Thursday, July 30, 2020

শতবর্ষের আলোকে সরবতের দোকান>P



শতবর্ষের আলোকে  সরবতের দোকান




সেই দিন হঠাৎ একটা বইয়ের খোঁজে কলেজ স্ট্রিট-এ গিয়েছিলাম।  গ্রীষ্মের প্রখর রোদ্দুর। এ দোকান সে দোকান ঘুড়তে  ঘুড়তে  বইটা অবশ্য পেলাম। বইটা পেলে কি হবে, তার সন্ধান করতে গিয়ে আমার অবস্থা খুবই কাহিল হয়ে পড়লো।  ঘেমে নিয়ে একাকার হয়ে গেলাম। শরীরটা  একটু গাছের ছাওয়ায় স্নিগ্ধ হাওয়ায় নিরিবিলিতে একটু বিশ্রাম পেতে চাইছিলো।  কলেজ স্ট্রিটে এরকম জায়গা পাওয়া তো দুস্কর। প্রথমে কলেজ স্কোয়ারে গিয়ে একটা ছাওয়ায় বসলাম।  জায়গাটায় ছাওয়া থাকলেও রোদের ঝলকানি আর সাথে গরম হাওয়া দিচ্ছিল। সেখানে বেশিক্ষন বসা গেলো না।  সেখান থেকে উঠে পড়লাম।  এবার চললাম কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত শরবতের দোকানে। ওখানে একটু ঠান্ডা শরবত খেয়ে প্রাণটা  জুড়ানোই উদ্দ্যেশ্য। 

 ওখানে ঢুকে দেখলাম বেশ ভিড় রয়েছে, তবে কয়েকটা খালি জায়গা রয়েছে।  ওদের বিখ্যাত ডাবের শরবত দেওয়ার জন্য বললাম।  বসে বসে দোকানের ইতিহাসটা ভাবছিলাম।  কি ঐতিহ্য দোকানটির।  প্রায় একশত বছর অতিক্রান্ত  এক দোকান। ভাবা যায় একটা শরবতের দোকানের বয়স  শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে। 

১৯১৮ সাল। অবিভক্ত বাংলার বরিশাল নিবাসী নীহাররঞ্জন মজুমদার কলকাতায় এসে দোকানটি  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি নাম দেন প্যারাডাইস। প্রতিষ্ঠানটা শুধু দোকান ছিল না।  দোকানের আড়ালে চলতো স্বদেশী আন্দোলনের কাজ কর্ম। নীহারবাবু নিজে ছিলেন একজন বিপ্লবী। এখানে তখন সতীন  সেন, বাঘাযতীন এরকম বহু স্বনামধন্য বিপ্লবীদের যাতায়াত ছিল।  এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও। শরবতের আড়ালেই চলতো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গুপ্ত সমিতির কাজকর্ম। ব্রিটিশদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চলতো  অনুশীলন সমিতির কাজ। কিন্তু তা বেশিদিন চালানো যায়নি।  তাদের কাজকর্মের খবর একদিন ব্রিটিশ সরকারের নজরে চলে আসে।  তারা এসে দোকানটিকে বন্ধ করে দেয়।  বেশ কিছু বছর পর দোকানটি আবার চালু করা হয়। সালটা ছিল সম্ভবত ১৯৩৭। তবে দোকানটির নাম পরিবতর্ন করে তখন করা হলো প্যারামাউন্ট। সেই থেকে এক রয়ে গেছে দোকানের চেয়ার-টেবিল।  শরবতেরও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, তার রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ আজও বহাল রয়েছে। চাওমিন, বিরিয়ানির যুগেও  বা কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডের যুগেও দোকানটি আট  থেকে আশি সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে।  


শরবতের যে কতরকম স্বাদ হতে পারে, কত রকম বৈচিত্র হতে পারে তা এখানে না আসলে জানা যায় না।  প্রত্যেকটির স্বাদই আলাদা, একের থেকে অন্যটি  ভিন্ন। কোকা মালাই, ম্যাংগো মালাই, কেশর মালাই, রোজ  মালাই, প্যাশন ফ্রউট, পাইনাপিল মালাই, ব্যানানা  মালাই, ভ্যানিলা মালাই ইত্যাদি নানারকম স্বাদের  শরবত    পাওয়া যায়।  এছাড়া নানারকম সিরাপও পাওয়া যায়।  

এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত শরবত হলো ডাবের শরবত। এই শরবত তৈরির নিয়ম আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নীহারবাবুকে বলে গিয়েছিলেন। তিনি কিভাবে ডাবের শাঁসের সাথে সিরাপ মিশিয়ে একটা সুস্বাদু শরবত বানানো যায় তা শিখিয়ে গিয়েছিলেন। এদের এই রেসিপিটি জগৎ বিখ্যাত। ভারতীয় বিজ্ঞান আচার্যের সেই রেসিপি আজও সমান ভাবে চলে আসছে। যা একশো বছর ধরে ব্যাট করে চলেছে। শোনা যায়,  প্রতিদিনই প্রায় তার ব্যাট থেকে দু-তিন শতক রানের বন্যা বয়ে চলে। এই ডাবের শরবতের স্বাদ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের পদধূলি বারংবার পড়েছে।  

এখানকার শরবতের টানে কাজী নজরুল ইসলাম, বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা, বিশিষ্ট লেখক শঙ্খ ঘোষ, স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়, শচীন দেব বর্মন,  মহানায়ক উত্তমকুমার, মহানায়িকা সুচিত্রা সেন, সিদ্ধার্থ শংকর রায়,  থেকে বহু ভারত বিখ্যাতরা  সুস্বাদু শরবতের টানে এখানে এসেছেন। বর্তমান দোকানের মালিকের সাথে কথা হচ্ছিল এঁনারা  টিভি বা কোনো কাগজ বা পত্রিকাতে কোনোরকম বিজ্ঞাপন দেন না , শতবর্ষ ধরে এদের বিজ্ঞাপন লোকের মুখে মুখেই  চলে আসছে। 

 
বাঙালির শরবত চর্চার ইতিহাসে, খাদ্য রসিক বাঙালির রসনা তৃপ্তির ক্ষেত্রে শতাব্দী প্রাচীন দোকানটি তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।  গরমের সময়  ক্লান্ত শরীরে  এখানকার শরবতে  এক চুমুকে চমক এনে দেয়। 




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৭-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 





Tuesday, July 14, 2020

শব্দসুরের জাদুকর>P



 শব্দসুরের জাদুকর  


পঞ্চাশের দশকের প্রায় শেষের দিকে পদার্থ বিজ্ঞানের এক ছাত্র গান শুনবেন বলে একটা ভালো মিউজিক সিস্টেম কিনলেন। ছাত্রটি তখন প্রবাসে ম্যাসাচুসেটস  ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়াশোনা করছেন। এই মিউজিক সিস্টেমে গান শুনে তার মন ঠিক মতো ভরছিল না।  কোনো অডিটোরিয়ামে বসে গান শোনা আর এই মিউজিক  সিস্টেমে গান শোনার মধ্যে অনেকটাই ফারাক সে অনুভব করতে লাগল। সে এই ফারাকটাকে ভরাট করার জন্য পদার্থ বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে গবেষণা শুরু করলো। পদার্থ বিদ্যার জ্ঞানকে সূত্র করে সে নতুন মিউজিক সিস্টেম তৈরী করতে লাগলো।

এই বাঙালি ছাত্রটির নাম অমর গোপাল বোস। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভেনিয়ার ফিলাডেলফিলায়।  তার মা ছিলেন আমেরিকান কিন্তু বাবা ছিলেন বাঙালি। তার বাবা ননী গোপাল বোস একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী ছিলেন।  কয়েকবার কারাবাসও করেছেন।  ১৯২০ সালে গ্রেফতারের ভয়ে তিনি আমেরিকায় পালিয়ে যান। 

অমর গোপাল বোস পেনসেলভালিয়ার অ্যাবিংটন সিনিয়র হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি ম্যাসাচুসেটস  ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভর্তি হন।  ১৯৫০ সালের শুরুতে তিনি সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংএ স্নাতক হন।  এরপর বোস নেদারল্যান্ডের এইডোভেন এ এনভি ফিলিপস ইলেক্ট্রনিকস এর গবেষণা ল্যাবে এক বছর কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ফুলব্রাইট রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসাবে দিল্লিতে এক বছর কাটান এবং এখানেই তার হবু স্ত্রী প্রেমার সাথে পরিচয় হয় (বর্তমানে তার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে)। তিনি এমআইটি থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি সম্পন্ন করেন; তার অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ছিল নন-লিনিয়ার সিস্টেমস। 

ছোটবেলা থেকেই  তিনি খুব কৌতূহলী ছিলেন। যেকোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে তার সম্বন্ধে জানার কৌতূহল ছিল তার সহজাত গুন।  

মাত্র তের বছর বয়সেই তিনি তার প্রতিভার পরিচয় দেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  চলাকালীন সময়ে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের যোগান দিতে তিনি তার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে মেরামতের একটি ছোট  ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন। লোকের বাড়িতে গিয়ে তারা নষ্ট হয়ে যাওয়া খেলনা ট্রেন ও রেডিও সারাই করে দিতো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তার বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।  তার পরিবার খুবই অর্থকষ্টে পড়ে। তখন তিনি তার পিতা  ননী গোপালকে বললেন বিভিন্ন দোকানে গিয়ে জানিয়ে আস্তে যে তারা পুরোনো রেডিও সারাই করে।    তার পিতা  সারাদিন দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে খারাপ  হয়ে যাওয়া রেডিও সারাই করার জন্য বাড়িতে নিয়ে আসতো। স্কুল থেকে ফিরে অমর সেই রেডিওগুলো সারাই করে দিতো।  এইভাবেই সে তার পারিবারিক আর্থিক অনটনের পিতার পাশে দাঁড়ান। যুদ্ধের পর অমর রেডার টিউব ও ট্রান্সফরমার দিয়ে একটা টেলিভিশন বানিয়ে ফেলে।  তার বুৎপত্তি দেখে পিতা  তাকে আমেরিকার সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় পোড়ানোর কথা ভাবলেন। কয়েকজনের কাছ থেকে  ঋণ  নিয়ে তিনি ১৯৪৭ সালে ম্যাসাচুসেটস  ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ছেলেকে ভর্তি করে দেন।  

 স্নাতক ও পরে স্নাতকোত্তর  সম্পন্ন করার পর অমর বসু এমআইটিতে  অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। তিনি একুইস্টিকস এ তার গবেষণা নিবদ্ধ করেন এবং ফলশ্রুতিতে তিনি এমন একটি স্টিরিও  লাউড স্পীকার আবিষ্কার করেন যা ঘরের ভেতর কনসার্ট হলের মত জোরালো প্রতিধ্বনিত শব্দক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ১৯৬৪ সালে তিনি উন্নত মানের স্পিকার বানানোর জন্য একটা  প্রতিষ্ঠানা গড়ে তোলেন। অন্য দেন "বোস কর্পোরেশন"। তাঁর উদ্ভাবন রাতারাতি বাজারে আলোড়ন ফেলে দিলো।  তার নির্মিত স্পিকারটি আসলে  ছোটো ও বড়ো কয়েকটির স্পিকারের  সমষ্টি। তিনি এই সমষ্টিতে রাখলেন উফারস টুইটার্স ছাড়াও একটি সক্রিয় ইকোয়ালাইজার দিলেন।  তার ফলে হল ঘরে দুই কোনে  দুটি স্পিকার বসিয়ে দিলে কনসার্টের মতো আমেজ পাওয়া যেতে লাগলো। তার এই আবিষ্কার তাঁকে  ও তাঁর বোস কর্পোরেশনকে বড়লোক বানিয়ে দিলো।  সেই থেকে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরতম ও শ্রেষ্ঠ স্পিকার সিস্টেমগুলো তাঁর প্রতিষ্ঠানই তৈরি হতে লাগলো।

তিনি শুধু বড় বড় হল ঘর নয় বাড়িতে বসেও যাতে লোকে সুন্দর শব্দ-সুধা পান করতে পারে তার ব্যবস্থা করলেন।  বিমানে বসে শোনার জন্য একপ্রকার হেডফোন আবিষ্কার করলেন। ১৯৮০ সালে তিনি গাড়িতে বসে গান শোনার কথা চিন্তা করলেন।  অচিরেই তিনি কার সিস্টেম আবিষ্কার করে ফেললেন। বর্তমানে সারা বিশ্বেই এখন বোস করপোরেশনের অফিস ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। প্রায় সাড়ে নয় হাজার কর্মী সেখানে কাজ করেন। আমৃত্যু নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তার কাজ তিনি নিজে করেছেন। তিনি ছিলেন প্রভূত সম্পদের অধিকারী। ২০১১ সালে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।

৮৩ বছর বয়সে ২০১২ সালের  ১২ জুলাই  এই শব্দের জাদুকর মারা যান। এই শব্দসুরের জাদুকর দুটি বিবাহ করেন তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন প্রেম আর দ্বিতীয় স্ত্রী  ছিলেন উরসুলা। তাঁর ভানু বসু ও মায়া বসু নামে এই দুটি সন্তান রয়েছে। তিনি ব্যাডমিন্টন খেলতে আর বেহালা বাজাতে খুব ভালোবাসতেন।  





ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৭-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, July 5, 2020

এক রূপকথার গল্প>P

 এক রূপকথার গল্প 



ধুলায় মিশে যাওয়া জীবনকে কি করে সম্মানের আসনে বসাতে হয়, তা বোধহয় একমাত্র বাঙালি মেয়ে বেবীই  জানে।  বাবুর বাড়ি বাসন মেজে যার জীবন চলতো আজ তার লেখা বই বেস্ট সেলার হয়।  নাম তার বেবী হালদার। জীবন যুদ্ধে অমানুষিক লড়াই চালিয়ে আজ সে সব কিছুকে হারিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধে তাকে বার বার হোঁচট খেতে হয়েছে। চলার পথের অলিতে-গলিতে কাঁকর বিছানো পথে  তাকে বার বার হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয়েছে। এই পড়া থেকে সে শিক্ষা গ্রহণ করে আবার চলা শুরু করেছে, নিজেকে পরিপক্ক করে তুলেছে। তার জীবন সংগ্রাম যেন এক রূপকথার গল্প।  

 বেবী ১৯৭৩ সালে কাশ্মীর উপতক্যায় জন্মগ্রহণ করে। তার বাবা সেনাকর্মী ছিলেন।  মদ্যপ অবস্থায় বাবা তার মার ওপর অত্যাচার করতো।  এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার মা তাকে ও তার বোনকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে তাদের মামার বাড়িতে চলে আসে। এখানে তার মা দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ছোট্ট বেবীর জীবন সৎ বাবার সংসারে ভালোই চলছিল।  যখন সে ক্লাস সিক্সে পড়ে সেই সময় তার বাবা তাকে বিবাহ দিয়ে দেয়,  হারিয়ে যায় তার স্বাদের লেখাপড়া, হারিয়ে যায় তার শৈশব।  বিবাহের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর আর তার স্বামীর বয়স ছিল ২৬।  বিয়ের প্রথম রাত  থেকেই তার ওপর অত্যাচার শুরু হয়।  তার স্বামী তাকে রান্না করা আর সন্তান ধারণ করা ছাড়া আর কিছু ভাবতো না।  এই ভাবেই বাঙালি মেয়েটি তার জীবন অত্যাচারের মাধ্যমেই ধারণ করতে লাগলো।  তার বয়স যখন বছর কুড়ি  তখন সে তিন তিনটি সন্তানের মাতা।  ১৯৯৯ সাল তার বয়স যখন বছর পঁচিশ তখন সে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দিল্লিগামী ট্রেনে  উঠে পরে। তার  সন্তানদের পিতৃপরিচয়ের কথা তোয়াক্কা না করে স্বামীর বাড়ির চৌকাঠ ছেড়ে চলে আসে। নিজের পরিচয় সন্তানদের বড় করার ব্যাপারে মনস্থির  করে নেয়। কোথায় যাবে কি করবে কিছুই তার জানা নেই, সে চায় না তার মতো তার সন্তানদের জীবন যেন না হয়।  সে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চায়।  

দিল্লিতে এসে পরিচারিকার কাজ নেয়।  বেশ কয়েকটি বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে লাগলো।  অল্প বয়সের যুবতী নানা রকম কুপ্রস্তাবও আস্তে লাগলো। এখানে সে ঘর ঝাড় দিয়েছে, বাসন মেজেছে অর্থাৎ একজন পরিচারিকার যা কাজ সবটাই করেছে। বহুজনের কাছ থেকে ভালো ও খারাব দুরকম ব্যবহার সে পেয়েছে।সন্তানদের কথা ভেবে কোনোদিন সেভাবে প্রতিবাদ করেনি, সব কিছু মেনে নিয়েছে।    সে তার কর্তব্যে স্থির থেকে এগিয়ে যেতে লাগলো।  এই ভাবে চলতে চলতে সে একদিন অধ্যাপক প্রবোধ কুমারের বাড়িতে কাজ পেলো। বেবি তাদের বাড়িতে থেকে সব কাজ করে দেবে।  বেবির সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে প্রবোধ বাবু রাজি হলেন।  প্রবোধবাবু মুন্সি প্রেমচাঁদের নাতি ও অধ্যাপক হওয়ায় পড়াশোনার ব্যাপারে তার অগাধ আগ্রহ ছিল। তার বাড়িতে বহু রকমের বই ছিল   তিনি ধীরে ধীরে বেবীকে নিজের মেয়ের মতো ভালো বাসতে  লাগলেন।  বেবীও তাঁকে পিতার মতো সম্মান করতে লাগলো।  তাঁকে  তাতুস বলে ডাকতো। তাতুস শব্দের অর্হ পিতা।  প্রবোধবাবুর বাড়িতে কাজে ঢোকার পর বেবীর  গতানুগতিক জীবন  একটু অন্য দিকে বাঁক নেয়। জীবনের কানা গলি থেকে বেরিয়ে যেন এবার সে সঠিক গলির  সন্ধান পেল।   

 বেবী বইয়ের তাক ঝাড়পোছ করতে করতে মাঝে মাঝে কোনো বই নিয়ে পাতা ওল্টাতো। বইয়ের কিছুটা অংশ পড়তো, আবার যথাস্থানে বইটা রেখে দিতো।  এই দৃশ্য গৃহকর্তা প্রবোধবাবুর দৃষ্টি এড়ায় নি। একদিন বইয়ের তাক ঝাড়তে গিয়ে সে  তসলিমা নাসরিনের "আমার মেয়েবেলা" বইটা  পায়।  তিনি বেশ আগ্রহের সাথে বইটা পড়তে লাগল। এ যেন তারই জীবন কাহিনী লেখা রয়েছে।  প্রমথবাবু বেবীকে খাতা ও পেন্সিল এনে দিয়ে বলেন রোজ এক দু পাতা করে লিখতে।  বেবী জানতে চায় কি লিখবো। তিনি বলেন তার যা মনে হয় তাই লিখতে বা তার জীবনের কাহিনীটাও লিখতে পারে। 

কাজের অবসরে বেবী রোজ এক পাতা দু পাতা করে লিখতে শুরু করে।  ধীরে ধীরে লিখলো  তার শৈশবের কথা, তার বিবাহের কথা, তার সন্তান ধরণের কথা, তার অত্যাচারিত হওয়ার  কথা।  এই সময় বেশ কিছুদিনের জন্য গৃহকর্তা দক্ষিণ ভারতে যান, ফিরে  এসে দেখেনবেবী  ততদিনে একশো পাতা লিখে ফেলেছে। লেখাটি পরে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান।  তিনি তার বেশ কয়েকজন বন্ধুকেও লেখাটি পড়ান। সবাই একবাক্যে লেখাটির তারিফ করে। তাঁরা অনেকে এনি ফ্রাঙ্কের ডায়েরির সাথে লেখাটিকে তুলনা করেছিলেন।  

প্রবোধবাবু নিজ উদ্যোগে লেখাটিকে বইয়ের আকারে প্রকাশ করেন। বইটির নাম হয়  "আলো -আঁধারি"।  এভাবেই দু- মলাটে তিনি বেবীর জীবনকে ধরে ফেললেন।  পরবর্তী কালে এই বইটা ইংরেজিতে ও আরো ১২ টি  ভাষায় অনুবাদ হয়।  .পরে তিনি "ইসস্থ রূপান্তর" ও "ঘরে ফেরার পথ" নামে  আরো দুটি বই লিখেছেন। সব কটা বইতেই সে  তার শৈশব ও কৈশোরকে অক্ষরবৃত্তে ধরেছেন। 

হটটকের  মতোই তার জীবনের গল্প বিক্রি হতে লাগলো।  তিনটি  বই বেস্ট সেলার হয়।  বেবী হয়ে ওঠে পরিচারিকা  থেকে লেখিকা। তার চলা শুরু হয় গলি পথ থেকে রাজপথে। 



লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ :০৫-০৭-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 






Sunday, June 28, 2020

জীবন ও জীবিকা (চতুর্থ পর্ব )>P

কুমোর  



"কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি"

- কবিগুরুর লেখা এই কথাগুলো  আজ  অতীত।  আজ আর মাটি দিয়ে তৈরী হতে দেখা যায় না বাসন-পত্র বা কলসি-হাঁড়ি  অর্থাৎ মাটির তৈরী  প্রয়োজনীয় সাংসারিক  জিনিসপত্র, যা এখন আর ব্যবহার হয় না।  তার পরিবর্তে ধাতু নির্মিত সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এসে গাছে।  তাই রবীন্দ্রনাথের উক্তিটি আজ আর প্রযোজ্য নয় বলা চলে।   পৃথিবীর সভ্যতা, বিজ্ঞান, জাতির কৃষ্টি কালচাররের উন্নতি যত বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে, তত অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু পুরোনো প্রথা, ঐতিহ্য ও নিদর্শন। 

মৃৎশিল্প হলো বিশেষ এঁটেলমাটি বা কাদামাটি অথবা চিনামাটি প্রভৃতির সাহায্যে হাঁড়ি -কলসী ও বিভিন্ন রকম নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র তৈরী করে তা উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়।  যারা এই কাজটি করে থাকে তাদেরকেই কুম্ভকার বা কুমোর বা মৃৎশিল্পী বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।  প্রথমে কাদাঁমাটিকে জিনিসের প্রয়োজন অনুযায়ী একটা রূপ দিতে হয় তারপর তা  আগুনে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। পোড়ানোর পর বস্তুটি র কাঠিন্য ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায় ও একটা স্থায়ী পরিবর্ত ঘটে।  ইতিহাস বলে মানুষের প্রাচীনতম আবিষ্কারের মধ্যে একটি হল মৃৎশিল্প। শোনা যায় নব্যপ্রস্তরযুগে চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রাভেতিয়ান সভ্যতার ডলনে ভোসনিসের খ্রীষ্টপূর্ব ২৯০০০ - ২৫০০০ আব্দের ভেনাসের প্রস্তরমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল।  চীনের জিয়াংঝিতে মাটির পাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০০ আব্দের। নব্য প্রস্তরযুগের প্রথমদিকের শিল্পকর্ম জাপানের যেমন (খ্রিস্টপূর্ব ১০৫০০). রাশিয়ার সর্ব পূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০০) সব-সাহারা দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া গেছে।  




কাদামাটি দিয়ে নির্মিত মৃৎশিল্পকে তিন ভাবে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।  মাটির পাত্র, পাথুরে পাত্র ও পোর্সেলিন। এগুলো নির্মাণ করার জন্য মাটি ও তাপমাত্রার হেরফের রয়েছে।  এই শিল্পে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।  সবচেয়ে বড়  ব্যাপার হলো প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদনের সময়ে দূষণমুক্ত  করা হচ্ছে ও বিষাক্ত পদার্থকে নির্গমন করা হচ্ছে। 

পূর্বে মৃৎশিল্পীদের হাতে নিপুণভাবে তৈরী হত মাটির হাড়ি-কলসী, আবার কেউ কেউ ঘর সাজানোর পুতুল ইত্যাদি নানারকম জিনিস তৈরী করত।  সারা বছর মোটামুটিভাবে চললেও নববর্ষ, অক্ষয় তৃতীয়া, শারদোৎসব সহ অন্যান্য পূজা পার্বনের সময় এদের মাটির হাড়ি, মালসা, ছোট-বড় প্রতিমার একটা ভালো বিক্রি বরাবরই ছিল, যা  আজও  রয়েছে। 


তবে কি মৃৎশিল্পী বা কুমোর আজ আর সেভাবে দেখা যায় না। যেটুকু দেখা যায়  তারা প্রায় সবাই প্রতিমা শিল্পের সাথে যুক্ত। কিছু কিছু কুমোরকে আজও  মাটির চায়ের ভার ও কুঁজো নির্মাণ করতে দেখা যায়। আধুনিক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা যত মাটির তৈরী বিভিন্ন জিনিসের ব্যবহার কমাচ্ছি তত কুমোরদের কপাল পুড়ছে। প্রতিমা নির্মাণে আজ মৃৎশিল্পীরা তাদের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে চলেছে।  বংশপরম্পরায় তাদের এই কাজে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়।  

ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ :২৮-০৬-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Sunday, March 29, 2020

মহামারী ও কোয়ারান্টাইন>P

মহামারী ও কোয়ারান্টাইন

'মহামারী' এই শব্দটা শুনলেই মানুষ ভীত হয়ে ওঠে।  শব্দটি সত্যিই ভয়াবহ। সাধারণত কোনো সংক্রমণ রোগ দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে কোন দেশের জনসংখ্যার এই বৃহৎ সংখ্যক লোকের মধ্যে সংক্রমিত হয় তাকেই 'মহামারী' বলা হয়ে থাকে।  মহামারীর ভয়াবহতা বারবার বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।  আমাদের কল্লোলিনী কলকাতাকেও একাধিকবার ছিন্ন-ভিন্ন করেছে।  অষ্টাদশ-উনিশ শতকে কলকাতায় প্রায় প্রতিবছর মহামারী লেগে থাকতো।  সাবেক কলকাতায় প্লেগ, আমাশা, কলেরায় বহু সাহেবকে আমরা মারা যেতে দেখেছি।  সেই আমলের পত্র-পত্রিকাগুলোতে সেইসব বিবরণ ছাপার অক্ষরে বের হতো।  পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাবো মহামারী কিন্তু ঘুরে ঘুরে দেখা দেয়।  ২০২০ সালের প্রথম থেকেই 'কোভিড -১৯' নামাঙ্কিত এক ভাইরাস ধীরে  ধীরে পৃথবীর বুকে থাবা বসিয়ে চলেছে।  গোটা বিশ্বই কম বেশি সংক্রমিত।  ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে বহু মানুষের। ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। মহামারী প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় অতীতের কিছু ঘটনার কথা।  অসুখ থেকে দূরে রাখার তারিকাটি অর্থাৎ কোয়ারান্টিনে পাঠানোর ইতিহাসটি দীর্ঘদিনের।  এই পদ্ধতি নানা দেশে নানা সময়ে কাজে লাগতে দেখা গেছে।

১৩৪০ সাল।  মধ্য এশিয়া থেকে সিল্ক রুট ধরে ক্রিমিয়া হয়ে এক ভয়ঙ্কর রোগ ইউরোপে হানা দিল।  লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে মারা যেতে লাগলো।  রোগটির নাম 'বিউবোনিক প্লেগ', কিন্তু লোকেরা রোগটির  'ব্ল্যাক ডেথ' নাম দিল। দশকে পর  দশকে রোগটি ইউরোপে বার বার ফিরে আসতো। ১৩৭০ সালেও রোগটি এসেছিল। ১৩৭৩ সালে ভেনিসের কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছিল তাদের বন্দরে যেসব জাহাজ ভিড়বে সেইসব জাহাজে যদি কোন প্লেগ আক্রান্ত রুগী থাকে, তাকে ভেনিসে ঢোকার আগেই একটা দ্বীপে চল্লিশ দিন অপেক্ষা করতে হবে।  তারপর তাকে শহরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে।

১৭৯৩ সাল।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে এক ধরণের জ্বর দেখা দিল। এই জ্বরে শহরের মোট জনসংখ্যার  প্রায় দশ শতাংশ লোক মারা যায়।  জ্বরটির নাম 'ইয়োলো ফিভার'।  কারো কারো মতে এটা মশা বাহিত রোগ আবার কারো কারো মতে নাবিকদের থেকেই রোগটি ছড়াচ্ছে। ১৭৯৯ সালে স্থানীয় প্রশাসন ঠিক করলো শহরের বাইরে একটা বিশাল 'কোয়ারেন্টাইন সেন্টার' নির্মাণ করবে।  শহরে আসা জাহাজে যদি কেউ অসুস্থ থাকে প্রথমেই তাকে ওই সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

১৮৯২ সাল।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে রাশিয়া থেকে ইহুদিদের একটা জাহাজ এসে ভিড়েছিল।  জাহাজটিতে প্রায় জনা  সত্তর যাত্রী ছিল।  দেখা গেলো দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার ফলে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ফলে জাহাজটির বেশিরভাগ যাত্রীর সারা গায়ে থিক থিক করছে উকুন।  এই উকুন থেকে আবার অনেকে টাইফয়েড রোগেও আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইস্ট রিভার নদীর নর্থ ব্রাদার দ্বীপে   তাঁবু খাটিয়ে রুগীদের শহর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দেওয়া হয়।

১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল।  রোগ সংক্রমণের ভয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।  সেই সময়ে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার চার ভাগের একভাগ লোক মারা গিয়েছিল। আনুমানিক প্রায় ৫০ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।  ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমেরিকায় জনসমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি বিভিন্ন নথিতে ও সংবাদ মাধ্যমগুলো অসুখের ভয়াবহতা অনেকটা কম করে দেখিয়েছিল।   বিভিন্ন মাধ্যম  থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল স্পেনে এই রোগের প্রকোপ সব থেকে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।  সেই কারণে বিশ্ব জুড়ে রোগটির নাম দেওয়া হয়েছিল 'স্প্যানিশ ফ্ল'।

আর একটি ঘটনার কথা প্রসঙ্গক্রমে এসে যায়।  পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিনের জন্য কোয়ারান্টিনে কে ছিলেন ?

১৯০৭ সাল।  মেরী  ম্যালোন, পেশায় একজন পাচক ছিলেন।  জন্মসূত্রে আইরিশ হলেও তিনি মার্কিন নাগরিক ছিলেন।  তিনি এক সংক্রমক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যে সব বাড়িতে তিনি রান্নার কাজ করতেন প্রথমে সেই সব পরিবারের লোকদের মধ্যে রোগটি সংক্রমিত হয়েছিল।  পরবর্তীকালে বন্ধু -বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ও পাড়া-পড়শির মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।  প্রচুর মৃত্যুও ঘটে। মেরী ম্যালোন অবশ্য জীবিত ছিলেন।  স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাকে পাকড়াও করে তিন বছরের জন্য নিউ ইয়ার্কের নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডের কোয়ারান্টিনে পাঠিয়ে দেয়।  কোয়ারান্টিনে থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর পাচকের কাজ করবেন না, কিন্তু  ১৯১৫ সালে তিনি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।  তাকে কর্তৃপক্ষ আবার পাকড়াও করে সারা জীবনের জন্য ওই দ্বীপের কোয়ারান্টিনে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তিনি ২৩টা বছর বেঁচেছিলেন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম কোয়ারান্টিনে থাকার নমুনা হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র : এই সময় সংবাদপত্র (২২-০৩-২০২০)

ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 










  

Saturday, March 28, 2020

বেলা মিত্রের জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি>P

 বেলা মিত্রের  জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি  



মাত্র কয়েকটি চিঠিতেই স্বামীর ফাঁসি রদ করেছিলেন এক বঙ্গললনা। চিঠিগুলো অবশ্য বঙ্গললনা নিজে লেখেননি, তাঁর অনুরোধে মহাত্মা গান্ধী তৎকালীন ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ ভাইসরয়কে চিঠিগুলো লিখেছিলেন নেতাজি সুভাষ অনুগামী চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির আদেশ বন্ধ করার জন্য। সেই চিঠিগুলোর ফলে অবশ্য তাঁদের ফাঁসি বন্ধ হয়েছিল, ফাঁসির বদলে তাঁরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত  হয়েছিলেন।  ভাবছেন নিশ্চই কে এই বঙ্গললনা?  তিনি আমাদের রাজ্যের অর্থমন্ত্রী শ্রী অমিত মিত্রের মাতৃদেবী, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ভাইজি, সুরেশচন্দ্র বসুর কন্যা বেলা বসু। ওই চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর একজন হলেন হরিদাস মিত্র, যিনি ছিলেন বেলাদেবীর স্বামী।  ১৯৭২ সালে হরিদাসবাবু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।  বাকি তিন বিপ্লবী হলেন পবিত্র রায়, জ্যোতিষচন্দ্র বসু  ও  অমর  সিং গিল।

১৯২০ সালে মাতুলালয় ভাগলপুরে জন্মেছিলেন বেলাদেবী।  তাঁর পিত্রালয় ছিল দক্ষিণ  ২৪ পরগনার কোদালিয়া গ্রামে। ১৯৩৬ সালে তিনি  আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগের অন্যতম প্রধান  যশোর নিবাসী হরিদাসের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিবাহের বছর দুয়েকের মধ্যে বেলাদেবী তাঁর শশুরবাড়িতে গড়ে তুললেন মহিলা সমিতি।  ১৯৪০ সালে কংগ্রেসের রামগড় অধিবেশন থেকে বেরিয়ে নেতাজি  আপস বিরোধী সম্মেলনের ডাক দেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সী বেলা সেই সম্মেলনের মহিলা শাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।  ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বেহালার বাড়ি থেকে তিনি ট্রান্সমিটার মারফত সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুনে নেতাজির সঙ্গে সংবাদ বিনিময়ের ব্যবস্থা করেন।  নেতাজির পাঠানো অস্ত্রশস্ত্র ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের উড়িষ্যার কোনারক মন্দিরের কাছে নিরাপদে অবতরণ করার জন্য বেলা ও তাঁর স্বামী প্রভূত সহায়তা করেন।  বেলা দেবীকে এজন্য নিজের প্রায় সমস্ত গহনা বিক্রয় করতে হয়েছিল, হয়েছিল তাঁদের জীবন বিপন্ন।

নেতাজি তখন বিদেশে। ৬এ বিপিন পাল রোডের বাড়িতে ব্রিটিশ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সুভাষ অনুগামী চার বিপ্লবীর  কার্য্যকলাপ চলতো।  তাঁরা এই বাড়িটিতে একটি টেলিগ্রাফ সেট বসিয়েছিলেন। এই টেলিগ্রাফ সেটের সাহায্যে তাঁরা সাংকেতিক ভাষায় গোপন খবর নেতাজিকে পাঠাতেন। মূলত এই কাজটি জ্যোতিষচন্দ্র বসু করতেন তাকে সহায়তা করতেন হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়।  ১৯৪৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর এই বাড়ি থেকেই গ্রেফতার হলেন জ্যোতিষচন্দ্র বসু।  তার কয়েকদিনের মধ্যে গ্রেফতার হলেন হরিদাস মিত্র, ওমর সিং গিল ও পবিত্র রায়। তাঁদের সকলকেই প্রথমে রাখা হয়েছিল লর্ড সিনহা রোডের গোয়েন্দা বিভাগের বাড়িতে।  নেতাজিকে সাংকেতিক ভাষায় জানানো বিভিন্ন সংবাদ জানার জন্য পুলিশ অকথ্য অত্যাচার চালাতো এই বিপ্লবীদের ওপর। কিছুদিন পরে অমর সিং গিল ও জ্যোতিষচন্দ্র কে রাখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে আর হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়কে রাখা হয়েছিল আলিপুর জেলে। অল্প দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর  চার বিপ্লবীর ফাঁসির আদেশ হল। জেলেরই এক কর্মীর পরামর্শে হরিদাস মিত্রের স্ত্রী ২২ বছরের বেলাদেবী  ও জ্যোতিষচন্দ্রের পিতা রঞ্জন বিলাস বসু পুনায় গিয়ে মহাত্মা গাঁধীর স্বরণাপন্ন হলেন। গাঁধীজি যদি ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ওভেলকে অনুরোধ করে পত্র দেন তাহলে এই চার বিপ্লবীর ফাঁসির হুকুম রদ হতে পারে এমনই তাঁদের ধারণা ছিল।  সত্যি সত্যি  একদিন সেই  অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। রদ হল  তাঁদের ফাঁসির আদেশ।  শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে  তাঁরা দণ্ডিত হলেন। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর চেষ্টায় শেষমেশ সবার মৃত্যুদণ্ড মকুব হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। 

আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপচর বিভাগের অন্যতম প্রধান  দায়িত্ব হরিদাস ও বেলা বহুদিন সামলেছেন  যখন হরিদাস যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে ছিলেন, তখন বেলা নিজ হাতে সব  কিছু সামলেছিলেন। শ্রী হরিদাস মিত্র স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের টিকিটে জিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হন।  কিন্তু বেলাদেবী স্বামীর মতো রাজনীতিরআঙিনায় পা রাখেননি।  ১৯৪৭ সালে বেলাদেবী আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসি রেজিমেন্টের (Rani of Jhansi Regiment)  আদর্শে তৈরী  করেন 'ঝাঁসি রানী বাহিনী'। যার সর্বাধিনায়ক তিনিই হন। স্বাধীনতার পর শিয়ালদহ ও অন্য কয়েকটি জায়গায় শরণার্থীদের ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালে বালি ও ডানকুনির মধ্যবর্তী জায়গায় অভয়নগর অঞ্চলে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের কাজে প্রাণপাত পরিশ্রম করেন। কঠিন পরিশ্রমের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়তে লাগলো। তিনি কঠিন রোগে পড়লেন।  অবশেষে ১৯৫২ সালের ৩১শে জুলাই মাত্র ৩২ বছর বয়সে এই মহিয়সী মহিলার জীবনাবসান হয়। চিরকালই তিনি পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে গেছেন। 

১৯৫৩ সালে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে অভয়নগর অঞ্চলের নামটির পরিবর্তন করে বেলানগর করা হয়।  ১৯৫৮ সালে ভারতীয় রেল ওই  অঞ্চলে একটা নতুন স্টেশন তৈরী করে তার নামে  নামাঙ্কিত করে।

এবছর অর্থাৎ ২০২০ সালে তার জন্মশতবর্ষ। কেউ আজ আর তাঁর নাম করে না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোথাও তাঁর জন্ম শতবর্ষের কথা শোনা যায় না।  কোথাও তাঁর একটা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও শুনিনি।  কত সহজেই এই মহিয়সী নারীকে আমরা ভুলে গেলাম।




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ২৮-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 







Monday, March 9, 2020

ল্যাংচা ও শক্তিগড়>P

ল্যাংচা ও শক্তিগড়





বাঙালির খাদ্য তালিকা মিষ্টান্ন ছাড়া ভাবা যায় না। শেষ পাতে মিষ্টি চাইই  চাই।  উৎসব অনুষ্ঠান হোক বা অতিথি আপ্যায়ন হোক রসনা তৃপ্তির জন্য মিষ্টি  অপরিহার্য।  বাংলার মিষ্টিও বৈচিত্রময়।  একেক জায়গা একেক ধরণের মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। স্থান বিশেষে বাঙালির মিষ্টি বিশ্ব জয় করেছে।

বাংলা অভিধানে ল্যাংচা কথাটির অর্থে বলা আছে পঙ্গু বা খোঁড়া অথচ এই শব্দটি বাঙালির রসনা তৃপ্তির জন্য একটি  অনবদ্য শব্দ।  বর্ধমান রাজপরিবারে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের কন্যার বিবাহ হয়েছিল।  বর্ধমান রাজার এই পুত্রবঁধুর গর্ভে যখন সন্তানের  আগমন ঘটলো তখন তাঁর মুখে কোনো সুখাদ্য ভালো লাগছিল না।  পরিবারের লোকেরা এই বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। একদিন বর্ধমান মহিষী অর্থাৎ বঁধুটির শাশুড়ি তাঁর কাছে জানতে চাইলেন তাঁর কি খেতে ইচ্ছে করছে। বালিকা বঁধুটি নতমুখে বলে ফেলেছিলো তাঁর ল্যাংচা খাওয়ার ইচ্ছে করছে।  কিন্তু ল্যাংচা কথাটি রানী পূর্বে কোনোদিন শোনেন নি। তিনি পরিবারের সবার কাছে কথাটি জানালেন। কেউই শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলেন না।  পরেরদিন রাজপুত্র সবার সামনে তাঁর মাকে জানালেন ল্যাংচা কোনো খাদ্যদ্রব্য নয়। একপ্রকার মিষ্টান্ন।  রাজবঁধু মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদে এক রকম মিষ্টান্ন খেয়েছিলেন, যে মিষ্টান্নটি একজন খোঁড়া মানুষ তৈরী করেছিলেন।  আজ আর তাঁর বঁধুসেই মিষ্টান্নটির নামটা মনে করতে পারছেন না।  সেই খোঁড়া মেঠাইওয়ালার তৈরী সেই মিষ্টিটি তাঁর খাওয়ার স্বাদ হয়েছে। রাজমহিষী গোপনে সংবাদটা মহারাজকে জানালেন।  বর্ধমান মহারাজ  কথাটি শোনার পরই তাঁর বিশ্বস্ত একজন অশ্বারোহীকে একটি জরুরি ও গোপন পত্র দিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদে পাঠালেন। কয়েকদিনের মধ্যেই অশ্বারোহী নদিয়ার সেই খোঁড়া ময়রাকে বন্দী করে নিয়ে এসে বর্ধমান রাজপ্রাসাদে হাজির করলেন।  বর্ধমানরাজ সেই ময়রাকে বর্ধমান শহরের পুবদিকে প্রায় ক্রোস চারেক দূরে বড়সুল গ্রামে কিছু ভূসম্পত্তি দান করলেন এবং তার বসবাসের জন্য একটি ঘরও তৈরী করে দিলেন।  প্রতিদিন ময়রার ভিয়েন থেকে রাজবাড়িতে প্রায় মন খানিক এই বিচিত্র ধরণের মিষ্টান্ন সরবরাহ হতে লাগল। খোঁড়া ময়রা প্রতিষ্ঠা পেলেন ল্যাংচা বিশারদ হিসেবে। উপরিউক্ত কাহিনীটি বিখ্যাত লেখক নারায়ণ স্যান্যালের 'রূপমঞ্জরী' উপন্যাস অবলম্বনে লেখা। ল্যাংচা বিশেষভাবে তৈরী একপ্রকার রসের  ভাজা মিষ্টি, খেতে খুবই সুস্বাদু ও নরম।  রঙ হয় কালচে বাদামি। ময়দা, ছানা, খোয়া ক্ষীর ও চিনির সাহায্যে এই মিষ্টি তৈরী করা হয়।


কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ধরে বর্ধমান বা বোলপুর-শান্তিনিকেতন যাওয়ার সময় সবাই শক্তিগড়ে যাত্রাবিরতি নেয়।  এই শক্তিগরের পূর্বে নাম ছিল বড়সুল। রাস্তাটার দুধারে অসখ্য মিষ্টির দোকান। দোকানগুলোর নাম বেশিরভাগ ল্যাংচা শব্দটি দিয়ে কোনটা ল্যাংচা ঘর, কোনটা ল্যাংচা সম্রাট, ল্যাংচা প্লাজা, ল্যাংচা নিকেতন আবার কোনটা ল্যাংচা কুঠি এরকম। বাহারি স্বাদের মতো নামের বাহার সব।   সেখানেই পাওয়া যায় এই সুবিখ্যাত ও সুস্বাদু মিষ্টিটি।  গাড়ি থামিয়ে গরম গরম ল্যাংচার স্বাদ নিতে কেউ ভোলে না। যদিও বর্তমানে ল্যাংচা আর শক্তিগড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই তা পৌঁছে গেছে  ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই।  তবে শক্তিগড়ের ল্যাংচার স্বাদ ভিন্ন ধরণের। রসগোল্লা, ল্যাংচা, সন্দেশ বাঙালির খুবই প্রিয়। শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাননি এরকম বাঙালি বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্ধমানের শক্তিগড়ের ল্যাংচা ছাড়াও সীতাভোগ ও মিহিদানাও খুব প্রসিদ্ধ। বছর আড়াই আগে বর্ধমানের সীতাভোগ ও মিহিদানা ভৌগোলিক স্বীকৃতি (জি. আই) পেয়েছে। এবার শক্তিগড়ের ল্যাংচার এই স্বীকৃতি পাওয়ার পালা।


ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১০-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Tuesday, March 3, 2020

রবিকথা>P

রবিকথা ...






রবীন্দ্রনাথকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাঁর মৃত্যুর অন্তত বছর কুড়ি বাদে আমি পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের কথা বাল্যকাল থেকেই বাড়ির বড়দের কাছ থেকে শুনতে অভ্যস্থ ছিলাম। বালক বয়সেই শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের কথাও শুনি। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গল্প বাবার কাছে বাল্য বয়সেই শুনেছিলাম, আর বড় বয়সে এসে সংবাদপত্রের মাধ্যমে সেই নোবেল পুরস্কারের চুরি যাওয়ার কথাও জেনেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ।  আমি জানি রবীন্দ্রনাথের সব কিছু সবাই জানেন তবুও আমার উপলদ্ধিকে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

ছেলেবেলায় বড়দের দেখতাম রবীন্দ্রনাথের নামের আগে কবিগুরু কথাটি বসাতে। তখন ধারণা ছিল তিনি শুধুমাত্র একজন কবি ছিলেন। পরবর্তীকালে নানারকম বই পড়ার মাধ্যমেই জেনেছিলাম তিনি কেবল কবি নন।  কাব্য রচনাই  তাঁর একমাত্র রচনা নয়।  সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। তিনি ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক শিরোমণি। তিনি শুধু কবি-সাহিত্যিক নন, একজন মহা-মনীষীও বটে। ভারতের স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম প্রথিকৃৎ। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি দেশবাসীকে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছিলেন।  বিশ শতকের প্রথম দশকে বাঙালির জাতীয় জীবনে নবজাগরণ দেখা দেয়।  লর্ড কার্জন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার চক্রান্ত করেন। কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলার বুকে জাতীয়তাবাদের বন্যা বয়ে গিয়েছিলো। বাংলা থেকেই ভারতের সর্বত্র জাতীয় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। তার পরিপেক্ষিতে মহারাষ্ট্রের অন্যতম জননায়ক গোপালকৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন "What bengal thinks today India thiinks tomorrow week"। যে বন্দেমাতরম মন্ত্র বাঙালির মনে জাতীয়তাবোধের প্রতীক হয়ে ওঠে সেই মন্ত্রের স্রষ্টা ছিলেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ দেশপ্রেমের বাণী প্রচার করেন। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল ও অন্যান্য কবিরা সব অপূর্ব দেশপ্রেমের গান রচনা করে নবযুগকে সাদরে আহ্বান করেন  ১৬ই আগস্ট ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব পাশ হয়।  ঐদিনটি ছিল রাখী পূর্ণিমার দিন।  রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে হিন্দু-মুসলমান দাদা ভাইয়ের হাতে হিন্দু বোনেদের রাখী বাঁধার উৎসব পালিত হয়। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের হাতে ভালোবাসার রাখী বেঁধে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন পাকা করলেন। কবি এইভাবেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।

কবি ও শিল্পীদের  চিত্ত বরাবরই স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল হয়। স্বদেশী যুগ ছিল উদ্দীপনার ও উন্মাদনার যুগ। স্বদেশপ্রেমীরা সেই উদ্দীপনায় গা ভাসিয়েছিলেন, জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের জন্য। রবীন্দ্রনাথও সেই উন্মাদনার প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না।  স্বদেশী যুগে হোক বা তার পরবর্তী যুগের রাজনৈতিক ঘটনাগুলো স্বভাবতই তাঁর চিত্তে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তা কেবল তাঁর গান বা প্রবন্ধে বা আলাপ-আলোচনায় প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর রচিত 'গোরা', 'ঘরে-বাইরে' এবং বিশেষভাবে 'চার অধ্যায়' উপন্যাসেও তা প্রকাশ পেয়েছিল।  বিভিন্ন প্রবন্ধ ও উপন্যাসে বারবার উঠে এসেছে তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভাবনাগুলো।  রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর অপর  স্মরণীয় ঘটনা হল 'নাইটহুট' উপাধি ত্যাগ করা। জালিয়ানওয়ালাবাদে ইংরেজদের পাশবিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ তিনি ওই উপাধি ত্যাগ করেন। এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা।  ১৯১৫ সালে তাঁকে 'নাইটহুট' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ১৯১৯ সালের ৩০শে মে তিনি বড়লাট লর্ড চেমস্ফোর্ডকে  চিঠি লিখে  উপাধি ত্যাগ করার কথা জানান।  তাঁর পৃথিবীজোড়া খ্যাতির জন্যই চিঠিখানা দেশ বিদেশে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

রবীন্দ্রনাথ চিত্রশিল্পী হিসেবেও তাঁর প্রতিভার সাক্ষ্য রেখে গেছেন। জীবনের শেষ  দিকে এসে তিনি চিত্রাঙ্কন শুরু করেন। চিত্রকলায় তাঁর কোনো প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না।  তাঁর আঁকা ছবিগুলো ছিল সার্থক শিল্পসৃষ্টি। তিনি তাঁর অঙ্কিত  ছবিগুলো নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন।  বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুও তার আঁকা ছবিগুলোর উচ্চ প্রশংসা করে গেছেন। আজও শান্তিনিকেতনের বিচিত্রভবনে ছবিগুলো রাখা আছে, যা চিত্রানুরাগীদের আকর্ষণের বস্তু হয়ে আছে।

দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর প্রতিভার পরিচয় রেখে গেছেন। দেশের সম্মুখে তিনি শিক্ষার এক নতুন আদর্শ স্থাপন করেন। সেই আদর্শ দেশবাসী ও সরকারের কাছে সমাদৃত হয়েছে। তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রতিবাদেই শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বা পাঠভবন বিদ্যালয়টি ১৩০৮ সালের ৭ই পৌষ (১৯০১ সালের ২২শে  ডিসেম্বর) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  তিনি মনে করতেন শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষ গড়া, পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ। সেই আদর্শকে সামনে রেখেই শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় ও আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। যা আজ  এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।  তাঁর নিজের মূল্যবান সময় ও শক্তি অকৃপণভাবে আশ্রমের সেবায় অর্পণ করেছিলেন। যদিও শান্তিনিকেতনের জমি কিনেছিলেন তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তিনি এখানে একটি প্রার্থনা কক্ষও তৈরী করেছিলেন। আশ্রমের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও মহর্ষির প্রভাব পরোক্ষভাবে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বাল্যকালের শিক্ষাও শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিজ্ঞান শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, সংগীত শিক্ষার সাথে চিত্রবিদ্যার শিক্ষাও শান্তিনিকেতনে অন্যতম ছিল, বর্তমানেও তা রয়েছে।  দেশের বহু নামি-দামি শিল্পীর হাতেখড়ি এখানেই হয়েছিল। শুধু শিক্ষা নয় তার সাথে খেলাধুলার প্রচলন করেছিলেন। সেকালে বাংলার স্কুলগুলোতে শুধুমাত্র ভারতের ইতিহাস পড়ানোর রেওয়াজ ছিল, কিন্তু এখানে তিনি সমগ্র বিশ্বের ইতিহাস পোড়ানো শুরু করেন।  বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাশীলতার উন্মেষই তাঁর শিক্ষার প্রকৃত আদর্শ ছিল। তাঁর কাছে প্রকৃতির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।  তাই তিনি মুক্ত আকাশে গাছের তলায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছিলেন।

তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করতেন। সমাজ কল্যাণ সাধনে ও পল্লীবাসীদের উন্নয়ন সাধনে তাঁর পরিকল্পনাই শ্রীনিকেতনের বাস্তবরূপ।  শ্রীনিকেতন আজ নানাভাবে তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে চারপাশের পল্লীগুলোর শ্রী ফেরানোর চেষ্টা করছে, পল্লীবাসীদের আর্থিক উন্নয়নের জন্য তিনি বস্ত্র ও চর্ম শিল্প প্রচলন করেছিলেন। গ্রামগুলোর অশিক্ষা দূর ও তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো ফোটানোর চেষ্টা আজও করে চলেছে শ্রীনিকেতন।  শ্রীনিকেতন এমন একটা প্রতিষ্ঠান যার মূল্য দেশ ও দেশের সরকার উপলব্ধি করছে।

বাইরে রবীন্দ্রনাথের প্রধান পরিচয় ছিল কবি-সাহিত্যিক হিসেবে কিন্তু শান্তিনিকেতনে তিনি গুরুদেব বলে পরিচিত ছিলেন। শোনা যায় আশ্রম প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর প্রথম সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় মহাশয়। তিনিই তাঁকে গুরুদেব আখ্যা দেন।  আশ্রমের ছাত্র ও শিক্ষকগণ তাঁকে গুরুদেব ছাড়া ভাবতে পারতেন না, আজও পারেন না।  তিনি মনে করতেন অধ্যাত্ব্য জীবনের উৎকর্ষ সাধনই মানব জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।  তাই তিনি এখানে সকাল সন্ধ্যায় উপাসনার প্রবর্তন করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি প্রত্যহ উপসনা করতেন। ৭ই পৌষ মহর্ষি ব্রহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন সেই দিনটিকে স্মরণে রাখার অভিলাষে রবীন্দ্রনাথ ৭ই পৌষ তাঁর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। মহর্ষির জীবনে উপনিষদের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।  রবীন্দ্রনাথের মন্দিরের ভাষণেও উপনিষদের ঋষিবাক্যগুলো বারবার উঠে আসতো। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন ধর্মের জয় হয়, অধর্ম সাময়িকভাবে সুখকর হলেও পরিণামে সমূলে বিনাশের কারণ হয়।  তিনি আরো মনে করতেন যিনি শান্তম তিনিই শিবম, তিনি আবার অদ্বৈতম। এই শান্তম শিবম অদ্বৈতম মন্ত্রটি রবীন্দ্রনাথের অবচেতন ও জাগ্রত মনের কথা।  তাঁর অবচেতন মনে প্রতিনিয়ত মন্ত্রটি কাজ করে চলতো। তাঁর জীবনে যেমন শান্তিনিকেতন তেমন মন্ত্রটির বিশেষ স্থান ছিল। আশ্রমগুরু আশ্রমবাসীদের প্রকৃত কল্যাণের পথ মন্ত্রটির মাধ্যমে নির্দেশ করেছেন।

ছোটগল্প, নাট্যসাহিত্য, প্রবন্ধ, চিত্রকলা ও সংগীতের মধ্যে তাঁর সাহিত্য কর্ম ছড়িয়ে আছে। তিনি প্রায় হাজার পঁচিশেক গান লিখে গেছেন। রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত গানগুলি বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা তিনিই ছিলেন। তাঁর কাব্য বহুবর্ণময়। কখনো রক্ষণশীল ধ্রুপদী শৈলীতে, কখনো হাস্যোজ্জ্বল লঘুতায়, কখনো বা দার্শনিকের গাম্ভীর্যে আবার কখনো বা আনন্দের উচ্ছাসে কাব্যগুলি উদ্ভাসিত।

 রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আশ্রমের ছাত্র ও শিক্ষক উভয়েরই গুরুদেব, সমগ্র বাঙালি জাতিরও গুরুদেব। তিনি কেবল কবি-সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রকৃত জীবনশিল্পীও। শান্তিনিকেতন ছিল তাঁর তপস্যাকেন্দ্র। এই তপস্যাকেন্দ্রেই তিনি তাঁর জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন। তাঁর অনন্য সাধারণ প্রতিভার সাথে অনলস সাধনা যুক্ত হয়ে গড়ে উঠেছিল এক মহান জীবন।

রবীন্দ্রনাথ এক অনন্য সাধারণ ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমী  ব্যক্তিত্ব।  তাঁর আবির্ভাবের প্রায় ১৬০ বছর পর তিনি আমাদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের শোকে-দুঃখে, আনন্দে-উৎসাহে যার অস্তিত্ব আমরা সবসময় অনুভব করে থাকি। আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনি কেবল নিজের সাথে নিজেই তুলনীয়।  মহাকাল তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। যুগে যুগে, জন্ম-জন্মান্তরে তাঁর অমরত্ব নিয়েই বাঙালি তথা ভারতবাসীর কাছে তিনি চিরকালীন হয়ে থাকবেন। তিনি  ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর উদ্ভাসিত মহিমা আজও এবং ভবিষ্যতেও আমাদের সঠিক ও পরিপূর্ণ জীবন গঠনে সহায়তা করে চলবে। বাঙালি জীবনে তিনি বরাবরই একটা 'রোল মডেল' হয়ে থাকবেন।






ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ০৩-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 









Sunday, February 16, 2020

বাবা জটিলেশ্বর মন্দির >P

বাবা জটিলেশ্বর মন্দির 


বাবা জটিলেশ্বর মন্দির 






হুগলী  জেলা বাংলার পুরাকীর্তির ও স্থাপত্যের ইতিহাসে বরাবরই উজ্জ্বল হয়ে আছে। ব্যান্ডেল গির্জা, ফুর ফূরাহ শরিফ, ইমামবাড়া, শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির, ষাঁড়েশ্বরতলা মন্দির, হংসেশ্বরী মন্দির, বৃন্দাবন জিউ মন্দির, নৃত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির, আঁটপুর মঠ, ওয়াচ টাওয়ার, জাফরগঞ্জ কবরস্থান, জয় কৃষ্ণ লাইব্রেরী, সেন্ট ওলাফের গির্জা, চার্চ অফ সেক্রে কোয়ের ডি জেসু, বৌদ্ধ মন্দির, লাইট হাউস টম্ব, চন্দননগর মিউজিয়াম, চন্দননগর গির্জা, নন্দদুলাল মন্দির ইত্যাদি জেলা পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য স্থান।

হুগলী  জেলার চুঁচুড়া শহর ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শহর। শহরটি জেলার সদর শহর হিসেবে পরিচিত। হুগলী  নদীর তীরে শহরটি গড়ে উঠেছে। ওলন্দাজদের হাত ধরেই শহরটির গোড়াপত্তন হয়। মুঘল কর্তৃক পর্তুগীজদের বিতরনের পর ১৬৩২ সালে ওলন্দাজরা হুগলীতে আসে।  তারা ১৬৩৮, ১৬৫০, এবং ১৬৬২ সালে মুঘল সম্রাটের নিকট হতে চুঁচুড়াতে ব্যবসা করার ছাড়পত্র বা হুকুমনামা লাভ করে।  ওলন্দাজ নৌ-সেনাপতি ভ্যান দাড় ব্র্যাক ১৫৫৩ সালে চুঁচুড়ায় কুঠি স্থাপন করেন। তিনি পরবর্তী প্রায় ৫৭ বছর এখানে বাণিজ্য করেন এবং তিনিই  চুঁচুড়া শহরের পত্তন করেন। ওলন্দাজদের  ক্রমবর্ধমান ব্যবসা বৃদ্ধি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি তৎকালীন ইংরেজ সকারের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭৫৯ সালে বিদেরার যুদ্ধে ইংরেজরা ওলন্দাজদের পরাজিত করার পর জেলাটি ইংরেজদের অধীনে চলে আসে।  শহরের আনাচে কানাচে ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে। এক সময় ওলন্দাজদের বন্দর ছিল এই শহরেই।


বাবা জটিলেশ্বরের রথ 

 চুঁচুড়ার কোদালিয়া ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের সিমলা অঞ্চলে বাবা জটিলেশ্বর মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি খুবই ঐতিহ্যহবাহী ও জাগ্রত এক মন্দির। শোনা কথা, সরস্বতী নদী থেকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত বাবা জটিলেশ্বরকে পাওয়া গিয়েছিল। শিব এখানে জটিলেশ্বর রূপে বিরাজ করছেন। অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে প্রতি বছর বাৎসরিক উৎসব হয়।  এই উৎসবকে কেন্দ্র করে একটি বিরাট রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। অসময়ের এই রথযাত্রা ও তাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলাও বসে। এই মেলায় যাত্রা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এই দিনটিতে বিশেষ পুজোও হয়। চিরাচরিত প্রথা মেনে রথে বাবা জটিলেশ্বরকে নিয়ে শহরে প্রমোদ ভ্রমণ করানো হয়। বহু লোকের সমাগম হয় সেই দিনটিতে। লোকের বিশ্বাস বাবার কাছে মানত করলে জটিল রোগ থেকে মুক্তি মেলে। সেই কারনে বাবার নাম জটিলেশ্বর হয়েছে। বাবার আবির্ভাব ও মন্দির স্থাপনার সন সম্বন্ধে স্থানীয় লোকেরা কিছু জানাতে পারলেন না। কেউ বললেন শত বৎসর উত্তীর্ণ আবার কারো কারো ধারণা ২০০ বছর পেরিয়ে গেছে। তবে একজন বয়স্ক জানালেন যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গড়ে তোলা যাত্রার দল প্রায় ১১২-১৩ বছর ধরে মেলার সময় যাত্রা করে চলেছে। সেই হিসেব ধরলে এখানকার মন্দির শত বৎসর অতিক্রান্ত। এই অকাল মেলাটি চলে আরো বেশ কয়েকদিন ধরে। 



ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১৬-০২-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Monday, February 10, 2020

অস্তাচলে রাতের তারা >P

অস্তাচলে রাতের তারা 



"শরীর, শরীর। আমার এই শরীর নিয়েই তো সব কিছু। তাই জানো, শেষ জীবনে এই শরীরটাই দান করে দিয়ে যেতে চাই।  যদি কারো কোনও কাজে লাগে।  বলতে পারো, এটাই আমার শেষ ইচ্ছে।" মৃত্যুর  কয়েক মাস আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলি বলেছিলেন।


আরতি দাস হয়ে উঠেছিলেন মিস শেফালী। তিনি ছিলেন ছয় ও সাতের দশকের খ্যাতনামা নর্তকী, কলকাতার প্রথম বাঙালি ক্যাবারে ডান্সার। বাংলা চলচিত্রের "কুইন অফ ক্যাবারে" আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। গত ৬ই ফেব্রুয়ারী, ২০২০ বৃহস্পতিবার সোদপুরের বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।  বহুদিন তিনি কিড়নির রোগে শয্যাশায়ী ছিলেন  তাঁর পায়ের ছন্দ, শরীরী বিহঙ্গ এক সময় আমাদের তিলোত্তমাকে তোলপাড় করে দিয়েছিল। আহিরীটোলার এক ঘিঞ্জি বাড়ি থেকে বিনোদন জগতের ঝলমলে আলোয় উঠে আসা এক মধ্যবর্তী বাঙালি মেয়ের নাম আরতি ওরফে শেফালী। 

আহিরীটোলার গরিব পরিবারের কন্যা ছিলেন আরতি। ছয় মাস বয়সে বাবা-মার হাত ধরে পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। ১৯৪৪ সালে নারায়ণগঞ্জে জন্ম হয়েছিল।  কলকাতায় আসার পর প্রবল আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে তাঁদের পরিবারকে যেতে হয়। আধপেটা খেয়ে কোনো মতে তাঁদের দিন চলতো। অর্থের এভাবে তাঁর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি।  বাবা একটা ফলের দোকানে কাজ নিয়েছিলেন। মা পরিচারিকার কাজ করতেন।  তাঁদের  সামান্য আয়ে সংসার চালানো মুশকিল হচ্ছিল। সংসারের হাল ধরার জন্য মাত্র ১১ বছর বয়সে আরতিকে রোজগারের আশায় কাজের জগতে ঢুকতে হয়েছে। তিনি চৌরঙ্গী এলাকার একটা  এংলো ইন্ডিয়ান পরিবারে পরিচারিকার কাজ নিয়েছিলেন। এই পরিবারে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাচ-গান ও খানাপিনা আয়োজন করা হতো। কিশোরী আরতি পর্দার আড়াল থেকে নাচ দেখতো। তখনই তাঁর নাচের প্রতি একটা আকর্ষণ জন্মায়। একদিন ভিভিয়ান নামে এক সাহেবের কাছে তাঁর নাচের ইচ্ছের কথা জানান। সেই ভিভিয়ান  তাঁকে ফিরপোজ হোটেলে নাচের জন্য ব্যবস্থা করে দেন। এখানেই তাঁর ক্যাবারে নাচের হাতেখড়ি। মাসের শেষে তাঁকে ৭০০ টাকা মেইনে  দেওয়া হবে শুনে নাবালিকা আরতি বেজায় খুশি হয়েছিলেন। বাঙালি মেয়ে ক্যাবারে নাচছে। মধ্যবিত্ত বাঙালির মূল্যবোধে আঘাত হানলো। বাবা ও বাড়ির অন্যান্যরাও আপত্তি তুললো। সমাজও ভালোভাবে নিলোনা। সকলের  আপত্তিকে অবজ্ঞা করে চরম দারিদ্য দেখা আরতি তাঁর নাচ চালিয়ে গিয়েছিল। এই ফিরপোজ হোটেলের মালিক তাঁর আরতি নাম পরিবর্তন করে "মিস শেফালী" নাম দিয়েছিলেন।

ইউরোপীয় নৃত্যশিল্পীরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো, সুযোগ বাড়ছিল স্থানীয়দের। আরতির কপালে এই সময় সুবর্ণ সুযোগটা এসে গিয়েছিল।  তারপর ফিরপোজ হোটেল থেকে পার্ক স্ট্রিট হয়ে ওবেরয় গ্রান্ড হোটেলে  গানের সুরের সাথে পা মিলিয়ে তিনি "মিস শেফালী" নামের মর্যাদা রেখেছিলেন পরবর্তীকালে টালিউড থেকে বলিউডের চলচ্চিত্র  জগৎকেও  নাচের ছন্দে তিনি মাতিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর রূপের ছটায় মুগ্ধ হতেন যুবক থেকে বৃদ্ধ সবাই।  প্রথম শোয়ের পোশাক দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন, কিন্তু সংসারের দারিদ্র্যতার কথা ভেবে মুখ বুজিয়ে নাচে মন দিয়েছিলেন। প্রথম দিনই তাঁর নাচ সুপার ডুপার হিট হয়ে যায়। হাততালিতে হল সরগরম হয়ে ওঠে। তখন তাঁর কোনো রকম নাচের তালিম ছিল না। দেখে দেখে যেটুকু শেখা ও ফিরপোজের তত্ত্বাবধানে কিছু নাচ শেখা। পরবর্তীকালে তিনি চার্লস্টন, ক্যান ক্যান, টুইস্ট, বেলি ড্যান্স ইত্যাদি নাচের তালিম নেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শহরের সাহেবি হোটেলগুলোতে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন।  একের পর এক হোটেলে তিনি ক্যাবারে ড্যান্সার হিসেবে ঝড় তুললেন। তাঁর নাচ দেখার জন্য কলকাতার নিশিনিলয়গুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে, উড়তে থাকে মদের ফোয়ারা, বাড়তে থাকে হোটেলগুলোর লভ্যাংশ। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাতের দশকের হাটথ্রম। তাঁর নাচের গুণে আবদ্ধ তখনকার কিশোর, যুবক থেকে বৃদ্ধ সকলেই।

ধীরে ধীরে তিনি থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন।  বিশ্বরূপা থিয়েটারে যোগদান করেন।  প্রথম "চৌরঙ্গী" নাটকে তরুণকুমারের সাথে অভিনয় করেন। তারপর সারকারিনায় "সম্রাট ও সুন্দরী" নাটকে অভিনয় করেন। এই "সম্রাট ও সুন্দরী" নাটক তাঁকে  খ্যাতির উচ্চসীমায় তুলে দেয়। তাঁর অভিনয় দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়ে যায়।  পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি সিনেমাতেও এই লাস্যময়ী অভিনেত্রীকে দেখা গেছে। সত্যজিৎ রায়ের ১৯৭০ সালে নির্মিত  "প্রতিদ্বন্দ্বী", ১৯৭১ সালে "সীমাবদ্ধ" সিনেমাতে তিনি অভিনয় করেছিলেন।এছাড়া ১৯৭৬ সালে "বহ্নিশিখা",  ১৯৯২ সালে নির্মিত "পেন্নাম কলকাতা" সিনেমাতেও তাঁকে দেখা গেছে। সুপ্রিয়া দেবী, উত্তমকুমার, বিশ্বজিৎ, তরুণ কুমার, উৎপল দত্তের মতো কিংবদন্তি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে তিনি অভিনয় করেছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি হিন্দি সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন। অমিতাভ বচ্চন তাঁর নাচের গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চ ও থিয়েটারেও  সমানতালে অভিনয় চালিয়ে গিয়েছিলেন। "সম্রাট ও সুন্দরী", "সাহেব বিবি গোলাম" ও "অশ্লীল" নাটকে তাঁর অভিনয় যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিল। তাঁর শো মানেই তখন হাউসফুল থাকতো। অমিতাভ বচ্চন ও উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর খুবই সুসম্পর্ক ছিল।

সারাজীবন যেটুকু ভালোবাসা পেয়েছিলেন তাতেই তিনি খুশি ছিলেন। কিন্তু তাঁর আক্ষেপ ছিল তাঁর যৌবনের আবেদনটাকেই বাঙালি গোগ্রাসে গিলেছে। খুব কম মানুষের কাছ থেকেই একজন স্বাবলম্বী নারীর মর্যাদা তিনি পেয়েছেন।  তাঁর শরীরী আবেদনে বহু পুরুষ সারা দিয়েছে, প্রেম করেছে, কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা  কেউ তাঁকে দেয় নি। তাঁর ইচ্ছে ছিল, তাঁর বায়োপিক হলে তাঁর চরিত্রে যেন অভিনয় করেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ইচ্ছে ছিল ডান্স রিয়ালিটি শোয়ে বিচারকের আসন অলংকৃত করার। কিন্তু তাঁকে কেউই সেই সুযোগ দেন নি। শেষ জীবনে তাই  অভিমানে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে রেখেছিলেন।

শেফালী বিয়ে করেননি কিন্তু পরিবারের সবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এরপর একদিন লাইমলাইট থেকে হারিয়ে যান। দিনের পর দিন কাজ না পাওয়ার যন্ত্রনায় ভুগেছেন। শিল্পী সংসদ থেকে দু-একবার  সামান্য সাহায্যে পেয়েছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন "দুহাতে যেমন রোজগার করেছি, তেমন টাকাও উড়িয়েছি। নিজের ভালো-মন্দ কিছুই তো ছাই বুঝতে পারতাম না। ইস, তখন যদি একজন ভালো গাইড পেতাম।  যে আমাকে আগলে রাখতে পারতো। তবুও এসবের মধ্যেও যে নাগেরবাজারে ফ্ল্যাট কিনেছি, সোদপুরে বাড়ি বানাতে পেরেছি, সেটাই ঢের।" তিনি কোনোদিনই সঞ্চয়ী ছিলেন না, বরং লোকের বিপদে আপদে সাধ্যমতো সহায়তা করতেন। বহু টাকা রোজগার করলেও তাঁর শেষজীবন খুবই অর্থকষ্টে ও শারীরিক অসুস্থতায় কেটেছে।  তাঁর ব্যক্তিগত জীবন খুবই বর্ণময় ছিল, অবশেষে জীবন প্রদীপটি চিরতরে নিভে গেল, একটা  যুগের অবসান ঘটলো। বিনোদন জগতের আর এক নক্ষত্রের পতন ঘটলো। ভারতবাসী যেমন হিন্দি সিনেমার হেলেনের কথা চিরদিন মনে রাখবে তেমন বাঙালিরাও মিস শেফালিকে চিরদিন তাদের মনের ভিতরে রেখে দেবে। নাম যখন শেফালী তখন ভোরেই ঝরে যাওয়ার কথা।  তিনি গেলেনও তাই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১০-০২-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 





Thursday, January 30, 2020

জীবন-জীবিকা (তৃতীয় পর্ব )>P



ক্ষৌরকার






শরীরের যে অংশ নিয়ে মানুষের সবচেয়ে দুর্বলতা রয়েছে, তা হল তার কেশবিন্যাস। এটি কমতে থাকলে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কেশ বা চুলকে ভালোবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা খুবই নগন্য। ছেলেদের কেউ বড়, কেউ ছোট আকারে চুল রাখতে পছন্দ করে আবার বর্তমানে মুন্ডিত মস্তক লক্ষ্য করা যায়।  মেয়েরা কেউ কেউ লম্বা চুলে বেণী বাঁধতে যেমন পছন্দ করে তেমন কেউ আবার বব  কাট  চুল রাখতে পছন্দ করে থাকে।  বর্তমানে আবার চুলের রঙ পরিবর্তন করে নানান রঙে রঙিন  করার চল হয়েছে। সৌন্দর্য ও মর্যাদার বহিঃ প্রকাশই হলো মানুষের কেশবিন্যাস। আমাদের এই কেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নাপিত বা ক্ষৌরকারদের প্রয়োজন হয়। তাদের পরামানিক ও কেশবিন্যাসকারীও বলা হয়ে থাকে।

নাপিত বা ক্ষৌরকারদের পেশা একটি বৈধ পেশা।  তারা সমাজকর্মী হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।  হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে এই সম্প্রদায়ের লোকদের একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানস্বরূপ গণ্য করা হয়। জীবনের প্রতিস্তরে এই পেশার লোক ছাড়া হিন্দুদের চলে না।   তা সে দৈনন্দিন জীবনের চুল বা দাঁড়ি কাটা হোক বা জন্ম ও বিবাহ উৎসব অনুষ্ঠানে হোক।   কিছু  ধর্মীয় আচার-আচরণ তাদের দ্বারা পালন করতে হয়। হিন্দু ব্রাহ্মণ সন্তানদের উপনয়নের সময় ও পিতা-মাতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় মস্তক মুন্ডন করার জন্য এদের প্রয়োজন হয়। মানুষকে সেবা প্রদানের  মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে তাদের সংসার যাপন চলে। পূর্বে এই ধরণের সেবা প্রদানের জন্য তারা অর্থের বদলে দ্রব্যসামগ্রী উপহারস্বরূপ পেত।

নাপিতরা নমঃ শূদ্র জাতিগোষ্ঠীর একটি অংশ। এরা নমঃশূদ্ররা ছিল সমাজের সবচেয়ে নীচু প্রজাতির নিম্ন সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও এরা অস্পৃশ্য নয়। মানুষের সেবামূলক কাজগুলো করাই এদের প্রধান দায়িত্ব। আগে যেখানে শীল গোত্রের নমঃশূদ্ররাই এই কাজটি করতো। সময়ের পরিবর্তনে  ও বাঁচার তাগিদে অন্য গোত্রের হিন্দুরাও এই পেশায় সামিল হয়েছে।

নাপিতদের সাধারণত একটি দোকান থাকে, সেই দোকানকে বলা হয় "সেলুন"।  এই দোকানে বসেই তারা দৈনন্দিন পেশার কাজ করে।  যেসব নাপিতের সেলুন খোলার ক্ষমতা নেই তারা রাস্তার ধরে ইটের ওপর বসে কাজ চালিয়ে নেয়।  বাঙালিরা রসিকতা করে এই গুলোকে "ইটালিযান সেলুন" বলে থাকে। আগে বাড়ির বড়োরা এই ইতালিয়ান সেলুনে বসে চুল-দাঁড়ি কেটে রাস্তার কোলে স্নান সেরে তবে বাড়িতে ঢুকতো। আজকাল এই ধরনের ইতালিয়ান সেলুন খুব কম দেখা যায়। পাড়ার সেলুনগুলোও অনেক কমে গেছে।  তার বদলে এসে গেছে ঝা-চকচকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সেলুন।  যার গাল  ভরা নাম দেওয়া হয়েছে ইংরেজদের থেকে ধার করে বিউটি পার্লার।   বর্তমানে  শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে পুরুষদের ও মহিলাদের জন্য বিউটি পার্লার। কোনটা শুধুমাত্র মহিলাদের আবার কোনটা শুধুমাত্র পুরুষদের।  তবে কিছু পুরুষ-মহিলাদের পার্লার রয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় ইউনিসেক্স পার্লার। ভিতরে ঢোকার জন্য পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা দরজা রয়েছে।  সেখানে সাধারণত চুল কাটা, চুলে রঙ  করা, কনেকে সাজানো ইত্যাদি কাজ করা হয়ে থাকে।



ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Saturday, January 25, 2020

সচল বিশ্বনাথ >P

সচল বিশ্বনাথ 

"দেখলাম সাক্ষাৎ বিশ্বনাথ তাঁহার শরীরটা আশ্রয় করে প্রকাশিত হয়ে রয়েছেন।  তাঁর থাকায়  কাশী উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।  উঁচু জ্ঞানের অবস্থা।  শরীরের কোনো হুশই নেই, রোদে বালি এমনি তেতেছে যে, পা দেয় কার সাধ্য - সেই বালির ওপরেই সুখে শুয়ে আছেন। পায়েস রেঁধে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দিয়েছিলাম। তখন কথা কন না - মৌনী।  ইশারায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঈশ্বর এক না অনেক? তাতে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন - সমাধিস্থ হয়ে দেখ তো এক, নইলে যতক্ষণ আমি, তুমি, জীব, জগৎ ইত্যাদি নানা জ্ঞান রয়েছে, ততক্ষন অনেক।  তাঁকে  দেখিয়ে হৃদেকে বলেছিলাম, একেই ঠিক ঠিক পরমহংস অবস্থা বলে।" 

                                                                                                   -   ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব


"সন্ন্যাসী হয়ে যদি উলঙ্গ থাকবে, তবে এই জনাকীর্ণ তীর্থস্থান ত্যাগ করে জঙ্গলে গিয়ে বাস করো।" মহিলাটি দীপ্তকণ্ঠে বেশ কয়েকবার কথাগুলো বলল তার সামনে দিয়ে আগত এক উলঙ্গ সন্ন্যাসীটিকে। কিন্তু তাতে সন্ন্যাসীটির কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এই উলঙ্গ সন্ন্যাসী তখন হনুমান ঘটে বাস করেন।  এক সম্ভ্রান্ত ঘরের মহারাষ্ট্রীয় মহিলা এই ঘাটের পথ ধরে বাবা বিশ্বনাথের পুজো দিতে রোজই যেতেন। একদিন এক সরু গলি দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এই সন্ন্যাসীকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় দেখে উপরোক্ত শ্লেষপূর্ণ তিরস্কারে তিরস্কৃত করেছিলেন।  মহিলাটির স্বামীর পেটে  বিরাট ক্ষত, ডাক্তার বদ্যিরা সব তাদের অক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছেন।  স্বামীর রোগমুক্তির আশায় তিনি রোজ্ গঙ্গা স্নান করে বাবা বিশ্বনাথের পুজো দিতে যেতেন। তিরস্কার করার দিন রাতে তিনি এক স্বপ্ন দেখেছিলেন যে স্বয়ং মহাদেব তাকে বলছেন, "যে উদ্দেশ্য নিয়ে তুই রোজ আমার পুজো করিস, তোর সেই উদ্দেশ্য আমি সফল করতে পারবো না।" আরো বললেন "আজ তুই যে উলঙ্গ মহাযোগীকে অপমান করেছিস তার কৃপা পেলেই তোর মনোস্কামনা পূর্ণ হবে।" পরদিন সকাল বেলায় মহিলাটি হনুমান ঘাটে গিয়ে মহাযোগীর পা ধরে ক্ষমা চাইলেন আর তার স্বামীর প্রাণভিক্ষাও চাইলেন।  মহাযোগী তাকে ক্ষমা করলেন। স্বামীজী এক মুঠো ভস্ম তাকে দিয়ে বললেন স্বামীর দেহে পুরো ভস্মটি  মাখিয়ে দিতে। এই ভস্ম মাখানোর পর তার স্বামী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন।


 সেই প্রাচীন কাল থেকেই কাশীতে কত সাধক-মহাসাধকদের পদধূলি পড়েছে।  নানা বইতে নানা আলোচনায় তাঁদের অলৌকিক মহিমার কথা উঠে এসেছে।  মহাত্মা মহাযোগী তৈলঙ্গস্বামীর বহু অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই দেবভূমি।  প্রায় ১৫০ বছর তিনি কাশীতে বসবাস করেছেন। অলৌকিক শক্তির অধিকারী এক মহাযোগী। তাঁর সময় যত ভক্ত ও সাধক কাশীতে এসেছিলেন তাঁরা বাবা বিশ্বনাথ, দেবী অন্নপূর্ণা, মণিকর্ণিকা ঘাট ও দশাশ্বমেধ ঘাট দর্শন করার পর এই মহাত্মাকে দর্শন করে কাশী ত্যাগ করতেন।  কাশীর অধিবাসীরা তাঁকে "সচল বিশ্বনাথ" নামকরণ করেছিলেন।

তৈলঙ্গস্বামীর সন্ন্যাস নেওয়ার পূর্বে নাম ছিল "শিবরাম" আর সন্ন্যাস নেওয়ার পর নাম হয়েছিল "গণপতি সরস্বতী"। তৈলঙ্গ দেশ থেকে আগত বলে তিনি কাশীর মানুষদের কাছে তৈলঙ্গস্বামী হিসেবে পরিচিত হলেন। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের হোলিয়া জনপদে এক রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতা নরসিংহ রাও ওই জনপদের রাজা ছিলেন।  খুব সৎ ও ধর্মপরায়ণ রাজা ছিলেন।  তাঁর  স্ত্রী বিদ্যাবতীও খুব ধর্মপরায়ণ ছিলেন।  প্রতিদিন তাঁরা শিবের আরাধনা, ব্রাহ্মণ সেবা, দেবদেবীর পূজা করতেন।  দীর্ঘদিন তাঁদের কোনো সন্তান হচ্ছিলো না, নরসিংহ বংশরক্ষার জন্য খুব চিন্তিত ছিলেন। একপ্রকার বাধ্য হইয়াই তিনি বিদ্যাবতীর অনুমতি নিয়ে দ্বতীয়বার বিবাহ করেন। দেবদেবীর কৃপায় ও মহাদেবের করুণায় ১৬০৭ সালের এক পুন্য লগ্নে নরসিংহের প্রথম স্ত্রী বিদ্যাবতী এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। শিবের পূজারী বিদ্যাবতী সন্তানের নাম রাখলেন "শিবরাম"। পরবর্তীকালে অবশ্য রাজা নরসিংহের দ্বিতীয় স্ত্রীও একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই পুত্রের নাম ছিল শ্রীধর। বালক বয়স থেকেই শিবরাম মায়ের পুজোর সময় পাশে বসে সব লক্ষ্য করতেন।  বালক বয়স থেকেই তিনি খুব গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন।  অন্যান্য বালকদের মত তাঁর খেলাধুলায় কোনোরূপ আগ্রহ ছিল না। শুধু বাল্যকাল নয়, কৈশোরে, যৌবনকালে সব ব্যাপারে তিনি সবসময় উদাসীন থাকতেন। বিষয়, সম্পত্তি ও সংসারের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। ৪০ বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতাকে হারান, ৫০ বছর বয়সে মাতাকেও হারান। মাকে হারানোর পর তিনি খুব ভেঙে পড়েন।  তিনি সংসার ছেড়ে শ্মশানে এসে একটি পর্ণকুটির তৈরী করে বাস করতে থাকেন। ভ্রাতা শ্রীধর ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সকলেই তাঁকে কুটির ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। সকলের অনুরোধ তিনি উপেক্ষা করে এই কুটিরেই বাস করতে লাগলেন। এই কুটিরেই একদিন পাঞ্জাবের বাস্তুর গ্রামের যোগগুরু স্বামী ভোগীরথানন্দ সরস্বতী আসলেন।  পরবর্তীকালে এই যোগীর কাছ থেকে শিবরাম সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন। সন্ন্যাস নেওয়ার পর তিনি গুরুর নির্দেশে পর্যটনে বাহির হলেন।  রামেশ্বর, নেপাল, উত্তরাখন্ড, প্রয়াগ ঘুরে ১৮৪৪ সালে তিনি কাশীতে এসে পৌঁছলেন। কঠোর সাধনায় এবং গুরুর কৃপায় তিনি হয়ে উঠলেন মহাশক্তিধর যোগগুরু। কাশীতে এসে প্রথমে আসিঘাটে গোস্বামী তুলসীদাসের বাগানে বাস করতে আরম্ভ করলেন।  তারপর হনুমান ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট আর সবশেষে পঞ্চগঙ্গা ঘাটে বাস করতে লাগলেন। তাঁর মুখে শিব আরাধনার স্ত্রোত্র শুনতে কাশীর ঘাটে প্রচুর লোক সমাগম হতো।   কাশীর ঘাটে-ঘাটে, অলিতে-গলিতে তাঁর মহিমা ছড়িয়ে আছে। তাঁর অলৌকিক কান্ডকারখানার সাক্ষী থাকতো কাশীর অধিবাসীরা। নগ্ন হয়েই তিনি ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর আরো দুটো -তিনটি অলৌকিক মহিমার গল্প আজ আপনাদের জনাব।

স্বামীজী যখন আসি ঘাটে বাস করতেন, তখন তিনি প্রায়ই লোলার্ক কুন্ডে যেতেন। একদিন তিনি ওখানে গিয়ে দেখেন ব্রহ্মসিংহ নামে  আজমীরের এক বাসিন্দা কুষ্ঠরোগে পঙ্গু হয়ে যন্ত্রনায় ছটফট করছেন।  এই দৃশ্য দেখে মহাযোগীর করুণা হল, তিনি সস্নেহে একটা বেলপাতা ব্রহ্মসিংহকে দিয়ে বললেন "কোন চিন্তা করো না. তুমি লোলার্ক কুন্ডে স্নান করে এসে এই বেলপাতাটি মাথায় ধারণ করলে তোমার সব রোগ সেরে যাবে।" ব্রহ্মসিংহ স্বামীজীর কথা মতো লোলার্ক কুন্ডে স্নান করে এসে মাথায় বেলপাতা ধারণ করলেন এবং অচিরেই রোগমুক্ত হলেন।

মহাযোগী একদিন আসি ঘাটে পৌঁছে দেখলেন একজন তরুণী তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে উচ্চকন্ঠে কাঁদছেন।  সাপের কামড়ে তার স্বামী মারা গেছেন।  যেহেতু সাপে কাটা মৃতদেহকে শশ্বানে পোড়ানো হয় না, তাই তার আত্মীয়রা গঙ্গার ভাসানোর উদ্দেশ্যে আসি ঘাটে মৃতদেহটি নিয়ে এসেছে।  এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে পরম দয়ালু স্বামীজী মনে মনে খুব কষ্ট অনুভব করলেন। স্বামীজী নদীর ধার থেকে কিছুটা গঙ্গামাটি নিয়ে এসে মৃতদেহের ক্ষতস্থানে মাখাইয়া দিলেন।  কিছুক্ষন পর সবাই দেখল আস্তে আস্তে দেহে প্রাণ সঞ্চার হতে লাগল। সবাই এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তরুণীটিও তার জীবনসাথীকে ফিরে পেল।

একবার এক বদমেজাজের নতুন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে কাশীতে এলেন। তিনি একদিন নগর পরিক্রমায় বেড়িয়ে দশাশ্বমেধ ঘাটে এসে উপস্থিত হলেন।  এখানে তিনি এক  উলঙ্গ স্বামীজিকে দেখে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন।  হাজতের  ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ও কয়েকজন রক্ষীকে ডেকে পাঠালেন এবং আদেশ দিলেন এই অসভ্য লোকটাকে ধরে হাজতে পাঠাবার জন্য।  সবাই মিলে স্বামীজিকে ধরে হাজতে তালাবন্ধ করে রাখলেন। স্বামীজী তখন ভাবলেশহীন। পরদিন সকালে ম্যাজিস্ট্রেট স্বামীজিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর ঘরে গিয়ে দেখলেন যে ঘর ফাঁকা, স্বামীজী বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘরে যেমন তালা লাগানো ছিল, তেমনি লাগানো রয়েছে।  তিনি ঘরটির দরজা, দেওয়াল ও তালা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন, সব ঠিকই রয়েছে।  কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারলেন না কিভাবে কয়েদি ঘরের  বাইরে আসল।  তিনি বেশ গম্ভীরভাবে স্বামীজিকে বললেন, "সাধু, তুমি সত্য কথা বল, কি করে তুমি হাজতের বাইরে এলে?" স্বামীজী সহজ সরল ভাষায় বললেন "প্রত্যুষে আমার বাইরে আসবার ইচ্ছে হয়েছিল। সেই  ইচ্ছে হবার পরমুহূর্তে বাইরে এসে পড়লাম, কোনো বাধা কোথাও পেলাম না।" কয়েদির ঘরটি জলে জলময় হয়েছিল। মেজিস্ট্রেট স্বামীজীর কাছে জানতে চাইলেন এতো জল কিভাবে এখানে এলো।  স্বামীজী বললেন, "রাতে আমার প্রস্রাবের বেগ হয়েছিল, দেখলাম দ্বার তালাবন্ধ, ঘরের বাইরে যেতে তখন ইচ্ছে হয়নি, তাই শায়িত অবস্থাতেই খানিকটা মূত্রত্যাগ করেছি। তারপর রাত  হয়ে এলে, অন্ধকার ঘরটা তেমন আমার ভালো লাগছিল না , তাই মুক্ত হাওয়ায় এই বারান্দায় একটু ঘুরে বেড়াচ্ছি।" মেজিস্ট্রেট ভীষণ রেগে গেলেন, তিনি স্বামীজিকে আবার হাজতে পুড়ে নিজের হাতে দু-দুটো তালা লাগিয়ে তার এজলাসে চলে এলেন। কিছুক্ষন পরে তিনি এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। তিনি যাকে নিজের হাতে তালাবন্ধ করে এলেন, সেই স্বামীজী তার এজলাসের এক কোনে বসে দুষ্টু বালকের মতো হাসছেন। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে মেজিস্ট্রেট হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। স্বামীজী আস্তে আস্তে তার সামনে এসে বললেন "সাহেব, তুমি অন্যান্য সাধারণ মানুষের মত শুধু জড় ও জড়ের শক্তিই বোঝো। এই জগতের মধ্যে ওতপ্রোত হয়ে আছে এক চৈতন্যলোক, তার খবর তোমার মোটেই জানা নেই, সেই চৈতন্যলোকের সঙ্গে যার যোগাযোগ সাধিত হয়েছে, কোনো বন্ধন বা কোনো বাঁধাই আর তার স্বেচ্ছাবিহারকে আটকাতে পারে না। ভারতের যোগীপুরুষদের শক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কার্যই কখনো অসাধ্য বলে গণ্য হয় না।  বেটা, তাহলে বল দেখি , আমার মতো সাধু সন্ন্যাসীকে বিরক্ত করে কি লাভ ? তাছাড়া, সে শক্তিই বা তোর আছে কোই ?" মেজিস্ট্রেট তখন তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং তিনি নির্দেশ দিলেন যে কাশী শহরে তৈলঙ্গস্বামী নিজের ইচ্ছামত যেখানে খুশি ঘুরতে পারবেন। তাঁকে কেউ বাধা দিতে পারবে না।

কখনো তাঁকে  কাশীর গঙ্গায় ভাসমান আবার কখনো ডুবন্ত অবস্থায় দেখা যেত। গঙ্গার সাথে তাঁর যেন অন্তরের সম্পর্ক ছিল। এরকম বহু লীলা বা মহিমা স্বামীজী দেড়শো বছর ধরে দেবভূমিতে করে গেছেন।  সাধারণ সাধু সন্ন্যাসীদের জীবন সাধারণত শিষ্যবর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।  কিন্তু তৈলঙ্গস্বামীর সে অর্থে কোন শিষ্য ছিল না।  উমাচরণ মুখোপাধ্যায়ের নামই একমাত্র শিষ্য হিসেবে শোনা যায়, তবে তাঁর প্রচুর ভক্ত ছিলেন। । ১৮৮৭ সালের পৌষ মাসের শুক্লা একাদশীর পুন্য তিথিতে স্বইচ্ছায় ২৮০ বছর বয়সে তিনি যোগবলে দেহরক্ষা করেন অর্থাৎ প্রয়াত হন।  মৃত্যুর পূর্বে তিনি ভক্তদের বলে গিয়েছিলেন তাকে চন্দনকাঠের বাক্সে ভোরে গঙ্গা সমাধি দেওয়ার কথা তাঁর ইচ্ছাই ভক্তগণ পূরণ করেন।

 ১৮৬৮ সালে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব কাশীতে যখন এসেছিলেন তখন তিনি তৈলঙ্গস্বামীর সাথে দেখা করেছিলেন এবং নিজ হাতে তৈরী করা পায়েস স্বামীজিকে খাইয়েছিলেন। যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ীও স্বামীজীর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

মহাত্মা তৈলঙ্গস্বামী ছিলেন ভারতের  সাধকদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল জোতিস্ক। প্রথম বিস্ময় তাঁর দীর্ঘ আয়ু। আরো বিস্ময় অলৌকিক ক্ষমতাবলে  মানবের জীবন দান  ও হিতসাধন করা। তবে এটা  চিরন্তন সত্য যে মানব কল্যানে ব্রতী হয়ে ভারতবর্যে যুগে যুগে ঈশ্বর বিভিন্ন অবতারের রূপ ধরে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। কখনও বুদ্ধ, কখনও যিশু আবার কখনও শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস। তেমনি তৈলঙ্গস্বামীকেও ভগবানের  এক রূপ বলে মানব সমাজ মেনে নিয়েছে।






ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ২৫-০১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।