Thursday, March 7, 2019

কলকাতার বিনোদন পার্ক Kolkata Park

কলকাতার বিনোদন পার্ক 

কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী, পূর্বে ভারতের রাজধানী ছিল। তিনশো  বছরের ইতিহাসে  সমৃদ্ধ একটা শহর। এই শহরের  অলিতে গলিতে ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আমাদের এই শহর কারো কাছে  আনন্দনগরী বা  "সিটি অফ জয়"  আবার কারো কাছে আবর্জনায় ভরা এক নোংরা শহর।  এখানকার জনজীবন কখনোই স্তব্ধ থাকে না।  সারাবছরই মেলা, ধর্ণা, মিছিল-মিটিং চলতেই থাকে। হই-হট্টগোলের মাঝেও কিছুটা সময় একান্তে কাটানোর জন্য এখানে নিত্য-নতুন বিনোদন পার্ক গড়ে উঠছে। এইসব পার্কে গিয়ে আপনি আপনার পরিবারকে নিয়ে কিছুটা সময় আনন্দে  কাটাতে পারেন। আপনার ক্লান্ত শরীরটাকে কিছুটা মনোমুগ্ধকর পরিবেশে বসে , শীতল বাতাসে ক্লান্তিমুক্ত করতে পারেন। এখানে আজ আমি এরকম কিছু পার্কের কথা লিখব। যে পার্কগুলো শহরবাসীর কাছে এক একটা অমূল্য পাওনা। 

কলকাতা ময়দান 
ময়দান বা গড়ের মাঠ  কলকাতার কেন্দ্রস্থলে বিরাট জায়গা নিয়ে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠটা রয়েছে। এটাকে শহর কলকাতার ফুসফুস বলা হয়। পৃথিবীর কোনো শহরের কেন্দ্রস্থলে এরকম সবুজে ঢাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেখাযায় না।   পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭৭ সালে গোবিন্দপুরে ফোর্ট উইলিয়াম নির্মাণের পর তার আশ-পাশের সব জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে।  এই জঙ্গল কাটার ফলেই একটা বিস্তীর্ন খালি জায়গা বেরিয়ে আসে।   সেই খালি  জায়গাটিই কলকাতা ময়দান। ময়দানটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে রয়েছে। তৃনাচ্ছাদিত ময়দানে প্রচুর বড়  গাছ-গাছালি রয়েছে। এখানে গেলেই দেখা যায় বহু ছেলে  ফুটবল বা ক্রিকেট খেলছে। ময়দানটির উত্তরদিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের বাসস্থানটি অবস্থিত। এই বাসস্থানের পিছনদিকে পৃথিবীর বৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়াম "ইডেন গার্ডেন্স" রয়েছে। ময়দানে  অনেকগুলো ছোট বড় ক্রীড়া সংস্থার বাংলো রয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় ক্রীড়া সংস্থার  নিজস্ব গ্যালারি দিয়ে ঘেরা মাঠও তাদের বাংলোর সাথে রয়েছে । প্রতিদিন সকালে প্রচুর বয়স্ক লোকেরা এখানে প্রাতঃভ্রমণ করে। 

ঠিকানা :
জওহরলাল নেহেরু রোড 
কলকাতা 


মোহরকুঞ্জ
২০০৫ সালে কলকাতা পৌর সংস্থা এই উদ্দ্যানটি তৈরী করে।  উদ্দ্যানটি রবীন্দ্র সদনের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত।  পূর্বে এই উদ্দ্যানটির নাম ছিল "সিটিজেন পার্ক"। প্রথিতযশা  শিল্পী শ্ৰীমতী  কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর  ২০০৭ সালে পার্কটি তাঁর নামে উৎসর্গিত করা হয়।  তাঁর আসল নাম ছিল "অনিমা" আর  ডাক নামছিল "মোহর"। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ও শিক্ষিকা।  ১৯৩৫ সালে  রবীন্দ্রনাথ তাঁর "অনিমা" নামটি পরিবর্তন করে "কণিকা" নাম রাখেন।  এই পার্কটি তৈরী করতে ৬৪ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। পার্কটি নানারকম ফুলে সজ্জিত। বিভিন্ন জায়গায় বসার জন্য ব্যবস্থা আছে।  এছাড়া একটা মুক্ত মঞ্চ আছে। এই মুক্ত মঞ্চে সারা বছর নানারকম  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। পার্কটি সকাল ৫টা থেকে ৯টা আর দুপুর ৩টা থেকে রাত্রি ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। পার্কটিতে ঢোকার জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য লাগে না।   

ঠিকানা :
ক্যাথিড্রাল রোড , রেস কোর্স 
কলকাতা - ৭০০ ০২২

নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বর 
এই চত্বরটি মোহরকুঞ্জের ঠিক সামনে অবস্থিত। এই স্থানটিকে বা অঞ্চলটিকে  কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক পীঠস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। অঞ্চলটির মধ্যে ভারতবর্ষের প্রধান চারটি   সাংস্কৃতিক কেন্দ্র  রয়েছে। একদিকে রবীন্দ্র সদন, আর এক দিকে নন্দন নামে  চলচ্চিত্রের দুটি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। এছাড়া শিশির মঞ্চ বলে একটা নাটকের প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। শিশির মঞ্চের ঠিক সামনে দুটি তলা নিয়ে  দুটি আর্ট এক্সজিবিশনের হলও  রয়েছে। চত্বরটির পিছনদিকে একাডেমি অফ ফাইন আর্টস নাম একটা গ্যালারি ও সাথে একটা নাটকের মঞ্চও রয়েছে। এইসব মঞ্চ ও গ্যালারিগুলোতে প্রতিদিন নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এছাড়া বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গায প্রচুর বড় বড় গাছের সমারোহ আছে।  এরকম গাছের ফাঁকে আর একটা মুক্ত মঞ্চও রয়েছে।এখানে গেলে দেখা যায় গাছের তলায় বসে বাচ্চা-বড় সবাই আড্ডায় ব্যস্ত আছে। এই আড্ডাস্থলটি যুবক-যুবতীদের প্রাণের জায়গা।


ঠিকানা :  
১/১ এ জে সি বসে রোড 
কলকাতা - ৭০০ ০২০


মনোহর দাস   তরাগ 
বনবীথিই হল পূর্বতন মনোহর দাস তরাগ। এটি  কলকাতা ময়দানের দক্ষিণদিকে অবস্থিত। এটা একটি বহু পুরোনো জলাশয়। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই জলাশয়টিকে নতুনভাবে সংস্কার, সংরক্ষণ ও সৌন্দযায়ন করা হয়েছে। জলাশয়টির চারপাশে বাঁধানো বেশ সুন্দর  রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। জলাশয়টির চারদিকের পাড়গুলোকেও সুন্দর করে বাঁধানো হয়েছে। লোহার ফেন্সিং দিয়ে জলাশয়টিকে ঘেরা হয়েছে। আলোক সজ্জার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এখানে প্রবেশ করার জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য লাগে না। 

ঠিকানা :
জওহরলাল রোড 
কলকাতা 



আলিপুর চিড়িয়াখানা  
ভারতের   মোটামুটি  বড়   বড়  শহরেই   একটা   করে চিড়িয়াখানা  বা   পশুশালা   রয়েছে।  তাদের   মধ্যে   কলকাতার     চিড়িয়াখানা সবচেয়ে  প্রাচীন  ও  অন্যতম। এই   পশুশালাটি  কলকাতার দ্রষ্টব্য স্থানগুলির   মধ্যে   সবচেয়ে জনপ্রিয়  স্থান।  চিড়িয়াখানাটি  ১৮৭০ সালে  তৈরী করা  হয়। ১৮৭৬ সালের  ১লা  জানুয়ারি   প্রিন্স  অফ  ওয়েলস    সপ্তম  এডওয়ার্ড  এই   চিড়িযাখাটির  উদ্বোধন করেন।  এখানে  নানান    প্রজাতির  জীবজন্তু   রয়েছে। বেশ  কিছু   বিরল প্রজাতির পাখিও আছে। "সাদা বাঘ" এখানকার  সবচেয়ে  আকর্ষণীয়।  শীতের  সময়  পশুপ্রেমী  বা উৎসবপ্রেমী বাঙালি  চিড়িয়াখানাতে ভিড় করবেই।   আজকের  এনিম্যাল  প্ল্যানেট  বা    জিওগ্রাফি  চ্যানেলের  যুগেও   কলকাতার  চিড়িয়াখানায় জীবন্ত জন্তু  দেখার  অভিজ্ঞতা  শিশু  -কিশোর - বৃদ্ধ  কেউ  হাতছাড়া  করতে  চায়    না।  প্রতি  বৃহস্পতিবার   পশুশালাটি  পূর্ণদিবস  বন্ধ  থাকে।  সকাল  ৯টা  থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি  খোলা থাকে। প্রবেশ  মূল্য লাগে ৫ বছরের উর্ধে ২৫ টাকা আর   ৫ বছরের নিম্নে  ১০ টাকা।   

ঠিকানা :
২ আলিপুর রোড 
কলকাতা ৭০০ ০২৭

মিলেনিয়াম পার্ক 
গত  শতাব্দীর শেষ সময়  এই পার্কটি  গঙ্গার পূর্ব তীরে তৈরী করা হয়।  খ্রিষ্ট  বছর গণনার হিসেবে 
দ্বিতীয়   সহশ্রাব্দকে  স্মরণীয় করে রাখার জন্যই  পশ্চিমবঙ্গ সরকার  পার্কটি তৈরী করে। ১৯৯৯ সলের  ২৬শে   ডিসেম্বর    সরকারিভাবে  পার্কটির উদ্বোধন করা  হয়।পার্কটির  মূল   প্রবেশ দ্বারটি   নির্মাণ  করে  দিয়েছে   টাটা   গোষ্ঠী।   মিলেনিয়াম পার্কের  তোরণটিকে  তাই   অনেকে    টাটা  গেটও  বলে    থাকে।   এখানে  মজাদার  কিছু    রাইড বাচ্ছাদের জন্য রয়েছে।  ছুটির  দিনে  অসংখ্য  শিশু  তাদের  অভিভাবকদের সাথে  মজা  নিতে এখানে আসে। পার্কটি  সকাল  এগারোটা  থেকে  রাত  আটটা  পর্যন্ত খোলা  থাকে।  এই  পার্ক থেকে গোধূলি বেলায় গঙ্গার বুকে সূর্যাস্ত দেখা একটা স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরী করে দেয়।  

ঠিকানা :
১২ স্ট্র্যান্ড রোড 
বাবদীবাগ , কলকাতা ৭০০ ০০১  

রবীন্দ্র সরোবর 
এটি  দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত একটি কৃত্রিম জলাশয়। ১৯২০ সালে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট
দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলের ১৯২ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে।  তখন এই জায়গাটা বেশ ঘন জঙ্গলে  ঢাকা  ছিল।   অঞ্চলটিকে  বসবাসযোগ্য করে তোলাই  তাদের উদ্দেশ্য ছিল। ঠিক এই সময়েই তারা এখানে একটা বৃহৎ হ্রদ খনন করেন। যা তখন ঢাকুরিয়া লেক বলে পরিচিত ছিল।১৯৫৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নামে এই হৃদটিকে নামাঙ্কিত করা হয়। হ্রদটিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে এখানে গড়ে উঠেছে শিশু উদ্দ্যান, খেলার মাঠ, বাগান। ২০০৩ সালে জাতীয় হ্রদ সংরক্ষণ প্রকল্পে এই হ্রদটি সংযুক্ত হয়।  হ্রদটির আয়তন ৭৩ একর আর বাকি অংশে প্রচুর গাছ-গাছালি রয়েছে। শীতকালে এই হ্রদে প্রচুর পরিযায়ী পাখীকে এখানে আসতে দেখা যায়। হ্রদটির উত্তর দিকে ১৯৫০ সালে ২৬০০০ আসন বিশিষ্ট একটা ফুটবল স্টেডিয়াম গড়ে তোলা হয়েছিল। এখানে রবীন্দ্রনাথের একটা পূর্ণবয়ব ভাস্কর্য রয়েছে। হ্রদটির দক্ষিণদিকে একটা জাপানি বৌদ্ধ  মন্দির আছে। হৃদটিতে বেশ কয়েকটি রোয়িং ও সুইমিং ক্লাব রয়েছে। হৃদটিতে একটা ঝুলন্ত সেতু ও একটা মসজিদও  রয়েছে। এখানেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের নামে নামাঙ্কিত একটা মুক্তমঞ্চ আছে। এই পার্কে ঢোকার জন্য কোনো প্রবেশ মূল্যের দরকার হয় না। পার্কটি ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে।     


ঠিকানা :
সাউদার্ন এভিনিউ 
কলকাতা - ৭০০ ০২৯

সুভাষ  সরোবর 
কলকাতার বুকে দক্ষিণের রবীন্দ্র সরোবর আর পূর্বের সুভাষ সরোবর যেন কলকাতার দুই হৃৎপিণ্ড। এই সরোবর দুটি শহরের কোলাহলের মধ্যে থেকেও স্নিগ্ধ বাতাস নেওয়ার আদর্শ জায়গা। সুভাষ সরোবরে আসলেই দেখা যায় প্রচুর গাছ-গাছালিতে ভরপুর। শোনা যায় পাখিদের কলতান। এ যেন হারিয়ে যাওয়ার এক ঠিকানা। এই সরোবরটি  সল্টলেকে স্টেডিয়ামের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত। 

ঠিকানা :
সুভাষ সরোবর পার্ক ,
ফুলবাগান, বেলেঘাটা 
কলকাতা - ৭০০ ০১০

প্রকৃতি তীর্থ 
এই  পার্কটি  কলকাতার  নিউটাউন   শহরে  অবস্থিত   ৪৮০ একর  জায়গা  নিয়ে  তৈরী  পার্কটি  ভারতের   বৃহত্তম পার্ক। এছাড়াও  ১০৮  একর   জায়গা  নিয়ে  একটা   দ্বীপ  রয়েছে। পার্কটি   তিনটি   অংশে  বিভক্ত। এই  থিম    উদ্যানে   দুটো  জলাশয় ও তিরিশটি  বিনোদনমূলক   জায়গা  আছে।  ২০১২ সালের    ২৯ শে   ডিসেম্বর  পার্কটির    উদ্বোধন  করা    হয়।  পার্কটিতে   বিভিন্ন  রকমের  গাছ রয়েছে।  পার্কটি  কলকাতা আন্তর্জাতিক  বিমানবন্দর  থেকে  মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে  অবস্থিত।   পার্কটি    পরিচালনা   করে  পশ্চিমবঙ্গ    হাউসিং ইনফ্রাস্টাকচার   ডেভেলপমেন্ট    কর্পোরেশন   (হিটকো) ।  দেশ  বিদেশের  পর্যটকদের  কাছে  গ্রাম  বাংলার  রূপ তুলে ধরার     উদ্দ্যেশ্য নিয়েই এই  পার্কটি  তৈরী  করা  হয়েছিল ।  এখানে  নানারকম  বাগান, মাস্ক গার্ডেন, রেস্তোরা, কটেজ , ট্রয় ট্রেন, ব্লাটারফ্লাই গার্ডেন আছে।   এখানেই   তৈরী   করা  হয়েছে    "সাত আশ্চর্য"।  এই  সাত  আশ্চর্য  হলো  পৃথিবীর   বিখ্যাত  সাতটি  ঐতিহাসিক  সৌধকে  বেছে   তাদের   প্রতিরূপ  দেওয়া  হয়েছে।   বিশাল  দীঘি,  সবুজে   মোরা এই  পার্কে  বুকভরে  স্নিগ্ধ   বাতাস নেওয়ার জন্য এখানে  আসতেই  পারেন  আপনারা। এই  পার্কটি  প্রতি সোমবার পূর্ণ  দিবস বন্ধ থাকে।  গ্রীষ্মকালে মঙ্গলবার থেকে শনিবার দুপুর ২.৩০ মিনিট থেকে রাত  ৮.৩০ আর রবিবার ও ছুটির দিন দুপুর ১২টা  থেকে  রাত্রি  ৯.৩০ পর্যন্ত খোলা  থাকে। শীতকালে  মঙ্গলবার থেকে শনিবার দুপুর ১২টা  থেকে রাত  ৮.৩০  পর্যন্ত  এবং  রবিবার  ও  ছুটির  দিনে  সকাল  ১১ টা  থেকে  রাত  ৭.৩০ পর্যন্ত  খোলা  থাকে। পার্কটিতে ঢুকতে গেলে ৩০ টাকা  প্রবেশ মূল্য দিয়ে ঢুকতে হবে।  

ঠিকানা :
মেজর আর্টেরিয়াল রোড (সাউথ-ওয়েস্ট)
অ্যাকশন এরিয়া ২, নিউটউন 
কলকাতা - ৭০০ ১৫৬

নিক্কো পার্ক 
এই পার্কটি ১৯৯১ সালে কলকাতার মানচিত্রে জুড়ে গেছে। কলকাতার এক শিল্পসংস্থা এটি তৈরী করে।এটা এক অন্যতম জনপ্রিয় ও বৃহত্তম  চিত্তবিনোদনের উদ্যান।  প্রায় ৪০ একর জায়গা নিয়ে পার্কটি তৈরী হয়েছে। এটাকে কলকাতার  ডিজনিল্যান্ডও  বলা হয়। যে কোনো বয়সের মানুষ এখানে  আসতে পারেন। এখানকার রাইডগুলি বেশ রোমাঞ্চকর। বাইরের খাওয়া নিয়ে এখানে ঢুকতে দেওয়া হয়  না,  তবে ভেতরে সবরকম স্বাদের খাবারের  স্টল আছে।  এই  পার্কটি প্রতিদিন খোলা থাকে।  গ্রীষ্মকালে সকাল ১১টা  থেকে রাত  ৯টা  আর শীতকালে সকাল ১১টা  থেকে রাত  ৮টা  পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশ মূল্য ১৫০ টাকা।  এছাড়া ভিতরের  বিভিন্ন পার্কে বিভিন্ন মূল্যের প্যাকেজ রয়েছে।  

ঠিকানা :
সল্টলেকে বাইপাস ঝিলমিল 
সেক্টর - ২, বিধাননগর 
কলকাতা - ৭০০ ১০৬

নলবন বোটিং কমপ্লেক্স 
যারা কোলাহল মুক্ত নির্জন জায়গা ভালোবাসেন তাদের জন্য এই জায়গাটি খুবই মনোরম লাগবে। এখানকার আকর্ষণের মধ্যে সম্পূর্ণ পায়ে চালানো হালকা ধরণের বোট ও শিকারা  উল্লেখযোগ্য।  

ঠিকানা :
এইচ এম ব্লক, নলবন ভেরি 
বিধাননগর , কলকাতা - ৭০০ ১০৬

স্বভূমি  
এটা একটা ঐতিহ্যপূর্ণ উদ্যান। এখানে এখনো ভারতীয় চারুকলাকে ধরে রেখেছে।  সল্টলেক স্টেডিয়ামের ঠিক উল্টোদিকে সুভাষ সরোবর তার কাছেই এই উদ্যানটির অবস্থান। এখানে কারুশিল্প গ্রাম, শহর অঞ্চল, খাদ্য উদ্যান ও মীনা বাজার আছে। এখানে পশ্চিমবঙ্গের সব ঐতিহ্যসম্পন্ন সম্ভারের স্টল আছে।  

ঠিকানা :
৮৯সি মৌলানা আবুল কালাম সরণি 
কাঁকুড়গাছি, কলকাতা - ৭০০০৫৪


সায়েন্স সিটি 
এটি একটি বিজ্ঞান সংগ্রহশালা ও বিজ্ঞানকেন্দ্রিক বিনোদন উদ্যান।  এই জায়গাটি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে খুবই শিক্ষণীয় জায়গা। সব বয়সের মানুষের কাছেই এখানে অনেক কিছুই শিক্ষণীয় আছে। এমন শিক্ষণীয় ও বিনোদনের উপযুক্ত স্থান ভারতে  খুবই  কম আছে। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের ধারে অবস্থিত এই  বিজ্ঞান কেন্দ্রটি শিক্ষার সাথে বাড়ানোরও  উপযুক্ত একটা জায়গা।  এটির মধ্যে একটি রোপওয়ে, ছোট বড় দুটি  অডিটোরিয়াম ও ৮টি সেমিনার হল আছে। এখানে  স্পেস এক্সিবিউশন, ডায়নামোশেন, আর্থ এক্সপ্লোরেশন, মেরিটাইম সেন্টার ও সায়েন্স পার্ক রয়েছে। এসবের প্রতিটি বিভাগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞান চিত্র প্রদর্শনী, থ্রিডি প্রদর্শনী ও চলচ্চিত্র অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।  সায়েন্স সিটি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে প্রবেশ করতে গেলে ৪০ টাকা প্রবেশ মূল্য দিয়ে ঢুকতে হবে। এছাড়া অভন্তরীন আকর্ষণগুলোর জন্য  আলাদা আলাদা প্রবেশ মূল্য লাগে।  

ঠিকানা :
জে বি এস হালডেনে এভিনিউ 
ইস্ট তপসিয়া,  কলকাতা - ৭০০ ০৪৬

মুদিয়ালী নেচার পার্ক 
এই পার্কটি তারাতলা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ও ব্রেসব্রিজ স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটেও যাওয়া যাওয়া যায়। ২০০৫ সালের ১০ই জুলাই পার্কটির উদ্বোধন করা হয়। বিশাল জায়গা নিয়ে পার্কটি তৈরী করা হয়েছে।পার্কটিতে বেশ কয়েকটা  বড় বড়  জলাশয় আছে।  নানারকম ফুল ও  বড় বড় গাছে পার্কটি একদম ভরপুর। " মুদিয়ালী ফিশারমেন্স কো -অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড" নামে এক সংস্থা বর্তমানে  উদ্দ্যানটির  দেখাশোনা করে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায়না ভিতরের এই সুবিশাল জায়গাটিকে। মাত্র ২৫/- টাকার বিনিময়ে একবার ভিতরে ঢুকলেই বুঝতে পারবেন  এর বিশালতাটি। 

ঠিকানা :
তারাতলা রোড 
পাহাড়পুর, গার্ডেনরিচ 
 কলকাতা - ৭০০ ০৮৮

হিমেল হাওয়ার পরশ গায়ে লাগলেই বোঝা যায়, শহরে শীত চলে এল। আর শহরে শীতের আগমন মানেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবীদের একটু  নিয়ে ঘুড়ে বেড়ানো। ঘুড়ে বেড়ানোর কথা মনে আসলেই শহরবাসী উপরিল্লিখিত বিনোদন পার্কগুলিতে ঘুড়তে চলে   আসে।  




তারিখ : ০৭-০৩-২০১৯
 লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Wednesday, March 6, 2019

আলোকচিত্র (1) (Photo)



ছবির স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী


তৃষ্ণার্থ 
বাচ্ছাদের খেলা 
সমুদ্রের বুকে সূর্যোদয় 

Sunday, March 3, 2019

সংস্কৃতির সূতিকাগার Coffee House >

সাংস্কৃতির  সূতিকাগার 



দোতলার নিওসাইন বোর্ড 

"গল্প হচ্ছে মনের ম্যাসাজ, চিত্তের দলাই  মালাই, পড়লে মেজাজ চাঙ্গা হয়" 

উপরিউক্ত কথাগুলো বিখ্যাত  বাঙালি লেখক  রাজশেখর বসু তাঁর  একটা লেখায় বলেছিলেন। গল্প সম্পর্কে লেখক তাঁর মনের অভিব্যক্তি এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন। যদিও তিনি গল্পের বই পড়া সম্বন্ধেই এই উক্তিটি করেছিলেন, কিন্তু গল্প করার ক্ষেত্রেও উক্তিটি সমানভাবেই প্রযোজ্য বলেই  আমার মনে হয়।  সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একটু গল্প করলে বা একটু আড্ডা মারলে  ক্লান্ত মনের অবসন্নতা কিছুটা হলেও শিথিল হয়, মনটাও একটু ফুরফুরে হয়ে ওঠে।  আনন্দে আত্মহারা কিংবা  কষ্টে যখন কাতর হয়ে ওঠে মন, তখন মনও চায় বন্ধুদের সাথে মনের অভিব্যাক্তিটাকে একটু ভাগ করে নিতে। আড্ডাটা বাঙালি মননের অনিবার্য চাহিদা বা তৃষ্ণা। বাঙালি জীবনে আড্ডা মানে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা বা  সমালোচনার ঝড় বওয়া। মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে হোক বা জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে হোক আড্ডার ভূমিকা বর্ণনাতীত। সেই প্রাচীনকাল থেকেই  আড্ডাপ্রিয় বাঙালির জীবনে আড্ডা একটা বিশাল ভূমিকা গ্রহণ করে আসছে।  
ঢোকার মুখের বোর্ড 

এই আড্ডার সাথে যদি একটু চা-কফি বা মুড়ি-তেলেভাজার ব্যবস্থা থাকে তবে তো আড্ডাটা সর্বতোভাবে জমে উঠবেই। আজ আমি ও আমার এক বন্ধু শ্যামল তেমনি এক আড্ডারস্থলে গিয়েছিলাম কিছুটা সময় ব্যয় করার জন্য। যে আড্ডার জায়গা কত লেখকের বা কত কবির মনে কত বিচিত্র সব লেখার জন্ম দিয়েছে। আমি প্রায়দিনই কাজের জন্য শিয়ালদহ অঞ্চলে যাই। গত ২০ তারিখে আমার বন্ধু শ্যামল বই কিনতে কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়ায় এসেছিল। আমায় ফোন করে কফি হাউসে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। কলেজ স্ট্রিটের প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকের গলিতেই বাঙালির প্রিয় কফি হাউসটি অবস্থিত। যার পোশাকি নাম "ইন্ডিয়ান কফি হাউস"। এখন অবশ্য অনেকে এটাকে মান্না দের কফি হাউসেও বলে থাকে। 
সিঁড়ির গাত্রে পোড়ামাটির টাইলস 


আমাদের শহরে বেশ কয়েকটি কফি হাউস আছে। কলকাতার সেন্ট্রাল এভিনিউতে, কলেজ স্ট্রিটে, যাদবপুরে কফি হাউস আছে। এছাড়া দক্ষিণ কলকাতার বসুশ্রী সিনেমা হলের সাথে আর একটা কফি হাউস তৈরী হয়েছিল, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। যে বছর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ সেই ১৯৪১ সালেই সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের কফি হাউসটি তৈরী করা হয়েছিল। বর্তমানেও এটি সচল রয়েছে।  এটাই কলকাতার প্রথম কফি হাউস। এই কফি হাউসের কিছুদিন পরেই "ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড" কলেজ স্ট্রিটের পাশে ১৫ নম্বর বঙ্কিম  চ্যাটার্জী স্ট্রীটের অ্যালবার্ট হলে এই   কফি হাউসটি খোলে। দীর্ঘদিন তারা এটা চালিয়েছে। ১৯৫৭ সালে কফি বোর্ডের  আওতা থেকে অ্যালবার্ট হলের এই কফি হাউসটি বেরিয়ে আসে। সেই সময় অর্থাৎ ১৯৫৭ সাল থেকেই এখানকার কর্মচারীদের সমবায়ের  তত্ত্বাবধানে এটা চলে আসছে।  কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি স্কুল-কলেজ থাকায় সব সময়ই এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের ভীড় লেগেই থাকে। কলেজ স্ট্রিটেই  কলকাতার সবচেয়ে বড় বইয়ের বাজার থাকায় বইপ্রেমীদেরও এখানে দেখা মেলে। কলেজে স্ট্রিটের কফি হাউসটি কলকাতার সবচেয়ে জনপ্রিয় কফি হাউস।
তিন তলা থেকে নেওয়া দোতলার হলটি 


এই অ্যালবার্ট হলটি বহু লেখক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, গায়ক, দেশি-বিদেশী পর্যটকদের আড্ডা দেওয়ার জায়গা। বহু ঐতিহাসিক জমায়েতের সাক্ষীও এই হলটি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও আরো কত কৃতী ব্যক্তিত্বরা এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। আজ প্রায় ৭৫ বছরের পুরোনো এই কফি হাউসটি সব সময়েই বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আড্ডার স্থল হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। 


নিচের হল ঘরটি 
যথাসময়ে    কফি  হাউসের   সেই  পুরাতন  জরাজীর্ণ  ভবনটির   সামনে  এসে  দাঁড়ালাম।    শ্যামল আমার জন্য অপেক্ষা  করছিল।  প্রবেশদ্বারের ওপরে ইংরাজি হরফে "ইন্ডিয়ান কফি হাউস"  কথাটি  লেখা দুটি বোর্ড রয়েছে।  বন্ধুর  আহ্বানে কর্মস্থল  থেকে  হঠাৎ এসেছি বলে,  আজ আর আমার সাথে ক্যামেরাটা নেই, তাই চলমান ফোনে কয়েকটা  ছবি  তুললাম।  দুজনে   সিঁড়ি   বেয়ে  দোতলায়  উঠে দেখলাম একটা  নিওসাইন  বোর্ডে  বাংলা হরফে  লেখা  "কফি হাউস" কথাটি জ্বল জ্বল করছে।  তার পাশেই   আরো  একটা  বোর্ড  রয়েছে, তাতে  লেখা  আছে  খোলা-বন্ধের  সময়।  সিঁড়ির দেওয়ালটার  সামান্য অংশ ছাড়া নানারকম বিজ্ঞাপনে ভর্তি রয়েছে। এগুলো দেখে মনটা খুব খারাপ লাগল। এতো প্রাচীন  ঐতিহ্যশালী ভবনটি এরকমভাবে দৃশ্যদূষণ করা রয়েছে। এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা দুজনে ওপরে উঠে আসলাম। ওপরের একদিকের দেওয়ালে অবশ্য খুব সুন্দর পোড়ামাটির কাজ করা টাইলস লাগানো রয়েছে, এটা  দেখে  মনটা একটু  হলেও  খুশি  হল।  কফি  হাউসের
ঐতিহ্য 
ঐতিহ্যের সাথে এগুলো  বেশ  মানিয়েছে    বলে  আমার  মনে  হল।    দরজা  দিয়ে  ভিতরে   ঢুকে  দেখলাম  লোকে লোকারণ্য।    সবাই   নিজেদের   মধ্যে গল্পে-আড্ডায় বেশ  মত্ত  হয়ে আছে।   তারা  নিজেদের মধ্যে গল্পে  এতটাই মোহিত  হয়ে আছে যে  কে ভিতরে  ঢুকচ্ছে, কে  ভিতর  থেকে বাইরে  আসছে  তাতে  তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। 
হল ঘরটির পিছন দিকের দেওয়ালে সুন্দর একটা  যুবক বয়সের বিশ্বকবি  রবীন্দ্রনাথের চিত্র  বাঁধিয়ে  রাখা  আছে।  এছাড়া বাকি  তিনদিকের দেওয়ালগুলিতেও  প্রায় দশ-বারোটার মতন  নানারকম অঙ্কনের চিত্র বাঁধিয়ে  রাখা আছে।  ডানদিকে খাবার তৈরির ঘর, তার পাশে  বেশ  বড়  একটা  কাউন্টার  করা  আছে।   এই  কাউন্টারের পাশে পুরুষদের একটা শৌচালয় আছে।  পুরো হল  ঘরটিতে  চার  বর্গফুটের  প্রচুর টেবিল পাতা রয়েছে। এই টেবিলগুলোর চার পাশে কোনোটায় তিনটে  আবার  কোনোটায়  চারটে  করে চেয়ার  পাতা আছে।  প্রত্যেকটা টেবিলে একটা করে রঙিন মেনু কার্ড রাখা আছে। এখানে  বসার কোনো  জায়গা  খালি  নেই, তাই আমরা  অপেক্ষা  করছিলাম।  একজন  ওয়েটার  এসে  বলল তিনতলায়  চলে যান ওখানে দু-তিনটি টেবিল খালি আছে। আমরা আবার সিঁড়ি ভেঙে  তিনতলায় উঠে আসলাম।  ভিতরে  ঢুকে  দেখলাম  একটা  ছোট্ট হল ঘর। ঘরটি  বেশ  সুন্দর  করে   সাজানো,  তবে  নীচের ঘরটির   মতো  এত আলোকিত নয়।  এখানকার  দেয়ালগুলোতেও   বেশ কয়েকটি  অঙ্কণ বাঁধিয়ে রাখা আছে।  এই  ঘরটির  বেশ  কিছুটা  অংশ  অর্ধগোলাকারে  কাটা  রয়েছে, যেখান থেকে নীচের হল  ঘরটির বেশিভাগ অংশই দেখা যাচ্ছে। এখানে  আমরা বসার একটা  জায়গা 
ওয়েটার গিরি 
পেয়েও  
গেলাম।  আমরা   বসতেই  সাদা  ইউনিফর্ম  ও  মাথায়  সুন্দর  রাজসিক  একটা পাকড়ী  পরা একজন  বয়স্ক  লোক  এসে  কি  খাব       তা    জানতে  চাইল।   আমরা   সামান্য   স্ন্যাকস   ও    দুকাপ  কফি  আনতে   বললাম।   সে  জানাতে চাইলো  কি কফি আমরা  নেব। সে  আরো বলল  এখানে কয়েকরকম  কফি পাওয়া যায়। সে  আমাদের মেনু  কার্ডটা  একবার দেখে  নিতে বললো। আমরা  সাধারণ  গরম  কফি খেতে  চাইলাম  আর  সাথে বাটার টোস্ট নিয়ে আসতে বললাম।   সে আমাদের থেকে খাবারের কথা  জেনে নীচে নেমে গেলো, সম্ভবতঃ রান্নাঘরে চলে গেলো। কিছুক্ষন অপেক্ষার পর আমাদের কাঙ্খিত খাবার  নিয়ে এলো। এই অপেক্ষার সময় নীচের হলটির পরিবেশটা একটু চাক্ষুষ করছিলাম।  দেখলাম প্রচুর অল্প  বয়সী ছেলে-মেয়ে বেশিরভাগ টেবিলগুলোতে শোরগোল তুলছে।  একটা টেবিলে জনা দুয়েক  বিদেশিকেও দেখলাম  নিজেদের  মধ্যে গল্পে ব্যস্ত রয়েছে।  কয়েকজনকে আবার দেখলাম  মুঠি ফোনে নিজের ছবি তুলছে।  সামনের  একটা  টেবিলে  কয়েকজন  যুবক  রাজনীতি  নিয়ে বেশ তর্কাতর্কি করছিল। যাইহোক,  খাবার এসে  যাওয়ায়  আমরা খেতে  আরম্ভ করলাম। শ্যামলকে দেখলাম নিজের মুঠি ফোনে  কারো  সাথে কথা  বলছে। খেতে খেতে আমি মান্না দের সেই  কিংবদন্তি  গানটার কথা ভাবছিলাম।  তিনি গেয়ে  গিয়েছিলেন   সাতটা  টেবিল  আজও আছে,  কফির  সাতটা  পেয়ালাও  ঠিক রয়েছে,  কিন্তু  তাঁর সেই  ছয়  বন্ধু  মইদুল, অমল,  ডিসুজা,  রমা রায়, নিখিলেশ  স্যান্যাল ও  সুজাতা আজ আর নেই। মান্না দেও কিছুদিন হল আমাদের  ছেড়ে  চলে গেছেন। তাঁরা এরকমই কোনো টেবিলে সাতজন  বসে  তিন  চার  ঘন্টা কতরকম  তর্ক  করে কাটাতেন।  গানটির  শেষ  ছত্রে  গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তুলে ধরেছিলেন অসাধারন কিছু সত্য কথা। 

" সেই সাতজন নেই আজ টেবিলটা তবুও আছে। 
সাতটা পেয়ালা আজও খালি নেই 
একই সেই বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁড়ি 
শুধু সেই সেদিনের মালি নেই 
কত স্বপ্নের রোদ ওঠে এই কফি হাউজে 
কত স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যায় 
কতজন এলো গেল কতজনই আসবে 
কফি হাউজটা শুধু থেকে যায়।" 

সত্যি কথা কত গুণীজনের পদধূলি মাখা এই কফি হাউসটি।  তাঁদের বেশিরভাগই আজ পৃথিবীর মায়া  ত্যাগ করে  চলে গেছেন।  নতুন নতুন কত বুদ্ধিজীবী বা গুণীজন রোজ  এখানে এসে আড্ডায় যোগ দিচ্ছেন, রোজ চলছে কত নতুন নতুন বিষয় নিয়ে কত নতুন নতুন মানুষের আড্ডা। জন্ম নিচ্ছে হয়তো আরো কত কবিতার বা উপনাস্যের খসড়া, তৈরী হচ্ছে হয়তো আরো কত নতুন গানের মুখরা। কিন্তু পুরানো আড্ডপ্রেমীরা বলেন কফি হাউসে এখন আর সেই সব সোনালী বিকেল আর নেই। তাঁরা এখানে আসলে পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান, পুরোনো মাধুর্যকে  খুঁজে পেতে চান। এভাবেই  নস্টালজিয়া ও আধুনিকতার লড়াই সারাক্ষণই চলতে থাকবে কফি হাউসে। আমাদের খাওয়া শেষ হয়ে গেলো। খাবারের দাম মিটিয়ে আমরা নীচে নেমে এলাম।  





তারিখ : ০৩-০৩-২০১৯
 লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 






Saturday, March 2, 2019

প্রিন্সেপ ঘাট এককথায় অসাধারণ (Princep Ghat) >

প্রিন্সেপ ঘাট - এক কথায় অসাধারণ 


জেমস প্রিন্সেসের স্মৃতিসৌধ 
শহর কলকাতার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে কত ইতিহাস, কত স্থাপত্য, কত ঐতিহ্য।  দেশি বিদেশী ঐতিহাসিকরা  প্রায়ই এখানে গবেষণার কাজে  আসেন।  আমাদের শহরের  ইতিহাসের গল্পতো ভারতের প্রাচীনতম ইতিহাসেরই একটা অংশ। তার খোঁজে তো ঐতিহাসিকরা ভিড় জমাবেনই। শুধু কি ইতিহাসের খোঁজ করেন তাঁরা, না সাথে এখানকার ঐতিহ্য যেমন দেখেন, তেমন এখানকার দর্শনীয় জায়গাগুলোও উপভোগ করেন। এইসব ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানগুলোর টানে শুধু ঐতিহাসিকরা নন, পৃথিবীর বহু দেশ থেকে বহু পর্যটকও  ভিড় করেন এখানে। আমাদের দেশের পর্যটকরা তো  ধর্ম ও ইতিহাসের টানে বার বার এখানে আসেন। এখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আজ পুরোনো কলকাতার স্মৃতিকে  বহন করে চলেছে।  গঙ্গার বুকে গড়ে ওঠা প্রিন্সেপ ঘাট তেমনই এক ঐতিহাসিক  নিদর্শন।



১৭৭৫ সালে প্রথম সাহেবি জাহাজ কলকাতার চাঁদপাল ঘাটে এসে ভিড়েছিল। সেই জাহাজে বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ  বিচারপতি এসেছিলেন । এই কলকাতাই তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল। এখানেই তখন ভারতের প্রথম বিচারালয়  তৈরী করা হয়েছিল। সেই বিচারালয়ে যোগদান করতেই বিচারপতিরা এখানে এসেছিলেন।তখন চাঁদপাল ঘাটেই সব জাহাজ এসে ভিড়তো। এই চাঁদপাল ঘাটটি বর্তমান বাবু  ঘাটের কিছুটা উত্তরদিকে আছে। যত বড়লাট, যত ব্রিটিশ সরকারের উর্ধতন ব্যক্তিত্ব সেই আমলে যাঁরা কলকাতায় আসতেন, সবাই এই চাঁদপাল ঘাটটিকে  ব্যবহার করতেন।

নৌকার সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে  

১৮২০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ইংল্যান্ড থেকে চাঁদপাল ঘাটেই এসে নেমেছিলেন জেমস প্রিন্সেপ নামে এক যুবক। তিনি কলকাতার টাঁকশালে সহকারী ধাতু পরীক্ষক(Assey Master) হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।  তাই তাঁর এই  শহরে পদার্পন। এই পদে তিনি মাত্র এক বছর কলকাতায় ছিলেন। তারপর তিনি নতুন টাঁকশাল খোলার জন্য কাশীতে চলে যান। কাশীতে টাঁকশাল, একটা গির্জা ও একটা সেতু তাঁরই  হাতে তৈরী হয়। কাশীতে থাকাকালীন তিনি কাশী  উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য ও সম্পাদকও হয়েছিলেন। ১৮২২ সালে তাঁর নেতৃত্বে কাশীর উপর একটা সার্ভে করা হয়েছিল। সেই সময় তিনি এই সার্ভে  রিপোর্টের সাথে একটা মানচিত্র এঁকে দিয়েছিলেন। এই মানচিত্রটি ১৮৩০ সাল নাগাদ ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল।  মানচিত্রটি প্রাচীন কাশীর একটা দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। গবেষকদের কাছে এই মানচিত্রটি খুবই উপযোগী। তিনি ডেপুটি এসে মাস্টার (Deputy Assey Master) হিসেবে আবার কলকাতার টাঁকশালে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে এখানকার টাঁকশালেই তিনি আশে  মাস্টার (Assey Master)  হন। তিনি  "ভিউস এন্ড ইলাসস্ট্রেশনস অফ বেনারস" (Views and Illastrations of Benaras) নামে একটা বই লেখেন। "গ্ল্যানিংস অফ সায়েন্স" (Gleanings of Science) নামে একটা সাময়িক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এই সাময়িক পত্রিকাটিই পরবর্তীকালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির মুখপত্র হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৩২ থেকে ১৮৩৮ সাল  পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সম্পাদক ছিলেন।  কলকাতার সার্কুলার খালটি তাঁরই তত্ত্বাবধানে কাটানো হয়েছিল। তিনি নানারকম বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর  জীবনের সর্বশেষ্ঠ কাজ হলো সম্রাট অশোকের প্রস্তর স্তম্ভে  ও পর্বতগাত্রে খোদিত লিপিগুলোর পাঠোদ্ধার করা। জেমস প্রিন্সেপ মাত্র ৪১ বছর বয়সে ২২শে এপ্রিল ১৮৪০ সালে ইংল্যান্ডে  মারা যান।

গঙ্গার ধারের রাস্তা 
জেমস প্রিন্সেপের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তদকালীন ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড  এডেনবরা ১৮৪১-৪২ সাল নাগাদ জেমস প্রিন্সেপের নামে একটি স্মৃতিসৌধ ও একটি  ঘাট তৈরী করেন। ব্রিটিশ যুগে তৈরী প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঘাটটি কলকাতায় হুগলী  নদীর তীরে অবস্থিত। ঘাটের পাশেই  স্মৃতিসৌধ তৈরী রয়েছে।

বিশাল জায়গা নিয়ে স্মৃতিসৌধটি তৈরী করা হয়েছে। সৌধটির সামনে বেশ বড় খালি  জায়গা জুড়ে সবুজ ঘাসে ঢাকা রয়েছে। এই জায়গাটিতে একটি মা ও বাচ্চা হাতির মূর্তি করে রাখা আছে।জেমস প্রিন্সেপের সমাধিসৌধ বা স্মৃতিসৌধটি একটি অসাধারন স্থাপত্যশৈলীর  সঙ্গে সৌন্দর্যের এক অপরূপ সংমিশ্রণ।  জায়গাটা বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন। সৌধটির গা ঘেসেই  গড়ে উঠেছে ঝুলন্ত  বিদ্যাসাগর সেতু বা দ্বিতীয় হুগলী  সেতু। ১৯৯২ সালের ১০ই অক্টোবর এই সেতুটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। এই সেতুর তারগুলি স্মৃতি সৌধটিকে যেন একটা নতুন রূপ দিয়েছে। ব্রিটিশ স্থাপত্যের সাথে ভারতীয় স্থাপত্য মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এখানে। এখান থেকে একটু এগেলেই একটা রেল লাইন পড়ে। এই  লাইনটিতে  চক্ররেল  চলাচল করে।

প্রিন্সেপ ঘাট স্টেশন 
পাশেই চক্র রেলের একটা স্টেশন আছে। স্টেশনটির নামও  "প্রিন্সেপ ঘাট"।  স্টেশনটি বেশ সুন্দর ও নিরিবিলি,  খুবই পরিষ্কার। চক্ররেলটি   সম্ভবত ১৯৮৪ সাল নাগাদ চালু করা হয়েছিল। ট্রেন লাইনটি পার হলেই হুগলী  নদীটি দেখা যায়।  এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল  লর্ড এডেনবরার তৈরী জেমস প্রিন্সেপের নামাঙ্কিত সেই ঘাটটি। ঘাটে অনেকগুলো নৌকো সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই নৌকোগুলো করেই মনোরম নৌবিহার করার ব্যবস্থা রয়েছে। ঘাটটির সামনে বসার জন্য কয়েকটা বেঞ্চ পাতা রয়েছে। খুব হালকা আওয়াজে রবীন্দ্র সংগীত বাজছে।  নদীকে সামনে রেখে এই বেঞ্চে বসে রবীন্দ্র সংগীত শোনার  অভিজ্ঞতা সারা জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত গড়ে তোলে।  নদীতে নামার ঘাটটি  খুব সুন্দর করে বাঁধানো আছে। আগের তুলনায় এখন প্রিন্সেপ ঘাটটিতে অনেক বদল ঘটে গেছে। এখানে সবুজায়ন ও সৌন্দর্য্যায়ন যেন হাতে হাত রেখেছে। নদীর ধারে কংক্রিটের রেলিং ও বাধাঁনো সুন্দর রাস্তা তৈরী করা হয়েছে।  পড়ন্ত  বিকেলে নদী তীরের সুন্দর বাঁধানো  রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এই রাস্তার ধারে বেশ কয়েকটা খাবারের স্টল আছে।  এই স্টলগুলোতে বসে একটু খাবারের স্বাদ নিতেও মন্দ লাগে না।
সূর্যাস্তের দৃশ্য 

সন্ধ্যার মুখে যখন সূর্যটা সোনালী থালা হয়ে পশ্চিমপাড়ে হেলতে শুরু করে, তখন নদীর বুকে একটা মোহময়ী রূপ তৈরী  হতে  দেখা যায়। প্রিন্সেপ ঘাটের বেঞ্চে বসে এই মোহময়ী রূপ দেখা বেশ রোমাঞ্চকর। সন্ধ্যার পর আলোকিত সৌধটিকেও দেখতে ভারী সুন্দর লাগে।

দ্বীপ দীপাবলিতে ঘাট সাজানো হচ্ছে 
কার্তিক পূর্ণিমাতে বেনারসের ঘাটে যেমন  "দেব-দীপাবলী" উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তারই অনুকরণে গতবছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে প্রিন্সেপ ঘাটে কার্তিক পূর্ণিমার দিনেই প্রদীপ জ্বালিয়ে দেব-দীপাবলির প্রথম  অনুষ্ঠান করা হয়। কলকাতায় এই প্রথম এরকম গঙ্গা আরতির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই দিন এই  ঘাটে  তিলধারণের জায়গা ছিল না। ঢাকের শব্দে, আলোকসজ্জায় ঘাটটাতে এক সুন্দর পরিবেশ তৈরী হয়েছিল। এখানে সেই দিন উত্তরপ্রদেশের বেনারসের দেব-দীপাবলির প্রতিচ্ছবি হয়ে যেন দেখা দিচ্ছিল। দেখছিলাম  এখানে প্রচুর লোক প্রদীপ জ্বালিয়ে শাল পাতার থালায় বসিয়ে নদীতে ভাসাচ্ছিল। ১০-১২টা নৌকোতে সেচ্ছাসেবক ও কিছু পুলিশ পাহারা দিচ্ছিল। অনুষ্ঠানটার উদ্বোধন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাননীয় মন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়। রাজনীতি, খেলাধুলা ও রুপোলি পর্দার কয়েকজন
নামিদামি ব্যক্তিত্বকে দেখছিলাম সমগ্র অনুষ্ঠানটা অতিথি আসনে বসে উপভোগ করছেন। উত্তরীয় দিয়ে কয়েকজন বিশেষ অতিথিকে বরণ করা হয়। ওই নৌকোগুলো থেকে মাঝে মাঝেই ফানুস ছাড়া হচ্ছিল। ঘাট চত্বরটা বেশ একটা উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল।

প্রিন্সেপ ঘাট ও স্মৃতিসৌধটি ঘুরলে আপনার জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরী করে রাখবে।  সারাদিনই এখানে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত যুবক-যুবতী থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলেই  এখানকার মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে আসে।  প্রিয় শহরের বুকেই রয়েছে গড়ে ওঠা  এমন একটি জায়গা যেখানে পৌঁছলে  সব ক্লান্তি দূর হতে বাধ্য।  নয়নাভিরাম দৃশ্যের সাথে এক ঝলক নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে চাইলে অবশ্যই চলে আসুন প্রিন্সেপ ঘাটে। 

কিভাবে যাবেন : 
ধর্মতলা থেকে বাবুঘাটগামী বাসে  করে বাবুঘাটে এসে নামুন। বাবুঘাট  থেকে পায়ে হেঁটে মাত্রা আট  মিনিটে পৌঁছে যাবেন।


তারিখ : ০২-০৩-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী



যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, February 24, 2019

ঋতুরাজ (Rituraj)>

ঋতুরাজ 




ফুল ফুটুক  না ফুটুক আজ বসন্ত 

উপরিউক্ত উক্তিটি বিখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বসন্তকাল সম্বন্ধে তাঁর এক জনপ্রিয় কবিতায় বলে গেছেন।  বসন্তকাল বাংলার ঋতুচক্র আবর্তনের সর্বশেষ ঋতু।  শীতের রুক্ষতার পর মাঘের সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখন পূর্বে বসন্তের সূর্যের আগমন ঘটে।  পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, অশোক প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে। গাছে গাছে কিশলয় তাদের উজ্জ্বল রঙ প্রকৃতির ঔজ্জ্বল্যকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

কত কবির কলমে বসন্তকে নিয়ে কত কবিতা লেখা হয়েছে। কত সংগীতজ্ঞ তাঁদের গানে বসন্তকে তুলে ধরেছেন।  কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলে গেছিলেন "নীল দিগন্তে, ওই ফুলের আগুন লাগলো, বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল"। যখন বাংলার বুকে ঋতুরাজ বসন্তের বর্ণময়, সুরভিত ও রোমাঞ্চকর আবির্ভাব ঘটে, তখন সবার মনও আন্দোলিত হয়ে ওঠে। কোকিলের কুহু কুহু রব ও বিভিন্ন ফুলের প্রাচুর্য প্রকৃতিকে যেন রাজকীয় বেশে সাজিয়ে তোলে।   

বনে বনে হিম -শীতল উত্তরে বাতাসের বিদায়বার্তা ঘোষিত হয়ে যায় চারিদিকে। উত্তর দিক ছেড়ে তখন দক্ষিণদিক থেকে মনরোম মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করে দেয়। মৌমাছিদের ক্লান্তিবিহীন গুঞ্জরণে, কোয়েল-দোয়েলের বিরামহীন গানের সুরে, বনে  বনে অশোক, শিমুল, পলাশ ও কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম উচ্ছাসে  উথাল -পাতাল করা ফুলের গন্ধের সৌরভ প্রকৃতিকে ভরিয়ে তোলে।  তাই বসন্তকে ঋতুদের রাজা "ঋতুরাজ" বলে অভিহিত করা হয়।  

আগুনরঙা পলাশই বসন্তের পূর্ণতা বয়ে আনে। তার ডালে ডালে রক্তরাঙা ফুলগুলোকে দেখলে সবাই মনে মনে গুণ গুণিয়ে ওঠে কবিগুরুর সেই বিখ্যাত গান "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে " বা "ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে - ডালে ডালে, বনে বনে  পাতায় পাতায় রে আড়ালে আড়ালে কোণে   কোণে "।  এগুলো না হলে কাজী নজরুলের সেই বিখ্যাত সাঁওতালি গান "হলুদ গাদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল, এনে দে, এনে দে, নইলে বাঁধব না, বাঁধব না চুল"। মনও  যেতে চায় পুরুলিয়ায় বা নিদেনপক্ষে কবিগুরুর শান্তিনিকেতনের পলাশ ফুলের  বনে। সেখানকার পলাশ গাছের তলায় পলাশের  বিছানো ফুলের চাদরে বাচ্ছাদের ফুল তোলার ছবি একটা উপরি পাওনা হয়ে দেখা দেয়।বসন্ত মানেই যেন পূর্ণতা, বসন্ত মানেই যেন নতুন প্রাণের কলরব।  বসন্ত মানেই যেন একে অপরের হাত ধরে চলা।

শান্তিনিকেতনের বসন্তউৎসবে নাচ

দোল বা হোলি উৎসব এই সময়ই অনুষ্ঠিত হয়।  ফালগুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা হয়।একে রবীন্দ্রনাথ 'বসন্তোত্‍সব'  নামকরন  করেছিলেন। যদিও হিন্দু-বৈষ্ণব উৎসব বলে দোল উৎসব বিবেচিত হয়। কিন্তু তা আজ আর কোন ভাষা, গোষ্ঠী বা ধর্মের গন্ডিতে আবদ্ধ নয়। সর্ব মানুষের, সর্ব  ধর্মের সমন্বয়ের  উৎসবের নাম দোল উৎসব বা বসন্ত উৎসব। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় যে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ এই পূর্ণিমার দিনই  গোপিনীদের সাথে রঙ খেলায় মেতে উঠেছিলেন । এই উৎসবে শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সী নারী-পুরুষ পরস্পরকে বিভিন্ন রঙের আবির দিয়ে একে অপরকে রাঙিয়ে দেয়।


শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব বাংলার বুকে সবচেয়ে  জনপ্রিয় ও বিখ্যাত।  এখানকার  বসন্ত উৎসব পালনের রীতি আজ প্রায় পঁচাত্তর বছর পাড় হয়ে গেলো। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৫ সালে এই উৎসবের সূচনা করেছিলেন।  এই উৎসবের মূল সুর সেই সময় থেকেই এখানে তৈরী হয়ে গেছিল, যা আজও  সমান তালে বেজে চলেছে। রঙ আর আবিরে রাঙিয়ে দেওয়া হয় বিশ্বকবির শান্তিনিকেতনকে।  এখানকার আদিবাসীদের সাথে, দেশ বিদেশের অতিথিরা ও পর্যটকরা  
শান্তিনিকেতনে আবির নিয়ে খেলা
একসাথে  সমানভাবে এই উৎসবে মেতে ওঠে  । সবাই একসাথে গেয়ে ওঠে  "ওরে গৃহবাসি, খোল, দ্বার খোল, লাগল যে দোল। দ্বার খোল, দ্বার খোল। রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে, রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে, নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল। দ্বার খোল, দ্বার খোল"।  এই গানটিকে দিয়েই মূল অনুষ্ঠানটি শুরু করা হয়। বিশ্বভারতীর মূল চত্বরে। এখানকার উৎসবটা .সরকারিভাবে হয়ে থাকে। এই উৎসবে যেমন এখানকার ছাত্র-ছাত্রী ও অশ্রমের  বাসিন্দারা অংশগ্রহণ করে, তেমন বহু দেশি-বিদেশী পর্যটকও  অংশগ্রহণ করে থাকে। বিশেষ নৃত্য ও সংগীতের  মাধ্যমে উৎসবটি খুব সুন্দরভাবে  পালন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে সবাই মিলে  একসাথে গেয়ে ওঠে "রাঙিয়ে দিয়ে যাও , যাও য়াও  গো এবার যাওয়ার আগে।" গানটি। সন্ধ্যায় গৌড় প্রাঙ্গণে রবীন্দ্রনাথের নাটক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া প্রথা অনুযায়ী আরো কয়েকটি জায়গায় নানারকম সংকৃতিক  উৎসব হয়ে থাকে। এই বসন্ত উৎসবের দিন এখানে প্রায়  দু-তিন লাখ  লোকের সমাগম হয়। বোলপুর-শান্তিনিকেতন এই দিন জনসমুদ্রের  রূপ নেয়।

বর্তমানে নিউটাউনের রবীন্দ্রতীর্থে ও  গল্ফগ্রীনেও  খুব ঘটা করে দোল উৎসব আয়োজন  করা  হয়।  এখানেও অবিরের রঙে উৎসবের  আবহাওয়া তৈরী হয়। রবীন্দ্র নৃত্য ও গান দিয়ে সমগ্র অনুষ্ঠানটা সাজিয়ে তোলা হয়। এই  জায়গাটাও নাচে -গানে সব বয়সের মানুষকে মাতিয়ে তোলে।


কলকাতা বিশ্বভারতীতে বসন্তউৎসবে ছাত্রীরা 


কলকাতার রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রভারতী বিশ্বাবিদ্যালয়টিতেও প্রতিবছরই বেশ ঘটা  করে  বসন্ত উৎসব  পালন করা হয়। তবে এই অনুষ্ঠানটি দলের দু-একদিন আগে অনুষ্ঠিত হয়। নানা রঙে সেজে ওঠে এখানকার  চত্বরটা। ছাত্ররা নানা রঙের পাজামা পাঞ্জাবি আর ছাত্রীরাও  সুন্দর সুন্দর  শাড়ি পরে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়।  এই দিন এখানে অগুনতি আলোকচিত্রীদেরও  উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা নানারকম রঙ মেখে নানা ভঙ্গিমায় এইসব আলোকচিত্রীদেরকে দিয়ে ছবি তোলায়। এখানকার মাঠে রবীন্দ্র নৃত্য ও গান পরিবেশন করা হয়। সবাই একসাথে এখানকার সাংকৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে। বর্তমানে এখানেও শান্তিনিকেতনের মতই  ভীড়  উপচে পড়তে দেখা যায়।  

শান্তিনিকেতনের মত  করে বসন্ত উৎসব আজকাল কলকাতার পাড়ায় পাড়ায়  অনুষ্ঠিত হতে দেখা যাচ্ছে। বাঙালিদের কাছে দিনকে দিন এইসব অনুষ্ঠানগুলোও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সব পাড়ারই যেন  পলাশের রঙের সাথে ফাগের রঙ  মিলেমিশে এক করে দিচ্ছে। কলকাতার বাঙালিরা প্রতিবছর এখানকার এই বসন্ত উৎসবগুলোতেও   ভীড় জমাচ্ছে। বহু প্রাচীনকাল থেকেই নবদ্বীপ, মায়াপুর, শান্তিপুর ও আম্বিকা কালনাতে দোল উৎসবের প্রচলন আছে।

দোলের আগেরদিন সারাদিন ধরে গাছের  শুকনো পাতা, খড়, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটা ঘর বানানো হতো। আমরা ছোটবেলায় একে "বুড়ীরঘর" বলতাম।  সন্ধ্যার সময় সেই ঘরে আগুন লাগিয়ে  "হোলিকাদহন" বা "নেড়াপোড়া" উৎসব পালন করা হত।  বর্তমানে এই উৎসব আজ আর কোথাও হতে খুব একটা দেখা যায় না। 

এক একটা বছর বদলায়, এক এক জায়গায়, এক একরকমভাবে বসন্ত উৎসব পালিত হতে দেখা যায় কিন্তু বাঙালীরা কোন উৎসবে ফাঁকি পড়তে রাজি নয়।  তারা  সব উৎসব থেকেই সমানভাবে আনন্দ নিতে আগ্রহী হয়।



তারিখ : ২৪-০২-২০১৯

 ছবি ও লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।