ক্যামেরা, ট্রাইপট নিয়ে সূর্য্যমামার তেজকে উপেক্ষা করে তারা অপেক্ষা করছে।  যখন  একটা দৌড় শুরু হচ্ছে তখন সমগ্র পরিবেশটা বেশ উত্তেজনায় কেঁপে উঠছে।  অতি উৎসাহী বেশ কিছু চিত্রপ্রেমীকে দেখলাম ভালো ছবির জন্য জল-কাদায় মাখামাখি করে মাঠের মধ্যে নেমে পড়েছে।

এখানে আলোকচিত্রীদের ক্যামেরা ও লেন্সের বহর দেখে আমি প্রথমদিকে সাহস করে আমার পুচকে ক্যামেরাটা বের করতে লজ্জা পাচ্ছিলাম।  পরের দিকে অবশ্য দু-একটা ছবি তুলেছি। ছবিগুলো হয়তো সেরকম ভালো কিছু হয়নি।  দর্শকাসন থেকে প্রতিযোগিতা শুরুর জায়গাটা বেশ কিছুটা দূরে ছিল,  সেক্ষেত্রে জুম লেন্স ছাড়া ছবি তোলা বেশ মুসকিল হচ্ছিল। আমার ক্যামেরাতে সেরকম কোনো জুম লেন্স নেই তাই ভালো ছবি তুলতে আমি পাচ্ছিলাম না।

এখানকার গরুর দৌড়ে কোন রাজনীতির রঙ নেই, নেই কোনো ধর্মের রঙও।  হিন্দু-মুসলমান একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দৌড়ে অংশগ্রহণ করে। এই প্রতিযোগিতাটা এখানে যেন এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জ্বলন্ত উদাহরণ।


ছবি ও  লেখার স্বত্ত  : সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ০৯-০৭-২০১৯

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।