দেবীর সৃষ্টি
সকল দেবতার শরীর থেকে নির্গত তেজোরাশি একত্রিত হয়ে এক দশভুজা নারীমূর্তি ধারণ করে।
মহাদেবের তেজে তৈরী হয় দেবীমুখ
বরুণের তেজে জংঘা ও উরুদ্বয়
বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ
যমের তেজে কেশপাশ
ইন্দ্রের তেজে শরীরের মধ্যভাগ
চন্দ্রের তেজে স্তনযুগল
পৃথিবীর তেজে নিতম্ব
ব্রম্ভার তেজে পদযুগল
সূর্যের তেজে পদ আঙ্গুলিসমূহ
অষ্টবসুর তেজে হাতের আঙ্গুলিসমূহ
কুবেরের তেজে নাসিকা,
সন্ধ্যাদেবীদ্বয়ের তেজে ভ্রূযুগল
বায়ুর তেজে কর্ণদ্বয়
এবং বিশ্বকর্মা ও অন্যান্য দেবতাগণের তেজঃপুঞ্জ থেকে দশভুজা দেবী দুর্গা সৃষ্টি হলেন।
অনন্তর সমস্ত তেজোরাশিসম্ভূত মহাদেবীকে দেখে মহিষাসুরপীড়িত অমরগণ আনন্দিত হলেন।
দেবীকে অস্ত্র প্রদান
দেবতারা তাঁদের তেজরাশি দিয়ে দশভুজা নারীকে তৈরী করলেন, এবার তাঁকে অস্ত্র ও অলংকারে সজ্জিত করার পালা। দেবতারা দেবী দুর্গাকে নানারকম অস্ত্র ও অলংকার দিয়ে সজ্জিত করলেন। ত্রিশূলধারী মহাদেব স্বীয় শুল থেকে শুলান্তর, বিষ্ণু স্বীয় সুদর্শনচক্র থেকে চক্রান্তর উৎপাদন করে দেবীকে দিলেন , বরুণদেব দিলেন শঙ্খ , অগ্নিদেব দিলেন শক্তি , পবনদেব দিলেন একটি ধনু ও দুটি বানপূর্ণ তূনীর, ইন্দ্র তাঁর বজ্র থেকে বজ্রান্তর এবং ঐরাবত নামক স্বর্গগজের গলদেশস্থ ঘন্টা থেকে ঘন্টান্তর উৎপাদন করে দিলেন, যমরাজ দিলেন কালদন্ড থেকে একটি দণ্ড, জলদেবতা বরুণ নিজের পাশ থেকে একটি পাশ, প্রজাপতি ব্রম্ভা রুদ্রাক্ষমালা থেকে একটি মালা ও কমণ্ডলু থেকে সৃষ্ট একটি কমণ্ডলু, নিমেষাদিকালাভিমানিনী দেবতা একটি প্রদীপ্ত খড়গ ও একটি ঢাল, ক্ষিরোদসমুদ্র দিলেন উজ্জ্বল মুক্তাহার, বজ্রযুগল ,দিব্যচূড়ামণি, দুইটি কুণ্ডল , হস্তসমূহের বলয়গুলি, শুভ্র ললাটভূষণ, সকল বাহুতে অঙ্গদ (বাজু), পায়ের নুপুর, কণ্ঠভূষণ ও অঙ্গুলিগুলির অঙ্গুরী, বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার, নানাপ্রকার অস্ত্র, অভেদ্য কবচ, সমুদ্র তাঁর শিরে অম্লান পদ্মের একটি মালা, বক্ষের একটি মালা ও হস্তে একটি পদ্ম দান করলেন ,গিরিরাজ হিমালয় দিলেন বাহনস্বরূপ সিংহ ও বিবিধ রত্ন, কুবের দিলেন পানপাত্র ,নাগরাজ বাসুকি মহামণিশোভিত একটি নাগাহার প্রদান করলেন। অন্যান্য দেবগন কর্তৃক অস্ত্র ও অলংকারে ভূষিত হয়ে জগন্মাতা দেবী দূর্গা বারংবার অট্টহাস্য ও হুঙ্কার করতে লাগলেন।
ক্রমবিকাশের পথে দেবী দূর্গা
আদিম যুগে শুধু ভারতবর্ষেই নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশে প্রাণস্পন্দন ও প্রাণস্পন্দনহীন প্রাণী ও পদার্থের পূজা ও আরাধনার প্রচলন ছিল। আদিম ও অনুন্নত যুগে বিদেহী আত্মা, ভূত-প্রেত প্রভৃতি অপদেবতাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পূজার প্রচলন ছিল। প্রাচীনকালে বৃক্ষকে কল্পনা করা হতো সূর্যের আশ্রয়রূপে। আকাশের সাথে বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হত। যেসব বৃক্ষগুলি সুউচ্চ ও সুপ্রসারিত যেমন বট, অশ্বত্থ, বেল, নিঁম এগুলিকে আকাশ বা সূর্যের আশ্রয় বলা হত এবং পূজা করার রীতি চালু ছিল। বৃক্ষ পূজার পর এলো যূপ ও স্তুপ পূজা। এগুলো বৈদিক যাগযজ্ঞে ব্যৱহৃত হত। যূপ থেকেই ক্রমে শিবলিঙ্গের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়েছে। যূপ ও বৃক্ষ পূজা আর্যসভ্যতার নিদর্শন। দেবী দুর্গার পূজা গোড়ার দিকে অশ্বত্থ, নিম, বেল প্রভৃতি বৃক্ষে করা হত। বিল্ল বৃক্ষকে সেখানে দেবী দূর্গা ভাবা হত। ষষ্ঠী তিথিতে বিল্ব বৃক্ষের পূজার পর সপ্তমীর প্রাতঃকালে বৃক্ষরূপিণী দেবী দুর্গার আরোহন করা হয়। শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসর ও ঢাক বাজিয়ে সেই শাখাদেবীকে পূজামণ্ডপে আনা হয়। বৈদিক সম্প্রদায়ের অনুকরণে বৌদ্ধসম্প্রদায়ে মূর্তি পূজা প্রবর্তিত হয়েছিল বলে ধরা হয়। মূর্তিপূজা ভারতের সকল প্রদেশেই প্রচলিত আছে তবে পশ্চিমবাংলায় এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দুর্গার দ্বিভূজা, চতুর্ভূজা, অষ্টভুজা, দশভুজা, দ্বাদশভূজা ও অস্টাদশভূজা মূর্তির কথা পূরণে বলা আছে। এই সকল মূর্তির সমস্ত মূর্তিই সকল দেশে পূজ্য নহে, বাংলায় আমরা দশভুজা মূর্তি পূজা করে থাকি।
স্বজন-পরিজন
দেবী দুর্গার স্বজন পরিজন বলতে সাধারণতভাবে তাঁর দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে ধরা হয়। আমাদের দূর্গা প্রতিমায় মা দুর্গার দক্ষিণপাশে লক্ষ্মীর মূর্তি এবং বামপাশে সরস্বতীর মূর্তি থাকে। লক্ষ্মী মূর্তির উপরে গণেশ আর সরস্বতী মূর্তির উপরে কার্তিকের মূর্তি থাকে।
দেবী সরস্বতী - ভারতীয় পূরাণে দেবী সরস্বতী বহুমাত্রিক দেবী হিসেবে পরিচিত। দেবী সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বুদ্ধি, শিল্পকলা ও বিদ্যার দেবী। শ্রী শ্রী চন্ডীতে মহাত্মা অম্ভুন ঋষির বিদুষী কন্যার নাম ছিল "বাক" এবং সেই "বাক" বিদ্যারূপিণী দেবী সরস্বতী নামে পরিচিত হয়েছিলেন। সরস্বতী নামের পৌরাণিক ব্যাখ্যায় "নদীরূপা" ও "দেবতারূপা" দু রকমই পাওয়া যায়। পদ্মপুরাণে তিনি দক্ষকন্যা এবং কশ্যপ পত্নী হিসাবে স্বীকৃত এবং ব্রম্ভবৈবত পুরান মতে তিনি নাযায়নের পত্নী। আদিতে তিনি উত্তর ভারতের সপ্তনদীর (গঙ্গা, যমুনা, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা, সরস্বতী ও শতদ্রু ) অন্যতম নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরস্বতী দেবী দুর্গার বামদিকে অধিষ্ঠিত থাকেন। দেবীর বাহন শ্বেতহংস।
দেবী লক্ষ্মী - দেবী লক্ষ্মী হলেন ধনদেবী। তবে দেবী লক্ষ্মীর রূপ বা মূর্তি বর্তমানকালে যেভাবে কল্পনা করা হয় বৈদিক যুগে সেরকম ছিল না। তখন লক্ষ্মীকে কখনও শুভ, আবার কখনও অশুভদায়িনীরূপে পাওয়া যায়। দেবী মা দুর্গার দক্ষিণদিকে অধিষ্ঠিত থাকেন। দেবীর বাহন পেঁচা।
সিদ্ধিদাতা গণেশ - সিদ্ধিদাতা গণেশ হলেন আসলে মিত্রদেবতার (সূর্যের) একটি ভিন্নরূপ। সমস্ত পূজানুষ্ঠানে, ধর্মীয় ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে সর্বাগ্রে গণেশের পূজা বিধেয়। দক্ষিনভারতে গণেশের সমাদর ও পূজা অধিকতর ব্যাপক এবং গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধিদাতা গণেশ মা দুর্গার ডানপাশে দেবী লক্ষ্মীর পরে অধিষ্ঠিত থাকেন। গণেশের বাহন ইঁদুর।
কার্তিকেয় - কার্তিক বা কার্তিকেয় সাধারণতভাবে দেব সেনাপতি হিসেবে পরিচিত। কার্তিকের অপর নাম স্কন্দ। কৃত্তিকা নক্ষত্রে কার্তিকের জন্ম। কৃত্তিকা নক্ষত্রমন্ডলীর ছয় কৃত্তিকার দ্বারা পুত্ররূপ গৃহীত ও প্রতিপালিত হওয়ায় তিনি কার্তিক বা কার্তিকেয় নামে অভিহিত হইয়াছেন। কার্তিকের অর্থ কৃত্তিকাতনয়। দেবী দুর্গার বামপাশে দেবী সরস্বতীর পরে অধিষ্ঠিত থাকেন। কার্তিকের বাহন ময়ূর।
আগমনী

আগমনী শব্দটি কন্যারুপী দেবীদুর্গার শরৎকালে মর্ত্যে আগমন বার্তাকেই প্রকাশ করে। মায়ের আগমনী বার্তা আকাশ, বাতাস, হৃদয়-মন ভড়িয়ে তোলে। হালকা হিম হিম ভাব, ঘাসের গায়ে লক্ষ শিশিরের কোহিনুর, দোয়েল শ্যামার ডাক, সফেদ শুভ্র কাশের গুচ্ছ, ঘন নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা এভাবেই প্রকৃতি যেন তার বরণডালা নিয়ে আমাদের কাছে শরৎ ঋতুতে উপস্থিত হয়। প্রকৃতির হাত ধরেই চারদিকে মায়ের আগমনের বার্তা মানুষের মনে আনন্দের পূর্বাভাসের হিন্দোল তোলে।
মহালয়া
"বাজলো তোমার আলোর ধ্বনি"- এর সুর আর স্বর্গীয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বজ্র গম্ভীর কণ্ঠের "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জরী" এই চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়েই মহালয়ার দিনটা শুরু হয়। শ্রী শ্রী চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়েই দেবী দুর্গাকে মর্ত্যলোকে আবাহন জানানো হয়। শারদীয় দুর্গাপুজোর সাথে মহালয়ার কোনো সম্বন্ধ নেই। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে মহালয়ার পরের দিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। গঙ্গার ঘাটগুলোতে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পন করার জন্য মানুষের ঢল নামে। পুণ্যস্নান আর মন্ত্রচারণে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়।
পূজার পাঁচটা দিনের নিয়ম
মহাষষ্ঠী
এই দিন দেবী সপরিবারে মর্ত্যে আবির্ভূত হন। বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মায়ের মূর্তির উন্মোচন করা হয়। সকালে বিল্ব বৃক্ষে দেবীর মঙ্গল বোধন করা হয়। বোধন অর্থ জাগরণ অর্থাৎ বোধনে দেবী জাগরিত হন। আমন্ত্রণ মানে দেবীকে নিয়ে আসা। বোধন, আমন্ত্রনের পর সন্ধ্যায় অধিবাস করা হয়। অধিবাস মানে দেবীর অবস্থান করা। মহাষষ্ঠীর দিন নয়টি কোলস্ঘট জলপূর্ণ করে দেবীর নবশক্তিকে আহ্বান করা হয়। এই দিনই বাঙালীর শ্রেষ্ঠ উৎসবের শুভারম্ভ হয়।
মহাসপ্তমী
মহাসপ্তমী তিথিতে মৃন্ময়ী প্রতিমায় চক্ষুদান, প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও আবাহন মন্ত্রে মা মৃন্ময়ী হতে চিন্ময়ীরূপে পূজিতা হন। সকালে নব পত্রিকা স্নানের মাধ্যমে দুর্গাপূজার সূচনা হয়। নব পত্রিকা হল দেবী দুর্গার প্রতিনিধি। নয় ধরণের উদ্ভিদের পুজোর প্রাচীন প্রথা হল নবপত্রিকা স্নান। নবপত্রিকার চারদিকে শ্বেত অপরিজিতা লতা ও হরিদাক্ত ডোর (সুতা) দিয়ে বাঁধার নিয়ম আছে। নবপত্রিকার আর এক নাম কুলবৃক্ষ। এই কুলবৃক্ষের প্রধান অধিষ্ঠিত দেবতা ও যোগিনীরা হলেন দেবীর সহচরী। জলপূর্ণ কলস বা ঘটকে দেবীর প্রতীকরূপে কল্পনা করা হয়। ঘটের গায়ে সিঁদুরের পুত্তলিকা, ঘটের মাথায় চালপূর্ণ সরা ও নারিকেল, ঘটে জল ও ঘটের মুখে পঞ্চপল্লব রাখা হয়। নবপত্রিকা প্রবেশের পরেই দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। ঘটে, প্রতিমায় দেবীর আবির্ভাব হয়। মৃন্ময়ী প্রতিমা চিন্ময়ী রূপে আবির্ভত হন বলে ধরা হয়।
মহাঅষ্টমী
ভক্তবৃন্দের সমবেত পুষ্পাঞ্জলীর মাধ্যমে মহাঅষ্টমীর সূচনা হয়ে থাকে। সকাল থেকে উপবাস করে তারপর পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার নিয়ম। এইদিন বহু হিন্দু পরিবারে অন্নভোগ রান্না হয় না, পরিবর্তে নিরামিষ খাবারের চল রয়েছে। অষ্টমী পূজার পরই হয় সন্ধিপূজা।
সন্ধিপূজা
সন্ধিপূজা হলো দুর্গাপূজার সবচেয়ে মাহাত্ম্যপূর্ণ পূজা। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট আর নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট হল সন্ধিক্ষণ। এই সন্ধিক্ষণেই মা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। অসুরশক্তির বিনাশকালের এই শুভক্ষনেই সন্ধিপূজা করা হয়। এইদিন কোথাও কোথাও কুমারী পূজাও করা হয়। বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কুমারী পূজা চালু করেছিলেন।
কুমারী পূজা
কুমারী পুজো শারদীয়া দুর্গোৎসবের এক বর্ণাঢ্য পর্ব। তান্ত্রিক মতে কুমারী পুজো চলে আসছে বহু প্রাচীন কাল থেকে। কিন্তু এই পুজোর পরিচিতি সেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কুমারী পুজোর আয়োজন করার পর থেকে এই পুজো নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। তন্ত্র শাস্ত্র অনুযায়ী কুমারী পুজো বলতে বোঝায় এক থেকে ষোলো বছরের কম বয়সী অরজঃসলা কুমারী মেয়ের পুজো। বয়স অনুসারে কুমারীর বিভিন্ন নামকরণ করা হয়।
এক বছরের কন্যার নাম = সভ্যা
দুই বছরের কন্যার নাম = সরস্বতী
তিন বছরের কন্যার নাম = ত্রিধমূর্তি
চার বছরের কন্যার নাম = কালিকা
পাঁচ বছরের কন্যার নাম = সুঙ্গা
ছয় বছরের কন্যার নাম = উমা
সাত বছরের কন্যার নাম = মাতঙ্গিনী
আট বছরের কন্যার নাম = কুষ্টিকা
নয় বছরের কন্যার নাম = কাল সন্দভা
দশ বছরের কন্যার নাম = অপরাজিকা
এগারো বছরের কন্যার নাম = রুদ্রাণী
বারো বছরের কন্যার নাম = ভৈরবী
তেরো বছরের কন্যার নাম = মহালক্ষ্মী
চোদ্দ বছরের কন্যার নাম = পঠনায়িকা
পনেরো বছরের কন্যার নাম = ক্ষেত্র
ষোলো বছরের কন্যার নাম = অম্বিকা
মহানবমী
মহানবমী হল দুর্গা পূজার শেষ দিন। সন্ধিপূজার পর শুরু হয় মহানবমীর পূজা। এই দিন ষষ্ঠী থেকে যত দেবদেবীর পূজা করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আহুতি দিতে হয়। এই দিনের অন্যতম অঙ্গ হচ্ছে বলিদান। শাস্ত্রমতে ছাগ বা মহিষাদি বলির রীতি আছে। কিন্তু বর্তমানে পশুবলি করা যায় না, তার পরিবর্তে কুস্মান্ড, ইক্ষুদান বলি দেওয়া হয়।
দশমী
তিনদিনের পুজোর পর বিষাদের দিন। দশমীর পুজো শেষ করে মহাস্নানের যে দর্পণ ছিল সেটিতে মাকে চিন্ময়ীরূপে বিসর্জন দেওয়া হয়। বেজে ওঠে বিসর্জনের বাদ্যি। মানুষের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
নবমীর উচ্ছ্বাস-আনন্দের পরই বিদায়ের সুর নিয়ে আসে দশমী।
দেবীবরণ
দশমী পুজোর পর শুরু হয় দেবীকে বরণ করার পালা। এই দেবীবরণের মাধ্যমে মাকে জানানো হয় মনের সব কামনা। বলা হয় "মা তুমি আবার এসো, তুমি আমাদের রূপ দাও, যশ দাও, শত্রূকে জয় করার শক্তি দাও। তোমার আশীর্বাদ আমাদের নিত্য পাথেয় হোক "।
সিঁদুর খেলা
বিজয়ার বিষাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে সিঁদুর খেলার নিয়ম। এটা হল স্ত্রী আচার। মানুষের বিশ্বাস দুর্গামায়ের সিঁথির সিঁদুর নিয়ে মাথায় ঠেকালে সধবাদের সিঁথির সিঁদুর দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাকে সিঁদুর দানের পর একে অন্যের সিঁথি সিঁদুরে রাঙিয়ে দেয়। দেবীবরণের মাধ্যমে আনন্দময় সমাপন ঘটে। চারদিনের প্রানঢালা আনন্দস্রোত পৌঁছে যায় শেষ লগ্নে। বিষাদসিন্ধুতে ডুবে যাওয়ার আগে সিঁদুরখেলার মাধ্যমেই অন্তরের সব আবেগ উজাড় করে দেওয়া হয়।
বিসর্জন
শাস্ত্র মতে পুরোহিত মায়ের বিসর্জনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ করেন। তারপর মণ্ডপে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত সন্ধ্যায় শোভাযাত্রা সহকারে মাকে নিরঞ্জনের জন্য কাছাকাছি কোন নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই শেষ হয় হিন্দু ধর্মের পরম কাঙ্খিত শারদোৎসব। উত্তর চব্বিশ পরগনার টাকিতে এই বিসর্জন একটু অন্যভাবে পালন করা হয়ে থাকে। সেখানে সকালে দুটো নৌকোর মাঝখানে মাকে বসিয়ে সারাদিন ইছামতী নদীতে প্রদক্ষিণ করানো হয়। তারপর সন্ধ্যের সময় মাকে ইছামতীতে ভাসানো হয়।
বিজয়া দশমী
শিবসহ শিবানী কয়েকদিনের জন্য ছিলেন কৈলাশের বাইরে। বিজয়া মুহূর্তে তাঁদের কৈলাসে ফিরে আসাকে আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। মর্ত্যেও মিষ্টি মুখের সাথে অশুভের উপর শুভের বিজয়া উদযাপিত হয়। সবাই মেতে ওঠে এই মিষ্টতার উৎসবে। পূর্বে এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ ছিল "কোলাকুলি" করা, যা বর্তমানে খুব একটা দেখা যায় না।
দুর্গাপূজা আনন্দময় মহামিলনের উৎসব। যা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিয্যের প্রতীক। এই পুজো এখন আর শুধু হিন্দুদের জন্য আনন্দ বয়ে আনে না, সব জাতির মধ্যেই আনন্দ, শান্তি ও ভালোবাসা বয়ে নিয়ে আসে। এ যেন এক সৌভ্রাতৃত্বের মিলনোৎসব। তাই দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় কৃত্য নয়, তা সার্বজনীন উৎসবও বটে
তথ্যসূত্র : মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা , স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ
ছবি ও লেখার স্বত্ত : সুদীপ্ত মুখার্জী
তারিখ : ১৫-০৮-২০১৯
যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো পেতে ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।