Sunday, June 28, 2020

জীবন ও জীবিকা (চতুর্থ পর্ব )>P

কুমোর  



"কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি"

- কবিগুরুর লেখা এই কথাগুলো  আজ  অতীত।  আজ আর মাটি দিয়ে তৈরী হতে দেখা যায় না বাসন-পত্র বা কলসি-হাঁড়ি  অর্থাৎ মাটির তৈরী  প্রয়োজনীয় সাংসারিক  জিনিসপত্র, যা এখন আর ব্যবহার হয় না।  তার পরিবর্তে ধাতু নির্মিত সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এসে গাছে।  তাই রবীন্দ্রনাথের উক্তিটি আজ আর প্রযোজ্য নয় বলা চলে।   পৃথিবীর সভ্যতা, বিজ্ঞান, জাতির কৃষ্টি কালচাররের উন্নতি যত বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে, তত অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু পুরোনো প্রথা, ঐতিহ্য ও নিদর্শন। 

মৃৎশিল্প হলো বিশেষ এঁটেলমাটি বা কাদামাটি অথবা চিনামাটি প্রভৃতির সাহায্যে হাঁড়ি -কলসী ও বিভিন্ন রকম নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র তৈরী করে তা উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়।  যারা এই কাজটি করে থাকে তাদেরকেই কুম্ভকার বা কুমোর বা মৃৎশিল্পী বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।  প্রথমে কাদাঁমাটিকে জিনিসের প্রয়োজন অনুযায়ী একটা রূপ দিতে হয় তারপর তা  আগুনে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। পোড়ানোর পর বস্তুটি র কাঠিন্য ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায় ও একটা স্থায়ী পরিবর্ত ঘটে।  ইতিহাস বলে মানুষের প্রাচীনতম আবিষ্কারের মধ্যে একটি হল মৃৎশিল্প। শোনা যায় নব্যপ্রস্তরযুগে চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রাভেতিয়ান সভ্যতার ডলনে ভোসনিসের খ্রীষ্টপূর্ব ২৯০০০ - ২৫০০০ আব্দের ভেনাসের প্রস্তরমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল।  চীনের জিয়াংঝিতে মাটির পাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০০ আব্দের। নব্য প্রস্তরযুগের প্রথমদিকের শিল্পকর্ম জাপানের যেমন (খ্রিস্টপূর্ব ১০৫০০). রাশিয়ার সর্ব পূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০০) সব-সাহারা দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া গেছে।  




কাদামাটি দিয়ে নির্মিত মৃৎশিল্পকে তিন ভাবে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।  মাটির পাত্র, পাথুরে পাত্র ও পোর্সেলিন। এগুলো নির্মাণ করার জন্য মাটি ও তাপমাত্রার হেরফের রয়েছে।  এই শিল্পে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।  সবচেয়ে বড়  ব্যাপার হলো প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদনের সময়ে দূষণমুক্ত  করা হচ্ছে ও বিষাক্ত পদার্থকে নির্গমন করা হচ্ছে। 

পূর্বে মৃৎশিল্পীদের হাতে নিপুণভাবে তৈরী হত মাটির হাড়ি-কলসী, আবার কেউ কেউ ঘর সাজানোর পুতুল ইত্যাদি নানারকম জিনিস তৈরী করত।  সারা বছর মোটামুটিভাবে চললেও নববর্ষ, অক্ষয় তৃতীয়া, শারদোৎসব সহ অন্যান্য পূজা পার্বনের সময় এদের মাটির হাড়ি, মালসা, ছোট-বড় প্রতিমার একটা ভালো বিক্রি বরাবরই ছিল, যা  আজও  রয়েছে। 


তবে কি মৃৎশিল্পী বা কুমোর আজ আর সেভাবে দেখা যায় না। যেটুকু দেখা যায়  তারা প্রায় সবাই প্রতিমা শিল্পের সাথে যুক্ত। কিছু কিছু কুমোরকে আজও  মাটির চায়ের ভার ও কুঁজো নির্মাণ করতে দেখা যায়। আধুনিক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা যত মাটির তৈরী বিভিন্ন জিনিসের ব্যবহার কমাচ্ছি তত কুমোরদের কপাল পুড়ছে। প্রতিমা নির্মাণে আজ মৃৎশিল্পীরা তাদের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে চলেছে।  বংশপরম্পরায় তাদের এই কাজে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়।  

ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ :২৮-০৬-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Sunday, March 29, 2020

মহামারী ও কোয়ারান্টাইন>P

মহামারী ও কোয়ারান্টাইন

'মহামারী' এই শব্দটা শুনলেই মানুষ ভীত হয়ে ওঠে।  শব্দটি সত্যিই ভয়াবহ। সাধারণত কোনো সংক্রমণ রোগ দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে কোন দেশের জনসংখ্যার এই বৃহৎ সংখ্যক লোকের মধ্যে সংক্রমিত হয় তাকেই 'মহামারী' বলা হয়ে থাকে।  মহামারীর ভয়াবহতা বারবার বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।  আমাদের কল্লোলিনী কলকাতাকেও একাধিকবার ছিন্ন-ভিন্ন করেছে।  অষ্টাদশ-উনিশ শতকে কলকাতায় প্রায় প্রতিবছর মহামারী লেগে থাকতো।  সাবেক কলকাতায় প্লেগ, আমাশা, কলেরায় বহু সাহেবকে আমরা মারা যেতে দেখেছি।  সেই আমলের পত্র-পত্রিকাগুলোতে সেইসব বিবরণ ছাপার অক্ষরে বের হতো।  পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাবো মহামারী কিন্তু ঘুরে ঘুরে দেখা দেয়।  ২০২০ সালের প্রথম থেকেই 'কোভিড -১৯' নামাঙ্কিত এক ভাইরাস ধীরে  ধীরে পৃথবীর বুকে থাবা বসিয়ে চলেছে।  গোটা বিশ্বই কম বেশি সংক্রমিত।  ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে বহু মানুষের। ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। মহামারী প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় অতীতের কিছু ঘটনার কথা।  অসুখ থেকে দূরে রাখার তারিকাটি অর্থাৎ কোয়ারান্টিনে পাঠানোর ইতিহাসটি দীর্ঘদিনের।  এই পদ্ধতি নানা দেশে নানা সময়ে কাজে লাগতে দেখা গেছে।

১৩৪০ সাল।  মধ্য এশিয়া থেকে সিল্ক রুট ধরে ক্রিমিয়া হয়ে এক ভয়ঙ্কর রোগ ইউরোপে হানা দিল।  লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে মারা যেতে লাগলো।  রোগটির নাম 'বিউবোনিক প্লেগ', কিন্তু লোকেরা রোগটির  'ব্ল্যাক ডেথ' নাম দিল। দশকে পর  দশকে রোগটি ইউরোপে বার বার ফিরে আসতো। ১৩৭০ সালেও রোগটি এসেছিল। ১৩৭৩ সালে ভেনিসের কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছিল তাদের বন্দরে যেসব জাহাজ ভিড়বে সেইসব জাহাজে যদি কোন প্লেগ আক্রান্ত রুগী থাকে, তাকে ভেনিসে ঢোকার আগেই একটা দ্বীপে চল্লিশ দিন অপেক্ষা করতে হবে।  তারপর তাকে শহরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে।

১৭৯৩ সাল।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে এক ধরণের জ্বর দেখা দিল। এই জ্বরে শহরের মোট জনসংখ্যার  প্রায় দশ শতাংশ লোক মারা যায়।  জ্বরটির নাম 'ইয়োলো ফিভার'।  কারো কারো মতে এটা মশা বাহিত রোগ আবার কারো কারো মতে নাবিকদের থেকেই রোগটি ছড়াচ্ছে। ১৭৯৯ সালে স্থানীয় প্রশাসন ঠিক করলো শহরের বাইরে একটা বিশাল 'কোয়ারেন্টাইন সেন্টার' নির্মাণ করবে।  শহরে আসা জাহাজে যদি কেউ অসুস্থ থাকে প্রথমেই তাকে ওই সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

১৮৯২ সাল।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে রাশিয়া থেকে ইহুদিদের একটা জাহাজ এসে ভিড়েছিল।  জাহাজটিতে প্রায় জনা  সত্তর যাত্রী ছিল।  দেখা গেলো দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার ফলে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ফলে জাহাজটির বেশিরভাগ যাত্রীর সারা গায়ে থিক থিক করছে উকুন।  এই উকুন থেকে আবার অনেকে টাইফয়েড রোগেও আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইস্ট রিভার নদীর নর্থ ব্রাদার দ্বীপে   তাঁবু খাটিয়ে রুগীদের শহর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দেওয়া হয়।

১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল।  রোগ সংক্রমণের ভয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।  সেই সময়ে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার চার ভাগের একভাগ লোক মারা গিয়েছিল। আনুমানিক প্রায় ৫০ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।  ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমেরিকায় জনসমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি বিভিন্ন নথিতে ও সংবাদ মাধ্যমগুলো অসুখের ভয়াবহতা অনেকটা কম করে দেখিয়েছিল।   বিভিন্ন মাধ্যম  থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল স্পেনে এই রোগের প্রকোপ সব থেকে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।  সেই কারণে বিশ্ব জুড়ে রোগটির নাম দেওয়া হয়েছিল 'স্প্যানিশ ফ্ল'।

আর একটি ঘটনার কথা প্রসঙ্গক্রমে এসে যায়।  পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিনের জন্য কোয়ারান্টিনে কে ছিলেন ?

১৯০৭ সাল।  মেরী  ম্যালোন, পেশায় একজন পাচক ছিলেন।  জন্মসূত্রে আইরিশ হলেও তিনি মার্কিন নাগরিক ছিলেন।  তিনি এক সংক্রমক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যে সব বাড়িতে তিনি রান্নার কাজ করতেন প্রথমে সেই সব পরিবারের লোকদের মধ্যে রোগটি সংক্রমিত হয়েছিল।  পরবর্তীকালে বন্ধু -বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ও পাড়া-পড়শির মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।  প্রচুর মৃত্যুও ঘটে। মেরী ম্যালোন অবশ্য জীবিত ছিলেন।  স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাকে পাকড়াও করে তিন বছরের জন্য নিউ ইয়ার্কের নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডের কোয়ারান্টিনে পাঠিয়ে দেয়।  কোয়ারান্টিনে থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর পাচকের কাজ করবেন না, কিন্তু  ১৯১৫ সালে তিনি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।  তাকে কর্তৃপক্ষ আবার পাকড়াও করে সারা জীবনের জন্য ওই দ্বীপের কোয়ারান্টিনে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তিনি ২৩টা বছর বেঁচেছিলেন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম কোয়ারান্টিনে থাকার নমুনা হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র : এই সময় সংবাদপত্র (২২-০৩-২০২০)

ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 










  

Saturday, March 28, 2020

বেলা মিত্রের জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি>P

 বেলা মিত্রের  জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি  



মাত্র কয়েকটি চিঠিতেই স্বামীর ফাঁসি রদ করেছিলেন এক বঙ্গললনা। চিঠিগুলো অবশ্য বঙ্গললনা নিজে লেখেননি, তাঁর অনুরোধে মহাত্মা গান্ধী তৎকালীন ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ ভাইসরয়কে চিঠিগুলো লিখেছিলেন নেতাজি সুভাষ অনুগামী চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির আদেশ বন্ধ করার জন্য। সেই চিঠিগুলোর ফলে অবশ্য তাঁদের ফাঁসি বন্ধ হয়েছিল, ফাঁসির বদলে তাঁরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত  হয়েছিলেন।  ভাবছেন নিশ্চই কে এই বঙ্গললনা?  তিনি আমাদের রাজ্যের অর্থমন্ত্রী শ্রী অমিত মিত্রের মাতৃদেবী, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ভাইজি, সুরেশচন্দ্র বসুর কন্যা বেলা বসু। ওই চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর একজন হলেন হরিদাস মিত্র, যিনি ছিলেন বেলাদেবীর স্বামী।  ১৯৭২ সালে হরিদাসবাবু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।  বাকি তিন বিপ্লবী হলেন পবিত্র রায়, জ্যোতিষচন্দ্র বসু  ও  অমর  সিং গিল।

১৯২০ সালে মাতুলালয় ভাগলপুরে জন্মেছিলেন বেলাদেবী।  তাঁর পিত্রালয় ছিল দক্ষিণ  ২৪ পরগনার কোদালিয়া গ্রামে। ১৯৩৬ সালে তিনি  আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগের অন্যতম প্রধান  যশোর নিবাসী হরিদাসের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিবাহের বছর দুয়েকের মধ্যে বেলাদেবী তাঁর শশুরবাড়িতে গড়ে তুললেন মহিলা সমিতি।  ১৯৪০ সালে কংগ্রেসের রামগড় অধিবেশন থেকে বেরিয়ে নেতাজি  আপস বিরোধী সম্মেলনের ডাক দেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সী বেলা সেই সম্মেলনের মহিলা শাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।  ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বেহালার বাড়ি থেকে তিনি ট্রান্সমিটার মারফত সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুনে নেতাজির সঙ্গে সংবাদ বিনিময়ের ব্যবস্থা করেন।  নেতাজির পাঠানো অস্ত্রশস্ত্র ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের উড়িষ্যার কোনারক মন্দিরের কাছে নিরাপদে অবতরণ করার জন্য বেলা ও তাঁর স্বামী প্রভূত সহায়তা করেন।  বেলা দেবীকে এজন্য নিজের প্রায় সমস্ত গহনা বিক্রয় করতে হয়েছিল, হয়েছিল তাঁদের জীবন বিপন্ন।

নেতাজি তখন বিদেশে। ৬এ বিপিন পাল রোডের বাড়িতে ব্রিটিশ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সুভাষ অনুগামী চার বিপ্লবীর  কার্য্যকলাপ চলতো।  তাঁরা এই বাড়িটিতে একটি টেলিগ্রাফ সেট বসিয়েছিলেন। এই টেলিগ্রাফ সেটের সাহায্যে তাঁরা সাংকেতিক ভাষায় গোপন খবর নেতাজিকে পাঠাতেন। মূলত এই কাজটি জ্যোতিষচন্দ্র বসু করতেন তাকে সহায়তা করতেন হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়।  ১৯৪৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর এই বাড়ি থেকেই গ্রেফতার হলেন জ্যোতিষচন্দ্র বসু।  তার কয়েকদিনের মধ্যে গ্রেফতার হলেন হরিদাস মিত্র, ওমর সিং গিল ও পবিত্র রায়। তাঁদের সকলকেই প্রথমে রাখা হয়েছিল লর্ড সিনহা রোডের গোয়েন্দা বিভাগের বাড়িতে।  নেতাজিকে সাংকেতিক ভাষায় জানানো বিভিন্ন সংবাদ জানার জন্য পুলিশ অকথ্য অত্যাচার চালাতো এই বিপ্লবীদের ওপর। কিছুদিন পরে অমর সিং গিল ও জ্যোতিষচন্দ্র কে রাখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে আর হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়কে রাখা হয়েছিল আলিপুর জেলে। অল্প দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর  চার বিপ্লবীর ফাঁসির আদেশ হল। জেলেরই এক কর্মীর পরামর্শে হরিদাস মিত্রের স্ত্রী ২২ বছরের বেলাদেবী  ও জ্যোতিষচন্দ্রের পিতা রঞ্জন বিলাস বসু পুনায় গিয়ে মহাত্মা গাঁধীর স্বরণাপন্ন হলেন। গাঁধীজি যদি ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ওভেলকে অনুরোধ করে পত্র দেন তাহলে এই চার বিপ্লবীর ফাঁসির হুকুম রদ হতে পারে এমনই তাঁদের ধারণা ছিল।  সত্যি সত্যি  একদিন সেই  অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। রদ হল  তাঁদের ফাঁসির আদেশ।  শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে  তাঁরা দণ্ডিত হলেন। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর চেষ্টায় শেষমেশ সবার মৃত্যুদণ্ড মকুব হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। 

আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপচর বিভাগের অন্যতম প্রধান  দায়িত্ব হরিদাস ও বেলা বহুদিন সামলেছেন  যখন হরিদাস যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে ছিলেন, তখন বেলা নিজ হাতে সব  কিছু সামলেছিলেন। শ্রী হরিদাস মিত্র স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের টিকিটে জিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হন।  কিন্তু বেলাদেবী স্বামীর মতো রাজনীতিরআঙিনায় পা রাখেননি।  ১৯৪৭ সালে বেলাদেবী আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসি রেজিমেন্টের (Rani of Jhansi Regiment)  আদর্শে তৈরী  করেন 'ঝাঁসি রানী বাহিনী'। যার সর্বাধিনায়ক তিনিই হন। স্বাধীনতার পর শিয়ালদহ ও অন্য কয়েকটি জায়গায় শরণার্থীদের ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালে বালি ও ডানকুনির মধ্যবর্তী জায়গায় অভয়নগর অঞ্চলে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের কাজে প্রাণপাত পরিশ্রম করেন। কঠিন পরিশ্রমের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়তে লাগলো। তিনি কঠিন রোগে পড়লেন।  অবশেষে ১৯৫২ সালের ৩১শে জুলাই মাত্র ৩২ বছর বয়সে এই মহিয়সী মহিলার জীবনাবসান হয়। চিরকালই তিনি পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে গেছেন। 

১৯৫৩ সালে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে অভয়নগর অঞ্চলের নামটির পরিবর্তন করে বেলানগর করা হয়।  ১৯৫৮ সালে ভারতীয় রেল ওই  অঞ্চলে একটা নতুন স্টেশন তৈরী করে তার নামে  নামাঙ্কিত করে।

এবছর অর্থাৎ ২০২০ সালে তার জন্মশতবর্ষ। কেউ আজ আর তাঁর নাম করে না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোথাও তাঁর জন্ম শতবর্ষের কথা শোনা যায় না।  কোথাও তাঁর একটা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও শুনিনি।  কত সহজেই এই মহিয়সী নারীকে আমরা ভুলে গেলাম।




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ২৮-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 







Monday, March 9, 2020

ল্যাংচা ও শক্তিগড়>P

ল্যাংচা ও শক্তিগড়





বাঙালির খাদ্য তালিকা মিষ্টান্ন ছাড়া ভাবা যায় না। শেষ পাতে মিষ্টি চাইই  চাই।  উৎসব অনুষ্ঠান হোক বা অতিথি আপ্যায়ন হোক রসনা তৃপ্তির জন্য মিষ্টি  অপরিহার্য।  বাংলার মিষ্টিও বৈচিত্রময়।  একেক জায়গা একেক ধরণের মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। স্থান বিশেষে বাঙালির মিষ্টি বিশ্ব জয় করেছে।

বাংলা অভিধানে ল্যাংচা কথাটির অর্থে বলা আছে পঙ্গু বা খোঁড়া অথচ এই শব্দটি বাঙালির রসনা তৃপ্তির জন্য একটি  অনবদ্য শব্দ।  বর্ধমান রাজপরিবারে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের কন্যার বিবাহ হয়েছিল।  বর্ধমান রাজার এই পুত্রবঁধুর গর্ভে যখন সন্তানের  আগমন ঘটলো তখন তাঁর মুখে কোনো সুখাদ্য ভালো লাগছিল না।  পরিবারের লোকেরা এই বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। একদিন বর্ধমান মহিষী অর্থাৎ বঁধুটির শাশুড়ি তাঁর কাছে জানতে চাইলেন তাঁর কি খেতে ইচ্ছে করছে। বালিকা বঁধুটি নতমুখে বলে ফেলেছিলো তাঁর ল্যাংচা খাওয়ার ইচ্ছে করছে।  কিন্তু ল্যাংচা কথাটি রানী পূর্বে কোনোদিন শোনেন নি। তিনি পরিবারের সবার কাছে কথাটি জানালেন। কেউই শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলেন না।  পরেরদিন রাজপুত্র সবার সামনে তাঁর মাকে জানালেন ল্যাংচা কোনো খাদ্যদ্রব্য নয়। একপ্রকার মিষ্টান্ন।  রাজবঁধু মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদে এক রকম মিষ্টান্ন খেয়েছিলেন, যে মিষ্টান্নটি একজন খোঁড়া মানুষ তৈরী করেছিলেন।  আজ আর তাঁর বঁধুসেই মিষ্টান্নটির নামটা মনে করতে পারছেন না।  সেই খোঁড়া মেঠাইওয়ালার তৈরী সেই মিষ্টিটি তাঁর খাওয়ার স্বাদ হয়েছে। রাজমহিষী গোপনে সংবাদটা মহারাজকে জানালেন।  বর্ধমান মহারাজ  কথাটি শোনার পরই তাঁর বিশ্বস্ত একজন অশ্বারোহীকে একটি জরুরি ও গোপন পত্র দিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদে পাঠালেন। কয়েকদিনের মধ্যেই অশ্বারোহী নদিয়ার সেই খোঁড়া ময়রাকে বন্দী করে নিয়ে এসে বর্ধমান রাজপ্রাসাদে হাজির করলেন।  বর্ধমানরাজ সেই ময়রাকে বর্ধমান শহরের পুবদিকে প্রায় ক্রোস চারেক দূরে বড়সুল গ্রামে কিছু ভূসম্পত্তি দান করলেন এবং তার বসবাসের জন্য একটি ঘরও তৈরী করে দিলেন।  প্রতিদিন ময়রার ভিয়েন থেকে রাজবাড়িতে প্রায় মন খানিক এই বিচিত্র ধরণের মিষ্টান্ন সরবরাহ হতে লাগল। খোঁড়া ময়রা প্রতিষ্ঠা পেলেন ল্যাংচা বিশারদ হিসেবে। উপরিউক্ত কাহিনীটি বিখ্যাত লেখক নারায়ণ স্যান্যালের 'রূপমঞ্জরী' উপন্যাস অবলম্বনে লেখা। ল্যাংচা বিশেষভাবে তৈরী একপ্রকার রসের  ভাজা মিষ্টি, খেতে খুবই সুস্বাদু ও নরম।  রঙ হয় কালচে বাদামি। ময়দা, ছানা, খোয়া ক্ষীর ও চিনির সাহায্যে এই মিষ্টি তৈরী করা হয়।


কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ধরে বর্ধমান বা বোলপুর-শান্তিনিকেতন যাওয়ার সময় সবাই শক্তিগড়ে যাত্রাবিরতি নেয়।  এই শক্তিগরের পূর্বে নাম ছিল বড়সুল। রাস্তাটার দুধারে অসখ্য মিষ্টির দোকান। দোকানগুলোর নাম বেশিরভাগ ল্যাংচা শব্দটি দিয়ে কোনটা ল্যাংচা ঘর, কোনটা ল্যাংচা সম্রাট, ল্যাংচা প্লাজা, ল্যাংচা নিকেতন আবার কোনটা ল্যাংচা কুঠি এরকম। বাহারি স্বাদের মতো নামের বাহার সব।   সেখানেই পাওয়া যায় এই সুবিখ্যাত ও সুস্বাদু মিষ্টিটি।  গাড়ি থামিয়ে গরম গরম ল্যাংচার স্বাদ নিতে কেউ ভোলে না। যদিও বর্তমানে ল্যাংচা আর শক্তিগড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই তা পৌঁছে গেছে  ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই।  তবে শক্তিগড়ের ল্যাংচার স্বাদ ভিন্ন ধরণের। রসগোল্লা, ল্যাংচা, সন্দেশ বাঙালির খুবই প্রিয়। শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাননি এরকম বাঙালি বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্ধমানের শক্তিগড়ের ল্যাংচা ছাড়াও সীতাভোগ ও মিহিদানাও খুব প্রসিদ্ধ। বছর আড়াই আগে বর্ধমানের সীতাভোগ ও মিহিদানা ভৌগোলিক স্বীকৃতি (জি. আই) পেয়েছে। এবার শক্তিগড়ের ল্যাংচার এই স্বীকৃতি পাওয়ার পালা।


ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১০-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Tuesday, March 3, 2020

রবিকথা>P

রবিকথা ...






রবীন্দ্রনাথকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাঁর মৃত্যুর অন্তত বছর কুড়ি বাদে আমি পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের কথা বাল্যকাল থেকেই বাড়ির বড়দের কাছ থেকে শুনতে অভ্যস্থ ছিলাম। বালক বয়সেই শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের কথাও শুনি। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গল্প বাবার কাছে বাল্য বয়সেই শুনেছিলাম, আর বড় বয়সে এসে সংবাদপত্রের মাধ্যমে সেই নোবেল পুরস্কারের চুরি যাওয়ার কথাও জেনেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ।  আমি জানি রবীন্দ্রনাথের সব কিছু সবাই জানেন তবুও আমার উপলদ্ধিকে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

ছেলেবেলায় বড়দের দেখতাম রবীন্দ্রনাথের নামের আগে কবিগুরু কথাটি বসাতে। তখন ধারণা ছিল তিনি শুধুমাত্র একজন কবি ছিলেন। পরবর্তীকালে নানারকম বই পড়ার মাধ্যমেই জেনেছিলাম তিনি কেবল কবি নন।  কাব্য রচনাই  তাঁর একমাত্র রচনা নয়।  সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। তিনি ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক শিরোমণি। তিনি শুধু কবি-সাহিত্যিক নন, একজন মহা-মনীষীও বটে। ভারতের স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম প্রথিকৃৎ। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি দেশবাসীকে সত্য পথের সন্ধান দিয়েছিলেন।  বিশ শতকের প্রথম দশকে বাঙালির জাতীয় জীবনে নবজাগরণ দেখা দেয়।  লর্ড কার্জন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার চক্রান্ত করেন। কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলার বুকে জাতীয়তাবাদের বন্যা বয়ে গিয়েছিলো। বাংলা থেকেই ভারতের সর্বত্র জাতীয় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। তার পরিপেক্ষিতে মহারাষ্ট্রের অন্যতম জননায়ক গোপালকৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন "What bengal thinks today India thiinks tomorrow week"। যে বন্দেমাতরম মন্ত্র বাঙালির মনে জাতীয়তাবোধের প্রতীক হয়ে ওঠে সেই মন্ত্রের স্রষ্টা ছিলেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ দেশপ্রেমের বাণী প্রচার করেন। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল ও অন্যান্য কবিরা সব অপূর্ব দেশপ্রেমের গান রচনা করে নবযুগকে সাদরে আহ্বান করেন  ১৬ই আগস্ট ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব পাশ হয়।  ঐদিনটি ছিল রাখী পূর্ণিমার দিন।  রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে হিন্দু-মুসলমান দাদা ভাইয়ের হাতে হিন্দু বোনেদের রাখী বাঁধার উৎসব পালিত হয়। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের হাতে ভালোবাসার রাখী বেঁধে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন পাকা করলেন। কবি এইভাবেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।

কবি ও শিল্পীদের  চিত্ত বরাবরই স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল হয়। স্বদেশী যুগ ছিল উদ্দীপনার ও উন্মাদনার যুগ। স্বদেশপ্রেমীরা সেই উদ্দীপনায় গা ভাসিয়েছিলেন, জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের জন্য। রবীন্দ্রনাথও সেই উন্মাদনার প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না।  স্বদেশী যুগে হোক বা তার পরবর্তী যুগের রাজনৈতিক ঘটনাগুলো স্বভাবতই তাঁর চিত্তে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তা কেবল তাঁর গান বা প্রবন্ধে বা আলাপ-আলোচনায় প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর রচিত 'গোরা', 'ঘরে-বাইরে' এবং বিশেষভাবে 'চার অধ্যায়' উপন্যাসেও তা প্রকাশ পেয়েছিল।  বিভিন্ন প্রবন্ধ ও উপন্যাসে বারবার উঠে এসেছে তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভাবনাগুলো।  রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর অপর  স্মরণীয় ঘটনা হল 'নাইটহুট' উপাধি ত্যাগ করা। জালিয়ানওয়ালাবাদে ইংরেজদের পাশবিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ তিনি ওই উপাধি ত্যাগ করেন। এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা।  ১৯১৫ সালে তাঁকে 'নাইটহুট' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ১৯১৯ সালের ৩০শে মে তিনি বড়লাট লর্ড চেমস্ফোর্ডকে  চিঠি লিখে  উপাধি ত্যাগ করার কথা জানান।  তাঁর পৃথিবীজোড়া খ্যাতির জন্যই চিঠিখানা দেশ বিদেশে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

রবীন্দ্রনাথ চিত্রশিল্পী হিসেবেও তাঁর প্রতিভার সাক্ষ্য রেখে গেছেন। জীবনের শেষ  দিকে এসে তিনি চিত্রাঙ্কন শুরু করেন। চিত্রকলায় তাঁর কোনো প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না।  তাঁর আঁকা ছবিগুলো ছিল সার্থক শিল্পসৃষ্টি। তিনি তাঁর অঙ্কিত  ছবিগুলো নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন।  বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুও তার আঁকা ছবিগুলোর উচ্চ প্রশংসা করে গেছেন। আজও শান্তিনিকেতনের বিচিত্রভবনে ছবিগুলো রাখা আছে, যা চিত্রানুরাগীদের আকর্ষণের বস্তু হয়ে আছে।

দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর প্রতিভার পরিচয় রেখে গেছেন। দেশের সম্মুখে তিনি শিক্ষার এক নতুন আদর্শ স্থাপন করেন। সেই আদর্শ দেশবাসী ও সরকারের কাছে সমাদৃত হয়েছে। তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রতিবাদেই শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বা পাঠভবন বিদ্যালয়টি ১৩০৮ সালের ৭ই পৌষ (১৯০১ সালের ২২শে  ডিসেম্বর) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  তিনি মনে করতেন শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষ গড়া, পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ। সেই আদর্শকে সামনে রেখেই শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় ও আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। যা আজ  এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।  তাঁর নিজের মূল্যবান সময় ও শক্তি অকৃপণভাবে আশ্রমের সেবায় অর্পণ করেছিলেন। যদিও শান্তিনিকেতনের জমি কিনেছিলেন তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তিনি এখানে একটি প্রার্থনা কক্ষও তৈরী করেছিলেন। আশ্রমের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও মহর্ষির প্রভাব পরোক্ষভাবে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বাল্যকালের শিক্ষাও শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিজ্ঞান শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, সংগীত শিক্ষার সাথে চিত্রবিদ্যার শিক্ষাও শান্তিনিকেতনে অন্যতম ছিল, বর্তমানেও তা রয়েছে।  দেশের বহু নামি-দামি শিল্পীর হাতেখড়ি এখানেই হয়েছিল। শুধু শিক্ষা নয় তার সাথে খেলাধুলার প্রচলন করেছিলেন। সেকালে বাংলার স্কুলগুলোতে শুধুমাত্র ভারতের ইতিহাস পড়ানোর রেওয়াজ ছিল, কিন্তু এখানে তিনি সমগ্র বিশ্বের ইতিহাস পোড়ানো শুরু করেন।  বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাশীলতার উন্মেষই তাঁর শিক্ষার প্রকৃত আদর্শ ছিল। তাঁর কাছে প্রকৃতির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।  তাই তিনি মুক্ত আকাশে গাছের তলায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছিলেন।

তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করতেন। সমাজ কল্যাণ সাধনে ও পল্লীবাসীদের উন্নয়ন সাধনে তাঁর পরিকল্পনাই শ্রীনিকেতনের বাস্তবরূপ।  শ্রীনিকেতন আজ নানাভাবে তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে চারপাশের পল্লীগুলোর শ্রী ফেরানোর চেষ্টা করছে, পল্লীবাসীদের আর্থিক উন্নয়নের জন্য তিনি বস্ত্র ও চর্ম শিল্প প্রচলন করেছিলেন। গ্রামগুলোর অশিক্ষা দূর ও তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো ফোটানোর চেষ্টা আজও করে চলেছে শ্রীনিকেতন।  শ্রীনিকেতন এমন একটা প্রতিষ্ঠান যার মূল্য দেশ ও দেশের সরকার উপলব্ধি করছে।

বাইরে রবীন্দ্রনাথের প্রধান পরিচয় ছিল কবি-সাহিত্যিক হিসেবে কিন্তু শান্তিনিকেতনে তিনি গুরুদেব বলে পরিচিত ছিলেন। শোনা যায় আশ্রম প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর প্রথম সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় মহাশয়। তিনিই তাঁকে গুরুদেব আখ্যা দেন।  আশ্রমের ছাত্র ও শিক্ষকগণ তাঁকে গুরুদেব ছাড়া ভাবতে পারতেন না, আজও পারেন না।  তিনি মনে করতেন অধ্যাত্ব্য জীবনের উৎকর্ষ সাধনই মানব জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।  তাই তিনি এখানে সকাল সন্ধ্যায় উপাসনার প্রবর্তন করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি প্রত্যহ উপসনা করতেন। ৭ই পৌষ মহর্ষি ব্রহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন সেই দিনটিকে স্মরণে রাখার অভিলাষে রবীন্দ্রনাথ ৭ই পৌষ তাঁর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। মহর্ষির জীবনে উপনিষদের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।  রবীন্দ্রনাথের মন্দিরের ভাষণেও উপনিষদের ঋষিবাক্যগুলো বারবার উঠে আসতো। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন ধর্মের জয় হয়, অধর্ম সাময়িকভাবে সুখকর হলেও পরিণামে সমূলে বিনাশের কারণ হয়।  তিনি আরো মনে করতেন যিনি শান্তম তিনিই শিবম, তিনি আবার অদ্বৈতম। এই শান্তম শিবম অদ্বৈতম মন্ত্রটি রবীন্দ্রনাথের অবচেতন ও জাগ্রত মনের কথা।  তাঁর অবচেতন মনে প্রতিনিয়ত মন্ত্রটি কাজ করে চলতো। তাঁর জীবনে যেমন শান্তিনিকেতন তেমন মন্ত্রটির বিশেষ স্থান ছিল। আশ্রমগুরু আশ্রমবাসীদের প্রকৃত কল্যাণের পথ মন্ত্রটির মাধ্যমে নির্দেশ করেছেন।

ছোটগল্প, নাট্যসাহিত্য, প্রবন্ধ, চিত্রকলা ও সংগীতের মধ্যে তাঁর সাহিত্য কর্ম ছড়িয়ে আছে। তিনি প্রায় হাজার পঁচিশেক গান লিখে গেছেন। রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত গানগুলি বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা তিনিই ছিলেন। তাঁর কাব্য বহুবর্ণময়। কখনো রক্ষণশীল ধ্রুপদী শৈলীতে, কখনো হাস্যোজ্জ্বল লঘুতায়, কখনো বা দার্শনিকের গাম্ভীর্যে আবার কখনো বা আনন্দের উচ্ছাসে কাব্যগুলি উদ্ভাসিত।

 রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আশ্রমের ছাত্র ও শিক্ষক উভয়েরই গুরুদেব, সমগ্র বাঙালি জাতিরও গুরুদেব। তিনি কেবল কবি-সাহিত্যিক ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রকৃত জীবনশিল্পীও। শান্তিনিকেতন ছিল তাঁর তপস্যাকেন্দ্র। এই তপস্যাকেন্দ্রেই তিনি তাঁর জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন। তাঁর অনন্য সাধারণ প্রতিভার সাথে অনলস সাধনা যুক্ত হয়ে গড়ে উঠেছিল এক মহান জীবন।

রবীন্দ্রনাথ এক অনন্য সাধারণ ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমী  ব্যক্তিত্ব।  তাঁর আবির্ভাবের প্রায় ১৬০ বছর পর তিনি আমাদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের শোকে-দুঃখে, আনন্দে-উৎসাহে যার অস্তিত্ব আমরা সবসময় অনুভব করে থাকি। আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রেই তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনি কেবল নিজের সাথে নিজেই তুলনীয়।  মহাকাল তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। যুগে যুগে, জন্ম-জন্মান্তরে তাঁর অমরত্ব নিয়েই বাঙালি তথা ভারতবাসীর কাছে তিনি চিরকালীন হয়ে থাকবেন। তিনি  ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর উদ্ভাসিত মহিমা আজও এবং ভবিষ্যতেও আমাদের সঠিক ও পরিপূর্ণ জীবন গঠনে সহায়তা করে চলবে। বাঙালি জীবনে তিনি বরাবরই একটা 'রোল মডেল' হয়ে থাকবেন।






ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ০৩-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 









Sunday, February 16, 2020

বাবা জটিলেশ্বর মন্দির >P

বাবা জটিলেশ্বর মন্দির 


বাবা জটিলেশ্বর মন্দির 






হুগলী  জেলা বাংলার পুরাকীর্তির ও স্থাপত্যের ইতিহাসে বরাবরই উজ্জ্বল হয়ে আছে। ব্যান্ডেল গির্জা, ফুর ফূরাহ শরিফ, ইমামবাড়া, শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির, ষাঁড়েশ্বরতলা মন্দির, হংসেশ্বরী মন্দির, বৃন্দাবন জিউ মন্দির, নৃত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির, আঁটপুর মঠ, ওয়াচ টাওয়ার, জাফরগঞ্জ কবরস্থান, জয় কৃষ্ণ লাইব্রেরী, সেন্ট ওলাফের গির্জা, চার্চ অফ সেক্রে কোয়ের ডি জেসু, বৌদ্ধ মন্দির, লাইট হাউস টম্ব, চন্দননগর মিউজিয়াম, চন্দননগর গির্জা, নন্দদুলাল মন্দির ইত্যাদি জেলা পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য স্থান।

হুগলী  জেলার চুঁচুড়া শহর ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শহর। শহরটি জেলার সদর শহর হিসেবে পরিচিত। হুগলী  নদীর তীরে শহরটি গড়ে উঠেছে। ওলন্দাজদের হাত ধরেই শহরটির গোড়াপত্তন হয়। মুঘল কর্তৃক পর্তুগীজদের বিতরনের পর ১৬৩২ সালে ওলন্দাজরা হুগলীতে আসে।  তারা ১৬৩৮, ১৬৫০, এবং ১৬৬২ সালে মুঘল সম্রাটের নিকট হতে চুঁচুড়াতে ব্যবসা করার ছাড়পত্র বা হুকুমনামা লাভ করে।  ওলন্দাজ নৌ-সেনাপতি ভ্যান দাড় ব্র্যাক ১৫৫৩ সালে চুঁচুড়ায় কুঠি স্থাপন করেন। তিনি পরবর্তী প্রায় ৫৭ বছর এখানে বাণিজ্য করেন এবং তিনিই  চুঁচুড়া শহরের পত্তন করেন। ওলন্দাজদের  ক্রমবর্ধমান ব্যবসা বৃদ্ধি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি তৎকালীন ইংরেজ সকারের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭৫৯ সালে বিদেরার যুদ্ধে ইংরেজরা ওলন্দাজদের পরাজিত করার পর জেলাটি ইংরেজদের অধীনে চলে আসে।  শহরের আনাচে কানাচে ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে। এক সময় ওলন্দাজদের বন্দর ছিল এই শহরেই।


বাবা জটিলেশ্বরের রথ 

 চুঁচুড়ার কোদালিয়া ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের সিমলা অঞ্চলে বাবা জটিলেশ্বর মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি খুবই ঐতিহ্যহবাহী ও জাগ্রত এক মন্দির। শোনা কথা, সরস্বতী নদী থেকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত বাবা জটিলেশ্বরকে পাওয়া গিয়েছিল। শিব এখানে জটিলেশ্বর রূপে বিরাজ করছেন। অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে প্রতি বছর বাৎসরিক উৎসব হয়।  এই উৎসবকে কেন্দ্র করে একটি বিরাট রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। অসময়ের এই রথযাত্রা ও তাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলাও বসে। এই মেলায় যাত্রা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এই দিনটিতে বিশেষ পুজোও হয়। চিরাচরিত প্রথা মেনে রথে বাবা জটিলেশ্বরকে নিয়ে শহরে প্রমোদ ভ্রমণ করানো হয়। বহু লোকের সমাগম হয় সেই দিনটিতে। লোকের বিশ্বাস বাবার কাছে মানত করলে জটিল রোগ থেকে মুক্তি মেলে। সেই কারনে বাবার নাম জটিলেশ্বর হয়েছে। বাবার আবির্ভাব ও মন্দির স্থাপনার সন সম্বন্ধে স্থানীয় লোকেরা কিছু জানাতে পারলেন না। কেউ বললেন শত বৎসর উত্তীর্ণ আবার কারো কারো ধারণা ২০০ বছর পেরিয়ে গেছে। তবে একজন বয়স্ক জানালেন যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গড়ে তোলা যাত্রার দল প্রায় ১১২-১৩ বছর ধরে মেলার সময় যাত্রা করে চলেছে। সেই হিসেব ধরলে এখানকার মন্দির শত বৎসর অতিক্রান্ত। এই অকাল মেলাটি চলে আরো বেশ কয়েকদিন ধরে। 



ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১৬-০২-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Monday, February 10, 2020

অস্তাচলে রাতের তারা >P

অস্তাচলে রাতের তারা 



"শরীর, শরীর। আমার এই শরীর নিয়েই তো সব কিছু। তাই জানো, শেষ জীবনে এই শরীরটাই দান করে দিয়ে যেতে চাই।  যদি কারো কোনও কাজে লাগে।  বলতে পারো, এটাই আমার শেষ ইচ্ছে।" মৃত্যুর  কয়েক মাস আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলি বলেছিলেন।


আরতি দাস হয়ে উঠেছিলেন মিস শেফালী। তিনি ছিলেন ছয় ও সাতের দশকের খ্যাতনামা নর্তকী, কলকাতার প্রথম বাঙালি ক্যাবারে ডান্সার। বাংলা চলচিত্রের "কুইন অফ ক্যাবারে" আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। গত ৬ই ফেব্রুয়ারী, ২০২০ বৃহস্পতিবার সোদপুরের বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।  বহুদিন তিনি কিড়নির রোগে শয্যাশায়ী ছিলেন  তাঁর পায়ের ছন্দ, শরীরী বিহঙ্গ এক সময় আমাদের তিলোত্তমাকে তোলপাড় করে দিয়েছিল। আহিরীটোলার এক ঘিঞ্জি বাড়ি থেকে বিনোদন জগতের ঝলমলে আলোয় উঠে আসা এক মধ্যবর্তী বাঙালি মেয়ের নাম আরতি ওরফে শেফালী। 

আহিরীটোলার গরিব পরিবারের কন্যা ছিলেন আরতি। ছয় মাস বয়সে বাবা-মার হাত ধরে পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। ১৯৪৪ সালে নারায়ণগঞ্জে জন্ম হয়েছিল।  কলকাতায় আসার পর প্রবল আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে তাঁদের পরিবারকে যেতে হয়। আধপেটা খেয়ে কোনো মতে তাঁদের দিন চলতো। অর্থের এভাবে তাঁর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি।  বাবা একটা ফলের দোকানে কাজ নিয়েছিলেন। মা পরিচারিকার কাজ করতেন।  তাঁদের  সামান্য আয়ে সংসার চালানো মুশকিল হচ্ছিল। সংসারের হাল ধরার জন্য মাত্র ১১ বছর বয়সে আরতিকে রোজগারের আশায় কাজের জগতে ঢুকতে হয়েছে। তিনি চৌরঙ্গী এলাকার একটা  এংলো ইন্ডিয়ান পরিবারে পরিচারিকার কাজ নিয়েছিলেন। এই পরিবারে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাচ-গান ও খানাপিনা আয়োজন করা হতো। কিশোরী আরতি পর্দার আড়াল থেকে নাচ দেখতো। তখনই তাঁর নাচের প্রতি একটা আকর্ষণ জন্মায়। একদিন ভিভিয়ান নামে এক সাহেবের কাছে তাঁর নাচের ইচ্ছের কথা জানান। সেই ভিভিয়ান  তাঁকে ফিরপোজ হোটেলে নাচের জন্য ব্যবস্থা করে দেন। এখানেই তাঁর ক্যাবারে নাচের হাতেখড়ি। মাসের শেষে তাঁকে ৭০০ টাকা মেইনে  দেওয়া হবে শুনে নাবালিকা আরতি বেজায় খুশি হয়েছিলেন। বাঙালি মেয়ে ক্যাবারে নাচছে। মধ্যবিত্ত বাঙালির মূল্যবোধে আঘাত হানলো। বাবা ও বাড়ির অন্যান্যরাও আপত্তি তুললো। সমাজও ভালোভাবে নিলোনা। সকলের  আপত্তিকে অবজ্ঞা করে চরম দারিদ্য দেখা আরতি তাঁর নাচ চালিয়ে গিয়েছিল। এই ফিরপোজ হোটেলের মালিক তাঁর আরতি নাম পরিবর্তন করে "মিস শেফালী" নাম দিয়েছিলেন।

ইউরোপীয় নৃত্যশিল্পীরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো, সুযোগ বাড়ছিল স্থানীয়দের। আরতির কপালে এই সময় সুবর্ণ সুযোগটা এসে গিয়েছিল।  তারপর ফিরপোজ হোটেল থেকে পার্ক স্ট্রিট হয়ে ওবেরয় গ্রান্ড হোটেলে  গানের সুরের সাথে পা মিলিয়ে তিনি "মিস শেফালী" নামের মর্যাদা রেখেছিলেন পরবর্তীকালে টালিউড থেকে বলিউডের চলচ্চিত্র  জগৎকেও  নাচের ছন্দে তিনি মাতিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর রূপের ছটায় মুগ্ধ হতেন যুবক থেকে বৃদ্ধ সবাই।  প্রথম শোয়ের পোশাক দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন, কিন্তু সংসারের দারিদ্র্যতার কথা ভেবে মুখ বুজিয়ে নাচে মন দিয়েছিলেন। প্রথম দিনই তাঁর নাচ সুপার ডুপার হিট হয়ে যায়। হাততালিতে হল সরগরম হয়ে ওঠে। তখন তাঁর কোনো রকম নাচের তালিম ছিল না। দেখে দেখে যেটুকু শেখা ও ফিরপোজের তত্ত্বাবধানে কিছু নাচ শেখা। পরবর্তীকালে তিনি চার্লস্টন, ক্যান ক্যান, টুইস্ট, বেলি ড্যান্স ইত্যাদি নাচের তালিম নেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শহরের সাহেবি হোটেলগুলোতে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন।  একের পর এক হোটেলে তিনি ক্যাবারে ড্যান্সার হিসেবে ঝড় তুললেন। তাঁর নাচ দেখার জন্য কলকাতার নিশিনিলয়গুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে, উড়তে থাকে মদের ফোয়ারা, বাড়তে থাকে হোটেলগুলোর লভ্যাংশ। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাতের দশকের হাটথ্রম। তাঁর নাচের গুণে আবদ্ধ তখনকার কিশোর, যুবক থেকে বৃদ্ধ সকলেই।

ধীরে ধীরে তিনি থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন।  বিশ্বরূপা থিয়েটারে যোগদান করেন।  প্রথম "চৌরঙ্গী" নাটকে তরুণকুমারের সাথে অভিনয় করেন। তারপর সারকারিনায় "সম্রাট ও সুন্দরী" নাটকে অভিনয় করেন। এই "সম্রাট ও সুন্দরী" নাটক তাঁকে  খ্যাতির উচ্চসীমায় তুলে দেয়। তাঁর অভিনয় দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়ে যায়।  পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি সিনেমাতেও এই লাস্যময়ী অভিনেত্রীকে দেখা গেছে। সত্যজিৎ রায়ের ১৯৭০ সালে নির্মিত  "প্রতিদ্বন্দ্বী", ১৯৭১ সালে "সীমাবদ্ধ" সিনেমাতে তিনি অভিনয় করেছিলেন।এছাড়া ১৯৭৬ সালে "বহ্নিশিখা",  ১৯৯২ সালে নির্মিত "পেন্নাম কলকাতা" সিনেমাতেও তাঁকে দেখা গেছে। সুপ্রিয়া দেবী, উত্তমকুমার, বিশ্বজিৎ, তরুণ কুমার, উৎপল দত্তের মতো কিংবদন্তি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে তিনি অভিনয় করেছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি হিন্দি সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন। অমিতাভ বচ্চন তাঁর নাচের গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চ ও থিয়েটারেও  সমানতালে অভিনয় চালিয়ে গিয়েছিলেন। "সম্রাট ও সুন্দরী", "সাহেব বিবি গোলাম" ও "অশ্লীল" নাটকে তাঁর অভিনয় যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিল। তাঁর শো মানেই তখন হাউসফুল থাকতো। অমিতাভ বচ্চন ও উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর খুবই সুসম্পর্ক ছিল।

সারাজীবন যেটুকু ভালোবাসা পেয়েছিলেন তাতেই তিনি খুশি ছিলেন। কিন্তু তাঁর আক্ষেপ ছিল তাঁর যৌবনের আবেদনটাকেই বাঙালি গোগ্রাসে গিলেছে। খুব কম মানুষের কাছ থেকেই একজন স্বাবলম্বী নারীর মর্যাদা তিনি পেয়েছেন।  তাঁর শরীরী আবেদনে বহু পুরুষ সারা দিয়েছে, প্রেম করেছে, কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা  কেউ তাঁকে দেয় নি। তাঁর ইচ্ছে ছিল, তাঁর বায়োপিক হলে তাঁর চরিত্রে যেন অভিনয় করেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, ইচ্ছে ছিল ডান্স রিয়ালিটি শোয়ে বিচারকের আসন অলংকৃত করার। কিন্তু তাঁকে কেউই সেই সুযোগ দেন নি। শেষ জীবনে তাই  অভিমানে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে রেখেছিলেন।

শেফালী বিয়ে করেননি কিন্তু পরিবারের সবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এরপর একদিন লাইমলাইট থেকে হারিয়ে যান। দিনের পর দিন কাজ না পাওয়ার যন্ত্রনায় ভুগেছেন। শিল্পী সংসদ থেকে দু-একবার  সামান্য সাহায্যে পেয়েছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন "দুহাতে যেমন রোজগার করেছি, তেমন টাকাও উড়িয়েছি। নিজের ভালো-মন্দ কিছুই তো ছাই বুঝতে পারতাম না। ইস, তখন যদি একজন ভালো গাইড পেতাম।  যে আমাকে আগলে রাখতে পারতো। তবুও এসবের মধ্যেও যে নাগেরবাজারে ফ্ল্যাট কিনেছি, সোদপুরে বাড়ি বানাতে পেরেছি, সেটাই ঢের।" তিনি কোনোদিনই সঞ্চয়ী ছিলেন না, বরং লোকের বিপদে আপদে সাধ্যমতো সহায়তা করতেন। বহু টাকা রোজগার করলেও তাঁর শেষজীবন খুবই অর্থকষ্টে ও শারীরিক অসুস্থতায় কেটেছে।  তাঁর ব্যক্তিগত জীবন খুবই বর্ণময় ছিল, অবশেষে জীবন প্রদীপটি চিরতরে নিভে গেল, একটা  যুগের অবসান ঘটলো। বিনোদন জগতের আর এক নক্ষত্রের পতন ঘটলো। ভারতবাসী যেমন হিন্দি সিনেমার হেলেনের কথা চিরদিন মনে রাখবে তেমন বাঙালিরাও মিস শেফালিকে চিরদিন তাদের মনের ভিতরে রেখে দেবে। নাম যখন শেফালী তখন ভোরেই ঝরে যাওয়ার কথা।  তিনি গেলেনও তাই। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১০-০২-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 





Thursday, January 30, 2020

জীবন-জীবিকা (তৃতীয় পর্ব )>P



ক্ষৌরকার






শরীরের যে অংশ নিয়ে মানুষের সবচেয়ে দুর্বলতা রয়েছে, তা হল তার কেশবিন্যাস। এটি কমতে থাকলে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কেশ বা চুলকে ভালোবাসেন না এমন মানুষের সংখ্যা খুবই নগন্য। ছেলেদের কেউ বড়, কেউ ছোট আকারে চুল রাখতে পছন্দ করে আবার বর্তমানে মুন্ডিত মস্তক লক্ষ্য করা যায়।  মেয়েরা কেউ কেউ লম্বা চুলে বেণী বাঁধতে যেমন পছন্দ করে তেমন কেউ আবার বব  কাট  চুল রাখতে পছন্দ করে থাকে।  বর্তমানে আবার চুলের রঙ পরিবর্তন করে নানান রঙে রঙিন  করার চল হয়েছে। সৌন্দর্য ও মর্যাদার বহিঃ প্রকাশই হলো মানুষের কেশবিন্যাস। আমাদের এই কেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নাপিত বা ক্ষৌরকারদের প্রয়োজন হয়। তাদের পরামানিক ও কেশবিন্যাসকারীও বলা হয়ে থাকে।

নাপিত বা ক্ষৌরকারদের পেশা একটি বৈধ পেশা।  তারা সমাজকর্মী হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে।  হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে এই সম্প্রদায়ের লোকদের একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানস্বরূপ গণ্য করা হয়। জীবনের প্রতিস্তরে এই পেশার লোক ছাড়া হিন্দুদের চলে না।   তা সে দৈনন্দিন জীবনের চুল বা দাঁড়ি কাটা হোক বা জন্ম ও বিবাহ উৎসব অনুষ্ঠানে হোক।   কিছু  ধর্মীয় আচার-আচরণ তাদের দ্বারা পালন করতে হয়। হিন্দু ব্রাহ্মণ সন্তানদের উপনয়নের সময় ও পিতা-মাতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় মস্তক মুন্ডন করার জন্য এদের প্রয়োজন হয়। মানুষকে সেবা প্রদানের  মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে তাদের সংসার যাপন চলে। পূর্বে এই ধরণের সেবা প্রদানের জন্য তারা অর্থের বদলে দ্রব্যসামগ্রী উপহারস্বরূপ পেত।

নাপিতরা নমঃ শূদ্র জাতিগোষ্ঠীর একটি অংশ। এরা নমঃশূদ্ররা ছিল সমাজের সবচেয়ে নীচু প্রজাতির নিম্ন সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও এরা অস্পৃশ্য নয়। মানুষের সেবামূলক কাজগুলো করাই এদের প্রধান দায়িত্ব। আগে যেখানে শীল গোত্রের নমঃশূদ্ররাই এই কাজটি করতো। সময়ের পরিবর্তনে  ও বাঁচার তাগিদে অন্য গোত্রের হিন্দুরাও এই পেশায় সামিল হয়েছে।

নাপিতদের সাধারণত একটি দোকান থাকে, সেই দোকানকে বলা হয় "সেলুন"।  এই দোকানে বসেই তারা দৈনন্দিন পেশার কাজ করে।  যেসব নাপিতের সেলুন খোলার ক্ষমতা নেই তারা রাস্তার ধরে ইটের ওপর বসে কাজ চালিয়ে নেয়।  বাঙালিরা রসিকতা করে এই গুলোকে "ইটালিযান সেলুন" বলে থাকে। আগে বাড়ির বড়োরা এই ইতালিয়ান সেলুনে বসে চুল-দাঁড়ি কেটে রাস্তার কোলে স্নান সেরে তবে বাড়িতে ঢুকতো। আজকাল এই ধরনের ইতালিয়ান সেলুন খুব কম দেখা যায়। পাড়ার সেলুনগুলোও অনেক কমে গেছে।  তার বদলে এসে গেছে ঝা-চকচকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সেলুন।  যার গাল  ভরা নাম দেওয়া হয়েছে ইংরেজদের থেকে ধার করে বিউটি পার্লার।   বর্তমানে  শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে পুরুষদের ও মহিলাদের জন্য বিউটি পার্লার। কোনটা শুধুমাত্র মহিলাদের আবার কোনটা শুধুমাত্র পুরুষদের।  তবে কিছু পুরুষ-মহিলাদের পার্লার রয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় ইউনিসেক্স পার্লার। ভিতরে ঢোকার জন্য পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা দরজা রয়েছে।  সেখানে সাধারণত চুল কাটা, চুলে রঙ  করা, কনেকে সাজানো ইত্যাদি কাজ করা হয়ে থাকে।



ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Saturday, January 25, 2020

সচল বিশ্বনাথ >P

সচল বিশ্বনাথ 

"দেখলাম সাক্ষাৎ বিশ্বনাথ তাঁহার শরীরটা আশ্রয় করে প্রকাশিত হয়ে রয়েছেন।  তাঁর থাকায়  কাশী উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।  উঁচু জ্ঞানের অবস্থা।  শরীরের কোনো হুশই নেই, রোদে বালি এমনি তেতেছে যে, পা দেয় কার সাধ্য - সেই বালির ওপরেই সুখে শুয়ে আছেন। পায়েস রেঁধে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দিয়েছিলাম। তখন কথা কন না - মৌনী।  ইশারায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঈশ্বর এক না অনেক? তাতে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন - সমাধিস্থ হয়ে দেখ তো এক, নইলে যতক্ষণ আমি, তুমি, জীব, জগৎ ইত্যাদি নানা জ্ঞান রয়েছে, ততক্ষন অনেক।  তাঁকে  দেখিয়ে হৃদেকে বলেছিলাম, একেই ঠিক ঠিক পরমহংস অবস্থা বলে।" 

                                                                                                   -   ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব


"সন্ন্যাসী হয়ে যদি উলঙ্গ থাকবে, তবে এই জনাকীর্ণ তীর্থস্থান ত্যাগ করে জঙ্গলে গিয়ে বাস করো।" মহিলাটি দীপ্তকণ্ঠে বেশ কয়েকবার কথাগুলো বলল তার সামনে দিয়ে আগত এক উলঙ্গ সন্ন্যাসীটিকে। কিন্তু তাতে সন্ন্যাসীটির কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এই উলঙ্গ সন্ন্যাসী তখন হনুমান ঘটে বাস করেন।  এক সম্ভ্রান্ত ঘরের মহারাষ্ট্রীয় মহিলা এই ঘাটের পথ ধরে বাবা বিশ্বনাথের পুজো দিতে রোজই যেতেন। একদিন এক সরু গলি দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এই সন্ন্যাসীকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় দেখে উপরোক্ত শ্লেষপূর্ণ তিরস্কারে তিরস্কৃত করেছিলেন।  মহিলাটির স্বামীর পেটে  বিরাট ক্ষত, ডাক্তার বদ্যিরা সব তাদের অক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছেন।  স্বামীর রোগমুক্তির আশায় তিনি রোজ্ গঙ্গা স্নান করে বাবা বিশ্বনাথের পুজো দিতে যেতেন। তিরস্কার করার দিন রাতে তিনি এক স্বপ্ন দেখেছিলেন যে স্বয়ং মহাদেব তাকে বলছেন, "যে উদ্দেশ্য নিয়ে তুই রোজ আমার পুজো করিস, তোর সেই উদ্দেশ্য আমি সফল করতে পারবো না।" আরো বললেন "আজ তুই যে উলঙ্গ মহাযোগীকে অপমান করেছিস তার কৃপা পেলেই তোর মনোস্কামনা পূর্ণ হবে।" পরদিন সকাল বেলায় মহিলাটি হনুমান ঘাটে গিয়ে মহাযোগীর পা ধরে ক্ষমা চাইলেন আর তার স্বামীর প্রাণভিক্ষাও চাইলেন।  মহাযোগী তাকে ক্ষমা করলেন। স্বামীজী এক মুঠো ভস্ম তাকে দিয়ে বললেন স্বামীর দেহে পুরো ভস্মটি  মাখিয়ে দিতে। এই ভস্ম মাখানোর পর তার স্বামী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন।


 সেই প্রাচীন কাল থেকেই কাশীতে কত সাধক-মহাসাধকদের পদধূলি পড়েছে।  নানা বইতে নানা আলোচনায় তাঁদের অলৌকিক মহিমার কথা উঠে এসেছে।  মহাত্মা মহাযোগী তৈলঙ্গস্বামীর বহু অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই দেবভূমি।  প্রায় ১৫০ বছর তিনি কাশীতে বসবাস করেছেন। অলৌকিক শক্তির অধিকারী এক মহাযোগী। তাঁর সময় যত ভক্ত ও সাধক কাশীতে এসেছিলেন তাঁরা বাবা বিশ্বনাথ, দেবী অন্নপূর্ণা, মণিকর্ণিকা ঘাট ও দশাশ্বমেধ ঘাট দর্শন করার পর এই মহাত্মাকে দর্শন করে কাশী ত্যাগ করতেন।  কাশীর অধিবাসীরা তাঁকে "সচল বিশ্বনাথ" নামকরণ করেছিলেন।

তৈলঙ্গস্বামীর সন্ন্যাস নেওয়ার পূর্বে নাম ছিল "শিবরাম" আর সন্ন্যাস নেওয়ার পর নাম হয়েছিল "গণপতি সরস্বতী"। তৈলঙ্গ দেশ থেকে আগত বলে তিনি কাশীর মানুষদের কাছে তৈলঙ্গস্বামী হিসেবে পরিচিত হলেন। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের হোলিয়া জনপদে এক রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতা নরসিংহ রাও ওই জনপদের রাজা ছিলেন।  খুব সৎ ও ধর্মপরায়ণ রাজা ছিলেন।  তাঁর  স্ত্রী বিদ্যাবতীও খুব ধর্মপরায়ণ ছিলেন।  প্রতিদিন তাঁরা শিবের আরাধনা, ব্রাহ্মণ সেবা, দেবদেবীর পূজা করতেন।  দীর্ঘদিন তাঁদের কোনো সন্তান হচ্ছিলো না, নরসিংহ বংশরক্ষার জন্য খুব চিন্তিত ছিলেন। একপ্রকার বাধ্য হইয়াই তিনি বিদ্যাবতীর অনুমতি নিয়ে দ্বতীয়বার বিবাহ করেন। দেবদেবীর কৃপায় ও মহাদেবের করুণায় ১৬০৭ সালের এক পুন্য লগ্নে নরসিংহের প্রথম স্ত্রী বিদ্যাবতী এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। শিবের পূজারী বিদ্যাবতী সন্তানের নাম রাখলেন "শিবরাম"। পরবর্তীকালে অবশ্য রাজা নরসিংহের দ্বিতীয় স্ত্রীও একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই পুত্রের নাম ছিল শ্রীধর। বালক বয়স থেকেই শিবরাম মায়ের পুজোর সময় পাশে বসে সব লক্ষ্য করতেন।  বালক বয়স থেকেই তিনি খুব গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন।  অন্যান্য বালকদের মত তাঁর খেলাধুলায় কোনোরূপ আগ্রহ ছিল না। শুধু বাল্যকাল নয়, কৈশোরে, যৌবনকালে সব ব্যাপারে তিনি সবসময় উদাসীন থাকতেন। বিষয়, সম্পত্তি ও সংসারের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। ৪০ বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতাকে হারান, ৫০ বছর বয়সে মাতাকেও হারান। মাকে হারানোর পর তিনি খুব ভেঙে পড়েন।  তিনি সংসার ছেড়ে শ্মশানে এসে একটি পর্ণকুটির তৈরী করে বাস করতে থাকেন। ভ্রাতা শ্রীধর ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সকলেই তাঁকে কুটির ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। সকলের অনুরোধ তিনি উপেক্ষা করে এই কুটিরেই বাস করতে লাগলেন। এই কুটিরেই একদিন পাঞ্জাবের বাস্তুর গ্রামের যোগগুরু স্বামী ভোগীরথানন্দ সরস্বতী আসলেন।  পরবর্তীকালে এই যোগীর কাছ থেকে শিবরাম সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন। সন্ন্যাস নেওয়ার পর তিনি গুরুর নির্দেশে পর্যটনে বাহির হলেন।  রামেশ্বর, নেপাল, উত্তরাখন্ড, প্রয়াগ ঘুরে ১৮৪৪ সালে তিনি কাশীতে এসে পৌঁছলেন। কঠোর সাধনায় এবং গুরুর কৃপায় তিনি হয়ে উঠলেন মহাশক্তিধর যোগগুরু। কাশীতে এসে প্রথমে আসিঘাটে গোস্বামী তুলসীদাসের বাগানে বাস করতে আরম্ভ করলেন।  তারপর হনুমান ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট আর সবশেষে পঞ্চগঙ্গা ঘাটে বাস করতে লাগলেন। তাঁর মুখে শিব আরাধনার স্ত্রোত্র শুনতে কাশীর ঘাটে প্রচুর লোক সমাগম হতো।   কাশীর ঘাটে-ঘাটে, অলিতে-গলিতে তাঁর মহিমা ছড়িয়ে আছে। তাঁর অলৌকিক কান্ডকারখানার সাক্ষী থাকতো কাশীর অধিবাসীরা। নগ্ন হয়েই তিনি ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর আরো দুটো -তিনটি অলৌকিক মহিমার গল্প আজ আপনাদের জনাব।

স্বামীজী যখন আসি ঘাটে বাস করতেন, তখন তিনি প্রায়ই লোলার্ক কুন্ডে যেতেন। একদিন তিনি ওখানে গিয়ে দেখেন ব্রহ্মসিংহ নামে  আজমীরের এক বাসিন্দা কুষ্ঠরোগে পঙ্গু হয়ে যন্ত্রনায় ছটফট করছেন।  এই দৃশ্য দেখে মহাযোগীর করুণা হল, তিনি সস্নেহে একটা বেলপাতা ব্রহ্মসিংহকে দিয়ে বললেন "কোন চিন্তা করো না. তুমি লোলার্ক কুন্ডে স্নান করে এসে এই বেলপাতাটি মাথায় ধারণ করলে তোমার সব রোগ সেরে যাবে।" ব্রহ্মসিংহ স্বামীজীর কথা মতো লোলার্ক কুন্ডে স্নান করে এসে মাথায় বেলপাতা ধারণ করলেন এবং অচিরেই রোগমুক্ত হলেন।

মহাযোগী একদিন আসি ঘাটে পৌঁছে দেখলেন একজন তরুণী তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে উচ্চকন্ঠে কাঁদছেন।  সাপের কামড়ে তার স্বামী মারা গেছেন।  যেহেতু সাপে কাটা মৃতদেহকে শশ্বানে পোড়ানো হয় না, তাই তার আত্মীয়রা গঙ্গার ভাসানোর উদ্দেশ্যে আসি ঘাটে মৃতদেহটি নিয়ে এসেছে।  এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে পরম দয়ালু স্বামীজী মনে মনে খুব কষ্ট অনুভব করলেন। স্বামীজী নদীর ধার থেকে কিছুটা গঙ্গামাটি নিয়ে এসে মৃতদেহের ক্ষতস্থানে মাখাইয়া দিলেন।  কিছুক্ষন পর সবাই দেখল আস্তে আস্তে দেহে প্রাণ সঞ্চার হতে লাগল। সবাই এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তরুণীটিও তার জীবনসাথীকে ফিরে পেল।

একবার এক বদমেজাজের নতুন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে কাশীতে এলেন। তিনি একদিন নগর পরিক্রমায় বেড়িয়ে দশাশ্বমেধ ঘাটে এসে উপস্থিত হলেন।  এখানে তিনি এক  উলঙ্গ স্বামীজিকে দেখে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন।  হাজতের  ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ও কয়েকজন রক্ষীকে ডেকে পাঠালেন এবং আদেশ দিলেন এই অসভ্য লোকটাকে ধরে হাজতে পাঠাবার জন্য।  সবাই মিলে স্বামীজিকে ধরে হাজতে তালাবন্ধ করে রাখলেন। স্বামীজী তখন ভাবলেশহীন। পরদিন সকালে ম্যাজিস্ট্রেট স্বামীজিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাঁর ঘরে গিয়ে দেখলেন যে ঘর ফাঁকা, স্বামীজী বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘরে যেমন তালা লাগানো ছিল, তেমনি লাগানো রয়েছে।  তিনি ঘরটির দরজা, দেওয়াল ও তালা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন, সব ঠিকই রয়েছে।  কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারলেন না কিভাবে কয়েদি ঘরের  বাইরে আসল।  তিনি বেশ গম্ভীরভাবে স্বামীজিকে বললেন, "সাধু, তুমি সত্য কথা বল, কি করে তুমি হাজতের বাইরে এলে?" স্বামীজী সহজ সরল ভাষায় বললেন "প্রত্যুষে আমার বাইরে আসবার ইচ্ছে হয়েছিল। সেই  ইচ্ছে হবার পরমুহূর্তে বাইরে এসে পড়লাম, কোনো বাধা কোথাও পেলাম না।" কয়েদির ঘরটি জলে জলময় হয়েছিল। মেজিস্ট্রেট স্বামীজীর কাছে জানতে চাইলেন এতো জল কিভাবে এখানে এলো।  স্বামীজী বললেন, "রাতে আমার প্রস্রাবের বেগ হয়েছিল, দেখলাম দ্বার তালাবন্ধ, ঘরের বাইরে যেতে তখন ইচ্ছে হয়নি, তাই শায়িত অবস্থাতেই খানিকটা মূত্রত্যাগ করেছি। তারপর রাত  হয়ে এলে, অন্ধকার ঘরটা তেমন আমার ভালো লাগছিল না , তাই মুক্ত হাওয়ায় এই বারান্দায় একটু ঘুরে বেড়াচ্ছি।" মেজিস্ট্রেট ভীষণ রেগে গেলেন, তিনি স্বামীজিকে আবার হাজতে পুড়ে নিজের হাতে দু-দুটো তালা লাগিয়ে তার এজলাসে চলে এলেন। কিছুক্ষন পরে তিনি এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। তিনি যাকে নিজের হাতে তালাবন্ধ করে এলেন, সেই স্বামীজী তার এজলাসের এক কোনে বসে দুষ্টু বালকের মতো হাসছেন। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে মেজিস্ট্রেট হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। স্বামীজী আস্তে আস্তে তার সামনে এসে বললেন "সাহেব, তুমি অন্যান্য সাধারণ মানুষের মত শুধু জড় ও জড়ের শক্তিই বোঝো। এই জগতের মধ্যে ওতপ্রোত হয়ে আছে এক চৈতন্যলোক, তার খবর তোমার মোটেই জানা নেই, সেই চৈতন্যলোকের সঙ্গে যার যোগাযোগ সাধিত হয়েছে, কোনো বন্ধন বা কোনো বাঁধাই আর তার স্বেচ্ছাবিহারকে আটকাতে পারে না। ভারতের যোগীপুরুষদের শক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কার্যই কখনো অসাধ্য বলে গণ্য হয় না।  বেটা, তাহলে বল দেখি , আমার মতো সাধু সন্ন্যাসীকে বিরক্ত করে কি লাভ ? তাছাড়া, সে শক্তিই বা তোর আছে কোই ?" মেজিস্ট্রেট তখন তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং তিনি নির্দেশ দিলেন যে কাশী শহরে তৈলঙ্গস্বামী নিজের ইচ্ছামত যেখানে খুশি ঘুরতে পারবেন। তাঁকে কেউ বাধা দিতে পারবে না।

কখনো তাঁকে  কাশীর গঙ্গায় ভাসমান আবার কখনো ডুবন্ত অবস্থায় দেখা যেত। গঙ্গার সাথে তাঁর যেন অন্তরের সম্পর্ক ছিল। এরকম বহু লীলা বা মহিমা স্বামীজী দেড়শো বছর ধরে দেবভূমিতে করে গেছেন।  সাধারণ সাধু সন্ন্যাসীদের জীবন সাধারণত শিষ্যবর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।  কিন্তু তৈলঙ্গস্বামীর সে অর্থে কোন শিষ্য ছিল না।  উমাচরণ মুখোপাধ্যায়ের নামই একমাত্র শিষ্য হিসেবে শোনা যায়, তবে তাঁর প্রচুর ভক্ত ছিলেন। । ১৮৮৭ সালের পৌষ মাসের শুক্লা একাদশীর পুন্য তিথিতে স্বইচ্ছায় ২৮০ বছর বয়সে তিনি যোগবলে দেহরক্ষা করেন অর্থাৎ প্রয়াত হন।  মৃত্যুর পূর্বে তিনি ভক্তদের বলে গিয়েছিলেন তাকে চন্দনকাঠের বাক্সে ভোরে গঙ্গা সমাধি দেওয়ার কথা তাঁর ইচ্ছাই ভক্তগণ পূরণ করেন।

 ১৮৬৮ সালে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব কাশীতে যখন এসেছিলেন তখন তিনি তৈলঙ্গস্বামীর সাথে দেখা করেছিলেন এবং নিজ হাতে তৈরী করা পায়েস স্বামীজিকে খাইয়েছিলেন। যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ীও স্বামীজীর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

মহাত্মা তৈলঙ্গস্বামী ছিলেন ভারতের  সাধকদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল জোতিস্ক। প্রথম বিস্ময় তাঁর দীর্ঘ আয়ু। আরো বিস্ময় অলৌকিক ক্ষমতাবলে  মানবের জীবন দান  ও হিতসাধন করা। তবে এটা  চিরন্তন সত্য যে মানব কল্যানে ব্রতী হয়ে ভারতবর্যে যুগে যুগে ঈশ্বর বিভিন্ন অবতারের রূপ ধরে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। কখনও বুদ্ধ, কখনও যিশু আবার কখনও শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস। তেমনি তৈলঙ্গস্বামীকেও ভগবানের  এক রূপ বলে মানব সমাজ মেনে নিয়েছে।






ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ২৫-০১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Saturday, January 11, 2020

মন্দারমণি>P

 লাল কাঁকড়ার দেশে 




অফিসে দু-তিনদিন ছুটি পেলেই বাঙালি মন ঘরে টিকতে চায় না।  কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য মন ছটফট করতে থাকে, আর যদি সেটা হয় শীতকাল, তবেতো কোনো কথাই নেই, ঘর ছেড়ে বেরোতেই হবে। অল্প সময়ের ছুটিতে ভ্রমনরসিকরা কাছাকাছি পাহাড়, জঙ্গল বা সমুদ্রের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ভ্রমণের ব্যাপারে বাঙালির যে একটা প্রসিদ্ধি আছে, ভারতের অন্য রাজ্যের অধিবাসীদের বোধহয় সেটা নেই। ভ্রমণটা বাঙালির মজ্জায় মজ্জায় গেঁথে রয়েছে। তেমনি এক অল্প শীতের ছুটির মুহূর্তে আমি সপরিবারে পাড়ি জমালাম পূর্ব মেদিনীপুরের এক সৈকতে।  বৈচিত্রময় পৃথিবীর দুটো জিনিস মানুষকে সবসময় অভিভূত করে। আকাশ আর সমুদ্র, দুটোই বিশাল আর অসীম। পার্থক্য হল, আকাশকে স্পর্শ করা যায় না, আর সমুদ্রকে শুধু স্পর্শ নয়, সর্ব শরীরকে তার কোলে নিমজ্জিত করা যায়।

 সূর্য্যোদয় 

পূর্ব মেদিনীপুরে বঙ্গোপসাগরের বুকে অনেকগুলো সৈকত রয়েছে, তাজপুর আর মন্দারমণি ছাড়া সব কটাই আমার দেখা হয়ে গেছে। তাই এবার চললাম লাল কাঁকড়ার দেশ মন্দারমণিতে। ব্যস্ত জীবনে একটু বিশ্রাম, একটু মুক্তির স্বাদ, আর সমুদ্রের মাতাল হাওয়ায় নিজেকে মাতাল করে তোলা। হালকা শীতল আবহাওয়া, সমুদ্রের শান্ত ঢেউ, মৃদু গর্জন, সেটা তো বিশ্রাম ও শান্তির আর এক নাম। দুচোখ ভরে শুধু দেখে যাওয়া আর মন ভরে শুধু বিশুদ্ধ নিশ্বাস নেওয়া।

শীতের এক সকালে ধর্মতলা থেকে দিঘাগামী বাস ধরে চাউলখোলাতে পৌঁছলাম। প্রায় ১৮০ কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে ঘন্টা চারেক সময় লাগলো।  এখান থেকে ভ্যান রিক্সা ধরে মন্দারমণি আসলাম।  রাস্তার ধারে অজস্র হোটেল। একটু ঘোরাঘুরি করে একটা হোটেলে সমুদ্রের দিকে একটা ভালো ঘর পেয়ে গেলাম।  ঘরে ঢুকে হাত-মুখ ধুয়েই ছুট লাগলাম সৈকতে।  সামনে দিগন্ত বিস্তীর্ন ঘন নীল আকাশ, বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলরাশি, ঝাউয়ের হাতছানি  আর নিরালা সাগরবেলা।  সমুদ্র উপকূলের নয়নাভিরাম দৃশ্য সার্বিকভাবে আমাদের মন ভরিয়ে দিল। এখানকার সমুদ্রতট সমান হওয়ার জন্য দেখলাম দুদিকেই বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। তটটিও বেশ  পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।

মাছ ধরার নৌকো 

হোটেলে ফিরে  দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে এলাম তটভূমিতে। তখন ভাটা  চলছে, সৈকতের বেশিরভাগ অঞ্চলটাই দৃশ্যমান, বালুকাতটে লাল কাঁকড়ার মিছিল, দূর থেকে মনে হচ্ছে অনেকটা জায়গা জুড়ে কে যেন টকটকে লাল আবির  ছড়িয়ে দিয়েছে।  সামান্য পায়ের আওয়াজেই তারা বালির গর্তে লুকিয়ে পড়ছে, চলছে তাদের লুকোচুরি খেলা।  সমুদ্রের তটভূমি  ধরে বেশ কিছুক্ষন হাঁটলাম।  রোদ ঝলমলে দুপুরের পর সৈকতে বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়তে লাগলো। ধীরে ধীরে আলো কমে আসতে লাগল, লালচে আভা ছড়িয়ে পড়তে লাগল সমগ্র সৈকতজুড়ে, সূর্য্যিমামাও পশ্চিমপাড়ে ঝাউয়ের বনে ঢোলে পড়লো। অনেক্ষন হাঁটার ফলে আমরাও কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। দীঘার থেকে ঝাউয়ের বন এখানে একটু কম বলেই আমার মনে হলো, তও যা রয়েছে তা এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। আমরা পাকোড়া ও চা খেয়ে অঞ্চলটা একটু ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম, সৈকতের ধারেই বেশ বড় একটা বাজার রয়েছে যেখানে নানারকম খেলনা, শামুকের তৈরী মূর্তি, কাপড়ের ব্যাগ আরো অনেক কিছু বিক্রি হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে মেয়েদের অলংকারও। সব সমুদ্র সৈকতের মতো এখানেও  ভাজা মাছ বিক্রি চলছে। বহু স্থানীয় বাসিন্দাদের দেখলাম তেলেভাজা ও মুড়ি কিনছে। ওদের দেখা দেখি কয়েকজন পর্যটকও গরম গরম তেলেভাজার স্বাদ নিচ্ছে। বহু পর্যটককে দেখলাম নানারকম জিনিস কিনছে। এখানে বিকি-কিনি বেশ ভালোই হচ্ছে বলে আমার মনে হলো। আমার গিন্নি  একটা সুন্দর পুঁথির মালা ও কানের দুল কিনলো, জানিনা নিজের জন্য না অন্য কারোকে উপহার দেবে।  এবার হোটেলের পথ ধরলাম।

সৈকত 

ঘর থেকেই দেখছিলাম চাঁদের আলোয় বেলাভূমির বালিগুলো হীরের মতো চিক্চিক করছে। ভাবছিলাম জ্যোস্না রাতে বেলাভূমিটি নিশ্চয় আরো ঝিকমিক করে, তখন নিশ্চয় আরো অপরূপা লাগে। জ্যোস্ন্যা রাতের সমুদ্রের সৌন্দর্য্য পৃথিবীর যে কোনো সৌন্দর্যকে হার মানায়। রাত যত বাড়ছে সমুদ্রের গর্জন তত হুঙ্কার ছাড়ছে। যদিও দীঘা বা পুরীর তুলনায় সেটা অনেকটাই কম। দীঘার কোলাহল পরিবেশ আর এখানকার শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশ দুটো পাশাপাশি সৈকতের মধ্যে কতটা ফারাক। এখানকার পরিবেশের সাথে ঈশ্বর যেন এখানকার ঢেউগুলোকেও শান্ত করে দিয়েছে। মন্দারমণি ও তাজপুর পশ্চিমবঙ্গের নতুন আবিষ্কৃত সৈকতগুলোর মধ্যে অন্যতম। মন্দারমণির সৈকত বেশ শক্ত, পূর্বে এই সৈকত ধরে গাড়ি যাতায়াত করতো, বর্তমানে  সরকারি তরফ থেকে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মোহনায় বাঁক কাঁধে জেলে 

ছোট ছোট চারটি গ্রাম নিয়ে তৈরী এই মন্দারমণি। .সমুদ্রতীরবর্তী গ্রামগুলোতে এককালে নোনা জলের বেশ কিছু ভেড়ি ছিল। এইসব ভেরিগুলোতে জেলেদের ও মাছের ব্যবসাদারদের আনাগোনা বরাবরই ছিল, কিন্তু ছিল না তাদের বসবাসের কোনোরূপ আস্তানা। এই মাছ ব্যবসায়ীদের উৎসাহে প্রথম এখানে হোটেল তৈরী হয়, পরবর্তীকালে পর্যটকদের অগমনে হোটেল ব্যবসা ও হোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।  মন্দারমণি এই নাম নিয়ে অনেকরকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কেউ বলে অঞ্চলটি মন্দার গাছে ঘেরা ছিল বলে এই নামকরণ আবার কারো কারো মতে বিশাল সৈকতে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার দলবদ্ধ দৌড় দেখে কোনো এক সময়ে এখানকার উচ্চপদস্থ কোনো সরকারি আধিকারিক মুগ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর চোখে দৃশ্যটা মন্দার ফুলের মতো লেগেছিল বলে তিনি নাকি এইরূপ নামকরণ করেছিলেন। প্রথমদিকে জায়গাটির নাম ছিল মন্দারবনি, পরবর্তীকালে মদার মণি আর বর্তমানে মন্দারমণি হয়েছে।  বছর কুড়ি আগে জায়গাটা পূর্ব মেদিনীপুরের এক অখ্যাত গ্রাম ছিল।  তার আপন রূপের কারণেই সে আজ সকলের মন জয় করে নিয়েছে।

সৈকত 

পরেরদিন কাক ভোরে উঠে বেলাভূমিতে গেলাম। আবছা আলোয় হাঁটতে থাকলাম। আলো-আধারিতে বিস্তীর্ণ বেলাভূমি, সারি সারি ঝাউ গাছ, সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউ, পশ্চিমপাড়ে সারিবদ্ধভাবে হোটেল, দিগন্তে জলরাশি ভেদ করে রক্তবর্ণের এক থালা ছোট থেকে বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে তার উজ্জ্বলতা বাড়তে লাগলো, চারপাশের লাল আভা আস্তে আস্তে সাদা হতে লাগল। একটার পর একটা ক্লান্তিহীন ঢেউ বালিয়াড়িতে আছড়ে পড়ছে, জলে পা ভিজিয়ে হেঁটে যাওয়া, এক মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভেসে যাওয়া। জলখাবার খেয়ে হোটেলের ঘরে একটু বিশ্রাম নিয়ে তোয়ালে কাঁধে সমুদ্র স্নানের উদ্দেশ্যে চললাম।

শরীরটাকে কিছুটা নিমজ্জিত করে বেশ কিছুক্ষন বসে থাকলাম, ক্ষনে ক্ষনে শীতল ঢেউ সমগ্র শরীরকে ভিজিয়ে যাচ্ছে, অনুভব করছি সমুদ্র স্নানের তৃপ্তি। ঢেউগুলো যেন বহুদূর থেকে উড়ে আসা একরাশ শিমুল তুলো, আমি যেন এক ধুনুরির ধনুক, সমানে বুনে চলেছি নকশিকাঁথার বালুচর। আমি আর নেই আমাতে, মিশে গেছি নীল সাগরের অতল জলে।  যতদূর চোখ যায় শুধু ঢেউ আর ঢেউ। ঢেউয়ের তালে তালে আমিও কখনও  এগিয়ে যাচ্ছে আবার কখনও  পিছিয়ে যাচ্ছি, এক মিনিটের জন্য এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছি না। নীল জলের গহন রহস্যে নিজেকে সমানে সামলে চলতে হচ্ছে। আমার মতো অনেকেই স্নান করছে।  লাফালাফি, ঝাপাঝাপি, বেলেল্লেপনা সবই চলছে, চলছে যুবক যুবতীদেরদের বাঁদরামীও। সমুদ্রের ফেনিল ঢেউয়ে মনে চলছে অনাবিল আনন্দের ঢেউ। বাচ্ছা বুড়ো সবার মুখেই সেই আনন্দের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে। দুটো পয়সার আশায় কয়েকজন আলোকচিত্রীও ছোটাছুটি করে এইসব দৃশ্যের ছবি তুলছে।

মোহনায় সূর্যাস্ত 


হোটেলে  দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে একটা অটো  ভাড়া নিয়ে চললাম মোহনা দেখতে।  মন্দারমণি থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে এই মোহনা অবস্থিত। বিচের শেষে জলধা খতি নদীর কূলে এখনকার মোহনা। মোহনার বালিয়াড়ি খুব নরম।  দীঘার মোহনার মতো এখানে কোনো মাছের আড়ৎ নেই, মাঝে মাঝে ছোট ছোট মাছ ভর্তি নৌকো এসে ভিড়ছে।  জেলেরা বাঁক কাঁধে সেই মাছ নিয়ে ছোটগাড়িতে তুলছে। শুনলাম এই মাছ চলে যাচ্ছে দীঘা মোহনার বাজারে।  মাছ আর মাঝিভাইদের আনাগোনায় জায়গাটা বেশ মনোরম লাগছিলো। এখানেই একটু অপেক্ষা করে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। পড়ন্ত বিকেলে আকাশকে চিরে সূৰ্য্যিমামা চারদিক লাল-কমলায় রাঙিয়ে আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। আজকের মতো তার কাজ শেষ। রাতটুকু চাঁদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে যেন তার এই গমন। এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত দৃশ্য বিস্ময়ে  বিমুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকলাম। গভীর আবেশে মন প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। জলধা খতি নদীর একপাশে মন্দারমণির মোহনা আর অপরপাড়ে তাজপুর। দূরে বঙ্গোপসাগর।

.রাতে খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। পরেরদিন সকালে আবার সৈকতের বুকে সূর্য্যোদয়  উপভোগ করলাম। শান্ত নির্জন সৈকতে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগলো। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বেশিক্ষন থাকা গেলো না ফেরার তারায়।  আজ আমাদের ফেরার পালা, দুপুরের খাবার খেয়ে একটা অটো  ধরে কাঁথি স্টেশানে চলে এলাম। এখান  থেকেই ট্রেন ধরে কলকাতার উদ্যেশ্যে রওয়ানা দিলাম।


নিরালা  পরিবেশে মন্দারমণি ঘোরা সত্যি মনোরম। দুটো দিন এই নিরিবিলি জায়গায় কাটাতে মন্দ লাগলো না। শান্ত, নির্জন সমুদ্রে মন পেল বিশ্রাম, প্রাণ পেল আরাম। যেন এক ক্যানভাসে আঁকা কোনো শিল্পীর তুলিতে উঠে আসা সব দৃশ্য। যা নির্ভেজাল ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা। দীঘার  ভিড় এড়িয়ে সমুদ্র ভ্রমণের অবশ্যই আদর্শ ঠিকানা এই শান্ত সৈকতটি। সমুদ্রের পেট চিরে সূর্য্যের উদয় হওয়া  আর পশ্চিমপাড়ে সূর্য্যের হারিয়ে যাওয়ার মনভোলানো দৃশ্য যা আমার কাছে সারাজীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। সমুদ্রকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার জন্য এখানকার নিরিবিলি পরিবেশে  দুটো দিন কাটাতে আপনারও বেশ ভালো লাগবে।



কিভাবে যাবেন :
কলকাতার ধর্মতলা থেকে দীঘাগামী বসে করে এসে চাউলখোলাতে নামুন। ওখান থেকে অটো করে অনায়াসে পৌঁছে যাবেন। অথবা হাওড়া থেকে দীঘার ট্রেন ধরে রামনগর বা কাঁথি স্টেশনে নামুন।  ওখান থেকে অটো ধরে মন্দারমণি চলে আসুন।

কোথায় থাকবেন :

অনেক হোটেল রয়েছে, তবে আগে থেকে বুক করে যাওয়া ভালো।

কোথায় কোথায় ঘুরবেন :

মন্দারমণি থেকে আপনি দীঘা, তাজপুর, শংকরপুর, দীঘার  মোহনা অটো ভাড়া করে দেখে আসতে  পারেন।


ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ১১-০১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Thursday, January 2, 2020

পৌষ মেলা>p

পৌষের আমন্ত্রণে গ্রামীণ মেলায় 




পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে 
আয় রে চলে, আয় আয় আয়। 


 শীত ঋতুর পৌষ মাসেই বাংলায় নবান্ন উৎসবের পরে আয়োজিত হয় বিভিন্ন উৎসব। পৌষের কুয়াশায়, শীত শীত হাওয়ায়, শীতল বাতাসে নেচে ওঠে ভ্রমণপিপাসু মানুষদের মন। শীতকাল আর মেলা যেন একে  ওপরের পরিপূরক।  এই সময় কলকাতা ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাঙালি মন এইসব মেলাগুলোকে উপেক্ষা করে ঘরে বসে থাকতে পারে না।  বছর দুয়েক আগে আমিও  পৌষের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারিনি। চলে গিয়েছিলাম এক গ্রামীণ মেলায়। ডাকছিল  পৌষ, ডাকছিল শান্তিনিকেতন, এ যেন মাটির টানেই চলে যাওয়া।


এককালে পশ্চিমবঙ্গের একটা ছোট্ট গ্রাম ছিল ভুবনডাঙ্গা। ১৮৬০ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ গ্রামটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল কিনে নিয়েছিলেন। অঞ্চলটির উন্নয়ন করেন। তৈরী করেন তাঁর সাধের প্রার্থনা ভবন।  পরবর্তীকালে ভুবনডাঙা হয়ে যায় শান্তিনিকেতন। মেলাকে কেন্দ্র করে কবিগুরুর  নানান স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে , জড়িয়ে রয়েছে নানান গল্পগাঁথা। 


১৮৪৩ সালের ২১শে ডিসেম্বর (৭ই পৌষ, ১২৫০) মহর্ষি কয়েকজন অনুগামীকে নিয়ে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছ থেকে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন।  ১২৯৮ সালের ৭ই পৌষ (২১শে ডিসেম্বর, ১৮৯১) শান্তিনিকেতনে তিনি একটা ব্রাহ্ম মন্দির স্থাপন করেন।  এই মন্দিরের উদ্বোধনের সময় তিনি মূল মন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকের মাঠে একটা ছোট্ট মেলায় আয়োজন করেন। সেই থেকেই শান্তিনিকেতনের জগৎ বিখ্যাত পৌষ মেলার শুরু। মহর্ষির প্রয়ানের পর রবীন্দ্রনাথই মেলার রূপকার হিসেবে দেখা দেন।  মেলার আয়তন বৃদ্ধি পাবার ফলে পরে মেলাটি পূর্বপল্লীর মাঠে আয়োজন করা হয়। মেলাটি চলে দিন তিনেক তবে ভাঙা মেলাটি চলে আরো বেশ কয়েকদিন। সমগ্র শহরটি জুড়েই বসে যায় পসরার হাট। খোয়াইয়ের পাড়ও হয়ে ওঠে জমজমাট। একতারার সুরে রবীন্দ্রনাথের শহর দুলতে থাকে। প্রতিবছর নিয়ম করে বিশ্বভারতী ৭ই পৌষ থেকে ৯ই পৌষ মেলাটির আয়োজন করে থাকে। মেলার সূচনা হয় বৈতালিক গান দিয়ে। গান গেয়ে গেয়ে আশ্রমিকরা ও অতিথিরা শালবীথি, আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি, ছাতিমতলা  পরিক্রমা করেন।উপাসনা, প্রয়াত আশ্রমিকদের স্মরণ থেকে খ্রিস্ট উৎসবের মাধ্যমে মূল পৌষ মেলাটির সমাপ্তি ঘটে।  এই মেলার বড় বিশেষত্ব হস্তশিল্প ও গ্রামীণ কৃষ্টির উপস্থিতি। বাঙালির অনুভূতির সঙ্গী যেমন রবীন্দ্রনাথ, তেমন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা বাঙালির মননের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। 




 বছর দুয়েক আগে কলকাতা থেকে রওনা দিলাম পৌষের আমন্ত্রণে বোলপুরে। পৌঁছে গেলাম ঘন্টা তিনেকের মধ্যে।  স্টেশনে নেমে দেখলাম লোকে লোকারণ্য।  সবাই একটা গাড়ির জন্য ছোটাছুটি করছে। কেউ কেউ কিছু না পেয়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর ভাগ্যক্রমে একটা সাইকেল রিক্সা পেয়ে গেলাম। আগে শুনেছিলাম স্টেশন থেকে মেলা প্রাঙ্গনের ভাড়া ৩০ টাকা, কিন্তু রিক্সাওয়ালা আমার কাছে ২০০ টাকা চাইলো।  অনেক দরাদরি করার পর ১৫০ টাকায়  সে রাজি হলো।  অল্প সময়ের মধ্যে মেলা প্রাঙ্গনে পৌঁছে গেলাম। 



 রিক্সা করে যেতে যেতে দেখছিলাম রাস্তার ধারে অনেক জায়গায় গ্রাম্য মহিলারা নানারকম পসরা সাজিয়ে বসে আছে।  মেলা প্রাঙ্গনে ঢুকে দেখলাম চারদিকে শুধু দোকান আর দোকান। বেশিরভাগই হস্তশিল্পের দোকান। প্রাঙ্গনটিতে নিরাপত্তার  বেশ আঁটোসাঁটো ব্যবস্থা রয়েছে।  সাদা পোশাকের মহিলা ও পুরুষ পুলিশ টহল দিচ্ছে।  ওয়াচ টাওয়ার ও সিসিটিভির মাধ্যমে অঞ্চলটির দেখভাল চলছে একটি কেন্দ্র থেকে। রয়েছে পুলিশের একটা সহাযতা কেন্দ্র। এছাড়া বিশ্বভারতীর বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষীও  পর্যটকদের সহাযতা করছে। রিক্সাওয়ালার মুখে শুনছিলাম আগে আতসবাজির প্রদর্শনী হতো, বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে তা বন্ধ রয়েছে।  দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাঙ্গনটিতে মাঝে মাঝে জল ছড়ানো ও ঝাড় দেওয়া হচ্ছে।  মেলার এক ধারে একটা বিশাল মঞ্চ রয়েছে, রয়েছে মঞ্চটির পিছনে বাউলের আখড়া।  মঞ্চটিতে সারাক্ষণই বাউল সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছে।  এই বাউল সংগীত মেলাটির অন্যতম আকর্ষণ। 




মেলাটিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের স্টল রয়েছে, রয়েছে শান্তিনিকেতন ব্যাগ, কাঠের তৈরী বিভিন্ন খেলনা, টেরাকোটার তৈরী ঘর সাজানোর জিনিস, পাটের তৈরী পুতুল ও জুতো, ডোকরার অলংকার, বাঁশি-ডুগডুগি-একতারা। এছাড়া বই, বস্ত্র ও চর্মজাত দ্রব্যের দোকানও  ঝলমল করছে। বাঁশির সুরে দোল দিচ্ছে পিঠে-পুলিও।  জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি বলে মনে হলো না। মেলার মধ্যে গ্রামীণ ও শহুরে জিনিসের সম্ভার সর্বত্রই বিরাজ করছে।  মেলার একপ্রান্তে বাচ্ছাদের খেলার জন্য দু-তিনটে জায়গা করা আছে, সেখানে টিকিটের বিনিময়ে বাচ্ছারা কিছুটা সময় অতিবাহিত করতে পারে। প্রাঙ্গণটির ঠিক মাঝখানে একটা জায়গা গোল করে ঘিরে রাখা আছে, জায়গাটি অপূর্ব ফুলে সজ্জিত  রয়েছে।  তবে ফুলগুলো সবই মেলার শোভাবর্ধনের জন্য, ক্রয় করা যাবে না। সবশেষে বলি মেলার মূল আকর্ষণ বাউল সংগীত হলেও খাবারের স্টলগুলো কম আকর্ষণের নয়।  আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবেই। বাচ্চা  থেকে বুড়ো সবাই বসে খাবার খেতে খেতে একটু বিশ্রাম করে নিচ্ছে।  গরম গরম জিলিপি, এগরোল, ঘুগনি, তেলেভাজা, বাদামভাজা, পাউরুটির কাটলেট, বিরিয়ানি কি নেই সেখানে। জিভে জল আনার পক্ষে যথেষ্ট।  আমিও লোভ সামলাতে পারলাম না, একটা এগ রোলের অর্ডার দিয়েই ফেললাম।  খেতে খেতে কিছুটা বিশ্রামও  হয়ে গেলো



কয়েকদিনের মেলা হলেও মেলাটিতে দেশীয়দের সাথে বহু বিদেশী পর্যটককেও ঘুরতে দেখছিলাম।  কেনাকাটা বা বিকিকিনি বেশ ভালোই চলছে। মেলাটি যেন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশ্রনে গড়ে উঠেছে। হস্তশিল্প ও গ্রামীণ শিল্পীদের সম্ভার বিক্রিকে বিশ্বভারতী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ত্ব দেয়। হাড় হিম করা কড়া ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে লালমাটির শাতিনিকেতন কয়েক হাজার মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা হয়ে উঠেছে বাংলার ঐতিহ্যের মিলনস্থল। 



বেড়েছে খরচ, বেড়েছে ব্যবস্থাপনার খরচও,  বিশৃঙ্খলা ও বিন্যাসের প্রতুলতা ছাড়িয়ে গেছে বোলপুর থেকে শান্তিনিকেতন হয়ে খোয়াই পর্যন্ত।  বেড়েছে হুল্লোড়ের ব্যাপ্তি, কমেছে ধর্মীয় পবিত্রতা ও শান্তশ্রী পরিবেশ। তবে টেরাকোটার কারুকাজ কেনা, বাউল গানের আসর, চেনা-অচেনা মানুষের মৈত্রী, কুয়াশাঘেরা বিষণ্ণতা আজও টিকে আছে। এ যেন গ্রামীণ কার্নিভ্যাল। বাঙালির সাধের পৌষমেলা আজ চিরাচরিত ঐতিহ্যকে  ছাপিয়ে যেন হয়ে উঠেছে কর্পোরেট। 



বর্তমানে পৌষ মেলার চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটেছে। মহর্ষির আদর্শ কিছুটা হলেও বিচ্যুত হয়েছে।  কয়েকদিন আগে একটা দৈনিক কাগজে পড়চ্ছিলাম এক প্রবীণ আশ্রমিক জানিয়েছিলেন "পৌষমেলা তার আদর্শ ও ঐতিহ্য থেকে সরে এসেছে। সেকালের পৌষমেলার সাথে আজকের মেলার অনেকটাই ফারাক ঘটে গেছে।" আমি আগে কখনো এখানকার মেলায় আসিনি, তাই এই সম্বন্ধে আমার কোনোরূপ ধারণা নেই। তবে মেলা প্রাঙ্গনে ও রাস্তায় বেশ কিছু বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখছিলাম।  যুগের পরিবর্তনের সাথে হয়তো গ্রামীণ চরিত্র হারিয়েছে।  মেলা প্রাঙ্গণেও বেশ কয়েকটি নামি-দামি সংস্থার স্টলও  রয়েছে। যাইহোক, জনপ্রিয় মেলাটি দেখতে সুদূর কলকাতা থেকে এসে বেশ আনন্দই উপভোগ করলাম। বাঙালির জীবনের সংস্কৃতির সাথে মেলাটি এখনো নিবিড়ভাবেই জড়িয়ে আছে বলে আমার মনে হলো। সন্ধ্যের ট্রেন ধরে আমায় ফিরে  সতে হবে বলে আর সময় নষ্ট করলাম না।  মেলা প্রাঙ্গন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। 

কিভাবে যাবেন :
হাওড়া থেকে গণদেবতা, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস, ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ও আরো অনেকগুলো ট্রেন রয়েছে যেগুলো সরাসরি বোলপুর যায়। শিয়ালদহ থেকেও মাতারা  এক্সপ্রেসও বোলপুর যায়।  তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টার মতো সময় লাগে। বোলপুর থেকে মেলাপ্রাঙ্গন মিনিট কুড়ি  সময় লাগে। 

কোথায় থাকবেন :
বোলপুরে ও শান্তিনিকেতনে প্রচুর বেসরকারি হোটেল রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন  দপ্তরের একটা সুন্দর অতিথি নিবাস রয়েছে।  মেলার সময় যেতে চাইলে অন্তত দু-তিন মাস আগে থেকে হোটেল বুক করতে হবে, নইলে জায়গা পাওয়া যাবে না।  





ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ০২-০১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।