Sunday, February 10, 2019

স্মরণে: মৃণাল সেন Mrinal Sen>

স্মরণে মৃণাল সেন

ত্রয়ী শব্দটা বাংলার সংস্কৃতি জগতে বার বার আলোচিত হয় । সাহিত্যের ত্রয়ী হলেন তিন বন্দ্যোপাধ্যায় - বিভূতিভূষণ, মানিক, তারাশঙ্কর। তেমনি নাট্য জগতে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, আর অজিতেশ বন্দ্যেপাধ্যায়। চলচ্চিত্র জগতের হলেন তিন দিকপাল পরিচালক সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেন। এই তিন জনের হাত ধরেই ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে বার বার উজ্জ্বল হয়েছে । বিশ্ব চলচ্চিত্রের আসরে বরাবরই তাঁদের গৌরবময় অবস্থান ছিল। তাঁরা মোটামুটি একই সময় চলচ্চিত্র শিল্পে পা রাখেন। তাঁরা আজ সবাই চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাঁদিয়ে চলে গেছেন । ৬ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৬ সালে ঋত্বিক ঘটক, ২৩শে এপ্রিল, ১৯৯২ সালে সত্যজিৎ রায় আর আজ অর্থাৎ ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৮ তে শেষ নক্ষত্রের পতন হলো। তিনি হলেন মৃণাল সেন । তাঁকে আর নীল আকাশের নীচে ধরে রাখা গেলো না । বছরের শেষে এসে মৃণাল সেনের মতো ব্যাক্তিত্বর চলে যাওয়া সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। শেষ হয়ে গেল বাংলা চলচ্চিত্রের একটি স্বর্ণযুগের।

যখন সারা দেশে স্বাধীনতার উত্তাল আন্দোলন চলছে, তখন অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর নামে এক ছোট শহরে মৃণাল সেন জন্মগ্রহণ করেন । সালটা ছিল ১৯২৩ এর ১৪ই মে। তাঁর পিতা উকিল হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য আদালতে যুদ্ধ চালাতেন। সেইসূত্রে ছোট্ট বয়স থেকেই মৃণাল সেন সুভাষচন্দ্র বসু, বিপিন পাল থেকে আরো কতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করতে দেখেছেন । তিনি তাঁর স্কুলের শিক্ষা ফরিদপুরে শেষ করে ,কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজে পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে পড়তে আসেন। মেসে থাকাকালীন তিনি পদার্থবিদ্যার সাথে কবিতা ও রাজনীতির চর্চ্চা শুরু করেন। আস্তে আস্তে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্কৃতি বিভাগের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন।

তিনি তাঁর পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে দু-চারটা টিউশনি, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা-লেখির মাধ্যমে সামান্য আয় করতে লাগলেন। ১৯৫০ সালে মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভের চাকরি নিয়ে কিছু দিনের জন্য কানপুরে চলে গেলেন। কিন্তু এই কাজে তাঁর মনের শান্তি আসলো না। তিনি চাকরি ছেড়ে আবার কলকাতায় ফিরে এলেন। বেকার অবস্থায় ঘোরা-ঘুরি করতে করতে একদিন এক চায়ের আড্ডায় চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্তের সাথে আলাপ হলো। তাঁর হাত ধরে তিনি চলচ্চিত্রের জগতে পা রাখলেন। চিত্রনাট্য লেখা, সহযোগী পরিচালনার কাজ করে নতুনভাবে জীবনটা চলে যাচ্ছিলো ও চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় হচ্ছিলো।

এইভাবে চলতে চলতে ১৯৫৫ সালে তিনি "রাত ভোর" নামে একটা ছবি তৈরী করে ফেললেন । কিন্তু ছবিটা সেভাবে দর্শকরা নিলো না । তিনি এই ছবিটা সম্বন্ধে পরবর্তীকালে বলেছিলেন " সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি, পৃথিবী কাঁপানো ছবি, আর আমার প্রথম ছবি আমাকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে"। তারপর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় "নীল আকাশের নিচে" তৈরী করলেন। এই ছবিটার থেকে তিনি আর্থিক দিক দিয়ে শক্ত জমিতে পা রাখতে পেরেছিলেন, কিছুটা পরিচিতিও আনতে পেরেছিলেন। তারপর "বাইশে শ্রাবন" তাঁকে কিছুটা আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৬৯ সালে তৈরী করেন "ভুবন সোম"। এই ভুবন সোম সিনেমাতেই অমিতাভ বচ্চন নেপথ্যে তাঁর জীবনের প্রথম কণ্ঠ দিয়েছিলেন।

তারপর থেকে মৃণাল সেন ইন্টারভিউ, ক্যালকাটা ৭১, পদাতিক, একদিন প্রতিদিন, মৃগয়া, খারিজ ইত্যাদি চলচ্চিত্র তৈরি করেন । এছাড়া তেলেগু ভাষায় " ওকা উড়ি কথা", ওড়িয়ায় "মাটির মনীষা", "জোড়া দিঘির চৌধুরী পরিবার" ও হিন্দিতেও কয়েকটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। তিনি মোট ২৭টা পূর্ণ দৈঘ্যের কাহিনিচিত্র, ১৬টি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ও ৪টি তথ্যচিত্র তৈরি করেন।

সিনেমায় তার অসামান্য অবদানের জন্য বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল -এ সিলভার পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭৫-এ কোরাস-এর জন্য আর ১৯৭৯ পরশুরামের জন্য। কার্লোভী ভ্যারি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল -এ স্পেশাল জুড়ি পুরস্কার পান ১৯৭৭ সালে ওকা উড়ি কথা ছবির জন্য। বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ ইন্টারফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পান ১৯৭৯- এ পরশুরাম আর ১৯৮১-তে অকালের সন্ধানের জন্য। ১৯৮১ সালেই তিনি অকালের সন্ধানের জন্য জুড়ি পুরস্কারও পান। কান ফিল্ম ফেস্টিভালে খারিজ সিনেমার জন্য ১৯৮৩ সালে জুরি পুরস্কার পান। ভেনিস ফিল্ম ওসিআইসি অ্যাওয়ার্ডস, অনারেবল মেনশন ১৯৮৯ সালে পায় তার একদিন অচনাক সিনেমাটি।

১৯৮১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রদান করে। ২০০৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার "দাদা সাহেব ফালকে " পান। ১৯৯৮ - ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্বারা নির্বাচিত সংসদের সাম্মানিক সদস্য পদ লাভ করেন। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাকে "অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ " সম্মানে ভূষিত করেন। ফরাসি সরকার তাদের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান "কমান্ডার অফ টি আর্টস এন্ড লেটার্স" এ তাকে ভূষিত করেন।

নিয়ম ভেঙে ছবি বানানোতেই মৃনাল সেন সবচেয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এভাবে চলচ্চিত্র বানাতে তিনি খুব আনন্দ পেতেন । বাংলা ছবির ধারাকে তিনি পাল্টে দিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের আধুনিক রূপরেখাও দিয়েছিলেন তিনি।

তারিখ : ১০-০২-২০১৯

ছবি : সংগৃহিত

লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া



➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


মহিষাদল ভ্রমণ Mohishadol >

 কালের সাক্ষী মহিষাদল রাজবাড়ী 


মুঘলদের বাংলা জয়ের পর থেকেই বাংলায় জমিদারি প্রথা শুরু হয়। জমিদারদের ব্যাক্তিত্বের ইতিহাস, প্রভাব ও নানারকম পৃষ্ঠপোষকতার গল্প ছড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামে গ্রামে। শুধু গ্রাম নয়, শহর কলকাতাতেও তাদের নানারকম কাহিনীর কথাও আমরা জানি। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় বেশ কয়েকটি রাজবাড়ীর হদিশ পাওয়া গেলেও বর্তমানে ঝাড়গ্রাম ও মহিষাদল রাজবাড়ী  দুটি জেলার মানুষের আবেগ বহন করে চলেছে৷ প্রায় চারশো বছরের পুরনো মহিষাদল রাজবাড়িটি এখনও অতীত যুগের ঐতিহ্য বহন করছে । 

মন চাইছিল আজ  ইতিহাসের খোঁজ পেতে। তাই পুরনো রাজবাড়ীর সন্ধানে আজকের গন্তব্য মহিষাদল রাজবাড়ী। কলকাতা থেকে ১২০ কিমি দূরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক মহকুমায় ৭০ একর জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল রাজবাড়ীটি। রাজা নেই। রাজত্বও নেই।  কিন্তু রয়ে গিয়েছে রাজাদের সেই ঐতিহ্য। মহিষাদল রাজবাড়ী সেই ঐতিয্যেরই প্রতীক। মহিষাদলের রাজাদের ও এই রাজবাড়ীর ইতিহাস বহু প্রাচীন। 


তাম্রলিপ্ত বন্দরটি যখন রমরমিয়ে চলছে,গেঁওখালী, মহিষাদল অঞ্চলগুলি তখনও সমুদ্রগর্ভে। মধ্যযুগ থেকেই এই জমিদারি প্রথমে রায়চৌধুরী পরিবার, দ্বিতীয় উপাধ্যায় পরিবারের হাত ঘুরে শেষে গর্গ পরিবারের হাতে আসে। ১৬৫৩ সাল যখন বাংলার মসনদে শাজাহানের পুএ সুলতান সুজা। তখন মহিষাদলে প্রথম রাজা হন কল্যাণ রায়চৌধুরী। রায়চৌধুরীরা জমিদারি বেশিদিন চালাতে পারেননি। তারা গেঁওখালির ধনী ব্যবসায়ী কনৌজের ব্রাহ্মণ জনার্দন উপাধ্যায়কে নীলামে জমিদারি বিক্রি করে দেন। ব্যবসায়ী জনার্দনের উত্তরসূরিরা এই বিশাল ভূখণ্ডের শাসক হয়ে রাজ্যপাট চালাতে থাকেন। জনার্দনের পুত্র দুর্যোধন, দুর্যোধনের পুত্র রামশরণ, রামশরণের পুত্র রাজারাম, রাজারামের পুত্র সুখলাল, সুখলালের পুত্র আনন্দলাল একে একে রাজত্ব চালান। আনন্দলালের কোনো পুত্র ছিল না তার একমাত্র কন্যার বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায়  আনন্দলালের মৃত্যুর পর তার ধর্মপ্রানা  স্ত্রী জানকীদেবী ১৭৭০ সালে রাজ সিংহাসনে বসেন। জানকীদেবী বেশ দক্ষতার সাথেই রাজ্যপাঠ চালিয়েছেন। জানকীদেবী তার মৃত্যুর আগেই তার একমাত্র কন্যা মন্থর গর্গের পুত্র অর্থাৎ জানকীদেবীর দৌহিত্র গুরুপ্রসাদ গর্গকে মহিষাদলের সমস্ত ভূসম্পত্তি, রাজপ্রাসাদ দান করে দেন। গুরুপ্রসাদ গর্গ সিংহাসনে বসেন।  সেই থেকে গর্গ পরিবারের জমিদারি  শুরু হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেরদিন পর্যন্ত এই গর্গের বংশধররাই এখানকার রাজ্যপাট চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে এই গর্গ পরিবারের হাতেই এখানকার জমিদার বাড়ি ও তদসংলগ্ল ভূখণ্ডটি রয়েছে।  


এই রাজ্ পরিবার ক্রমানুযায়ী তিনটি রাজবাড়ী নির্মাণ করেন। প্রথম রাজবাড়ীটি অবলুপ্ত, বর্তমানে দুটি রাজবাড়ী রয়েছে। দ্বিতীয় রাজবাড়ী রঙিবসান (সিংহদুয়ার ) রাজবাড়ী, যা নবাব আমলে অর্থাৎ ১৮৪০ সালে তৈরী হয়েছিল। তৃতীয় রাজবাড়ী তথা শেষ রাজবাড়ী (ফুলবাগ রাজবাড়ী) রঙ্গীনবসান রাজবাড়ীর তৈরীর প্রায় ৯৪ বছর পরে ১৯৩৪ সালে ইংরেজ আমলে রাজা সতী প্রসাদ গর্গ নিজস্ব পরিকল্পনায় তৈরী করেছিলেন। রঙ্গীনবসান রাজবাড়ীটি  বর্তমানে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। ফুলবাগ রাজবাড়ীটিতে রাজ পরিবারের লোকেরা দ্বিতীয় তলে এখনো বসবাস করে। প্রথমতলে একটা সুন্দর সংগ্রহশালা রয়েছে।  এছাড়া জলবাংলো (লালকুঠি ) নামে আর একটা বাড়ী আছে যেখানে রাজারা গ্রীস্মকালীন ছুটি কাটাতেন।

রঙ্গীনবসান রাজবাড়িটি সংরক্ষণের জন্য হেরিটেজ দপ্তর হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ।  জেলা শাসকের  দপ্তর থেকে ইতিমধ্যে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে এখানকার এক প্রবীণ বাসিন্দা জানালেন। তিনি আরো জানালেন যে রাজ্য সরকারের পি.ডব্লু ডি দপ্তর বেশ জোর কদমে সংস্কারের কাজ শুরু করেছে।  এই বাড়ীটি সংস্কারের বহুদিনের স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি আজ পূরণের পথে এগিয়ে চলেছে। 

এই রাজ্ পরিবার বহু জায়গায় দেব-দেবীর মন্দির, রথ নির্মাণ, পুস্করিণী-দীঘি-ইঁদারা খনন, এই  অঞ্চলে প্রথম দূর্গা পুজোর প্রচলন, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ গড়ে তোলা ইত্যাদি নানা রকম লোকহিতকর কাজ করেছিলেন। সেই সঙ্গে শরীর চর্চা, খেলাধুলা ,সুক্ষ সূচি-শিল্প , চিত্রকলা, উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে নানা বাদ্যযন্ত্রের মধ্য দিয়ে ললিতকলা-চারুকলার পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে রানী জানকী দেবী মহিষাদল রাজবাড়ির রথযাত্রার প্রচলন করেন।  দুই শতক পার করে আজও এখানকার এই রথের উত্‍সব, রথের মেলা এবং দুর্গাপুজোর আকর্ষণ অম্লান। মহিষাদলের রাজবাড়ির রথে কিন্তু শ্রীজগন্নাথদেব আরোহন করেন  না। আরোহন করেন মহিষাদল রাজবাড়ির কুলদেবতা মদনগোপাল জীঊ। পূর্বে ১৭ চূড়াবিশিষ্ট রথ টানা হতো, তবে বর্তমানে ১৩ চূড়াবিশিষ্ট রথ টানা হয়।  এই রথে ৩৪টি চাকা রয়েছে। রাজা সতীশ প্রসাদ গর্গের আমলে রথের সামনে দুটি ঘোড়া থাকতো। বর্তমানে মহিষাদল পঞ্চায়েত সমিতি পূর্বের সবরকম রীতিনীতি বজায় রেখে রথযাত্রা উৎসবটি  পরিচালনা করে।  মহিষাদল রাজবাড়ীর দূর্গাপুজো প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো পুজো। পুরোনো বনেদিয়ানা ও রীতিনীতি যতটা সম্ভব বজায় রেখে এখনো এই পুজো করা হয়। এলাকাবাসীদের কাছে রাজবাড়ীর পুজোর আকর্ষণ সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই একটা আলাদা মাত্রা পেয়ে আসছে । এখনো অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে এখানে স্থানীয়দের  ভীড় উপচে পরতে দেখা যায়।  


 ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে যে রাজবাড়ীর চলা শুরু হয়েছিল তাদের কিছু নিদর্শন এক সংগ্রহশালার মাধ্যমে তারা তুলে ধরেছেন।দশ টাকা টিকিটের বিনিময়ে শুধুমাত্র নীচের তলাতেই ঘোরাঘুরি করা যাবে।  কিন্তু সংগৃহিত দ্রব্যের ছবি তুলতে পারবেন না, সংগ্রহশালার সামনের বরান্দাটাতেই শুধু ছবি তোলা যায়, সংগৃহিত সামগ্রী রাখা ঘরগুলোর ছবি তুলতে দেয় না। দ্বিতীয় তলে ঢোকার  কোন সুযোগও মিলবে না। শুনলাম এই দ্বিতীয় তলে  রাজপরিবারের বংশধরের কোনো একজন বর্তমানে বাস করে,  এছাড়াও এই বংশের কেউ  আসলে এখানেই থাকে। সংগ্রহশালার  বিভিন্ন কক্ষে সংরক্ষিত সামগ্রীগুলো রাখা আছে।  খেলা কক্ষে একটা বিশাল বিলিয়ার্ড বোর্ড রয়েছে, অস্ত্র কক্ষে নানারকম অস্ত্রে ভর্তি আছে , সংগীত কক্ষে তানপুরা, তবলা, সেতার , হারমোনিয়াম আছে , পুস্তক কক্ষে বিভিন্ন পুস্তক ও কিছু চিঠি রাখা  আছে , বিশ্রাম কক্ষে একটা অতীব সুন্দর পালংক আছে, শিকার কক্ষে শকুন, হরিণ,  বাঘ প্রভৃতির  প্রমাণ মাপের  প্রতিমূর্তি করে সংরক্ষণ করা আছে।  এখানকার একজন কর্মচারী জানালো বাঘের চোখ দুটো  বাদে বাকি সব আসল। সংগ্রহশালাটি জমিদারদের আভিজাত্যের ধারক বাহক বলা যায়। এই রাজপরিবারের সংগীতের প্রতি খুবই অনুরাগ ছিল তা এদের সংগীত কক্ষে গেলে বোঝা যায়।  ভারতের বিখ্যাত সব উস্তাদরা এক সময় এখানে  সংগীত পরিবেশন করে গেছেন। লেখা-পড়া ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের আকর্ষণ যে কিছু কম ছিল না তা এদের সংগ্রহশালাটি দেখলে বোঝা যায়।  ছবি তুলতে দেয়  না বলে সংগৃহিত সামগ্রীর ছবি আপনাদের দেখাতে পারলাম না।  


  যখন একটা সিনেমা দেখতে গেলে আমাদের তিন চারশো টাকা ব্যয় করতে হয়,  তখন মাত্র ১০ টাকা বিনিময়ে  এরকম একটা সুন্দর সংগ্রহশালা দেখার সুযোগ পাওয়া সত্যি অকল্পনীয়। এছাড়াও এখানে  দু-তিন ঘন্টা সময় কাটানোর এক মনোরম জায়গা।  


কি ভাবে যাবেন :-


ধর্মতলা থেকে সরকারী-বেসরকারি বাসে করে নূরপুর লঞ্জঘাটে আসতে হবে।  বাসে ঘন্টা তিনেক সময় লাগবে। ওখান থেকে লঞ্চে  করে গেঁওখালী আসতে হবে। গেঁওখালী থেকে টোটো করে মহিষাদল রাজবাড়িতে পৌঁছনো যাবে।


তারিখ : ১০-০২-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী 

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Saturday, February 9, 2019

নেচার পার্ক ভ্রমণ Neture Park

পিকনিকের একান্ত ঠিকানা

ঘিঞ্জি শহর, যানজটের রাস্তা, আবর্জনায় মানুষের অবস্থা কাহিল, শ্বাস  বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা।  ছোট বড়  হোর্ডিংয়ের দৃশ্যদূষণ, রাস্তার ধারের গাছগুলিও বিজ্ঞাপনে ঢাকা পরে যাচ্ছে, রাস্তার ধারের তারের জটলায়ও ভয়াবহ দৃশ্যদূষণ।  শহরের দূষণ  বিপদের  সীমারেখা ক্রমেই অতিক্রম করে যাচ্ছে । দূষণ নিশ্বাস - প্রশ্বাসের  সাথে আমাদের ফুসফুসে গিয়ে বাসা বাঁধছে , রক্তে গিয়ে মিশছে। ধোয়ার চাদর আমাদের শহরটাকে ঢেকে দিচ্ছে,  আকাশ তার উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। যখন দূষণের ঠেলায়  শহরবাসীর নাভিশ্বাস ওঠার  অবস্থা।  যখন দূষণের ঠেলায়  শহরবাসীর নাভিশ্বাস ওঠার  অবস্থা। বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেওয়ার জায়গার বড়ই অভাব। তখন আপনি একদিন পরিবারকে নিয়ে বেশ কিছুটা সময় কাটানোর জন্য আসতেই পারেন কলকাতা শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই  সুবিশাল উদ্যানে।





আপনি কি জানেন কলকাতা  শহরের  মধ্যেই ব্রেসব্রিজ অঞ্চলে এমন একটা জায়গা রয়েছে যেখানে আপনি বিশুদ্ধ বাতাস নিতে পারবেন মন-প্রাণ খুলে । ব্রেসব্রিজ অঞ্চল একটা শিল্পাঞ্চল । এই অঞ্চল দিয়ে সব সময়ই ছোট বড় ট্রাক-ট্রেলার যাতায়াত করে থাকে। রাস্তার ধরে বড় বড় হরেকরকমের কারখানা আছে, এইসব  কারখানার সাথেই কিউ-১৬৭/১, সন্তোষপুর রোডে এই সুবিশাল উদ্যানটি অবস্থিত।  তারাতলা  মোড়  থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে, ব্রেসব্রিজ স্টেশন থেকে পায়ে পায়ে হেঁটেও আপনি পৌঁছে যেতে পারেন  এই উদ্যানে। ১০ই জুলাই, ২০০৫ সালে এই মনোরম উদ্দ্যানটির উদ্বোধন হয়। এইটা ঢোকার মুখে একটা বোর্ডে লেখা আছে উদ্বোধনের তারিখটা, কিন্তু এখনকার লোকেরা বলে এটা  ৯০ দশকে তৈরী হয়েছিল।


"Mudiely Fishermens' Co-operative Society Ltd."  নামে  এক সংস্থা উদ্দ্যানটির  দেখাশোনা করে । বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায়না ভিতরের এই সুবিশাল জায়গাটিকে। মাত্র ২৫/- টাকার বিনিময়ে একবার ভিতরে ঢুকলেই বুঝতে পারবেন  এর বিশালতা।

২৩ শে জানুয়ারী , ২০১৯ -এ এই উদ্যানে বনভোজন করতে এসে আমি অবাক  হয়ে গেছিলাম। ভিতরে ঢোকার পর দেখলাম বাঁদিকে একটা কার্যালয়  আছে। একটা সুন্দর রাস্তা সোজা ঢুকে গেছে, রাস্তাটির  শেষটা  দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার একদিকে সুন্দর ফুলের বাগান আর একদিকে বিশাল জায়গা নিয়ে ফুলকপি ও অন্যান্য সবজির  চাষ হচ্ছে। এই বাগানগুলো শেষ হওয়ার পর ডানদিকে বনভোজন করার জন্য বিশাল জায়গা রয়েছে। অনেকগুলো দল  বনভোজনে ব্যস্ত রয়েছে, একজনের মুখে শুনলাম  প্রায় ৫০ টা  দল একসাথে এখানে  বনভোজন করতে পারে । এই জায়গার বড় বড় গাছগুলিতে পিকনিক স্পটের নাম্বার লেখা আছে, আমাদের  স্পট নম্বর ছিল ১৯। রাস্তার ডানদিকে একটা সুন্দর নার্সারি রয়েছে, এই নার্সারি থেকে গাছ বিক্রি করা হচ্ছে । নার্সারির পাশ থেকেই কয়েকটা খাঁচা রয়েছে, খাঁচাগুলোর কয়েকটা ফাঁকা আর কয়েকটাতে   ময়ূরী, খরগোশ আর গিনিপিগ  রয়েছে । যাওয়ার আগে শুনেছিলাম এখানে একটা মৃগ উদ্যানও  আছে তাতে বেশ কিছু হরিণ আছে ।  যাওয়ার পর অনেক খোঁজা -খুঁজি করে একটাও হরিণ দেখতে পেলাম না । এখানকার কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম আগে হরিণ ছিল , তবে বর্তমানে কোনো হরিণ আর নেই। আরো জানতে পারলাম আগে প্রতি শীতে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসত , এখানকার সব জলাশয়গুলো ভর্তি থাকতো পাখিতে। রোজই  বহু আলোকচিত্রীরও  আনাগোনা ছিল সেই সময় । বর্তমানে পাখিরাও মুখ ফিরিয়ে  নিয়েছে, তারাও  আর এ পথ মারায় না । এখানে প্রায়ই বাংলা সিনেমার বা বাংলা সিরিয়ালের শুটিং হয় । 










আর একটু এগোতেই সামনে একটা খাবারের দোকান আছে । দোকানটির  বাঁদিকে বাচ্ছাদের খেলার একটা সুন্দর পার্ক করা রয়েছে। পার্কে বাচ্ছাদের খেলার নানারকম সরঞ্জাম আছে। পার্কের  পিছনে একটা বড়  শৌচালয় আছে। ডানদিকে  একটা সুন্দর ফোয়ারা আছে। ফোয়ারার পিছনে একটা বড় জলাশয় আছে যেখানে বোটিং করার সুব্যবস্থা রয়েছে। এখানে বেশ বড় মাপের তিন-চারটি জলাশয় আছে। প্রত্যেকটাতে পশ্চিমঙ্গ সরকারের মৎস্য দপ্তর  মাছ চাষ করে। বাচ্ছাদের পার্ক ছাড়াও পিকনিক স্পটগুলোতেও বেশ কয়েকটা দোলনা রয়েছে।



তারিখ : ২৬-০১-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী



যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 











নাটুকে রামনারায়ন Ramnarayan >


নাটুকে রামনারায়ন


তখন ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। কৌলিন্যপ্রথা ও বহুবিবাহ নিয়ে সমাজে  প্রবল আন্দোলন চলছিল, নানারকম কুসংস্কার সমাজকে আস্টেপিষ্ঠে  ধরেছে। সমাজের রন্ধে রন্ধে কৌলিণ্য প্রথার কুফল পড়ছিল। ঠিক সেই সময় "রংপুর বার্তাবহ" নামের একটা কাগজে "নাটক চাই" বলে একটা বিজ্ঞাপন বের হয়। বিজ্ঞাপনে নাটকের বিষয়বস্তু হতে হবে কৌলিন্যপ্রথার বিরুদ্ধে ও কি ভাষায় লেখা হতে হবে তা জানানো ছিল। এছাড়া সময়সীমা ছয় মাস ও পুরস্কারস্বরূপ লেখককে পঞ্চাশ টাকা দেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞাপনদাতা অধুনা বাংলাদেশের রংপুরের সম্ভ্রান্ত জমিদার কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী জানিয়েছিলেন।



সংস্কৃত কলেজের তরুণ অধ্যাপক রামনারায়ণ  তর্করত্নের নজরে বিজ্ঞাপনটি পড়ে। তিনি তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে একটি নাটক লিখে রংপুরের ঠিকানায় নিদির্ষ্ট সময়ের মধ্যে পাঠিয়ে দিলেন। নাটকটি পড়ে জমিদারবাবু মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে এই নাটকের জন্য তিনি রামনারায়াণকে একবার নয়, দু দুবার পুরস্কার দিলেন। একবার নাটক লেখার জন্য আর একবার নাটকটি বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার সময় । বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর সকলে মুগ্ধ হয়ে গেলো এবং তরুন রামনারায়ণের  নাম শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। লোকে ভালোবেসে তাঁকে "নাটুকে রামনারায়ণ" বলে ডাকতে লাগলেন । এই "কুলীন কুল সর্বস্ব" নাটকটিই কলকাতা তথা বাংলার প্রথম নাটক বলে পরিচিত। রামনারায়ণ তর্করত্ন নবজাগরণের লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এই নাটকটিই প্রথম বিধিবদ্ধ পূর্ণাঙ্গ নাটক হিসেবে রচিত হয়েছিল। 





১৮৫৪ সালে "কুলীন কুল সর্বস্ব" নাটকের পর থেকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪ টা নাটক তিনি রচনা করে গেছেন। যেমন কর্ম তেমন ফল (১২৭৯ বঙ্গাব্দে ), নব-নাটক (১৮৬৬ সালে), বেনি-সংহার (১৮৬৫ সালে ), রত্নাবলী (১৮৫৮ সালে), চক্ষুদান (১৮৬৯ সালে), উভয়সংকট (১৮৬৯ সালে), মালতি মাধব (১৮৬৭ সালে), রুক্মিণীহরণ (১৮৭১ সালে), কংসবধ (১৮৭৫ সালে), অভিজ্ঞান শকুন্তলম (১৮৬০ সালে ), ধর্মবিজয় (১৮৭৫ সালে) ইত্যাদি নাটক তাঁর হাতেই লেখা।



একবার ঠাকুর বাড়ির নাট্যপ্রিয় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও গুনেন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির দোতলায় একটা নাট্যশালা তৈরী করেন। স্টেজ বাধা হলো, পটুয়াদের দিয়ে দৃশ্যপট আঁকানো হলো, এবার একটা জবরদস্ত নাটক খোঁজার পালা। নাটকের খোঁজে তাঁরা রামননারায়ণের স্মরণাপন্ন হলেন। তাঁদের অনুরোধে "কুপ্রথা বিষয়ক নাটক" বলে একটা নাটক রামনারায়ণ লিখে দিলেন। নাটকটা তাঁদের খুব পছন্দ হলো কিন্তু নাটকের নামটা তাঁদের ভালো লাগলো না। তাঁদের অনুরোধে নামটা পরিবর্তন করে "নব-নাটক" রাখা হলো।

রামনারায়ণ একজন সংস্কৃত পন্ডিত হলেও তিনি সামাজিক সমস্যা  ও রসাত্মকবোধক নাটক লিখতে বেশি পছন্দ করতেন। তিনি নাটক ও তার অলংকরণে রসপুষ্ট ছিলেন।  তাঁর  নাটকগুলি ছিল সম্পূর্ণ বাস্তব ও স্বচ্ছন্দ ভাষায় লেখা।  তিনি সামাজিক সমস্যা নিয়ে নাটক, পৌরাণিক বিষয় নিয়ে নাটক ও প্রহসন প্রভৃতি লিখেছেন। লঘু কৌতুককে মাধ্যম হিসেবে তার ভাষায় ব্যবহার করতেন। ব্যক্তি বা সমাজজীবনের ছোটোখাট অসঙ্গতিগুলোকে সন্ধান করে তাতে ব্যঙ্গাত্বক রস কিংবা শ্লেষকে  যুক্ত করে  লিখতেন।


পুরোহিতের বা ব্রাহ্মণ এর মূর্খতা, ব্রাহ্মণ এর দারিদ্রতা, তাদের লোভ, ব্রাহ্মণ  পন্ডিতদের কৃত্রিম জীবনাচারণ, ঘটকদের শঠতা এইসব বিষয় তাঁর লেখা নাটকগুলিতে বার বার উঠে এসেছে। তার লেখা সব নাটকই সেই সময় জনপ্রিয় হয়েছিল, তবে হাস্যরসে ভরা প্রহসনগুলো তার শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বহন করে। মধুসূধনের আগে  যারা নাটক লিখেছিলেন তাদের মধ্যে রামনারায়ণই  সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।  

"কুলীন কুল সর্বস্ব" নাটকটিতে তিনি কৌলিন্য প্রথার দোষ ও তার অসঙ্গতি হাস্যরসাত্মক দৃশ্যের মাধ্যমে  দেখিয়েছিলেন। এক পিতার চার কন্যা ছিল। তাদের সবারই বয়স হওয়া সত্ত্বেও বিবাহ দিতে পারেনি  তাদের পিতা। অবশেষে তিনি একজন কুৎসিত দর্শন বৃদ্ধের সাথে কন্যাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হন।  নাটকটির এটাই মূল বিষয়। নাটকটি ছয় ভাগে বিভক্ত। প্রত্যেক ভাগই বিশেষ বিশেষ ব্যাঙ্গের  ভিতর দিয়ে সরস ও চিত্তাকর্ষক ছিল। নাটকটিতে তিনি কখনই গুরুগম্ভীর ভাষা ব্যবহার করেননি। সরস ও লঘু ভাষায়ই নাটকটিতে স্থান পেয়েছিল। নাটকটি তিনি কিছুটা গদ্য ও কিছুটা পদ্যের সাহায্যে লিখেছিলেন।  কুলীনের কুলই যে সর্বস্ব সেটাই তিনি নাটকটির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন।


"নব-নাটক" এই নাটকটিতে তিনি সেভাবে  হাস্যরস ব্যবহার করেননি। একটু তত্বকথার সাহায্যে তিনি সেই আমলের সামাজিক  জীবনের নানা রকম বাস্তব ছবিকে তুলে ধরেছিলেন। নাটকটিতে যেমন বহুবিবাহের কথা ছিল তেমনি ভাষা সমস্যার কথাও আলোচিত হয়েছিল।  "যেমন কর্ম তেমন ফল" এটা লিখেছিলেন  সম্পূর্ণ প্রহসন হিসেবে। স্বচ্ছ ও লঘু সংলাপের মাধ্যমে তিনি প্রহসনটি লিখেছেন। দুই অংকের এই প্রহসনটি তাহার দক্ষতার প্রমাণ রাখে। "চক্ষুদান" এটিও একটি ছোট্ট প্রহসন। তদকালীন লাম্পট্যদুষ্ট সমাজকে নিয়েই তিনি লিখেছিলেন। "উভয়সংকট" এটিও একটা ছোট্ট প্রহসন। সেই আমলের সম্পত্তি সমস্যাকে নিয়ে সরস ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে লেখা। "রুক্ষিণীহরণ" এই নাটকটি সম্পূর্ণ পৌরাণিক ঘটনাকে নিয়ে লিখেছিলেন। ঘটনাটি পৌরাণিক হলেও তার মধ্যে তিনি নতুন নতুন কিছু চরিত্রকে ঢুকিয়েছিলেন। রসিক রামনারায়ণের হাতে পড়ে এই পৌরাণিক চরিত্রগুলোও  লৌকিক বাস্তবতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।





এই "নাটুকে রামনারায়ণ" ছিলেন  বাংলার প্রথম মৌলিক নাট্যকার। বাংলা সাহিত্যে প্রথম বিধিবদ্ধ পূর্ণাঙ্গ নাটক রামনারায়ণ তর্করত্নই রচনা করেছিলেন। তিনি "হরিনাভি বঙ্গনাট্য সমাজ"- এর প্রতিষ্ঠাতা । এই "হরিনাভি বঙ্গ নাট্য  সমাজ" সংস্থাটি তিনি ১৮৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন।   দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার হরিনাভি গ্রামের এক পন্ডিত বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮২২ সালের ২৬শে ডিসেম্বর। তাঁর পিতা রামধন সেই সময়ের একজন নামকরা পন্ডিত ছিলেন,। তাঁর দাদা প্রাণকৃষ্ণ মহাশয় সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। গ্রামের চতুস্পাঠীতে বাল্যশিক্ষা লাভ করার পর রামনারায়ণ কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ১৮৪৩ সাল থেকে ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি মাত্র ২৭ বছর বয়সে সংস্কৃত কলেজেই অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।  ১৮৮২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর কলকাতা ছেড়ে নিজের গ্রামে গিয়ে নিজেই একটা চতুস্পাঠী খোলেন। এখানেই তিনি শিক্ষাদানের মাধ্যমে বাকি জীবনটা কাটান । ১৮৮৬ সালের ১৯ শে জানুয়ারি মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

পরবর্তীকালে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে নাটক সাহিত্যেও পরিবর্তন ঘটেছিল। রামনারায়ণ তর্করত্নর পর মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ দিকপাল লেখকদের রচনায় নাটকের বিভিন্নরূপ উঠে এসেছে। এঁনাদের রচনায় আমরা পৌরাণিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপেক্ষিতে রচিত বিভিন্ন নাটক পেয়েছি। 




তারিখ : ০৯-০২-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


মোনালিসা Monalisa>



মোনালিসা


মোনালিসা নাসরিন 


"মোনালিসা", এই নামটা বা শব্দটা শুনলেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা সেই পৃথিবী বিখ্যাত ছবিটার কথাই সবার আগে  মনে আসে, কিন্তু আমি সেই মোনালিসার কথা আপনাদের বলছি না। আজ আমি মোনালিসা নামে বাংলার এক অনামী তরুণীর জীবন সংগ্রামের মর্মস্পর্শী কথা জানাবো। যে সংগ্রামী জীবন কোনো ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসেনি, সম্পূর্ণ সত্য ও বাস্তব এক জীবন কথা। এই তরুণীকে আমি প্রথম দেখি "কলকাতা মিনি মেকার ফেয়ার" নামে এক বিজ্ঞান মেলায়। সেই মেলায় তরুণীটি  তাদের তৈরী বেশ কিছু সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম ও এল.ই.ডি আলো নিয়ে এসেছিলো। পরবর্তীকালে ব্যবসায়িক কারণে তার সাথে আরো কয়েকবার আমার দেখা হয়েছে। সেইসব সময় আলাপচারিতায় তার জীবন সংগ্রামের কথা আমি জেনেছিলাম।


মোনালিসা নাসরিন, মাত্র ২২ বছরের একজন গরিব সংখ্যালঘু পরিবারের মেয়ে। যার অদম্য ইচ্ছা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু গরিব পরিবারে সে জন্মেছে, তাই পদে পদে নানারকম বাঁধার সম্মুখীন তাকে হতে হয়েছে। সে সব বাঁধাকে অনায়াসে জয় করে পড়াশুনার সাথে সংসারের সব দায়িত্বও আজ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। যখন তার ১৮ বছর বয়স তখন পড়াশুনা ছাড়িয়ে দিয়ে বিবাহ দেওয়ার জন্য তার পরিবারের লোকেরা উঠে পড়ে লেগেছিলো। তার বাবা ব্যবসায়িক সূত্রে দিল্লিতে ছিলেন।মোনালিসার লেখা-পড়া সেখানেই শুরু হয় । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। বাবা মার সাথে মোনালিসাকেও সব ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসতে হয়। তার পরিবারও অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে  যায়। বহু কষ্ট করে সে তার স্কুলজীবন শেষ করে। সেই সময় থেকে পড়াশুনা করে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলাই তার জীবনের ব্রত হয়ে উঠেছিল।


মোনালিসা ও অধ্যাপক রাজীব গাঙ্গুলি 


তার ইলেক্ট্রনিকস নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খুব ইচ্ছে। কিন্তু পরিবারের সকলে তার এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তাদের মত, গরিব ঘরের মেয়ের উচ্চ শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই, একটা ভালো পাত্র দেখে তার বিয়ে দিয়ে দেওয়াই সব থেকে উচিত কাজ হবে। কিন্তু মোনালিসার অদম্য জেদের কাছে পরিবারের লোকেরা হার স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তাদের আর্থিক ক্ষমতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো সম্ভব হয় না। তারা মোনালিসাকে ২০১৪ সালে যোগমায়াদেবী কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়ার জন্য ভর্তি করে দেয়। কিন্তু রসায়নের রস মোনালিসার মন ভরাতে পারলো না। ইলেকট্রনিক্স নিয়ে পড়ার মনোগত ইচ্ছাকে সে কিছুতেই ভুলে রসায়নে মন দিতে পারছিলো না । এইভাবে একটা বছর  পার  হয়ে গেলো। মোনালিসা এই এক বছরের মধ্যে ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করে ফেলে । এই টাকা দিয়ে ২০১৫ সালে সে কলকাতার ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ম্যানেজমেন্টে  (UEM, Kolkata) ইলেকট্রনিক্স নিয়ে পড়ার জন্য ভর্তি হলো। তার দৃঢ় মনোবল, অদম্য সাহস ও সততার কাছে সব কিছু পিছু হটে যায়। ৪০ হাজার টাকা দিয়ে সে কলেজে ভর্তি হলেও পরবর্তী সেমিস্টারের টাকা কোথা থেকে আসবে সেই চিন্তা তাকে কুরে কুরে খেতে লাগলো। সে অত্যন্ত সাহসী ও মেধাবী ছাত্রী। সে তার ভালো রেজাল্টের সাহায্যে স্কলারশিপ পায়। সেই টাকায় সে তার পরবর্তী সেমিস্টারগুলো অনায়াসে পার করে দিয়ে  আজ চতুর্থ বর্ষে পৌঁছে গেছে।


মোনালিসার সাথে আমরা

সংখ্যালঘুদের জন্য সরকার যে স্কলারশিপ দেয়, মোনালিসা তার ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় প্রচুর হাঁটা-হাঁটি করে এই স্কলারশিপ আদায় করেছিল। শুধু তার নিজের জন্য নয়, পরবর্তীকালে তার নেতৃত্বে লড়াই করে এই ইউনিভার্সিটির প্রায় ২০০ জন মেধাবী সংখ্যালঘু ছাত্র - ছাত্রী আজ এই সুবিধা ভোগ করছে। তার এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তার ইউনিভার্সিটি তাকে ২০১৭ সালে বিশেষ উৎকর্ষ পুরস্কারে ভূষিত করে।


মোনালিসা ও ওর ইউনিভার্সিটির 
ডিন অধ্যাপক রাজীব গাঙ্গুলি  

এদিকে দিনকে দিন তার পরিবার অর্থনৈতিকভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। মোনালিসাকে তখন বাধ্য হয়েই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়। তার ইউনিভার্সিটির ডিন অধ্যাপক ডঃ রাজীব গাঙ্গুলী মহাশয় তার জীবন সংগ্রামের কথা জেনে ও তিন বছর ধরে তার যোগ্যতা ও ক্ষমতা চাক্ষুস করে তাকে নিয়ে "RMB Technology" নামে একটা ব্যবসা চালু করে। তারা সৌরবিদ্যুৎ ও LED-র নানারকম সরঞ্জাম তৈরী করতে আরম্ভ করে। গতবছরের  মেলায় মোনালিসা তাদের তৈরী দ্রব্য ও ব্যবসার উদ্দেশ্য আমায় বুঝিয়েছিল । সে বলেছিলো গ্রাম্য জীবনে ও সাধারণ জীবনে কম খরচে সৌরবিদ্যুৎকে পৌঁছে দেওয়াই তাদের ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য। ওই মেলায় তাদের তৈরী সোলার লণ্ঠন, সোলার সাহায্যে চলা যন্ত্রের মাধ্যমে আবর্জনাকে ধ্বংস করার যন্ত্র, মোবাইলের সাহায্যে ঘরের আলো -পাখা বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্যের চালু করা বা বন্ধ করার জন্য হার্ডওয়ারও তারা বাজারে এনেছে বলে জানিয়েছিল।



মোনালিসা তার শক্ত কাঁধে ব্যবসার বেশিরভাগ দায়িত্ব নিয়ে আজ প্রতিষ্ঠিত। পড়াশুনার সাথে ব্যবসা, আর ব্যবসার সাথে সংসারের অথনৈতিক দায়িত্বও সে আজ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আজ সে অনায়াসে পড়াশুনার সাথে ব্যবসা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাচ্ছে।



কারো অদম্য ইচ্ছা, ভবিষ্যতের লক্ষ্য যদি ঠিক থাকে, তাহলে অভাব-অনটন বা অন্য সব বাঁধাকে অবহেলার সাথেই পার করা যায়। নিজের স্বপ্নকে পূরণ করা যায়। মোনালিসা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।মোনালিসাকে আমার তরফ থেকে অসংখ্য ধ্যনবাদ জানাই। তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আমার তরফ থেকে অফুরন্ত আশীর্বাদ রইলো।

তারিখ : ০৯-০২-২০১৯
ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।