Sunday, May 19, 2019

রবীন্দ্রনাথের আদি নিবাস >

রবীন্দ্রনাথের আদি নিবাস.....





পুরোনো কলকাতার গল্পে কলকাতার নানারকম কাহিনীর কথা বলা হয়। সেইসব কাহিনীর বেশিরভাগই কলকাতার স্থাপত্যের ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। কলকাতার ঐতিহ্য শুধুই তার স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই সময়কার কলকাতার পরিবহন, রাস্তাঘাট এবং কলকাতাবাসীদের জীবনধারণ, খ্যাদ্যাভাস সবই এই ইতিহাসের সামিল হয়ে আছে। কলকাতার আদি যুগে প্রচুর বর্ধিষ্ণু পরিবার এখানে বসবাস করত। তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে বজায় করে চলত। এইরকমই এক ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিখ্যাত  পরিবারের আদি নিবাসের কথা আজ  বলব। আমার এক বন্ধুর অনুরোধে এই বিষয় নিয়ে লেখা। এই কাহিনী হয়তো বেশিরভাগ মানুষের জানা আছে,  মবে হয়  কিছু মানুষের বা বর্তমান প্রজন্মের জানা নেই। তাই আজ আমার লেখার বিষয়বস্তু উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস নিয়ে।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি সর্বজন পরিচিত এক ঐতিহ্যশালী বাড়ি। এই ঠাকুর পরিবারের সন্তান দর্পনারায়ণ ঠাকুর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম বিশ্বজোড়া। এই পরিবারের ইতিহাস প্রায় তিনশো বছরের ইতিহাস। বাংলার নবজাগরণে এই পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর ছিল। সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজ-সংস্কার, শিল্পকলা ও সংগীতে এই পরিবারের নাম বাংলার ইতিহাসে প্রথম সারিতে রয়েছে। ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস কিন্তু জোড়াসাঁকো বা পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে ছিল না। তাঁদের পূর্ব পুরুষদের পদবিও ঠাকুর ছিল না।

এই ঠাকুর পরিবারের আদি নিবাস সম্বন্ধে নানাজনের নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন বর্ধমান জেলার কুশগ্রামে আদি নিবাস ছিল, কেউ বলেন অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার পিঠভোগ গ্রামে ছিল। আবার কেউ বলেন যশোর জেলা থেকেই এই পরিবারের উদ্ভব।  ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল। বর্ধমানের কুশগ্রাম থেকেই এই বংশের পদবি "কুশারী" হয়েছিল।  বর্ধমানের কুশগ্রামের কুশারীরাই বাংলাদেশের খুলনা ও যশোরে এসে বসবাস শুরু করে।  এই বংশের আদি পুরুষ ছিলেন জগন্নাথ কুশারী। তিনি খুলনা  থেকে যশোরে এসে বাস করেন। তিনি যশোরের পিরালী ব্রাহ্মণ শুকদেব রায়চৌধুরীর কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। জগন্নাথের পুত্র পুরুষোত্তম ও প্রপৌত্র ছিলেন পঞ্চানন কুশারী। এই পঞ্চানন কুশারী ভাগ্য অন্নেষণে গোবিন্দপুর গ্রামে এসে গঙ্গা তীরবর্তী স্থানে বসবাস শুরু করেন।  সেই আমলে যারা ভাগ্য অন্নেষণে কলকাতা, সুতানুটি বা গোবিন্দপুরে আসতেন, তারা বেশিরভাগই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কেউ কেউ আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে লিপ্ত হতেন। পঞ্চানন কুশারী কিন্তু ব্যবসায় লিপ্ত ছিলেন।  তিনি কোম্পানির জাহাজের ক্যাপ্টেন ও খালাসীদের বিভিন্নরকম মাল সরবরাহ করতেন। জাহাজে মাল ওঠানো-নামানোর কাজও তিনি করতেন।

 আমাদের দেশে বহু প্রাচীনকাল থেকেই ব্রাহ্মণ সন্তানদের "ঠাকুরমশাই" বলে সম্বোধন করা হতো। ইংরেজরা এই ঠাকুর কথাটিকে বিকৃত করে টেগোর বলতো। ঠাকুর মশাই খেতাবের আড়ালে তাদের আসল পদবি  হারিয়ে যেতে দেখা যেত। পঞ্চানন কুশারীকে ইংরেজরা পঞ্চানন টেগোর  বলে ডাকত। ব্যবসার কাজে যেসব নীচু শ্রেণীর মানুষের সাহায্য তিনি নিতেন, তারাও তাঁকে ঠাকুরমশাই বলে সম্বোধন করত। এইভাবে পঞ্চানন কুশারীও ধীরে ধীরে পঞ্চানন ঠাকুর হয়ে যান। ইংরেজরাও তাদের নথিপত্রে কুশারী পদবিটা পাল্টে ঠাকুর পদবি লেখা শুরু করে। এই পরিবার এইভাবে  কুশারী পরিবার থেকে  ঠাকুর পরিবারে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

পঞ্চানন ঠাকুরের দুই  পুত্র ছিল।  তাঁদের নাম জয়রাম,  রামসন্তোষ। পঞ্চানন তাঁর জীবদ্দশায় ইংরেজ কালেক্টর রালফ শেলডন সাহেবকে ধরে তাঁর দুই পুত্র জয়রাম ও রামসন্তোষকে  কোম্পানিতে আমিনের চাকরি করে দেন। তাঁরা দীর্ঘদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে আমিনের কাজ করেছিলেন। তাঁরা তখন গোবিন্দপুর নিবাসী ছিলেন। পরবর্তীকালে কোম্পানি গোবিন্দপুরে একটা দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। এই দুর্গই বর্তমানের ফোর্ড উইলিয়াম দুর্গ।  এই দুর্গ নির্মাণের জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন হয়ে পরে। কোম্পানি গোবিন্দপুরে বসবাসকারীদের এখানকার জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তখন জয়রামদের  এই জমির মায়া ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল। তাঁরা সেই সময় পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে চলে আসেন। জয়রামের চার পুত্র ছিল তাঁরা হলেন আনন্দরাম , দর্পনারায়ণ, নীলমনি ও গোবিন্দরাম। ১৭৫৬ সালে জয়রামের মৃত্যু হয়।  তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আনন্দরাম অকালে মারা যান। জয়রাম ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র গোবিন্দরাম নিঃসন্তান ছিলেন। চারজনের মধ্যে সুযোগ্য পুত্র ছিলেন দর্পনারায়ণ ও নীলমনি। দর্পনারায়ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। দর্পনারায়ণ ঠাকুরই ঠাকুর বংশের প্রথম পুরুষ হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। নীলমনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে সেরেস্তার কাজ করতেন। তাঁরা পাথুরিয়াঘাটাতে একটা বিশাল বাড়ি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে পারিবারিক বিবাদ শুরু হয়।। এই বিবাদের ফলে নীলমনি ঠাকুর পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ত্যাগ করেন। তাঁরা এক সালিশি সভা করে ঠিক করেন দর্পনারায়ণ নীলমনিকে এক লক্ষ টাকা প্রদান করবেন এবং গৃহদেবতা লক্ষীনারায়ানের ভার নীলমনিকে নিতে হবে। দর্পনারায়ানকে পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি দিয়ে নীলমনি তাঁদের গৃহদেবতা লক্ষীনারায়ণ ও এক লক্ষ টাকা নিয়ে পাথুরিঘাটার বাড়ি ত্যাগ করেন।। এই সময় বৈষ্ণবদাস শেঠ নামে এক ব্যবসায়ী নীলমনিকে চিৎপুরের মেছোবাজারে বাড়ি নির্মাণ করার জন্য কয়েক বিঘা জমি প্রদান করেন। নীলমনি ওই জমির উপর আলাদাভাবে নিজের বসতবাড়ি গড়ে তুললেন। নীলমনি ঠাকুরের তৈরী এই বাড়িই হলো আজকের জগৎবিখ্যাত "জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি"। মেছোবাজার অঞ্চলটি পরবর্তীকালে জোড়াসাঁকো নাম হয়েছিল। নীলমনি ঠাকুরের পুত্র দ্বারকানাথ। তিনি প্রথমে ল এজেন্ট ও.পরবর্তীকালে তিনি চব্বিশ পরগনার জেলার কালেক্টর ছিলেন। দ্বারাকানাথ পরবর্তীকালে রাজসাহীর কালিগ্রামের বিশাল জমিদারি কিনে জমিদার হয়ে যান। দ্বারকানাথের হাত ধরেই ঠাকুর পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।  বাঙালি সমাজ থেকে ইংরেজি সমাজ সর্বত্রই তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। ঠাকুর পরিবার জমিদার পরিবারে পরিণত হয়। প্রিন্স দ্বারকানাথের পাঁচ পুত্র ছিল যথাক্রমে দেবেন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ, গিরীন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ এবং নগেন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন  কবি, সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও সমাজ-সংস্কারক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।  তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত।

এইভাবেই খুলনা থেকে গোবিন্দপুর, গোবিন্দপুর থেকে পাথুরিয়াঘাটা  হয়ে ঠাকুর পরিবার  জোড়াসাঁকোয় চলে আসেন। বিশ্ববিখ্যাত ঠাকুরবাড়ি তৈরী হয়।  কুশারী পদবি থেকে তাঁরা  ঠাকুর পদবি লাভ করে।

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


Tuesday, May 14, 2019

ব্যারাকপুর ভ্রমণ>

ঝটিকা সফরে ঐতিহাসিক শহরে


ব্যারাকপুর পশ্চিমবঙ্গের  এক সুপ্রাচীন শহর।  ব্যারাকপুরকে সাধারণত শিল্প নগর  বলা হয় কিন্তু এই নগরের নামের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস। জড়িয়ে আছে সেই প্রাচীন লাটসাহেবের বাংলো, এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা, বিখ্যাত ঘোড়দৌড়ের বিলুপ্ত ইতিহাস। যে মাটিতে ইংরেজরা  তাদের  ভারী বুটের আস্ফালন দেখিয়েছিল। সিপাহী মঙ্গল পান্ডে যে আস্ফালন সহ্য করতে পারেননি। মহিয়সী নারী লর্ড ক্যানিংয়ের ভালোবাসার শহর ছিল এই ব্যারাকপুর। শহরটি  উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গঙ্গা তীরবর্তী এক মহকুমা শহর। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্যারাকপুরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এই শহরেই দেশের প্রাচীনতম  বিমানঘাঁটি রয়েছে।  রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, সীমান্ত গান্ধী বাদশা খান, ও ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের পদধুলিমাখা শহর হল ব্যারাকপুর।

 ব্যারাকপুরের ইতিহাস :

ব্যারাকপুরের ইতিহাস জানা থাকলে আমার ধারণা এই সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক শহর ভ্রমণের আনন্দ লাভ করা যাবে। তাই আমি প্রথমে আমি ব্যারাকপুরের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত আকারে একটু ধরার চেষ্টা করছি।

ব্যারাকপুরের একসময় নাম ছিল "চানক"। ১৪৯৫ সালে বিপ্রদাস পিপিলাই রচিত "মনসামঙ্গল কাব্যে" এই "চানক" নামটা প্রথম পাওয়া যায়।  ১৮৭১ সালে কবি দীনবন্ধু মিত্র তাঁর "সুরধূনী" কাব্যেও "চানক"  নামটি ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা এখানে ব্যারাক অর্থাৎ সেনা ছাউনি তৈরী করে, সেই সময় ব্যারাক শব্দটি থেকেই চানক নামটা পরিবর্তিত হয়ে ব্যারাকপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। কারো কারো মতে ব্যারাকপুর একসময় সপ্তগ্রাম পরগনার অধীনে ছিল।  সেই সময় এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন রুকউদ্দিন বারবক শাহ। তাঁর স্মৃতিকে  স্মরণ করে লোকে  চানককে বরাবকপুর বলত। পরে অপভ্রংশ হয়ে ব্যারাকপুর হয়।   ১৭৬৫ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করেছিল।

২৫৪ বছর পূর্বে ব্যারাকপুরে যে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী হয়েছিল সেটাই ভারতবর্ষের ৬২টা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে সর্বপ্রথম ক্যান্টনমেন্ট ছিল। ১৮৫৭ সালের ২৯শে মার্চ ব্রিটিশ অবিচারের বিরুদ্ধে ব্যারাকপুরে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। দাঁত দিয়ে কার্তুজ কাটা নিয়ে অসন্তোষের স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে শুরু হয়। এই স্ফুলিঙ্গের আগুন জ্বলতে জ্বলতে এক মহাবিদ্রোহের রূপ নেয়। এখানকার সিপাহীরা  প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।  এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন ৩৪ নং রেজিমেন্টের ৫নং কোম্পানির সিপাহী মঙ্গল পান্ডে (সিপাহী নং ১৪৪৬)। ৩৪ নং রেজিমেন্টের দেশীয় বাহিনীর সার্জেন্ট মেজর হিউসন সাহেব জমাদার ঈশ্বরী পান্ডেকে হুকুম করেছিলেন বিদ্রোহী সিপাহীদের বন্দী করার জন্য।  ঈশ্বরী পান্ডে সেই হুকুম পালন করেননি। মঙ্গল পান্ডে সেই সময় লুকিয়ে হিউসন সাহেবকে লক্ষ্য করে বিদ্রোহের প্রথম গুলিটি চালিয়েছিলেন। যদিও গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। এই খবর পেয়ে ওই রেজিমেন্টের লেফটেনান্ট বি  এইচ বগ ঘোড়ায় চড়ে প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। মঙ্গল পান্ডে তাকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় গুলি চালিয়েছিলেন। বগ ঘোড়া সমেত মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। মাটি থেকে উঠে তিনি  মঙ্গল পান্ডেকে গুলি করেছিলেন, কিন্তু সেই গুলিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। মঙ্গল পান্ডের  ভাই মাতাদিন  বাল্মীকি, ঈশ্বরী পান্ডের সাথে আরো বেশ কিছু সিপাহী এই মহাবিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে এই অংশগ্রহণ করেছিল। এইভাবে বেশ কিছুক্ষন প্যারেড গ্রাউন্ডে বন্দুক ও তরোয়ালের লড়াই চলেছিল। বেগতিক দেখে মঙ্গল পান্ডে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি। তিনি ধরা পরে  গিয়েছিলেন।  ঈশ্বরী পান্ডেকেও সেইসময় ধরা হয়েছিল। অবশেষে ৮ই এপ্রিল ১৮৫৭ সালে মঙ্গল পান্ডে ও তাঁর ভাই মাতাদিন বাল্মীকিকে এখানকার ধোবি ঘাটে  ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

ব্যারাকপুর লাটভবন :
কলকাতার লাটভবনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল ব্যারাকপুরের লাটভবনটিকে।  ১৮০১ সালে  লর্ড ওয়েলেসলি এই বিশাল  বাড়িটি  নির্মাণ শুরু করেছিলেন। বাড়িটি নির্মাণ করার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ হওয়ার জন্য বোর্ড অফ ডিরেক্টরস ওয়েলেসলিকে দেশে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। ১৮০৫ সালে ওয়েলেসলি বাড়িটি  অসমাপ্ত রেখে দেশে ফিরে  গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে যত গভর্নর এখানে এসেছিলেন সকলেই এই লাটভবন ও ব্যারাকপুর পার্কের উন্নতিসাধন করেছিলেন। সেই পার্কই আজকের মঙ্গল পান্ডে পার্ক।

এশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা :
যখন বোর্ড অফ ডিরেক্টরস ওয়েলেসলিকে দেশে ফেরাবার জন্য করার ব্যবস্থা করছে, তখন ওয়েলেসলি একজন পরিবেশপ্রেমী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন।  তারই ফল স্বরূপ তিনি ১৮০০ সালে ব্যারাকপুরে তিনি এক পশুশালা তৈরী করেন। যেটা ব্যারাকপুর চিড়িয়াখানা নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছিল। এই  চিড়িয়াখানায়  বাঘ, সিংহ, হরিণ, ভালুক, বানর, ক্যাঙ্গারু, গন্ডার ও  উট এইসব পশু ছিল বলে শোনা যায়। পরবর্তীকালে আলিপুর চিড়িয়াখানা তৈরী হওয়ার পর এইসব পশু ওখান থেকে আলিপুর চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরিত করা হয়।

বিখ্যাত ঘোড়দৌড় :
১৮০৬ সালে ব্যারাকপুরে ঘোড়দৌড় শুরু হয়েছিল। ঘোড়  দৌড়ের মাঠ  সেই সময় জমজমাট ছিল।কলকাতা থেকেও জনপ্রিয় ছিল এই ঘোড় দৌড়। সেই সময় তৈরী করা হয়েছিল একটা নতুন স্টেডিয়াম। কলকাতা থেকে ঘোড়দৌড় দেখতে আসার সুবিধার জন্য ১৮২৭ সাল নাগাদ রেল লাইন পাতা হয়েছিল। সেনানিবাসের ভিতরেই একটা রেলওয়ে স্টেশনও তৈরী করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য এই ঘোড়দৌড় বন্ধ হয়ে যায়।

ব্যারাকপুরের ইতিহাসের গল্পতো মোটামুটি জানালাম এবার আমার ঘোরার কথায় আসি। গত বছর লক্ষ্মী পুজোর পরের রবিবারে ফেসবুকের "সহযোগী" নামের  একটা গ্রুপের বিজয়া উপলক্ষে দুপুরে  এক মিলন উৎসব ব্যারাকপুরের গঙ্গার পাড়ের একটা বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই গ্রুপের কর্মকর্তা শ্রী বিশ্বজিৎ গুপ্তর অনুরোধে আমায় ওই অনুষ্ঠানে যোগদান করতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানে যোগদানের আগে ও পরে আমি ব্যারাকপুরের কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে নিয়েছিলাম। আজ সেইসব জায়গার কথা আপনাদের জানাব। ব্যারাকপুরের সব দর্শনীয় স্থানই  ইতিহাসের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ।  তা সে  আঠারো - উনিশ শতকের ইতিহাস হোক বা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস হোক। ইতিহাসকে বাদ  দিয়ে এই  শহরের কথা বলা সম্ভব নয়। আমি শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে ব্যারাকপুর স্টেশনে এসে নামলাম।

ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৬২ সালে শিয়ালদহ থেকে অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেল লাইন পেতেছিল। ব্যারাকপুর স্টেশনটা সেই সময়ই চালু করা হয়েছিল। ১৮৬২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ব্যারাকপুরের উপর দিয়ে প্রথম ট্রেন চলেছিল। স্টেশনটা আজ দেখতে দেখতে  ১৫০ টা  বছর অতিক্রম করে ফেলেছে। স্টেশনটা সত্যিই দর্শনীয়। শুধু দর্শনীয় নয়, খুবই সুন্দর। পুরোনো আমলের বাড়ি, দেখলাম স্টেশনটিকে খুব সুন্দরভাবে রক্ষনাবেক্ষন করা হয়। স্টেশনের বাইরে রয়েছে অটো, টোটো ও রিক্সা স্ট্যান্ড রয়েছে। স্টেশন চত্বরেই একদিকে কয়েকটি লস্যির দোকান আর একদিকে ফার্স্ট ফুডের দোকান আছে।  এই স্ট্যান্ড থেকে একটু এগোলে হরেক রকমের দোকান আছে , তার মধ্যে মন হরণ করা বেশ কিছু খাবারের দোকানও রয়েছে দেখলাম। ব্যারাকপুরের বিখ্যাত দাদা-বৌদির বিরিয়ানির দোকানটাও একবার ভালো করে দেখে নিলাম। এইসব খাবারের দোকানের দিকে না তাকিয়ে মনটাকে  শক্ত করে আমি অটো স্ট্যান্ডে ফিরে এলাম। অন্নপূর্ণা মন্দির দর্শনের জন্য এখান থেকে একটা অটো রিক্সা ধরে প্রথমে তালপুকুরে এসে নামলাম।

শিবশক্তি অন্নপূর্ণা মন্দির :
অন্নপূর্ণা মন্দির 
এক মন্দিরটি খুবই প্রাচীন এক মন্দির। মন্দিরটি রানী রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বা দেবী ১৮৭৫ সালে তৈরী করেছিলেন। মন্দিরটি  অবিকল দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের আদলে তৈরী। এই মন্দিরে দেবী অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠিত আছেন। এছাড়া মহাদেবও গর্ভগৃহে বিরাজ করছেন। মন্দিরটির পিছনদিকে ৬ খানা ছোট আকারের শিবমন্দির রয়েছে। একটা সুন্দর নাটমন্দির ও নহবৎখানাও রয়েছে। মন্দিরের পিছনের দ্বার দিয়ে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে। ঘাটটিও খুব সুন্দর করে বাঁধানো। ঘাটটির নাম "রাসমনি ঘাট"। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব চারবার এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন।  ঠাকুরের পদধূলিমাখা মন্দিরটি খুবই সুন্দর। এটি বঙ্গীয় স্থাপত্য শৈলীতে তৈরী নবরত্ন মন্দির। এখানে বেশ শান্ত  ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রয়েছে। মন্দিরটিতে ঢোকার জন্য একটা বিশাল প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রবেশদ্বারের উপরে একটা বিশাল সিংহের মূর্তি রয়েছে। মন্দিরটি দর্শনার্থীদের জন্য সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০ ও বিকেল ৪টা  থেকে রাত্রি ৮টা খোলা রাখা হয়। এখানে কিছুটা সময় কাটাতে মন্দ লাগলো না। তবে  দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের পরিবেশের সাথে এখানকার পরিবেশের  আসমান-জমিন ফারাক রয়েছে।


জগন্নাথ মন্দির 
জগন্নাথ মন্দির:  অন্নপূর্ণা মন্দির যাওয়ার পথে সুন্দর উজ্জ্বল কমলা রঙের একটা মন্দির দেখতে পেলাম। এই মন্দিরটি প্রভু জগন্নাথদেবের মন্দির। মন্দিরটির কারুকার্য খুবই আকর্ষণীয়। মন্দিরটির গেটের উপরে দেবী লক্ষ্মী ও বিষ্ণুর মূর্তি আর নীচের দিকে বিষ্ণুর দশাবতার মূর্তি স্থাপিত রয়েছে।  মন্দিরটির ভিতরে একটা নাটমন্দির ও গর্ভগৃহ রয়েছে। গর্ভগৃহে প্রভু জগন্নাথদেবের সাথে বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তিও  রয়েছে ।

শতবর্ষ অতিক্রান্ত  ব্যারাকপুর পুরসভা :
রিক্সা করে যেতে যেতে পথে পড়ল ব্যারাকপুরের আর এক ইতিহাসের সাক্ষর ব্যারাকপুর পুরভবন। এটা কোনো দ্রষ্টব্যস্থান নয়, তবে অবশ্যই  এক ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান।নবাবী আমলে ব্যারাকপুর ছিল সপ্তগ্রামের অধীন। ১৭৯১ সালে ইংরেজরা এখানে জমি কেনেন।  ১৮৬৯ সালে ব্যারাকপুরে দুটি  পৌরসভা (উত্তর ও দক্ষিণ) গঠিত হয়েছিল।  পরবর্তীকালে সাউথ ব্যারাকপুর পৌরসভা ভেঙে খড়দহ, পানিহাটি, টিটাগড় পৌরসভা গঠিত হয়েছিল। ১৯১৬ সালের ১লা এপ্রিল ব্যারাকপুর পুরসভা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা আজ শতবর্ষ অতিক্রম করে গেছে। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও ব্যারাকপুরের মণিরামপুরে তাঁর পৈতৃক বাসভবনে দীর্ঘদিন বাস করেছিলেন। তিনি প্রায় ৩৪ বছর উত্তর ব্যারাকপুর পুরসভার পুরপ্রধান ছিলেন। তিনি ১লা মে ১৯৮৯ সাল থেকে ১৫ই  অক্টবর, ১৯২১ সাল পর্যন্ত পুরপ্রধান ছিলেন। তারপর তাঁর পুত্র ভবশঙ্কর ব্যানার্জী ৫ই জুন ১৯২২ সাল থেকে ৩রা নভেম্বর ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এখানে পুরপ্রধান হিসেবে কাজ করেছিলেন। ১৯২৫ সালের ৬ই আগস্ট রাষ্ট্রগুরু ব্যারাকপুরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সেই কারণে ব্যারাকপুর পুরসভা খুবই ঐতিহ্যপূর্ণ এক পুরসভা।

বার্থোলোমিউ চার্চ : 
এই চার্চটি তৈরী করা হয়েছিল আঠারো শতকে। ১৮৩১ সালে চার্চটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের ২৬শে আগস্ট ব্যারাকপুর ডায়োসিস আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।  সেই সময় রোনাল্ড উইনস্টন ব্রায়ান বিশপরূপে এখানে  নিযুক্ত হন। তিনি চার্চটির প্রভূত উন্নতি করেন।  সেই সময় থেকেই এই চার্চটি ক্যাথিড্রাল চার্চ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীকালে এখানে ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা থাকত। চার্চটি ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত। চার্চটির স্তাপত্যটিও  বেশ সুন্দর।

গান্ধী ঘাট :
গান্ধী ঘাটের প্রবেশদ্বার 
জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত ঘাট হল এই গান্ধী ঘাট। যখন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ গুরুতর  অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন মহাত্মা গান্ধী তাঁকে দেখতে ১৯২৫ সালের ৬ই মে ব্যারাকপুরে আসেন। ১৯৪৮ সালের ৩০শে  জানুয়ারী যখন মহাত্মা গান্ধী নিহত হন, তখন শাস্ত্র অনুযায়ী ভারতবর্ষের বিভিন্ন নদীতে তাঁর চিতাভস্ম অর্পণ করা হয়েছিল। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী এই ঘাটে জাতির জনকের চিতাভস্ম অর্পণ করেছিলেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ই জানুয়ারী তদকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই ঘাটটির উদ্বোধন করেন। এখানকার দ্রষ্টব্য হল ক্যান্টিলিভার প্রজেকশন, মণ্ডপ ও বিখ্যাত ভাস্কর  সুনীল পালের তৈরী গান্ধী জীবন নিয়ে পোড়ামাটির আলেখ্যটি। ঢোকার মুখেই একটা সুন্দর দ্বার রয়েছে।  দ্বার দিয়ে প্রবেশ করার পর একটু এগোলেই
গান্ধী ঘাট 
গঙ্গার তীরে বেশ সুন্দর একটা মিনার করা আছে।  মিনারটির  সাথে আড়াআড়িভাবে একটা বেশ প্রশস্থ ছাদ রয়েছে।  মিনারটির থেকে ধাপে ধাপে গঙ্গায় যাওয়ার সিঁড়ি নেমে গেছে।  মিনারটি ও সামনের দ্বার দুটিই শ্বেত শুভ্র রঙে রাঙানো রয়েছে।  এই সুন্দর পরিবেশে বসে গঙ্গার মনোরম হাওয়া খেতে বেশ ভালো লাগলো। এখানে কিছুক্ষন বসে এবার জওহরলাল নেহেরুর নামাঙ্কিত পার্কটি দেখতে গেলাম।


জওহরকুঞ্জ  পার্ক :
এই পার্কটি গান্ধী ঘাটের পাশেই অবস্থিত। তিরিশ টাকা টিকিটের মিনিময়ে পার্কটিতে  ঢুকতে হলো। গঙ্গার একদম পাশে ছোট বড় নানারকম গাছে সজ্জিত পার্কটি বেশ নিরিবিলি। পার্কটির ভিতরে একটা ছোট পুকুর আছে। কোথাও উঁচু,  কোথাও নীচু এইভাবে রাস্তাটিকে তৈরী করা হয়েছে।  ভিতরে একটা পাহাড়ি পরিবেশ তৈরী করার চেষ্টা করা হয়েছে। পার্কটিতে কয়েকটা ছাউনি দেওয়া বসার জায়গা রয়েছে। গঙ্গার ধারে এই রকম একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। নদীর মৃদু-মন্দ স্নিগ্ধ হাওয়া আর সাথে পাখিদের কলতানে  কিছুক্ষন বিশ্রাম করে নিলাম। পরিবেশটা বেশ ভালোই লাগছিল। এর পর মঙ্গল পান্ডের নামাঙ্কিত উদ্যানে যাবো।

মঙ্গল পান্ডে উদ্যান :
মঙ্গল পান্ডে উদ্যানটি ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে অবস্থিত। এই উদ্যানে ঢোকার জন্য প্রত্যেকের জন্য ১৫ টাকা আর ক্যামেরার জন্য ৫০ টাকা দিতে হয়।  আমি কড়কড়ে ৬৫টা টাকা গচ্চা দিয়ে উদ্যানটিতে ঢুকলাম। উদ্যানটি  সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যে ৬.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। ভ্রমণার্থীদের  জন্য একদম আদর্শ জায়গা।  উদ্যানটি বেশ সুন্দর।  পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য খুব ভালো জায়গা। উদ্যানটির  মধ্যে কয়েকটি খাবারের স্টলও আছে। একটা বেশ বড় প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখলাম বেশ খোলা মেলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গাটা। উদ্যানের পুরো রাস্তাটি খুব সুন্দর করে বাঁধানো রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে একটু এগোতেই দেখলাম মঙ্গল পান্ডের একটা মূর্তি বসানো আছে। এক জায়গায় দেখলাম দুটি জিরাফের মূর্তি আর এক জায়গায় দেখলাম বাচ্ছাদের জন্য স্লিপ, দোলনা ও আরো কয়েক রকম খেলনা আছে।  দোলনার উল্টোদিকে একটা কামান রাখা আছে।  গঙ্গার ধার বরাবর বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা রয়েছে।  ওই চেয়ারে  বসে কিছুক্ষন সময় কাটানো খুব স্বাদ ছিল, কিন্তু পূরণ হলো না।  সবকটা চেয়ারই  যুবক-যুবতীরা দখল করে রেখেছে। যাইহোক সবুজে মোড়া এক অসাধারণ উদ্যান দেখলাম, মন ভরে গেল।

গান্ধী স্মারক সংগ্রহশালা :
ব্যারাকপুর রিভার সাইড রোডে একদম গঙ্গার ধারে প্রায় আট-নয় বিঘা জায়গা নিয়ে সংগ্রহশালাটি তৈরী করা হয়েছে।  ১৯৬৬ সালের ৭ই মে এটির উদ্বোধন করা হয়েছিল। গান্ধীজি সম্পর্কিত প্রায় হাজার খানেক আলোকচিত্র, বেশ কিছু চিঠিপত্র আছে। সংগ্রহশালাটিতে পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। একটি কক্ষে বেশ বড় একটা দেওয়াল চিত্র রয়েছে, একটি কক্ষে গান্ধীজির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনাকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে  ধরা হয়েছে, একটি কক্ষে গান্ধীজির ব্যৱহৃত বেশ কিছু সামগ্রী রয়েছে, একটি কক্ষে সুন্দর একটা গ্রন্থাগার আছে আর একটা কক্ষে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র রয়েছে দেখলাম। সংগ্রহশালাটি বেশ ফাঁকা। এখানকার এক কর্মচারী বললেন রবিবার সাধারণত একটু ফাঁকা থাকে, অন্যান্য দিন স্কুল -কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড় থাকে। রবিবার সাধারণত বাইরের দর্শনার্থীরা আসে।

যখন মানুষ রোজকার জীবনের যাতাকলে হাঁপিয়ে  ওঠে, তখন সে একটু মনের খোরাক খুঁজতে চায়।  মানুষভেদে মনের খোরাক বিভিন্ন হয়, তবুও বলবো এখানে একদিনের জন্য ঘুরতে  আসলে আপনার মন  অবশ্যই আনন্দে ভরে উঠবে, বিদ্রোহী সিপাহীদের জন্য  শ্রদ্ধায় মাথা নত  হবে।

কিভাবে যাবেন : 
 শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ব্যারাকপুরগামী ট্রেন ধরে সোজা ব্যারাকপুর স্টেশনে এসে নামুন।  স্টেশনের বাইরে অটো, টোটো ও রিকশার স্ট্যান্ড রয়েছে।  এই স্ট্যান্ড থেকে শহরের সবকটা  দ্রষ্টব্যস্থানগুলো ঘোরার  জন্য অটো বা অন্য কোনো গাড়ি ভাড়া করে নিন।  ভাড়া মোটামুটি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো লাগবে। এছাড়া কলকাতা থেকে ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড ধরে সড়কপথেও ব্যারাকপুর আসা যায়।

কোথায় থাকবেন :
যদিও কলকাতা থেকে এখানে ঘোরার জন্য রাত্রিবাসের কোনো প্রয়োজন নেই, তবুও আপনি যদি এখানে রাত্রিবাস করতে চান তাহলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের  মালঞ্চ অতিথি নিবাসে থাকতে পারেন। এই অতিথি নিবাসটি কলকাতা থেকে বুক করতে হবে।


তারিখ : ১৪-০৫-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০



➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো  লাগে, তাহলে   অবশ্যই   আপনার  মূল্যবান  মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Thursday, May 9, 2019

নবাবহাট ১০৮ শিব মন্দির ভ্রমণ >

নবাবহাটে ২৩০ বছরের ইতিহাস 




পশ্চিমবঙ্গের একটি ঐতিহাসিক জেলা হল বর্ধমান জেলা।  এই জেলার প্রতিটি  ইটের গায়ে  জড়িয়ে আছে কত ইতিহাসের গল্প, রাজা-রানীদের নানান কীর্তি। জেলার নানান স্থানে নানারকম স্থাপত্যকীর্তি ছড়িয়ে আছে। এখনো তার কিছু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়, আবার কিছু জরাজীর্ণ ও কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা সর্বমঙ্গলা। তবে রাজ পরিবারের শিব ঠাকুরের প্রতি একটা আলাদা মোহ ছিল। এই জেলাকে শিব ঠাকুরের জেলা বললে ভুল বলা হয় না। সমগ্র জেলাজুড়ে অসংখ্য  শিব মন্দির রয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে  শিবঠাকুর বা মহাদেব পূজিত হয়ে থাকেন। কোথাও প্রতাপেশ্বর, কোথাও রাজেশ্বর, কোথাও পঞ্চানন, কোথাও বুড়োশিব, কোথাও বৈদ্যনাথ, কোথাও বুড়োরাজ নামে শিবঠাকুর পূজিত হন। শিবঠাকুরই এই জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা বলে মনে হয়। বর্ধমান জেলার সবচেয়ে বড় শিব ঠাকুর রয়েছে আলমগঞ্জের মোটা শিব নামে। এই শিবলিঙ্গটিকে বর্ধমানেশ্বর  বলে অভিহিত করা হয়। এই শিব লিঙ্গটির উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট আর ওজন প্রায় ৩৬০ কিলোগ্রাম (৯ টন)।  শোনা যায় ১৯৭২ সালে মাটি খোঁড়ার সময় এই বিশালাকৃতি শিবলিঙ্গটি পাওয়া গিয়েছিল।

বর্ধমান জেলার বর্ধমান শহরের খুব কাছের  একটা ছোট্ট গ্রাম  হল নবাবহাট।  নবাবহাট অঞ্চলেই মুঘলদের সাথে নবাবদের যুদ্ধ হয়েছিল। মুঘল আমলে বর্ধমানের নাম ছিল শরিফাবাদ। আবুল ফজলের  লেখা "আইন ই আকবরী" বইতে এই নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

বর্ধমান জেলা হল  ভারতবর্ষের একমাত্র জেলা যেখানে দু-দুটো ১০৮ শিব মন্দির রয়েছে। ভারতবর্ষের আর কোথাও এরকম শিব মন্দিরের সারিকে দেখা যায় না। বর্দ্ধমানের মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবী সর্বপ্রথম নবাবহাটে ১৭৮৮ সালে একটি ১০৮ শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ধমানের মহারাজ তেজবাহাদুর ১৮০৯ সালে জেলার কালনা শহরে আর একটা ১০৮ শিবমন্দির নির্মাণ করেন। কালনার এই শিবমন্দিরের সারিকে "নব-কৈলাশ শিবমন্দির" বলা হয়। আজ আমি নবাবহাটের শিবমন্দিরগুলোর কথা আপনাদের বলবো। প্রকৃতপক্ষে দুটি স্থানেই ১০৯ টি  করে শিবঠাকুরের মন্দির আছে।

একদা নাবাবহাট গ্রামে ভীষণ দুর্যোগ হয়, মন্বন্তরে  গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। এই সময় মহারাজ তিলকচাঁদের মৃত্যু হয়। তাঁর পুত্র নাবালক থাকায় তিলকরাজের বিধবা পত্নী মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবী কিছুদিন রাজ সিংহাসনে বসেন। মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবীর সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ বাঁধে। ইংরেজরা রানীর বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র করতে থাকে। মহারানী বিষ্ণুকুমারীদেবীর অনুগ্রহে নাবাবহাট গ্রামটি মন্বন্তরের হাত থেকে রক্ষা পায়। তিনি সর্বতোভাবে গ্রামবাসীদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এই সময় অর্থাৎ ১৭৮৮ সালে তিনি মহারাজ তেজপালের দাক্ষিণ্যে গ্রামবাসীদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে নাবাবাহাটে  একটা ১০৮ শিবমন্দির নির্মাণ শুরু করেন। নবাবহাটের মন্দিরগুলোর  নির্মাণ কাজ ১৭৯০ সালে শেষ হয়েছিল।

আমি যখন গতবছর  এই মন্দির দর্শনের জন্য গিয়েছিলাম তখন এরকমই মে মাসের এক ভীষণ গরমের দিন ছিল। মন্দিরের চাতালে পা দেওয়া যাচ্ছিল না। খালি পায়ে ওই গরম পাথরের চাতালেই হেঁটে মন্দিরগুলো দর্শন করতে হল।   মূল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে জুতো  রাখার লোহার একটা সুন্দর রেক রাখা আছে।  এই রেকে  জুতো রেখে তবে মূল মন্দিরে প্রবেশ করলাম।  এখানে জুতো রাখার জন্য সামান্য খরচা বহন করতে হয়।  জুতা রাখার পর একটা কল আছে সেখানে হাত ধুয়ে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হল। মন্দিরে প্রবেশ করার পর দেখলাম ডানদিকে একটা দোতলা বাড়ি আছে, এই বাড়িতে তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়িটির এক তলায় একটা ছোট্ট অফিস ঘর রয়েছে। মন্দিরগুলোর বামদিকে একটা সুন্দর বাগান রয়েছে। সমগ্র মন্দির চত্বরটি সুন্দরভাবে ঘেরা রয়েছে। মন্দির চত্বরের পিছনদিকে পুবদিক ঘেঁষা একটা সুন্দর জলাশয় রয়েছে। জলাশয়ের জল অতটা  স্বচ্ছ বা  পরিষ্কার নয়, একটু হলদেটে ঘোলা জল। জলাশয়টির  জলে গাছপালা ও মন্দিরের প্রতিফলন পড়ছে দেখলাম। প্রতিফলনটা দেখতে মন্দ লাগলো না।  সমগ্র জলাশয়টি লোহার জাল  দিয়ে ঘেরা রয়েছে। সামনের দিকে শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। পুরো  জলাশয়টির  পাড় সুন্দর করে বাঁধানো আছে।  জলাশয়ে  প্রবেশ করার জন্য কয়েকটা লোহার গেট করা আছে। জলাশয়টি ঠিক  একদম গোলাকৃতি  নয়, একটু লম্বাটে ধরনের। জলাশয়টির গেটের পাশে একটা বিজ্ঞপ্তি লাগানো আছে "জল নেওয়ার প্রয়োজন হলে মালির কাছ থেকে চাবি আছে, চাবি চেয়ে নিয়ে জল নেবেন এবং চাবি যথাস্থানে ফেরত দেবেন"। দুটি সারিতে ১০৮টি ও আর একটা আলাদাভাবে শিব মন্দির রয়েছে। এখানে মোট ১০৯টি শিব মন্দির রয়েছে। একটা নাটমন্দিরও রয়েছে দেখলাম। একটা মন্দিরের সাথে আর একটা মন্দির গায়ে  লাগানো, দুটি মন্দিরের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই।  সারা বছরই এখানে প্রচুর ভক্তের সমাগম হতে দেখা যায়।  মন্দির চত্বরের ভিতরে অফিস  ঘরের কাছে একটা জায়গায় লোহার ফ্রেমে ১০৮টি  ঘন্টা রাখা আছে। ঘণ্টাগুলো সম্পূর্ণ পিতলের তৈরী। ঘন্টাগুলি খুব বড় আকারের নয়, আবার একদম ছোটোও  নয়, মাঝারি মাপের।  সবাইকে দেখলাম  মন্দির দর্শন করার পর এখানে এসে এই  ঘণ্টাগুলো বাজাচ্ছে। ঘন্টা বাজনোয় অঞ্চলটিতে একটা মিষ্টি সুরেলা আবহাওয়া তৈরী করছে। কথিত আছে মন্দির দর্শনের পর এই ঘন্টা বাজালে নাকি মনস্কামনা পূরণ হয়।

কালনার নব কৈলাশ শিবমন্দিরের মতো এখানকার মন্দিরগুলো বৃত্তাকারে নয়, এখানে দুটি লম্বা সারিতে মন্দিরগুলোকে সাজানো হয়েছে। কালনার শিবমন্দিরগুলি যেন ফুলের মালায় ১০৮টি ফুলকে গেঁথে একটা মন্দিরমালা তৈরী করা হয়েছে। নবাবহাটের মন্দিরগুলো ঠিক ওইভাবে তৈরী নয়। এখানকার মন্দিরগুলো দুটি সারিতে সারিবদ্ধভাবে তৈরী করা হয়েছে।  মন্দিরগুলো আকারে বেশ ছোট। মন্দিরগুলোর উচ্চতা মোটামুটি পনেরো ফুটের মত হবে বলে আমার মনে হল। নাবাবাহাটের মন্দিরগুলি বাংলার আটচালা শিল্পরীতিতে তৈরী। সব কটা মন্দিরেই সামান্য টেরাকোটার কাজ রয়েছে। মন্দিরগুলির কোনোটাতে কোনো দরজা নেই। প্রত্যেকটা মন্দিরে শিব লিঙ্গ বিরাজ করছে। প্রতিটা শিবলিঙ্গই  কালো রঙের কোষ্ঠী পাথরের তৈরী।মন্দিরগুলো দেখলে বোঝা যায় সত্যিই  এক অসাধারণ শিল্পকীর্তি। মহারানী বিষ্ণুকুমারী দেবীর এক মহান কীর্তি এই শিবমন্দিরগুলো।  মন্দিরগুলো বর্ধমানের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

 এককালে এই মন্দিরগুলো জরাজীর্ন অবস্থায় চলে গিয়েছিল। ১৯৬৫ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সহযোগিতায় মন্দিরগুলোকে সংস্কার করা হয়েছে।  ১৯৭৪ সালে একটা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।  বর্তমানে মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষন থেকে নিত্যপূজা সবকিছুই এই ট্রাস্টিবোর্ড দেখাশোনা করে থাকে। প্রতিবছর শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে একটা বিশাল মেলা বসে।  সেই সময় এখানে নানান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে।  এই মেলায় প্রায় লাখ খানেক লোকের সমাগম হয়।

মন্দিরের প্রবেশদ্বারের পাশেই বাইরের দিকে কৃত্রিম পাহাড় তৈরী করা হয়েছে। এই  পাহাড়ের  উপর শিব-পার্বতী ও হনুমানজির মূর্তি রয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গনটি ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।  আমি যখন এই মন্দির দর্শনে যাই তখন একজন পুরোহিত মহাশয়কে দেখছিলাম অনেক খুঁজেও অন্যান্য মন্দিরের মত  কোনো পান্ডাকে এখানে  দেখতে পাইনি। পুরোহিত মহাশয় অন্যের পুজোয় ব্যস্ত থাকায় নিজের পুজো নিজেকেই দিতে হয়েছিল। এখানকার পরিবেশ আমার খুবই ভালো লেগেছিল। আপনারা বর্ধমান স্টেশন থেকে মাত্র দু-তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দিরটি দেখে আসতে পারেন। আশাকরি আমার মতো আপনাদেরও ভালো লাগবে।  মন্দির দেখার পর অবশ্যই বর্ধমানের বিখ্যাত মিহিদানা-সীতাভোগ খাবেন। বর্ধমানের এই  স্বাদ নিতে  ভুলবেন না।

মন্দিরগুলো সকাল আটটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত আর দুপুর তিনটে থেকে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত সর্ব সাধারণের  জন্য খোলা থাকে। দেখছিলাম একটা বোর্ডে কিছু নিয়মকানুন লেখা আছে। মন্দিরের ভিতরে কোথাও বসবেন না। মন্দিরের ভিতরে বা আশপাশে কোনোরূপ অশালীন আচরন করবেন না বলে বোর্ডটিতে লেখা আছে। তবে কোথাও ছবি তোলায় কোনো বারণ আছে, এই ধরণের কোনো বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়লো না।  আমি তো ইচ্ছে-খুশী মতো এখানে ছবি তুলেছিলাম। মন্দিরগুলো ২৫০ বছর ধরে বর্ধমানের ঐতিহ্যকে  বহন করে চলেছে।


কিভাবে যাবেন :
হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে করে বর্ধমান স্টেশনে এসে নামুন। স্টেশনের বাইরে প্রচুর অটো ও টোটোগাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে।  একটা গাড়ি বুক করে এখানে খুব সহজেই পৌঁছানো যাবে। গাড়ি করে আসলে বর্ধমান থেকে  জি টি রোড ধরে কিছুটাএগোলে ডানদিকে সিউড়ি রোড পড়বে।  এই সিউড়ি রোড ধরে সামান্য পথ এগোলেই এই মন্দিরগুলিকে দেখা যায়।




তারিখ : ১০-০৫-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো  লাগে, তাহলে   অবশ্যই   আপনার  মূল্যবান  মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, April 28, 2019

শতবর্ষের আলোকে মান্না দে >


শতবর্ষের আলোকে মান্না দে



বিংশ শতাব্দী ভারতীয় খেলাধুলা ও  সংস্কৃতি  জগতে এক বিস্ময়ের শতাব্দী, বলা যায় বহু নক্ষত্র সমাবেশের শতাব্দী। খেলাধুলার  জগতে,  সাহিত্য জগতে, অভিনয়ের  জগতে,  সংগীত জগতে এই শতাব্দী বিশ্বে তথা ভারতবর্ষে  অজস্র নক্ষত্রের জন্ম দিয়েছিল। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের নিজ নিজ জগৎকে অসামান্য দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন। এই শতাব্দীতেই  ভারতীয়  সংগীত জগতে কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দের জন্ম হয়েছিল।  সংগীত জগতে  তাঁর  উজ্জ্বল পদার্পন ভারতীয় সংগীতকে এক উচ্চ আসনে বসিয়েছিল। তাঁর অধ্যাবসায় তাঁকে ভারতীয়  সংগীত জগতে এক নক্ষত্রে পরিণত করেছিল।   ২০১৯ সালের ১লা মে দেখতে দেখতে তাঁর জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হতে চলল। দিকে দিকে তাঁর শতবর্ষই উদযাপন করা হচ্ছে। 

যখন আমার বারো - তেরো বছর বয়স তখন আমি  "বিনাকা সংগীতমালা" অনুষ্ঠানে ওনার গান শুনে আমি প্রথম এই কণ্ঠ মাধুর্যের সাথে পরিচিত হই। তারপর থেকে এই কণ্ঠ আমার জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে  জড়িয়ে গেছে।  আমার কৈশোরের প্রথম প্রেমই এই গায়কীর সাথে। সেই প্রেম আজও আমায় সমানভাবে আকর্ষণ করে রেখেছে, হয়তো আমার জীবনের শেষ নিঃশাস পড়া অবধি এই প্রেমের বন্ধন অটুট থাকবে। কয়েকদিন  যদি এই কণ্ঠ  বা এই গায়কী না শুনি এখনো  আমার মনটা উতলা হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমি অন্তত খান তিরিশেক ওনার গানের  প্রোগ্রাম শুনেছি, তার মধ্যে ১৮টা একক প্রোগ্রাম ছিল, যা আমার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। ওনার গানের সাথে রাধাকান্ত নন্দীর যুগলবন্দী, পরবর্তীকালে রাধাকান্ত নন্দীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মানিক নন্দীর যুগলবন্দী কোনদিন ভুলতে পারবো না। গায়ক ও তবলচির কি অসাধারণ বোঝাপড়া ছিল যা চোখে না দেখলে বলে বোঝানো  যাবে না।

মান্না দে, আজ এই সুন্দর ভুবনের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন ঠিকই। কিন্তু আজও সমগ্র ভারতবাসীকে তিনি তাঁর সুরমূর্ছনায় মাতিয়ে রেখেছেন। তাই তো এখনকার পরিচিত গায়ক অঞ্জন দত্ত ভক্তদের মনের কথা বলেছেন " আর বিরহের কথা এলে, বুকের জ্বালা ভুলে, আজও মাঝে মাঝে গাই মান্না দের গান"। প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ , ভক্তি , বন্ধুত্ব, উন্মাদনা মানব জীবনের সব ধরণের অনুভূতির প্রকাশ মান্না দের গানে বার বার এসেছে। তাঁর  গায়কি  দিয়ে তিনি সমগ্র দেশবাসী তথা পৃথিবীর মানুষকে মন-মুগ্ধ করে রেখেছেন।  ক্ল্যাসিক্যাল, সেমি -  ক্ল্যাসিক্যাল, গজল, আধুনিক গানে শুধু নয়, রক এন্ড রোল গানেও তাঁর পারদর্শিতার প্রমাণ  তিনি রেখে গেছেন। বাংলা ও হিন্দি ছাড়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় তিনি গান গেয়ে গেছেন। যার কণ্ঠে খেলা করতো সংগীতের সাত সুর।  তিনি সুরের চলনে সঞ্চার করতে পারতেন নাটক।  কঠিন গানকে কত সহজভাবে তিনি গাইতে পারতেন তার নমুনা বোধহয় "লাগা চুঁনড়ি মে দাগ" বা পড়াসন  চলচ্চিত্রের  "এক চতুর নার"। তাঁর এই ক্ষমতা অকল্পনীয় ছিল। বৈচিত্রের বিচারে সংগীতবোদ্ধাদের কাছে তিনি সর্বকালের সেরা গায়ক বলে বিবেচিত। তিনি বহু  ভাষায় বহু গান গেয়েছিলেন ঠিকই, তবে হিন্দি ও বাংলা গানে তাঁকে  কিংবদন্তি বলে ধরা হয়।

"ও কেন এত সুন্দরী হল" বা "এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি" গানের মাধ্যমে তিনি ব্যর্থ প্রেমিকের মনের  যন্ত্রনা যেমন ফুটিয়ে  তুলেছেন। তেমন  "সে আমার ছোট বোন" গানটিতে তিনি তাঁর  স্নেহ মায়া সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। "আমায় একটু জায়গা দাও,মায়ের মন্দিরে বসি" গানটিতে তাঁর শ্রদ্ধা-ভক্তিকে সুনিপুনভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন, যা  শুনলে যে কোনো শ্রোতার চোখ জলে ভিজে যায়। মান্না দের গানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তার গানের পরিধি বাঙালি জীবনের প্রত্যেকটা  ধাপের সাথে মিশে আছে।  আমাদের সব অনুভূতি বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ তাঁর গানে গানে প্রকাশিত হয়েছে। তাই তো তিনি "সারা  জীবনের গান" বা " সারা বছরের  গান" গেয়ে  ছিলেন।

 একশো বছর পূর্বে অর্থাৎ  ১লা মে  ১৯১৯ সালে উত্তর কলকাতার ৯ নং মদন ঘোষ লেনের এক মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা  পূর্ণ চন্দ্র দে আর মাতা ছিলেন মহামায়া  দেবী। তিনি শৈশবে ইন্দু বাবুর পাঠশালায়, পরে  স্কটিশ চার্চ স্কুল ও স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন এবং বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক হন। স্নাতক হওয়ার পর তাঁর পড়াশুনার পাঠ তিনি সাঙ্গ  করেন। তাঁর কাকা বিখ্যাত সঙ্গীতাচার্য কৃষ্ণ চন্দ্র দে তাঁকে সংগীতের প্রতি বরাবর অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করতেন। মান্না দের  যেমন সংগীতের প্রতি আকর্ষণ ছিল তেমন কুস্তি, বক্সিংয়ের প্রতিও খুব আগ্রহ ছিল। তিনি নিয়মিত বক্সিং চর্চা করতেন এবং খুবই পারদর্শী ছিলেন এই সব খেলায়। পড়াশুনার পাঠ সাঙ্গ  করার পর তিনি তাঁর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দের ছত্রছায়ায় সংগীত চর্চ্চা শুরু করেন। উস্তাদ  দাবির খাঁর কাছে তিনি সংগীতের তালিম নেওয়াও শুরু করেন। পরবর্তীকালে মুম্বাই যাওয়ার পর তিনি উস্তাদ আমন আলী খাঁ ও উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছে হিন্দুস্তানী সংগীতের তালিম নেন।

১৯৪২ সালে তিনি মুম্বাই পাড়ি দেন। প্রথমে তিনি কাকার সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তারপর শচীন দেববর্মন ও ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ ও অন্যান্য সুরকারদের অধীনে কাজ করেন।  কাজ করতে করতে তিনি স্বনামধন্য গীতিকারদের সংস্পর্শে আসেন। এইভাবে কিছুদিন চলার পর তিনি স্বাধীনভাবে সংগীত পরিচালনার কাজ শুরু করেন।

১৯৪৩ সালে "তামান্না" নামে একটা ছবিতে তাঁর কাকার সুরে প্রথম গায়ক হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে। "জাগো আই উষা" গানটি তিনি সুরাইয়ার সাথে দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছিলেন। এই গানটা তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ১৯৫০ সালে শচীন দেববর্মনের সুরে "মশাল" ছবিতে তিনি প্রথম এককভাবে গান গেয়েছিলেন।  এই গানটাও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই গানটাই তাঁকে পাকাপোক্ত গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীকালে  তিনি বহু সুরকারের সুরে বহু জনপ্রিয় গান গেয়ে গেছেন। ১৯৫৩ সালে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় নিজের সুরে "কত  দূরে আর নিয়ে যাবে বল" ও  "হায় হায় গো , রাত যায় গো"  গান দুটি  তাঁর  গাওয়া প্রথম বাংলা গান। পুজোর সময় গান দুটি প্রকাশ হওয়ার পর সুপার হিট হয়।  ১৯৬৭ সালে এন্টনি ফিরিঙ্গি সিনেমায় উত্তমকুমারের লিপে গাওয়া সব কটা গান আজও বাঙালির হৃদয়কে মোহিত করে রাখে। তিনি যেমন আরতি  মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও লতা মঙ্গেশকরের সাথে দ্বৈত কণ্ঠে বাংলা সিনেমায় বেশ কিছু জনপ্রিয় গান গেয়েছিলেন। তেমন  অনিল বাগচী, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে বাংলা চলচ্চিত্রেও  অনেক গান আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন। বাংলা আধুনিক গানে পুলক বন্দ্যোপাধ্যাযের লেখা ও নিজের সুরে গাওয়া গানগুলি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে সুপর্ন কান্তি ঘোষের সুরে বেশ কিছু বিখ্যাত গান তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। তার মধ্যে কফি হাউসের গানটি তো চিরকালীন শ্রেষ্ঠ গান হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে।  তিনি সব ভাষা মিলে  প্রায়  হাজার চারেক গান গেয়েছেন।

মান্না দে শুধু গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না. তিনি একজন নামজাদা সংগীত পরিচালকও ছিলেন। ১৯৪০ সালে যখন তাঁর বয়স ২১ বছর তখন তিনি শৈলেশ রায়ের কথায় "ওগো দূরের ধ্যানে" ও "বালুকাবেলায় অলস খেলায়" এই দুটি গান সুপ্রীতি ঘোষকে দিয়ে রেকর্ড করিয়েছিলেন। রেকর্ডে অবশ্য সুরকার হিসেবে প্রবোধ চন্দ্র দের  নাম উল্লেখ করা আছে।  তখন তিনি মান্না নামটি মনে হয়  ব্যবহার করতেন না। এরপর তিনি বহু বাংলা ও হিন্দি ছায়াছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছেন।  তিনি নিজের সুরে নিজে যেমন গেয়েছেন তেমন প্রচুর নামি-অনামী শিল্পীদের দিয়েও গান গাইয়েছেন। তাঁর সুরের মধ্যে সবসময় শাস্ত্রীয় সংগীতের ছোঁয়া  প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। ছায়াছবি ছাড়াও প্রচুর নন ফিল্মি গানে তিনি সুর দিয়ে গেছেন। ১৯৭৬ সালে পুজোর সময় আশা ভোঁসলেকে দিয়ে গাইয়েছিলেন "আমি খাতার পাতায় লিখেছিলাম", ও সুমন কল্যাণপুরকে দিয়ে গাইয়েছিলেন "কাঁদে কেন মন আজ" এবং "শুধু স্বপ্ন নিয়ে খেলা চলছে ", ১৯৭৮ সালে হৈমন্তী শুক্লাকে দিয়ে  গাইয়েছিলেন  "আমার বলার কিছু ছিল না"। এছাড়া প্রতিবছর তিনি নিজের সুর করা গানগুলো নিজেই গেয়ে গেছেন।  সবকটা গানই জনপ্রিতার শীর্ষে পৌঁছেছিল। কণ্ঠ  অনুযায়ী আদর্শ সুর নির্বাচন করার ক্ষমতা তাঁর ছিল।

১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী ও ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ খেতাব তিনি ভারত সরকারের থেকে লাভ করেন। ২০০৪ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০০৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট্ সম্মানে সম্মানিত হন।  ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রদান করে।  এছাড়া দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার, বহু প্রাদেশিক সরকার ও প্রতিষ্ঠান থেকে বহু সম্মানে তিনি সম্মানিত হয়েছেন।

১৯৫৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর তিনি কেরালার কন্যা সুলোচনা কুমারনকে বিবাহ করেন।  ১৯৫৬ সালের ১৯শে অক্টোবরে তাঁর প্রথম কন্যা সুরমা ও ১৯৫৮ সালের ২০শে  জানুয়ারী  তাঁর  কনিষ্ঠা  কন্যা সুমিতা জন্মগ্রহণ করে।  তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর মুম্বাইয়ে বসবাস করেন।  তবে কলকাতার পৈতৃক বাড়িতে তিনি প্রায়ই যাতায়াত করতেন। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর শেষ জীবনটা তিনি তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা সুমিতার কাছে ব্যাঙ্গালোরে কাটান। ২০১৩ সালের ২৪শে অক্টোবর ব্যাঙ্গালোরে তাঁর  মৃত্যু হয়। "শেষ পাতা গো, শাখায় তুমি থাকো" শেষ পর্যন্ত সেই পাতা ঝড়েই গেছে, কিন্তু শ্রোতারা সব সময়ই তাঁর গাওয়া গানগুলোকে মনে মনে গুন্ গুন্ করবে। মুকুটটা পড়েই আছে, শুধু রাজা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।

নিয়ম, নিষ্ঠা, অধ্যাবসায়, শিক্ষা ও রেওয়াজে সাজানো যেন এক সংঙ্গীত মন্দির, যে মন্দিরে একনিষ্ঠ পূজারী ছিলেন মান্না দে। প্রবাদপ্রতিম এই সংগীতশিল্পী আজ আমাদের মধ্যে নেই ঠিকই, কিন্তু মহাসিন্ধুর ওপার থেকে ভেসে আসা তার গানের অপেক্ষায় আমরা চিরকাল রয়ে যাবো।  কাগজ বা পাথরে তাঁর  নাম আমরা না লিখে আজও আমাদের হৃদয়ে  লিখে রেখেছি এবং তা রয়ে যাবে।




তারিখ :  ১লা মে, ২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০
➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Sunday, April 21, 2019

ঢাকুরিয়া লেক Lake >

প্রেমিক প্রেমিকাদের নিজস্ব ঠিকানা 


লেক ও রাস্তা 
আমাদের তিলোত্তমার শ্বাসযন্ত্র। কলকাতার ফুসফুস।  প্রেমিক-প্রেমিকাদের একান্ত ঠিকানা। যুগলদের স্নিগ্ধ বাতাসে বসে একান্তে কিছুটা সময় গল্প করে কাটানোর নিজস্ব জায়গাই হল  দক্ষিণ  কলকাতার বুকে গড়ে তোলা এই কৃত্রিম হ্রদটি। হ্রদটির পূর্বের নাম ছিল ঢাকুরিয়া লেক বর্তমানে অবশ্য  রবীন্দ্র সরোবর নামে  পরিচিত। এটি শহরের এক অন্যতম  বিনোদন পার্ক।  

দুরন্ত গতিতে চলা আমাদের ঐতিহ্যশালী তিলোত্তমা কলকাতা। বায়ুদূষণে যখন আমাদের তিলোত্তমাবাসীদের অবস্থা কাহিল, তখন তরতাজা নির্মল নিশ্বাস নেওয়ার জন্য এই হৃদটিতে এসে মন প্রাণ ভরে  তুলতে পারেন। এক টুকরো আকাশ, সুদীর্ঘ জলরাশি, প্রচুর গাছ দিয়ে সাজানো গোছানো এক মনোরম পরিবেশ যা আপনার জন্যই  অপেক্ষা করে রয়েছে।
লেকের রাস্তা 

উনিশ শতকের প্রথমদিকে কলকাতার দক্ষিণ অঞ্চলটির বেশিভাগ জায়গাই জলে-জঙ্গলে ভর্তি ছিল। বসবাসের জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিল না। ১৯২০ সালে কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট কলকাতার দক্ষিণ অঞ্চলের উন্নতিকল্পে রেল লাইনের ধার বরাবর ঢাকুরিয়া, লেক গ্রার্ডেন্স, টালিগঞ্জের বেশ কিছুটা অঞ্চলকে নিয়ে ১৯২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। রাস্তাঘাট তৈরী, নীচু  জমি উঁচু করে  বসবাসযোগ্য করে তোলাই ছিল তাদের  এই  জমি  অধিগ্রহনের একমাত্র কারণ। এই অধিগৃহীত জমির জঙ্গল পরিষ্কার করে ৭৩ একর জায়গা নিয়ে তারা একটি  বৃহৎ হ্রদ খনন করে। বাকি অংশটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়। এই বৃহৎ হৃদটিই আজকের রবীন্দ্র সরোবর। আমাদের শহরের প্রাণভ্রমরা।

হ্রদটি প্রথম থেকেই ঢাকুরিয়া লেক বলে পরিচিত ছিল। ১৯৫৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নামানুসারে কে আই টি হ্রদটির নামকরণ করে। জলাশয়টি ছাড়া এখানে তারা তৈরী করে ফুটবল স্টেডিয়াম, মুক্তমঞ্চ, ঝুলন্ত সেতু। এছাড়া এখানে বৌদ্ধ মন্দির, মসজিদ ও একটা গ্যালারিও রয়েছে। জলাশয়টিকে ঘিরে সুন্দর রাস্তা ও বসার জন্য বেশ কিছু চেয়ার তৈরী করা আছে।

ফুটবল স্টেডিয়ামটির নামও বিশ্বকবির নামে  নামাঙ্কিত। রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামটি ১৯৫০ সালে হ্রদটির উত্তরদিকে তৈরী করা হয়েছিল। ছাব্বিশ হাজার আসনবিশিষ্ট এক সুন্দর ফুটবল স্টেডিয়াম।  অডিও -ভিসুয়ালের সুবিধাযুক্ত এটিই  কলকাতার প্রথম স্টেডিয়াম।
সূর্যাস্তের আলোকচ্ছটা 

হ্রদটির উত্তরদিকে কেয়াতলার কাছে বিদ্রোহী কবি নজরুলের নামে  একটা বিশাল মুক্ত মঞ্চ রয়েছে। এই মঞ্চটিতে প্রায় তিন  হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা আছে। এখানেই পৃথিবী বিখ্যাত ডোভার লেন মিউজিক উৎসবটি প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়।  এছাড়া সারা বছরই নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

হ্রদটির দক্ষিণদিকে গোলপার্কের ঠিক পিছনে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারের ঐতিহ্যশালী বাড়িটি রয়েছে। এখানে বড়দের ও শিশুদের দুটি  পাঠাগার, দেশী ও বিদেশী ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র, মিউজিয়াম, প্রার্থনা ঘর, প্রকাশনা বিভাগ  ও  পুস্তক বিপনী রয়েছে। রামকৃষ্ণ মঠের এই শাখা কেন্দ্রটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির  এক অসাধারণ চর্চা কেন্দ্র।

জাপানি বৌদ্ধ মন্দির
জলাশয়টির দক্ষিণদিকে ঢাকুরিয়া চৈতন্য মহাপ্রভু সেতুর পাশে অবস্থিত অসাধারণ একটি বৌদ্ধ মন্দির। আন্তর্জাতিক সংগঠন নিপ্পনজান মোয়োহোজির প্রতিষ্ঠাতা নিচিদাৎসু ফুজি কলকাতার একমাত্র জাপানি বৌদ্ধ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৫ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এখানে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় বেশ ভক্তিভরে প্রার্থনা করা হয়।

হ্রদটির দক্ষিণদিকে একটা সুন্দর ঠাকুরের গ্যালারী রয়েছে। এই গ্যালারীতে বিখ্যাত বেশ কিছু সার্বজনীন দূর্গা পুজোর পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিমাগুলো কে সযত্নে সংরক্ষিত করে রাখা আছে। ২০১২ সালে এই গ্যালারীটিকে তৈরী করা হয়েছে।

 জলাশয়টির দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকে বেশ কয়েকটা সাঁতার ও রোয়িং প্রশিক্ষণের কেন্দ্র রয়েছে। এইসব প্রশিক্ষণ  কেন্দ্রগুলো বহু পুরোনো।  এখান থেকে বহু শিক্ষার্থী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে।

সেই ঐতিহাসিক কামান 
১৯২০ সালে যখন হ্রদটির  খননকার্য চালানো হচ্ছিলো  তখন ইংরেজ আমলে তৈরী  কতকগুলি কামান এখানে  পাওয়া গিয়েছিল। সেই কামানগুলি দূর্গা গ্যালারীর  কাছে আজও সগৌরবে বিরাজ করছে।

হ্রদটির দক্ষিণদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা পূর্ণবয়ব ভাস্কর্য রয়েছে। প্রতি বছর  রবীন্দ্রনাথের  জন্ম ও মৃত্যুরদিন সকালে ফুল-মালা দিয়ে কবিকে সম্মান জানানো হয়।

হ্ৰদটির  মধ্যভাগে একটা ছোট্ট সুন্দর দ্বীপ  রয়েছে। এই দ্বীপটির মধ্যে একটা মসজিদ আছে।  এই মসজিদটি হ্রদটি খনন করার পূর্ব থেকেই রয়েছে।  এই দ্বীপটিতে যাওয়ার জন্য ভারী সুন্দর একটা ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। ১৯২৬ সালে
ঝুলন্ত সেতু 
সেতুটিকে নির্মাণ করা হয়েছিল। সেতুর ওপর থেকে জলে খেলে বেড়ানো মাছেদের জলকেলির দৃশ্যটি খুব মনোরম লাগে।

শাল, সেগুন, আম, অশ্বত্থ, বট প্রভৃতি বড় বড় গাছ সমগ্র হৃদটিকে ঘিরে রেখেছে।  শোনা যায় প্রায় পঞ্চাশ রকমের গাছ এখানে রয়েছে, তারমধ্যে বেশ কিছু গাছের বয়স শতবর্ষ  পেড়িয়ে গেছে।  গাছগুলি ঐতিহ্যশালী হ্রদটির পরিবেশকে সবুজ ও মনোরম করে তুলেছে। বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় গাছ এখানে দেখা যায়। হ্রদের জলে রাজহাঁসের খেলে বেড়ানোর দৃশ্যও মন ভরিয়ে দেয়।

সরোবরটিতে  পাঁচটি প্রবেশ পথ রয়েছে।  প্রবেশ পথগুলির টাইলসে রবীন্দ্রনাথের লেখনী দিয়ে চিত্রিত করা আছে।  সরোবরের জলাশয়টির পাশের রাস্তাগুলোকে  টাইলস দিয়ে সুন্দর করে বাঁধানো হয়েছে।  জলাশয়ের রেলিংগুলোতে বোলার্ড লাগানো হয়েছে।  বোলার্ড হচ্ছে আবহাওয়া প্রতিরোধকারী এক প্রকার দর্শনীয় সৌর আলো।  সন্ধ্যের সময় যখন আলোগুলো জ্বলে ওঠে তখন লেকের সৌন্দর্য দ্বিগুন  করে তোলে। নিরাপত্তার করণে চারদিকে আরো কিছু অন্য ধরণের আলো দিয়ে সাজিয়ে  তোলা হয়েছে। লেকের দেয়ালগুলোতেও  বেশ কিছু জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রের চিত্র চিত্রিত করা হয়েছে। সব সময় এখানে  পাখীদের কলতানে ভরে থাকে।  শীতকালে এখানে বেশ কিছু অতিথি পাখীদের দেখা মেলে। প্রতিদিন ভোরবেলা  ও সন্ধ্যের সময় বহু স্থানীয় বাসিন্দাদের এখানে ভ্রমণ করতে দেখা যায়।

বিশ্বকবির ভাস্কর্য 
বর্তমানে সরকারি তরফ থেকে রবীন্দ্র সরোবরের সৌন্দর্যায়নের জন্য নতুন  একগুচ্ছ পরিকল্পনা করা হয়েছে।  সরোবরের চারদিকে বসার জন্য নতুন করে বেশ কিছু বেঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে।  আগের শিশু উদ্যানের মতো একটা নতুন শিশু উদ্দ্যান তৈরী করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। হ্রদের জলকে পরিষ্কার করে পরিবেশের সঙ্গে মানানসই করা হচ্ছে।  ছট পুজো করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কুকুর নিয়ে এই সরোবরে ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এইসব সৌন্দর্যায়নের কাজে প্রাতঃভ্রমণকারীদের সংগঠন সর্বতোভাবে  সহযোগিতা করছে।  "ত্রুমিত্র" নামে এক প্রকল্পের মাধ্যমে এখানকার বিশাল বিশাল গাছগুলোকে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।  এই প্রকল্পে নতুন নতুন গাছও  বসানো হচ্ছে।

দূর্গা গ্যালারির প্রতিমা 
আধুনিক সাজসজ্জা , বর্ণিল আলোকচ্ছটা, হ্রদের জলে সূর্যাস্তের রঙে রঙিন হয়ে ওঠা, গাছের ফাঁকে আলো-আঁধারি খেলা, এই আবছা আলোয় যুগলের গল্পে মশগুল থাকা, বাচ্ছাদের দুরন্তপণা  সবমিলে এখানকার স্নিগ্ধ, সুমধুর পরিবেশ শহরবাসীকে সবসময় প্রলুব্ধ করে চলেছে। এখানে আসলে একান্তে নিরিবিলি পরিবেশে  বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করা যায়। দৈনন্দিন কাজের পরিশ্রম  থেকে  কিছুটা সময় বের করে এখানে কাটাতে পারলে পরেরদিন নতুন উদ্দ্যমে নতুনভাবে কাজে মন দিতে সুবিধা হয়।




তারিখ : ২১-০৪-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব অধিকার : সুদীপ্ত মুখার্জী

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Saturday, April 13, 2019

অন্নপূর্ণা মন্দির >

প্রতিরূপ


মূল মন্দির 
দেবী অন্নপূর্ণা বা অন্নদা হলেন পার্বতীর এক রূপ।  দেবী অন্নপূর্ণা  হলেন দ্বিভূজা। তাঁর  এক হাতে থাকে অন্নের  পাত্র আর অন্য হাতে থাকে দর্বী অর্থাৎ  হাতা।  চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে দেবী পূজিত হন।  কাশীতে ১৭২৫ সালে নির্মিত ভারতবর্ষের অন্যতম জাগ্রত অন্নপূর্ণার মন্দিরটি আছে। এছাড়া অন্যান্য বহু স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবী অন্নপূর্ণার বহু মন্দির আছে। অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রভাবেই দেবী অন্নপূর্ণার পূজা চালু হয়। কথিত আছে যে নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার মহাশয় বাংলায় সর্বপ্রথম অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন।  

১৮৪৭ সালে রানী রাসমণি দাস-দাসী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে  নিয়ে কাশী যাত্রা করেন। তাঁর  উদ্দেশ্য ছিল কাশীর মাকে দর্শন করা ও ভক্তিভরে মায়ের পুজো দেওয়া। কিন্তু যাত্রাপথে একদিন রাতে রানী স্বপ্নাদেশ পান যে "কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ভাগীরথীর তীরে একটা মনোরম পরিবেশে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করে পুজো ও ভোগের ব্যবস্থা কর, আমি নিজে আবির্ভূত হয়ে তোর কাছ থেকে নিত্যপূজা গ্রহণ করব"। ভক্তিপরায়ণা রানী এইরূপ আদেশ লাভের পর তাঁর  কাশীযাত্রা স্থগিত করে দেন। তাঁর সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তিনি ১৮৫৫ সালে দক্ষিনেশ্বরে মা ভবতারিনীর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন ।

মন্দিরে পঙ্খের কাজ 
রানীর কনিষ্ঠ জামাতা মথুরনাথ বিশ্বাসেরও বহুকালের ইচ্ছা ছিল কাশীতে গিয়ে শ্রী শ্রী বিশ্বেশ্বর ও মা অন্নপূর্ণার দর্শন ও ষোড়শ  প্রচারে পুজো দেওয়ার। রানীর কাশী যাত্রা স্থগিত হয়ে যাওয়ায় মথুরবাবুর বাসনা পূর্ণ হয়নি। তখন থেকেই তিনি দক্ষিনেশ্বরের কাছে দেবী অন্নপূর্ণার একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য  মনে মনে বাসনা পোষণ করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তিনি তাঁর মনোবাঞ্ছা পূরণ করে যেতে পারেননি। রানীর চতুর্থ কন্যা অর্থাৎ মথুরবাবুর সহধর্মিনী জগদম্বাদেবী মথুরবাবুর ইচ্ছাপূরণের ব্যবস্থা করেন। তিনি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের  অনুমতি নিয়ে ১৮৭৫ সালে গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চল চানকে মা অন্নপূর্ণার এক বিশাল মন্দির নির্মাণ করেন। অতীতের চানকই বর্তমানের ব্যারাকপুর। ব্যারাকপুরের তালপুকুর অঞ্চলের এই মন্দিরটি ১৮৭৫ সালের ১২ই এপ্রিল উদ্বোধন করা হয়। মন্দিরটি দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের অনুকরণে তৈরী, ঠিক যেন তারই অবিকল এক প্রতিরূপ। তবে এই মন্দিরটি দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের থেকে উচ্চতায় সামান্য বেশি আর দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কিছুটা কম। মন্দিরটির পোশাকি নাম "শিবশক্তি অন্নপূর্ণা মন্দির"।

মন্দিরে পঙ্খের কাজ 
ব্যারাকপুরের মন্দিরটি বঙ্গীয় স্থাপত্য শৈলীতে তৈরী নবরত্ন ধারার মন্দির। এক বিরাট তোরণের ভিতর দিয়ে  মন্দিরে প্রবেশ করার পর  দেখলাম  পাশাপাশি  নাটমন্দির ও মূলমন্দিরটি রয়েছে। এছাড়া নহবতখানাও আছে। মন্দিরটির পশ্চিমদিকে কিন্নরেশ্বর, কল্যাণেশ্বর, কামেশ্বর, কৈলাসেশ্বর, কপিলেশ্বর, ও কেদারেশ্বর নামে  ছয়টি আট চালাবিশিষ্ট শিব মন্দির রয়েছে। প্রত্যেকটি মন্দিরে তিন ফুট উচ্চতার  কালো রঙের শিব মূর্তি বিরাজ করছে। এই শিব মন্দিরগুলির ঠিক মাঝখানে গঙ্গা ঘাটে  যাওয়ার একটা ছোট্ট দ্বার রয়েছে। গঙ্গার ঘাটটির নাম "রাসমণি ঘাট"। ঘাটের পাশে মহিলাদের সাজ বদলের জন্য একটা ঘর  রয়েছে।

প্রবেশের তোরণ 


মূল মন্দিরটি ইঁটের তৈরী উঁচু বেদীর  ওপর স্থাপিত। মন্দিরটিতে ওঠার জন্য তিনদিকে সিঁড়ি রয়েছে। মন্দিরটির স্তম্ভগুলি খুবই সুন্দর। মন্দিরটির গায়ে সুন্দর পঙ্খের কাজ করা আছে। মন্দিরটির দ্বিতল ও ত্রিতলে সুন্দর খাঁজকাটা দেওলাকৃত নয়টি রত্ন  রয়েছে। গর্ভগৃহে শ্বেতপাথরের বেদীর উপরে সম্পূর্ণ রুপোর তৈরী সিংহাসনে বেনারসি শাড়ি পরিহিতা  অষ্টধাতুতে তৈরী মায়ের মূর্তিটি বিরাজ করছে। এখানকার দেবী সোনার অলংকারে ভূষিতা। মূর্তিটির বাম হস্তে অন্নপাত্র আর ডান হস্তে দর্বী রয়েছে। মূর্তিটির ডানদিকে দন্ডায়মান রুপোর তৈরী মহাদেব রয়েছে। মহাদেবের হস্তে ত্রিশূল ও ভিক্ষাপাত্র আছে।

তোরণের সেই বিখ্যাত সিংহের মূর্তিটি 
নাট মন্দির 

মন্দিরটির ঠিক সামনে বেশ চাকচিক্যময় একটা বড় নাটমন্দির রয়েছে। এই নাটমন্দিরে প্রবেশ করার জন্য সাতটি প্রবেশপথ রয়েছে। গোলাকৃতি উঁচু থাম নাটমন্দিরটির চারদিকে আছে। পুরো মন্দির চত্বরটি ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা  আছে।

কথিত আছে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব চারবার এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন। ঠাকুর শেষবার ১৮৮২ সালের উল্টোরথের দিন মাহেশের রথ দেখে ফেরার পথে  মনমোহন, লাটুবাবু, গিরীন্দ্র ও হৃদয়কে সাথে নিয়ে এই  মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে রাসমণি ঘাটে এসে নেমেছিলেন। ঠাকুরের পদধুলিমাখা চানকের এই অন্নপূর্ণা মন্দিরটি খুবই ঐতিহ্যময় স্থান।
রাসমণি ঘাট 

মন্দিরটিতে অন্নপূর্ণা পুজোর দিন বাৎসরিক পুজো খুব ঘটা করে হয়ে থাকে। এইদিন মাকে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এই দিন কুমারীপুজোও করা হয়। অন্নপূর্ণার পুজো ছাড়াও বিপত্তারিণী, জগদ্ধার্থী  ও কালীপুজোও খুব আড়ম্বরের সাথে করা হয়ে থাকে। শিব মন্দিরগুলিতে নীলষষ্ঠী ও শিবরাত্রির দিনে পুজো হয়ে থাকে এইসব উৎসবের দিনগুলোতে ব্যারাকপুরের এই মন্দিরে  প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়।

ছয়টির তিনটি শিবমন্দির 
মন্দিরটির প্রবেশ পথে একটা বেশ বড় তোরণ আছে। তোরণটির মাথায় একটা  বড় সিংহের মূর্তি রয়েছে। এই সিংহের  মূর্তিটি নিয়ে লোকমুখে একটা গল্প চালু আছে।  সিংহ যেহেতু ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতীক ছিল, তাই তারা এই সিংহের মূর্তিটি সরিয়ে দেওয়ার জন্য সিংহের মূর্তিটি  নির্মাণের পর থেকেই মন্দির প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। মন্দির প্রশাসন এই সমস্যার সমাধানের জন্য আদালতের সাহায্য প্রার্থনা করে। দীর্ঘদিন আইনি লড়াই চলে। অবশেষে আদালত তাদের রায়ে জানায় যে "Art is art, let the art prevail"। প্রবেশপথে দেখলাম এখনো সিংহের মূর্তিটি যথাস্থানে বিরাজমান।

বাবা মহাদেব 
শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের স্মৃতি বিজড়িত এই প্রতিরূপ মন্দিরটি বহুদিন  যাবৎ দর্শন করার খুব  ইচ্ছে ছিল, নানা কারনে হয়ে উঠছিলো না। গত রবিবার সব বাঁধাকে দূর করে সক্কাল সক্কাল  শিয়ালদহ স্টেশন  থেকে ব্যারাকপুরগামী ট্রেনে চেপে বসলাম। যথাসময়ে ব্যারাকপুরে পৌঁছেও গেলাম। ওখান থেকে অটো রিক্সা করে তালপুকুরে এসে নামলাম। তালপুকুর থেকে সামান্য পথ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছলাম। এখানে এসে মন্দিরের চারপাশের পরিবেশ দেখে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। চারদিকে লোহালক্কড়ের দোকান, চায়ের দোকান, মন্দিরটির ঠিক সামনে ছোট ছোট ঘরে বেশ কিছু পরিবার বাস করছে, দেখে মনে হলো পরিবারগুলো সবই ভিন রাজ্যের। তারা বিহারী বলে মনে হল। একজনকেও বাঙালি বলে মনে হল না। মন্দিরটিতে দর্শনাথী নেই বললেই চলে। পূজা সামগ্রী কেনার জন্য কোনো দোকানও  চোখে পড়লো না।  দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরটির পরিবেশ মনে গেঁথে থাকায় এখানকার এই ঐতিহাসিক মন্দিটির পরিবেশ আমায় যথেষ্ট ব্যথিত করলো। অন্যান্য হিন্দু মন্দিরের পরিবেশের সাথে এখানকার পরিবেশে  আসমান-জমিন ফারাক রয়েছে।  যাই  হোক এতদিনের স্বপ্ন সফল হয়েছে তাই কালবিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি মন্দিরটি দেখে নিলাম। মন্দির দর্শনের সমস্ত বিবরণ উপরে উল্লেখ করেছি। আমার মনে হয় অবস্থানগত ও পরিবেশগত কারণেই মন্দিরটির এতো ঐতিহাসিক মূল্য থাকা সত্বেও  সেইভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি।

মন্দির দর্শনের  সময় :
সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০ আর বিকেল ৪টা থেকে রাত  ৮টা পর্যন্ত।

কিভাবে যাবেন :

শ্যামবাজার থেকে ব্যারাকপুরগামী বাসে করে তালপুকুরে নামবেন। অথবা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে ব্যারাকপুর স্টেশনে নেমে অটো রিক্সা করে তালপুকুরে এসে নামতে হবে।  তালপুকুর থেকে রিক্সা বা পায়ে হেঁটে  সামান্য পথ গেলেই এই প্রতিরূপ মন্দিরটি  দেখতে পাবেন। মন্দিরটি একদম রাস্তার ধরেই অবস্থিত।

তারিখ : ১৩-০৪-২০১৯

ছবি ও লেখার স্বত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী


যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিগুলো যদি আপনার ভালো  লাগে, তাহলে   অবশ্যই   আপনার  মূল্যবান  মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Saturday, April 6, 2019

কলকাতার সংগ্রহশালা

কলকাতার  সংগ্রহশালা

কলকাতা শহর সুপ্রাচীন এক শহর। শহরের প্রাচীন ইতিহাসের গল্প আমরা সবাই জানি।  ব্রিটিশ ভারতের উত্থান ও পতনের ইতিহাসের গল্পও আমাদের জানা আছে। রাজা - জমিদারদের তৈরী বিভিন্ন পুরাকীৰ্তির সব  অন্যন্য সংগ্রহ কলকাতার বিভিন্ন সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে।  কত শত পুরাকীর্তি ও রাজা রাজরাজড়াদের ব্যৱহৃত কত সামগ্রী, কত শিল্প সব নিয়ে শহরের বুকেই গড়ে উঠেছে কত বিচিত্র সব সংগ্রহশালা। এইসব সংগ্রহশালাগুলো ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের  প্রতীক হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আজ আমি এখানে কলকাতা শহরের  সংগ্রশালাগুলো সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত আকারে জনাবো।

ভারতীয় জাদুঘর :
১৯১৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন।  এটি ভারতবর্ষের বৃহত্তম জাদুঘর এবং বিশ্বের প্রাচীনতম জাদুঘর হিসেবে পরিগণিত হয়। ভারত সরকার এটির পরিচালনা  করে। এটি একটি  সাংকৃতিক ও বিজ্ঞান বিষয়ক   জাদুঘর। সম্পূর্ণ সংগ্রহশালাটিকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ১) শিল্প , ২) নৃতত্ত্ব, ৩) ভূতত্ত্ব,  ৪) পুরাতত্ত্ব, ৫) প্রাণীতত্ত্ব ও  ৬) উদ্ভিজ্জ। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশমূল্য ৫০/- টাকা, পাঁচ বছরের উর্দ্ধে ২০/- টাকা আর বিদেশী পর্যটকদের জন্য ৫০০/- টাকা লাগে। ক্যামেরার জন্য আলাদা মূল্য ধার্য করা হয়।  স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য  অবশ্য কোনো প্রবেশ মূল্য লাগে না।  সংগ্রহশালাটি প্রতি সোমবার বন্ধ থাকে। মঙ্গলবার থেকে রবিবার সকাল ১০টা  থেকে সন্ধ্যে ৮টা  পর্যন্ত খোলা থাকে। ভারতীয় জাদুঘরটি কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলে অবস্থিত।

ঠিকানা :
 ২৭, জওহরলাল নেহেরু রোড
কলকাতা - ৭০০ ০১৬

এশিয়াটিক সোসাইটি : 
এটি কলকাতার একটি অগ্রণী গবেষণা কেন্দ্র। ১৭৮৪ সালের ১৫ই জানুয়ারী  স্যার উইলিয়াম জোন্স এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ২৬টি ভাষায় ৫০ হাজারের বেশি ম্যানারস্ক্রিপ্ট সংরক্ষিত আছে। নিজস্ব গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালায় বহু প্রাচীন পুঁথি, বইপত্র, তাম্রসনদ, মুদ্রা, ছবি ও আবক্ষ মূর্তি রয়েছে। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিটি বিশ্বের সমজাতীয় সংস্থাগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। ১৮০৮ সালে এখানকার গ্রহাগারটিকে জনগণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। এশিয়াটিক সোসাইটিটি জওহরলাল রোড ও পার্ক স্ট্রিটের সংযোগস্থলে  অবস্থিত।

ঠিকানা :
 ১ ,পার্ক স্ট্রিট
কলকাতা - ৭০০০১৬

আশুতোষ সংগ্রহশালা :
এই সংগ্রহশালাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের মধ্যে অবস্থিত। এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি শিল্প সংগ্রহশালা। ১৯৩৭ সালে তৈরী হয় এই সংগ্রহশালাটি। ভারতের প্রথম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত সংগ্রহশালা হল এই আশুতোষ সংগ্রহশালাটি।   এখানে বিভিন্ন যুগের শিল্পসামগ্রী সংরক্ষিত আছে।

ঠিকানা :
৮৭/১ কলেজ স্ট্রিট
কলকাতা - ৭০০ ০৭৩

বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড টেকনোলজি মিউজিয়াম :
দক্ষিণ কলকাতার গুরুসদয় রোডে অবস্থিত এই সংগ্রহশালাটি  ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞানের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য ও প্রযুক্তি সম্বন্ধে প্রকৃত ধারণা তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এটি চালু করা হয়। এখানকার আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয় গ্যালারিগুলো হলো অন্ধকারে বিশ্বপরিচয়, চিলড্রেন্স গ্যালারি, চিত্তাকর্ষক পদার্থবিদ্যা, পরিবহন, চালিকা শক্তি, জনপ্রিয় বিজ্ঞান, জৈবপ্রযুক্তি, ধাতু, বিদ্যুৎ, টেলিভিশন, ও গণিত।  এখানে টিকিটের বিনিময়ে দৈনিক বিজ্ঞানভিত্তিক  মজাদার  সব প্রদর্শন প্রদর্শিত হয়ে থাকে। সাধারণ দর্শকদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৩০/- টাকা। সকাল ১০টা  থেকে বিকেল ৫.৩০ পর্যন্ত সংগ্রহশালাটি খোলা থাকে।

ঠিকানা :
১৯এ , গুরুসদয় রোড
কলকাতা - ৭০০ ০১৯


পুলিশ মিউজিয়াম :
কলকাতা পুলিশের ব্যৱহৃত সরঞ্জাম ও ঐতিহাসিক নানারকম দুর্লভ সামগ্রীতে ও ছবিতে  জমজমাট একটা সংগ্রহশালা। এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্যৱহৃত বেশ কিছু অস্ত্রসামগ্রীও সংরক্ষিত আছে। স্বাধীনতার আগে ও এখনকার কলকাতা পুলিশের ইতিহাস জানতে এখানে আসতে পারেন। এখানে ছবি তুলতে দেওয়া হয় না। এটি সকাল ১১টা  থেকে বিকেল ৫টা  পর্যন্ত সংগ্রহশালাটি খোলা থাকে। সংগ্রহশালাটি মানিকতলার কাছে অবস্থত।

ঠিকানা :
১১৩ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র স্ট্রিট
কলকাতা - ৭০০ ০০৯

ভারতীয় রেলওয়ে জাদুঘর :
এই জাদুঘরটি অবশ্য কলকাতার মধ্যে পড়ছে না, তবুও কলকাতার খুব কাছে বলে আমি এটিকে কলকাতার মধ্যেই রাখলাম। এই সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন হয় ২০০৬ সালের ৭ই এপ্রিল। ভারতীয় রেলের প্রথম থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে এখানে সংরক্ষিত করা আছে।  প্রতি সোমবার বন্ধ থাকে। অন্যান্য দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫.৩০ পর্যন্ত এটি খোলা থাকে। সংগ্রহশালাটি হাওড়া স্টেশনের পাশে অবস্থিত।

ঠিকানা :
রেল মিউজিয়াম ট্রয় ট্রেন লাইন
হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন
হাওড়া , পশ্চিমবঙ্গ - ৭১১১০১

 ভিক্টোরিয়া  মেমোরিয়াল হল :
এই হলটি যে কোনো দেশের পর্যটকের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। মহারানী ভিক্টোরিয়ার নামাঙ্কিত এই হলটি কলকাতার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সংগ্রহশালা। এখানে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বেশ কিছু দুর্লভ পুস্তক ও তৈলচিত্র সংরক্ষিত আছে। ব্রিটিশ আমলের সৈন্যদের ব্যৱহৃত কামান ও অন্যান্য সামগ্রীও সংরক্ষিত আছে। ১৯২১ সালে এই হলটি স্থাপিত হয়েছিল। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হলটি খোলা থাকে। প্রবেশ মূল্য ভারতীয় দর্শকদের জন্য ৩০/- টাকা আর সার্ক  দেশের পর্যটকদের জন্য ১০০ টাকা, ভারতীয় ও সার্ক  দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশের পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। সংগ্রহশালাটি পিজি হাসপাতালের বিপরীত দিকে অবস্থিত।

ঠিকানা :
১ কুইন্স ওয়ে
কলকাতা ময়দান
কলকাতা - ৭০০ ০৭১

নেতাজি ভবন :
দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে এই জাদুঘরটি অবস্থিত। ১৯৫৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।  এটি একটি স্মারক ভবন ও গবেষণা কেন্দ্র। এই ভবনের জাদুঘরে নেতাজীর পায়ের ছাপ রাখা আছে।  প্রতি সোমবার এটি বন্ধ থাকে, অন্যান্য দিন  সকাল ১১টা  থেকে বিকেল ৪.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। সংগ্রহশালাটি নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশনের কাছে অবস্থিত।

ঠিকানা :
৩৮/২ লালা লাজপত রায় সরণি
ভবানীপুর, কলকাতা - ৭০০ ০২০

বোট মিউজিয়াম :
এই সংগ্রহশালাটি কলকাতা শহরে নতুন সংযোজিত একটা সংগ্রহশালা। এখানে প্রায় ৫০ রকমের নৌকো ও জাহাজের প্রতিরূপ বানিয়ে রাখা আছে। খুবই সুন্দর সংগ্রহশালাটি। এই সংগ্রহশালাটি ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে কোনোরকম ছবি তুলতে দেওয়া হয় না।  প্রতি শনি ও রবিবার বন্ধ থাকে , অন্যন্য দিন সকাল ১০টা  থেকে বিকেল ৫.৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। সংগ্রহশালাটি কাঁকুড়গাছিতে অবস্থিত।

ঠিকানা :
আম্বেদকর ভবন
পি ১/৪ সি আই টি স্কিম VII (এম )
ভি আই পি রোড
কলকাতা - ৭০০ ০৫৪


নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম :
চৌরঙ্গী  রোডের  ওপর  একটা সুন্দর  তিনতলা   বাড়িতে  এই  মিউজিয়ামটি  অবস্থিত।  ১৯৭২  সালের
২৪শে  নভেম্বর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর  নামাঙ্কিত এই মিউজিয়ামটি    তদকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর  রায় উদ্বোধন করেন। প্রায় ১৩০টি দেশের পুতুল ও তিনশোর বেশি গণেশের মূর্তি  দিয়ে সাজানো এক সুন্দর সংগ্রহশালা।  বাচ্ছাদের সাথে বড়রাও  এখানে ভিড় জমান।  সোমবার ও মঙ্গলবার এটি পূর্ণদিবস বন্ধ থাকে। অন্যান্য দিন সকাল ১১টা  থেকে সন্ধ্যে ৭টা  পর্যন্ত খোলা থাকে।  ষোলো বছরের নীচে বয়স হলে ১০ টাকা আর ষোলো বছরের উর্দ্ধে  ২০ টাকা প্রবেশ মূল্য  লাগবে। সংগ্রহশালাটি এক্সইড মোড়ে অবস্থিত।

ঠিকানা :
৯৪/১ চোরঙ্গী রোড
কলকাতা - ৭০০ ০২০


জাতীয় গ্রন্থাগার :
এই গ্রন্থাগারটি ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার। এটি  দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর অঞ্চলে চিড়িয়াখানার সামনে অবস্থিত।   প্রায় ২ কোটির ওপর বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে এখানে। ৩০ হেক্টর জায়গা নিয়ে এটি তৈরী।  সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা  থেকে রাত  ৮টা  আর শনিবার ও রবিবার সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা  পর্যন্ত খোলা থাকে।

ঠিকানা :
বেলভেডিয়ার রোড
আলিপুর, কলকাতা - ৭০০ ০২৭


সাবর্ণ সংগ্রহশালা :
সাবর্ণ রায়চৌধুরীর নাম কলকাতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।  ২০০৫ সালের ৫ই জুন সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে এই সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করা হয়। এখানে অসংখ্য প্রাচীন মানচিত্র , জমিদারির দলিল দস্তাবেজ, কলকাতার সুতানুটি গোবিন্দপুরের  প্রজাস্বত্ব হস্তান্তের দুষ্প্রাপ্য দলিলের কপি রয়েছে। পরিবারের ব্যৱহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রের সংগ্রহও আছে।  বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা  থেকে দুপুর ১২টা  আর বিকেল ৫টা  থেকে রাত  ৭টা  পর্যন্ত খোলা থাকে। সংগ্রহশালাটি বেহালার বরিশা অঞ্চলে অবস্থিত।

ঠিকানা :
সপ্তর্ষি ভবন, বড়বাড়ি
৬৭/৩ ডায়মন্ড হারবার রোড
বরিশা, কলকাতা - ৭০০ ০৩৪

জোড়াসাঁকো সংগ্রহশালা :
এই সংগ্রহশালাটি  সম্পূর্ণরূপে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত এক সংগ্রহশালা। তিনতলা বিশিষ্ট সংগ্রহশালাটি বেশ সাজানো গোছানো এক সংগ্রহশালা। এখানে রবীন্দ্রনাথের ও তার পরিবারের ব্যৱহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, অবনীন্দ্রনাথের বিভিন্ন অঙ্কন, রবীন্দ্রনাথের আঁতুরঘর, পড়ার ঘর, গান শোনার ঘর, সাহিত্য চর্চার ঘর ইত্যাদি দেখতে এখানে আসতে পাবেন।  প্রতি সোমবার এই সংগ্রহশালাটি পূর্ণদিবস বন্ধ থাকে। মঙ্গলবার থেকে রবিবার পর্যন্ত সকাল ১০.৩০ থেকে বিকেল  ৫টা  পর্যন্ত খোলা থাকে।

ঠিকানা : 
২৬৭ রবীন্দ্র সরণি, সিঙ্গিবাগান,
জোড়াসাঁকো, কলকাতা - ৭০০ ০০৭

স্মরণিকা ট্রাম  মিউজিয়াম) :
এই সংগ্রহশালাটি ২০১৪ সালে উদ্বোধন করা হয়।  এখানে পুরোনো ট্রামের টিকিট, কযেন  এক্সচেঞ্জ মেশিন, কন্ডাক্টরের পরিহিত ইউনিফর্ম ও টুপি  ইত্যাদি। সংগ্রহশালাটিটি ধর্মতলা ট্রাম ডিপোর পাশে তৈরী করা হয়েছে। দর্শনের সময় দুপুর ১টা থেকে রাত  ৮টা  পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে ঢোকার জন্য সামান্য প্রবেশমূল্য লাগে।

ঠিকানা :
৬ সিদ্ধ কানু  ডহর, ধর্মতলা
কলকাতা - ৭০০ ০৬৯


মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম :
এই সংগ্রহশালাটি কলকাতার একদম কাছে নিউটাউনে অবস্থিত। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে এটির উদ্বোধন করা হয়।   ভারতবর্ষের জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্যদের  মোম  দিয়ে তৈরী  মূর্তি করে রাখা আছে। সোমবার বাদ  দিয়ে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত  ৭.৩০ পর্যন্ত এই সংগ্রহশালাটি খোলা থাকে। এখানে প্রবেশ করার জন্য মূল্য দিতে হবে তিন বছর থেকে  ১২ বছর পর্যন্ত ১৫০/- টাকা আর ১২ বছরের  উর্দ্ধে ২৫০/- টাকা লাগে।

ঠিকানা : 
ফিনান্স সেন্টার, ৫ & ৬ তল
অ্যাকশন এরিয়া ২, সিবিডি ১
নিউ টাউন , কলকাতা - ৭০০ ১৫৬

মৌলানা আবুল কালাম মিউজিয়াম :
দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে ভারতরত্ন মৌলনা আবুল কালাম আজাদের বসতবাড়িটিই বর্তমানে মিউজিয়াম তৈরী করা হয়েছে। এখানে ওনার ব্যৱহৃত চশমা, লাঠি, জামাকাপড় ও নানারকম ছবি সরক্ষিত করা আছে।  ভারতরত্ন-এর  রেপ্লিকাও এখানে রাখা আছে।  এই মিউজিয়ামে প্রবেশ করার জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য লাগে না।

ঠিকানা :
৫ লাভলক প্লেস
কলকাতা - ৭০০ ০১৯

গুরুসদয় মিউজিয়াম :
এই  সংগ্রহশালাটি বেহালার জোকা  অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে স্যার গুরুসদয় দত্তর সারাজীবনের সংগ্রহ করা সামগ্রী দিয়ে সাজানো। এটি ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের সংগ্রহশালা। এখানে সুক্ষ হস্তশিল্প, পোড়ামাটির প্যানেল, কথার কাজ, কালীঘাটের পটচিত্র সংরক্ষিত আছে। সোমবার বাদে প্রতিদিন সকাল ১১তা থেকে বিকেল ৫তা পর্যন্ত খোলা থাকে। ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৫ টাকা, ভারতীয়দের জন্য ১০ টাকা  আর বিদেশিদের জন্য ৫০ টাকা প্রবেশ মূল্য লাগে।

ঠিকানা :
ব্রতচারী গ্রাম,
পি৬  ডায়মন্ড হারবার রোড
ডায়মন্ড পার্ক , জোকা
কলকাতা - ৭০০ ১০৪

একাডেমি অফ ইন্ডিয়ান কয়েন্স এন্ড হিস্ট্রি :
১৯৯৭ সালে এটি তৈরী করা হয়।  একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রা ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করে, তারাই  এই সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তারাই এটি পরিচালনা করে।  যে কোনো কাজের দিন বেলা ১২টা থেকে  সন্ধ্যে ৬টা  পর্যন্ত এটি খোলা থাকে।

ঠিকানা :
৩৬২/বি রবীন্দ্র সরণি
কলকাতা

ফ্যানাটিক স্পোর্টস মিউজিয়াম:
এ যেন এক ছাদের তলায় এক টুকরো খেলার পৃথিবী। প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক রোবিয়া মজুমদার ও হর্ষ নেওটিয়ার  যৌথ উদ্যোগে প্রায় সাত হাজার বর্গফুট এলাকা নিয়ে এই সংগ্রহশালাটি তৈরী করা হয়েছে।  এখানে সচিন টেন্ডুলকারের ১০০ তম সেঞ্চুরি করার ব্যাট যেমন আছে তেমন অন্যান্য সব ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের নানারকম ক্রীড়া সরঞ্জাম সংগ্রহ করে রাখা আছে।  এটা কলকাতার মুকুটে নবতম পালক। এখানে প্রবেশ করার জন্য সাধারনদের জন্য ১০০ টাকা আর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৫০ টাকা প্রবেশ মূল্য লাগে।

ঠিকানা :
রাজারহাট , কলকাতা


জাদুঘর বা সংগ্রহশালা হলো একটি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষিত আবাসস্থল। এইসব ঐতিহ্যকে  যথাযথভাবে  সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা খুবই জরুরি। নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানানো খুবই প্রয়োজন। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জানার জন্য নতুন প্রজন্মের সাথে সবারই  এইসব জাদুঘর বা সংগ্রহশালা দেখা  উচিত।

তারিখ : ০৬-০৪-২০১৯
ছবি ও লেখার স্বত্ত্ব : সুদীপ্ত মুখার্জী

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি যদি আপনার ভালো  লাগে, তাহলে  অবশ্যই   আপনার  মূল্যবান  মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।