Monday, March 14, 2022

বইমেলা ও নতুন লেখক

বইমেলা ও নতুন লেখক 


সুদীপ্ত মুখার্জী 





মেলা কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল মিলনোৎসব। বহু শতক ধরে সভ্যতার ঐতিহ্যকে  বহন করে চলেছে  মেলা । মেলাতে মানুষ একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করে থাকে। বইমেলা হল বইয়ের মহোৎসব।বইমেলা একটা স্বতন্ত্র প্রকৃতির মেলা যা বইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক মিলন ক্ষেত্র।  যেটা  প্রকাশক, পাঠক ও লেখকদের মিলনোৎসব। বইমেলাতে পরস্পরের অর্থাৎ প্রকাশক, পাঠক ও লেখকের যোগাযোগ স্থাপন ও ভাব বিনিময় হয় বইয়ের মাধ্যমে। প্রকাশকরা তাদের প্রকাশিত নতুন ও পুরানো বইযের সম্ভার নিয়ে এখানে দোকান সাজিয়ে তোলেন। পাঠকরা নানা রকম বইয়ের সম্ভার থেকে  পছন্দের বইটা সংগ্রহ করে নেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  বলে গিয়েছিলেন 'বই হলো অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেয়া সাঁকো'।  বই ছাড়া শিক্ষিত জ্ঞান পিপাসু মানুষের জীবন প্রায় অচল বলা চলে। বই মানুষের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার নির্ভরযোগ্য উপাদান বলা চলে। ইরানের বিখ্যাত  কবি ওমর খৈয়াম বলেছিলেন  'রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,  বই, সেতো অনন্ত যৌবনা'। এই অনন্ত যৌবনা বইগুলোর সন্ধান বইযের মহোৎসবেই সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। বইমেলা আজ আমাদের ঐতিহ্যের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বইযের এই উৎসবেই যেন বাঙালি অবগাহন করে পুণ্যস্নানে। 

গত ৮ই নভেম্বর ২০২১ সরকারের তরফ থেকে  ২০২২ সালের 'কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা' হবে বলে জানানো হয়। তবে অবশ্যই যাবতীয় বিধি মেনে। সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে মেলাটি করা হবে।করোনা অতিমারীর কারণে গতবার মেলার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তাই বইপ্রেমীদের মন একদম ভালো ছিল না। শুধু বইপ্রেমী কেন প্রকাশকদের ও লেখকদের মনও ভালো ছিল না। প্রকাশকরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। তাই প্রকাশক, লেখক ও পাঠক সকলেই এই খবরে খুবই উল্লসিত হয়ে ওঠে। অনেক আক্ষেপ, অনেক হতাশা, অনেক অপেক্ষার যেন অবসান হল। 

আমরা জানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন বইমেলাটি  প্রতিবছর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কলকাতার মেলাটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা বলা হয়।  প্রতিবছর আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও 'অমর একুশ গ্রন্থমেলা' বলে একটা বইমেলার আয়োজন করা হয়। আমাদের তিলোত্তমার মেলাটি  প্রায় ৫০ বছরের একটা মেলা।  প্রতি বছর মেলাটি সুবিশাল আকারে আয়োজিত হয়। মেলাটা প্রকাশক, লেখক ও পাঠকদের গন্ডী ছাড়িয়ে আজ একটা সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। 


কলকাতা শহরে প্রতিবছর নিয়ম করে পাবলিশার্স ও বুক সেলার্স গিল্ড আয়োজন করে থাকে একটা  আন্তর্জাতিক বইমেলা। এই মেলাটি সর্বপথম ১৯৭৬ সালের ৫ই মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতা ময়দান এলাকাতে। তখন অবশ্য নাম ছিল 'কলকাতা পুস্তকমেলা'। বিশিষ্ট প্রকাশকরা মেলাটির আয়োজনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। সেই সময় মেলাটি অবশ্য আন্তর্জাতিক মেলায় পরিণত হয়নি। ১৯৮৪ সালে মেলাটি প্রথম আন্তর্জাতিক মেলায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে যেমন মেলার আয়তন বৃদ্ধি পায়  তেমন জনসমাগমও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭৮ সালে আয়োজিত তৃতীয় বইমেলা থেকে মেলাটি খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি ১৯৮৩ সালের মেলায় একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এসে একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের প্রাক্তন সম্পাদক অশোক কুমার সরকার মহাশয় মেলা প্রাঙ্গনেই অসুস্থ হয়ে প্রয়াত হন। ১৯৮৪ সাল থেকে প্রতিবছর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে 'অশোককুমার সরকার স্মৃতি বক্তিতা'র আয়োজন করা হয়। এই বছরেই মেলাটি জেনেভার ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স এসোসিয়েশনের সদস্য হয়ে বইমেলার আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে স্থান করে নেয়। ১৯৯৭ সাল কলকাতা পুস্তক মেলার একটা স্মরণীয় বছর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এই বছর  মেলার থিম ছিল 'ফ্রান্স'। তারপর থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের নামে থিম করা হয়ে থাকে। সেই বছরই এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুরো মেলাটি অগ্নিদগ্ধ হয়ে যায়। প্রচুর ক্ষতি হয় ও কয়েকজন দর্শনার্থীর মৃত্যুও হয়। ২০০১ সালে 'কলিকাতা পুস্তকমেলা' নামটি পরিবর্তন করে 'ক্যালকাটা বুক ফেয়ার'  রাখা হয়। পরিবেশের কারণে ২০০৭ সালে মেলাটি যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে,  ২০০৮ সালে পার্ক সার্কাস ময়দানে ও ২০০৯ সালে মিলনমেলা প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। এই বছর থেকে 'কলিকাতা বুক ফেয়ার' নামটি আবার পৰিবৰ্তন করে করা হয় 'আন্তর্জাতিক কলিকাতা বইমেলা'। মিলনমেলা প্রাঙ্গনটি মেরামত করার জন্য বর্তমানে মেলাটি বিধানগরের সেন্ট্রাল পার্কে আয়োজিত হচ্ছে। এই মেলায় গ্রন্থসম্ভারের পাশাপাশি চিত্রশিল্পী, খাবার, তথ্য প্রযুক্তি ও লিটিল ম্যাগাজিনের জন্য আলাদা স্থানের ব্যবস্থা করা হয়।  

কলকাতা বইমেলায় বই ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে আয়োজিত হয় বিভিন্ন সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান। বইমেলাতে প্রতিবছর নিয়ম করে বহু লেখকের নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বই প্রকাশে বেশিরভাগ প্রকাশক প্রাধান্য দিয়ে থাকেন পুরানো ও খ্যাতনামা লেখকদের। পরিচিতির আড়ালে থাকা স্বগুণ থাকা স্বত্তেও বহু নতুন লেখক বা কবি আড়ালেই থেকে যান । লক্ষ্য করলে দেখা যায় খ্যাতনামা পরিচিত লেখকের বা কবির বই এই ধরনের মেলায় হু হু করে বিক্রি হয় কিন্তু নতুনদের পরিচিতি না থাকায় তাদের লেখা বইয়ের বিক্রী সেরকম হয় না। তাই প্রকাশকরা নতুনদের লেখা যতই ভালো হোক তাঁদের কাছে নতুনদের  সেরকম কোনো গুরুত্ব থাকে না। নতুন লেখকদের মধ্যে  অনেকের  ভালো ভালো লেখা শুধুই তাঁদের খাতায় বন্দী হয়ে রয়ে যায়।  প্রকাশকের অভাবে পাঠকের কাছে তা আর পৌঁছতে পারেনা। খ্যাতনামা পরিচিত লেখকদের ভিড়ে হারিয়ে যায় অপরিচিত খ্যাতিহীন লেখকরা। কালের গর্ভে  ধীরে ধীরে বিলীন  হয়ে যায় তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা। থেমে যায় এইসব নবীনদের কলম। তাঁদের মেধা ও মনন দিয়ে যে ভাবনার জন্ম তাঁরা দিয়েছেন তা আর পৌঁছয় না পাঠক মহলে। 



বইমেলা যেমন খ্যাতনামা লেখকদের সঙ্গে প্রকাশক ও পাঠকের গাঁটছড়া বাঁধতে সহায়তা করে তেমন নবীন লেখকদের সাথেও প্রকাশকদের ঐকান্তিক চেষ্টায় পাঠকদের মিলনক্ষেত্র হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রকাশকদের লাভের অংশ একটু কম হবে। লাভের অংশ একটু কমিয়ে দিয়ে প্রতি বছর তাঁদের কয়েকজন নতুন লেখক ও কবির লেখাকে গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত। তবে অবশ্যই তা ভালো বিষয় ও  ভালো লেখা হতে হবে।

আজকাল আবার শোনা যায় নামী-অনামী বহু প্রকাশকের প্রবণতা নাকি নতুন লেখক অর্থাৎ অনামী লেখকদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে বই প্রকাশের কথা। এই ধরণের ঘটনা ঘটে কিনা আমার ঠিক জানা নেই। তবে এই ধরণের ঘটনা যদি সত্যি ঘটে থাকে সেটা অবশ্যই কাম্য নয়। অর্থের বিনিময়ে বই প্রকাশের এই সংস্কৃতি পাঠকদের কাছ থেকে নতুন লেখককে দূরে সরিয়ে দেবে। একজন লেখক হলেন মেধার পরিবেশক। তাই প্রকাশকদের লেখককে গুরুত্ব না দিয়ে অবশ্যই লেখাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নতুন লেখকদের কাছে সবটাই হতাশা নয়, কিছু প্রকাশক ভালো লেখাকে নিশ্চয় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে কোনো লেখক যদি সত্যি ভালো লিখে থাকেন তাহলে সেই প্রতিভা কখনোই চাপা থাকবে না, একদিন তা পাঠকদের হাতে নিশ্চিতভাবে পৌঁছবে। খ্যাতনামা লেখকদের পাশাপাশি নতুন বা অপেক্ষাকৃত নতুন লেখকরা কতটা উঠে আসতে পারছে সেইদিকে সরকার ও মেলা কর্তৃপক্ষেরও  তীক্ষ্ণ নজর রাখা উচিত। 



কিছু লোকের ধারণা নতুন প্রজন্মের বইয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই।  তারা তাদের অবসর সময়টা ফেসবুকে ও হোয়াটস্যাপে কাটাতে নাকি বেশি ব্যস্ত থাকে। একথা কিছুটা মেনে নিলেও লক্ষ্য করলে বহুক্ষেত্রে দেখা যায় এটা সঠিক নয়। নতুন প্রজন্ম টেক সেবি।  তারা এখন সব কিছুই অনলাইনে কিনতে অভ্যস্থ। তাদের বেশিরভাগের হাতে অত সময় থাকেনা যে তারা কলেজে স্ট্রীটে গিয়ে বা অন্য কোনো জায়গায় গিয়ে বই কেনার। তাই তাদের জন্যই গড়ে উঠেছে ভার্চুয়াল বইমেলা। শুধু নতুন প্রজন্ম নয় আজকাল  বয়স্করাও অনলাইনে বই কিনতে ধীরে ধীরে অভস্থ্য  হয়ে পড়ছে।  কচিগুলো আবার এখন বাংলা পড়ে  না, তারা সব ইংরেজিতে পড়তে অভ্যস্থ। ইংরেজিতে পড়লেও তারা হ্যারি পটার বা টিনটিনের ইংলিশ ভার্সান মোবাইলে পড়ে বেশি আনন্দে পায়। পূর্বের মতো ক্ষীরের পুতুল, নীলকমল-লালকমল আর তাদের টানে না। এছাড়া রহস্য, ভিনগ্রহের প্রাণী, অলৌকিকতা সম্বন্ধীয় বই যুবক-যুবতীদের বরাবরই টানতো। এখনো এই ধরণের বইয়ের বেশ ভালো বিক্রি আছে।  বইয়ের চাহিদা  হয়ত কিছুটা কমলেও বিক্রি কিন্তু বেশ ভালোই হচ্ছে। যদি সেরকম বিক্রি না হতো তাহলে যেমন  নতুন নতুন প্রকাশক গজিয়ে উঠতনা তেমন নতুন নতুন অনলাইন বিক্রেতাও আসতো না।  

এবছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবর্ষ। ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর এবং ভারত-বাংলাদেশের মৈত্রীর সুবর্ণজয়ন্তীর কথা মাথায় রেখে এবারের মেলার থিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে মনোনীত করা হয়েছে।  আশাকরি  করোনা অতিমারী পর্ব পেরিয়ে এবছরের আয়োজিত বইমেলা তার  নিজস্ব ছন্দ ফিরে পাবে। তার পুরানো ঐতিহ্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে। তবে অবশ্যই সবাইকে  গিল্ডের ও সরকারের দেওয়া করোনাবিধিকে মেনে চলতে হবে।   
 



তারিখ :১৪-০৩-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Tuesday, February 15, 2022

সাবর্ণ সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত  আন্তর্জাতিক ইতিহাসের আসর


সুদীপ্ত মুখার্জী


অনুষ্ঠান মঞ্চ 



আমাদের প্রাণের শহর কলকাতা। সেই তিলোত্তমার এক প্রাচীন পরিবার হল সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। এই পরিবার প্রতিবছরই নিজেদের বাড়িতে এক ইতিহাস উৎসবের আয়োজন করে থাকেন। বর্তমানে সেই উৎসব আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং দূর-দূরান্ত থেকে অগণিত ইতিহাসপ্রেমীরা ভিড় করেন এই বাড়ির ইতিহাস উৎসবে। প্রতিবারের মতন এবারও বড়িশার সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের বড়বাড়িতে সাবর্ণ সংগ্রহশালার আয়োজনে শুরু হয়ে গেল ষোড়শ আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব। গত ১৩ তারিখে  সকাল ১০টায় এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হল, চলবে আগামী ১৬ তারিখ অবধি। সাধারণ মানুষজনের বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার রয়েছে তবে প্রবেশের ক্ষেত্রে মানতে হবে কোভিড বিধি।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক শ্রীযুক্ত দেবর্ষি রায় চৌধুরীর সাথে আমি 



এই বিষয়ে কথা হল সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক তথা সাবর্ণ সংগ্রহশালার কিউরেটর দেবর্ষি রায় চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জানালেন এবার এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো সিন্ধু সভ্যতার ১০০ বছর উদযাপন। এছাড়া এবার  তাঁরা সর্বপ্রথম স্বনামধন্য অভিনেতা রবি ঘোষকে সম্মান জানাচ্ছেন।  রবিবাবুর  ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রদর্শনীতে রেখেছেন। প্রখ্যাত অভিনেতার ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, পেন, টুপি, ব্যাগ ইত্যাদি রাখা হয়েছে সাবর্ণদের প্রদর্শনীতে। এছাড়া তিনি জীবনে যে সমস্ত সম্মান পেয়েছেন তার কিছু অংশও রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক এই ইতিহাস উৎসবে। এবারের এই উৎসবের থিম ক্যান্ট্রি শ্রীলঙ্কা এবং ফ্রান্স। সেখানকারও নানান উপাদান সাজানো রয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত জিনিসপত্র



এছাড়া অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাদানের পাশাপাশি এবার সাবর্ণদের ইতিহাস উৎসবের মূল আকর্ষণ হল সিন্ধু সভ্যতা (হরপ্পা) আবিষ্কারের ১০০ বছর উৎযাপন। যে সভ্যতা প্রায় ৫০০০ বছরেরও প্রাচীন তা ১৯২১ সালে দয়ারাম সাহানি এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। এই সিন্ধু সভ্যতার ইট, মাটির পাত্র, পুতুল ইত্যাদি নানান ঐতিহাসিক উপাদান রাখা হয়েছে সংগ্রহশালার প্রদর্শনীতে। এইসব জিনিস আমরা এতদিন শুধু ছবিতে দেখে এসেছি।  এখানে এসে তার সামান্য কিছু আমার চাক্ষুস করার সৌভাগ্য হল।
 
কিংবদন্তি শিল্পী রবি ঘোষের উল্টোরথ পুরস্কার

এবারে তাঁরা অভিনেতা রবি ঘোষের সাথে বিখ্যাত গায়ক ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কেও সম্মান জানাচ্ছেন। এই মহান শিল্পীর যেমন বেশ  কিছু দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডস এই প্রদর্শনীতে স্থান  পেয়েছে। তেমন শিল্পীর বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবিও রয়েছে।  

শিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডস্


সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের বিভিন্ন জনের  ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা রয়েছে প্রদর্শনীতে। এছাড়া এই পরিবারের প্রথম জমিদার লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরীর জীবনের কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাস উৎসবে।  এছাড়া দুই আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি এই পাঁচ মহাদেশের পুতুল সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে সংগ্রহশালার প্রদর্শনীতে।

আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে নতুন ভাবে প্রকাশিত ‘লক্ষ্মীকান্ত’ বইটির উদ্বোধন করছেন সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় এবং সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরী


আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে নতুন ভাবে প্রকাশিত 'লক্ষীকান্ত' বইটি পুনঃ প্রকাশিত হল। বইটির  উদ্বোধন করেন রাজ্যসভার সদস্য মাননীয় সুখেন্দু শেখর রায়।  

 প্রতি বছরের ন্যায় এবছর এই ইতিহাস উৎসব বেশ শিক্ষণীয়।  প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এই উৎসব দর্শন করা উচিত। 



তারিখ :-১৫-০২-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Friday, February 4, 2022

সোনামুখীর দে বাড়ির সরস্বতী পুজো >P

শতবর্ষ উত্তীর্ণ ব্যতিক্রমী ও অভিনব সোনামুখীর দে বাড়ির সরস্বতী পুজো 



সুদীপ্ত মুখার্জী 


সোনামুখী হল বাঁকুড়া জেলার একটা সুপ্রাচীন জনপদ। সোনামুখীর নামকরণ হয় দেবী স্বর্ণময়ী  থেকে। এই অঞ্চলের জমিদার অধরচন্দ্র দে মহাশয় বর্ধমানের মহারাজার কাছ থেকে সোনামুখীর জমিদারি পান। তাঁরই বদান্যতায় ১৯০৬ সালে সোনামুখীতে একটি দেবী সরস্বতীর মন্দির স্থাপিত হয়। তিনি নারী শিক্ষার প্রচলন ও প্রসারের উদ্দেশ্যে দেবী সরস্বতীর আরাধনা শুরু করেন। কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন তিনি মকর সংক্রান্তির দিনে এক স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  এই পূজাটি দেখতে দেখতে আজ ১১৬ বছরে পদার্পন করলো। এখানে পূজাটি দুদিন নয়  চারদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 
সরস্বতী মন্দির 


সোনামুখী জমিদার বাড়ীর  কন্যা শ্রীমতী  নিলয়া দে জানালেন যে অধরচন্দ্রের  আট  সন্তান ছিল।  তাঁর সন্তানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখার উদ্দ্যেশে এক চালায় তিনি দেবী সরস্বতীর সাথে তাঁর ভাই ও বোনের পূজা শুরু করেন। আজও এখানে সেই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হতে দেখা যায়না।   সেই প্রাচীন নিয়ম মেনে এখানে বাগ্দেবীর আরাধনা চলে আসছে।  ডাকের সাজে সজ্জিতা দেবীকে পরিবারের সোনার গহনা দিয়ে সাজানো হয়। 
জমিদার অধরচন্দ্র দে 


শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার সাথে পরিবারের রান্নাপূজা ও অন্যান্য নিয়ম কানুন পালিত হয়।  পূজার প্রথম দিন পরিবারের নারায়ণ ও দেবী লক্ষ্মীকে দামোদর মন্দির থেকে সরস্বতী মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত ও পূজা করা হয়।  তারপর দেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। সরস্বতীর অঞ্জলি দেওয়ার পর পারিবারিক রীতি  মেনে পেঁয়াজ, রসুন ছাড়া মাছ রান্না করে খেতে হয়। দ্বিতীয় দিন মন্দিরের লাগোয়া পরিবারের বাড়িতে দেবী ষষ্ঠীর পূজা করা হয়।  এইদিন ষষ্ঠী দেবীকে ভোগ হিসেবে মাছের পদ ও গোটা সেদ্ধ দেওয়া হয়। তৃতীয় দিন দেবী সরস্বতী ও অন্যান্য দেব-দেবীকে সন্ধ্যায় লুচি ও মিষ্টান্ন দেওয়া হয়।  এই ভোগ স্থানীয় এক ময়রার কাছ থেকে আসে।  এই ময়রার বংশধররা বংশ পরম্পরায় প্রথম থেকে দেবীকে এই ভোগ নিবেদন করে আসছে। চতুর্থ দিন সকালে নারায়ণ ও লক্ষ্মীকে পরিবারের দামোদর মন্দিরে ফেরত নিয়ে  আসা হয়। এইদিন দেবীকে চিড়ে, খৈ, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টান্ন ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়।  এছাড়া এইদিন পরিবারের ও পাড়া-প্রতিবেশী সকলের জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে রন্ধন করা হয় খিচুড়ী, চাটনি, তরকারি ও মিষ্টি। এই খিচুড়ী ভোগ অবশ্য দেবীকে প্রদান করা হয় না।  প্রতিদিন সন্ধ্যায় দেবীকে শীতল ভোগ নিবেদন করা হয়ে থাকে।  চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় শোভাযাত্রাসহ দেবীকে স্থানীয় পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়।  বিসর্জনের সময় বিভিন্ন প্রকার আতস বাজি পোড়ানো হয়। 

গৃহলক্ষ্মী হাতে পরিবারের কন্যা নিলয়া দে 


  পারিবারিক রীতি মেনে পূজাটি প্রতি বছরের মত  এবছরও  অনুষ্ঠিত হবে। তবে অবশ্যই  করোনার সরকারি বিধি নিষেধ মেনে পূজাটি করা  হবে।


তারিখ :০৪-০২-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Wednesday, December 8, 2021

পেঁচার দেশ নতুনগ্রাম>P

পেঁচার দেশ নতুনগ্রাম 

- সুদীপ্ত মুখার্জী 





পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার একটি ছোট্ট স্টেশন হল অগ্রদ্বীপ। অগ্রদ্বীপ গ্রামটি খুবই প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম।  ব্যান্ডেল কাটোয়া লাইনের স্টেশন হল এই অগ্রদ্বীপ। এই স্টেশনের দক্ষিণ দিকে কিছুটা দূরে আর একটি গ্রাম রয়েছে যার নাম 'নতুনগ্রাম'। এটি খুবই ছোট্ট একটা গ্রাম। গ্রামটি ছোট হলেও শিল্পসুষমায় ভরপুর। বাংলার এক ঐতিহ্যের পীঠস্থান। বাংলার লোকশিল্পের জগতে গ্রামটির যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। বঙ্গীয় ঘরানার কাঠের পুতুলের জন্য গ্রামটি বিখ্যাত। বৈষ্ণব প্রভাবিত অগ্রদ্বীপ গ্রামের সন্নিহিত হওয়ার জন্য এখানকার শিল্পের মধ্যে একটা বৈষ্ণবীয় ধারার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।   




নতুনগ্রাম হল কাঠ খোদাই শিল্পের আঁতুরঘর। গ্রামটির একেকটা বাড়ি শিল্প সৃষ্টির আকর। আমরা বাংলার বিভিন্ন স্থানে মেলায় কাঠের তৈরী বিভিন্ন পুতুল দেখি  তার বেশিরভাগই এই  গ্রামে তৈরী  হয়। নতুনগ্রামে প্রায় ৫০টি পরিবার বাস করে। প্রায় প্রত্যেকটা পরিবারেই কাঠ খোদাইয়ের কাজ হয়।এখানকার শিল্পী স্বর্গীয় শম্ভুনাথ ভাস্কর মহাশয় ১৯৬৬ সালে তদকালীন রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর থেকেই এখানকার শিল্পের কদর বহুগুন বেড়ে যায়।  




 কাঠ খোদাই করে এখানকার শিল্পীরা বিভিন্ন পুতুল তৈরী করে থাকে। বিস্ফারিত চক্ষুর পেঁচা, রাজা-রানী, হাত তোলা গৌড়-নিতাই এই  তিন ধরণের পুতুল এখানকার ঐতিহ্য। এছাড়া কাঠের পেঁচা দিয়ে বসার টুল, কাঠের টেবিলের উপর পেঁচা আঁকা, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, পেঁচার আদলে তৈরী রাজা-রানী। এছাড়া  গৃহসজ্জার সম্ভার  হিসেবে কাঠের তৈরী  বিভিন্ন পুতুল ও দেব-দেবীর মূর্তিও তারা তৈরী করে। আয়নার ফ্রেম, কলমদানি, মোবাইল স্ট্যান্ড, ইজিচেয়ার, টেবিল ল্যাম্পও তাঁরা তৈরী করে। এখানকার কাঠ খোদাই করে নির্মিত বিভিন্ন মাপের পেঁচা জগৎ বিখ্যাত। এখানকার তৈরী প্রত্যেকটা জিনিসেই এখানকার শিল্পীরা একটা নিজস্ব শিল্পরীতির ছাপ রাখে। 
 

নতুনগ্রামের সূত্রধর জাতিরা প্রথম দিকে পাথর খোদাইয়ের কাজ করতেন। বর্ধমান রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাথর খোদাই কাজের একসময় এই অঞ্চলে  রমরমা ছিল।  বর্ধমান রাজার পতনের পর এখানকার পাথর খোদাইয়ের কাজ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এখানকার কারিগরদের অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাব হতে থাকে।   সেই সময় এখানকার শিল্পীরা এই কাজ ছেড়ে দারুশিল্প শুরু করে। 

 কোনো শিল্প গড়ে ওঠার পিছনে কিছু ভৌগোলিক, সামাজিক বা ধর্মীয় পটভূমি থাকে। এইসব পটভূমির জন্যই সেখানকার শিল্পের খ্যাতি একচেটিয়া হয়ে ওঠে। নতুনগ্রামের সূত্রধর জাতির প্রথমদিকে পাথর খোদাইয়ের কাজ করতেন। বর্ধমান রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাথর খোদাই কাজের একসময়  রমরমা ছিল। বর্ধমান রাজার পতনের পর এখানকার পাথর খোদাইয়ের কাজ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এখানকার কারিগরদের অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাব হতে থাকে।   সেই সময় এখানকার শিল্পীরা এই কাজ ছেড়ে দারুশিল্প শুরু করে। 

নতুনগ্রামের নানা আকারের কাঠের তৈরী পেঁচা বিশ্ববন্দিত। এখানকার কাঠ খোদাই করা পেঁচার উৎস সন্ধান করলে দেখা যায় এইসব অঞ্চলগুলো পূর্বে কৃষিপ্রধান ছিল। এখানকার শিল্পীরা প্রথমদিকে সাধারণত কাঠ দিয়ে গরুর গাড়ির চাকা বানাতো। এইসব অঞ্চলে পূর্বে  বছরে বার তিনেক লক্ষ্মীপূজা হতো। পৌষ, চৈত্র ও ভাদ্র মাসে লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হত। দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। পূজার  বিধান অনুসারে এক সের ধানের চারদিকে  চারটি পেঁচা রাখার নিয়ম ছিল। সেইসব পেঁচাগুলো পুরুষ শিল্পীরা নিজেরা বানিয়ে দিতো। বাড়িরই বাচ্চাদের আবদারে তারা কাঠ খোদাই করে তাদের বিভিন্ন পুতুল বানিয়ে দিতো।  পরবর্তীকালে তাদের সেইসব শিল্পকলা ছড়িয়ে পরে বিভিন্ন স্থানে। সময়ের তাগিদে চাহিদা বাড়ে। মানুষের রুচি বদলায়। তাই শুধু পুতুলেই আজ আর আটকে নেই নতুনগ্রাম। সেই কারণে উঠে আসে রাজা-রানী, গৌড় নিতাই, কৃষ্ণ ইত্যাদি মূর্তির  ভাবনা। বর্ধমান রাজ্যের কৃপাধন্য হয়ে পরে তাঁরা রাজা-রানীর মূর্তি নির্মাণ করে। এখানকার তৈরী প্রতিটা জিনিসেই রয়েছে শিল্পের সুষমা।এখানকার পুতুলগুলো রঙিন হওয়ার ফলে বেশ মনোগ্রাহী হয়।  বর্তমানে এখানকার এই শিল্প ধরে রাখার জন্য বেশ কয়েকবছর ধরে সরকার ও বেশ কয়েকটা সংস্থা বিভিন্ন জায়গায় মেলার আয়োজন করছে। সেইসব মেলায় এখানকার পুতুলের একটা আলাদা চাহিদা রয়েছে।শুধু পশ্চিমবঙ্গ সরকার নয়  ভারত সরকার ও ইউনেস্কো থেকেও এখানকার শিল্পীদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। 

বিংশ শতাব্দীর এক গোড়ার দিকে বাজারে প্লাস্টিক নির্মিত বিভিন্ন পুতুল চলে আসে।  প্লাস্টিক পুতুলের সম্ভার যত বাজারজাত হয়েছে তত এখানকার কাঠের খোদাই করা পুতুলের কদর কিছুটা হলেও কমেছে। এখানকার লোকশিল্পীদের ইতিহাস কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে। ১৯৫৫ সাল নাগাদ এখানকার কাঠ খোদাই শিল্প ভারত সরকারের নজরে আসে।  

এখানকার শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিল্প গরিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।  আধুনিকতার কাছে তাঁরা হয়তো কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়ছে তবুও তাঁরা তাঁদের শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিচ্ছে। তাঁদের নিখুঁত হাতের স্পর্শে  এখানকার শিল্প কর্ম আজ বিশ্বের কাছে বাংলার ম্যান ও সম্মান অনেকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। 


 

কিভাবে এখানে আসবেন :


নিজের গাড়িতে আসতে পারেন। এছাড়া হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে কাটোয়া লোকাল ধরে অগ্রদ্বীপ স্টেশনে নেমে অটো বা টোটো ধরে খুব সহজেই আসতে  পারবেন। 


তারিখ :০৯-১২-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 






Monday, November 8, 2021

কালীপুজায় চেতলা অভিযান >P

কালীপুজায় চেতলা অভিযান 


- সুদীপ্ত মুখার্জী 



দক্ষিণ কলকাতার আদি গঙ্গার দুধারে দুটি অঞ্চল রয়েছে।  পূর্বধারে রয়েছে কালীঘাট  আর পশ্চিম ধারে রয়েছে চেতলা নামক একটা জনপদ। কলকাতার অন্য অংশের মতো চেতলা অঞ্চলটিও বেশ ঘন বসতিপূর্ণ।  

কালিপূজায় মহানগরীর দুটো অঞ্চল বরাবরই একে অপরকে টেক্কা দিতো। অঞ্চল দুটি হল মধ্য কলকাতার আমহার্টস স্ট্রীট ও দক্ষিণ কলকাতার চেতলা। আমহার্টস স্ট্রিটে পরপর বেশ কয়েকটা বড় বড় পূজা হয়ে থাকে। বড় মণ্ডপ, বড় প্রতিমা এখানকার বৈশিষ্ট্য। এখানকার পূজায় লাইটিংয়ের খেলাও বিশেষত্ব। এখানে কোনো দিন কোনো থিম দেখা যায় না। সাবেকি প্রতিমায় দেবীর আরাধনা করা হয়। অঞ্চলের পূজাগুলির মধ্যে ফাটা কেষ্টর পূজা ও সৌমেন মিত্রের পূজা খুবই বিখ্যাত। এককালে এখানে জনসমুদ্র দেখা যেত।
 
চেতলার পূজা মানেই বর্ণময়। চেতলায় বরাবরই দেখা যায় দেবী কালীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এখানে শুধু শাস্ত্রমতে বর্ণিত রূপ নয়, এই অঞ্চলটিতে বাইরে থেকে নানা রকম রূপের দেবীকে  আমদানি করা হয়। এখানে কোনো পূজায় সেরকম বড় প্যান্ডেল বা বড় প্রতিমা সাধারণত দেখা যায় না।  লাইটের খেলাও খুব একটা দেখা যায় না।  এখানে কোথাও দশমহাবিদ্যা, কোথাও চামুন্ডা কালী আবার কোথাও দেখা যায় হাজার হাত কালীর। এই বৈচিত্রই চেতলা অঞ্চলের কালীপূজাকে দর্শনীয় করে তুলেছে। এখানেও এককালে জনসমুদ্র দেখা যেত। শুধু চেতলা অঞ্চলটি ঘুরলেই দেবীর সব রকমের রূপ দর্শন হয়ে যায়। 

আজ কালীপূজার দিন। এই দিন সকালে আমার মায়ের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দর্শনের উদ্দেশ্যে চেতলা অভিযান।  এখানে আমি আপনাদের দেখার জন্য মায়ের বিভিন্ন রূপের ছবি দেবো।  


দশ মুন্ড কালী 




রাবনের মতো দশ মুন্ডের কালী প্রতিমায় এখানে পূজা হয়। বলা হয় দশমুণ্ড কালী। দেবী অষ্টভুজা। উচ্চতায় প্রায় পনেরো ফুট। মহাদেবের উপর দেবী দন্ডায়মান। এই পূজাটি দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে করা হচ্ছে। পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা রূপান্তর ক্লাব। পূজাটি চেতলার শংকর ঘোষ রোডের সি.আই. টি পার্কে করা হয়।  এখানে তান্ত্রিক মতে পূজা করা হয়। দেবীকে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, পায়েস, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে নিবেদন করা  হযে থাকে। আখ, চালকুমড়া, শশা ও কলা বলি দেওয়া হয়। 


 শ্বেত কালী 




দেবী এখানে শ্বেত শুভ্র অর্থাৎ দেবীর গাত্রবর্ণ শ্বেত। পূজাটি পরিচালনা করে আলিপুর এ.বি.এস. স্পোর্টিং ক্লাব।  এবছর এখানে ৪৭ তম বর্ষের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেবীমূর্তি মাহেশ্বরী রুপি। দেবী চতুর্ভূজা। দেবীর এক হাতে রয়েছে ত্রিশূল, এক হাতে ডুগডুগি,  এক হাতে চাঁদমালা, ও অন্য হাতে থাকে মাটির নরমুণ্ড। দেবীর বিশেষত্ব হলো দেবীর পাদদেশে শিয়ালের বদলে থাকে শ্বেত ষাঁড়।  খিচুড়ি, লুচি, তরকারি, পাঁচরকম ভাজা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে মাকে নিবেদন করা হয়। এখানে কোনো প্রকার আমিষ ভোগ দেওয়ার প্রথা নেই।  


সিংহবাহিনী কালী 



দেবী সিংহবাহিনী কালীকে পূজা করে থাকে আলিপুর শীতল স্মৃতি সংঘ। এবছর তাদের পূজাটি ৫৩তম বর্ষে পদার্প করলো।  দেবীকে পোলাও, খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, মাছ, মাংস, চাটনি, পায়েস, ফল মিষ্টি ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়।  এখানে বলি দেওয়ার কোন নিয়ম নেই।  এখানকার মূর্তিটি রাজপুরের  বিপদতারিনী মায়ের আদলে তৈরী করা হয়।  প্রতিমাটির উচ্চতা প্রায় ১২ ফুটের মত। দেবী সিংহের উপর দন্ডায়মান।  দেবীর পাশে ত্রিশূল হাতে মহাদেব বসে রয়েছে।


শিব কালী 




শিবকালী হলেন দেবাদিদেব মহাদেব ও দেবী কালীর সম্মিলিত রূপ। শিবকালী পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা বালক সংঘ। পূজাটি এবছর ৪১তম বর্ষে পদার্পন করলো। এখানে দেবীর অর্ধেক অংশ দেবাদিদেব মহাদেব আর বাকি অর্ধেক অংশে দেবী কালী। দেবী এখানে পদ্মের উপর দন্ডায়মান। দেবীর নীচে বাহন হিসেবে শেয়ালকে দেখা যাচ্ছে। দেবী চতুর্ভূজা। দেবীর এক হাতে থাকে ত্রিশূল, এক হাতে খাঁড়া, এক হাতে চাঁদমালা, আর এক হাতে থাকে নরমুণ্ড। মাকে এখানে খিচুড়ি, পায়েস, আলুরদম, ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। এখানে কোনোরূপ বলি দেওয়া হয়না।  কোনো এক ভক্তের আঙ্গুল কেটে সামান্য রক্ত দেবীপূজায় মাকে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। 

চামুন্ডা কালী 




আমরা জানি দশমহাবিদ্যার প্রথম ও আদি রূপ হল কালী। রামায়ণে আমরা দেখেছি বশিষ্ঠ মুণি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন দক্ষিণাকালী রুপী কালীকে আরাধনা করে।  আদ্যাশক্তি মহামায়ার আটটি রূপ - দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, কৃষ্ণকালী, মহাকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী এবং চামুণ্ডাকালী।  এখানে দেবী কোরালবদনা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা, নরমুণ্ডমালা বিভূষিতা। চেতলা দুর্গাপুর  সেতুর পাশে রয়েছে আলিপুর আরাধনা সমিতি। এই সমিতির তত্ত্ববধানে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় চামুন্ডা কালীর পূজা। ষোলো ফুট উচ্চতার দেবী চামুন্ডার পাশে থাকে দশ ফুট উচ্চতার শিব ঠাকুর। দেবীর দুপাশে থাকে ভয়াল চেহারার ডাকিনি-যোগিনী ও কঙ্কাল। মণ্ডপে লোহার ট্রলিতে দেবীমূর্তি বিরাজিত। বিসর্জনের সময় এই ট্রলিকে ঠেলে বাবুঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। দেবী বিসর্জনে পর ট্রলিটিকে ফেরত নিয়ে আসা হয় এবং সেটাকে যত্ন সহকারে রেখে দেওয়া হয়। এই ট্রলিটিকে সারাবছর দেবীর কাঠামো হিসেবে পূজা করা হয়। কাঠামোটিকেই দেবী বলে গণ্য করা হয়। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার কাঠামোকে পূজা করা হয়।  এছাড়া প্রত্যেক অমাবস্যায় কাঠামোকে ভোগ দেওয়া হয়। এবছর ৭৪তম বর্ষের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খিচুড়ি, পায়েস, পাঁচরকম ভাজা, আলুরদম, পোলাও, সুজি, পাঁচরকম মিষ্টি, চাটনি দেবীকে ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। এখানে কোনো প্রকার আমিষ ভোগ  দেবীকে নিবেদন করা হয় না।  বলি দেওয়া হয় না।  বৈষ্ণব  মতে পূজা করা হয়। পুজোর দেবীর পূজার সময় দেবীকে মানব দেহের রক্ত ও কারণ সুধা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।  রক্ত ছাড়া চামুন্ডা কালির পূজা হয় না। 


দুর্গাকালী 




দুর্গাকালী হলেন দেবী দূর্গা ও দেবী কালীর  সম্মিলিত রূপ। পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা সৎ সংঘ  ক্লাব। এবছর ৩০তম পূজাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই ক্লাবটিতে পূর্বে শ্যামা মায়ের, তারপর অজন্তা কালীর  আরাধনা করা হত।  এখন দুর্গাকালীর আরাধনা করা হয়। এখানকার ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ।  খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, তরকারি, আলুরদম, শাকের ঘন্ট, পায়েস, ফল-মিষ্টি দেওয়া হয়।  চালকুমড়া, আখ, শশা, কলা, বাতাবি লেবু বলি দেওয়া হয়।  প্রথমে ১০৮টি পদ্ম দিয়ে দেবী দুর্গার পূজা করা হয়, তারপর দেবী কালীর পূজা করা হয়।  
 

হাজার হাত কালী 



হাজার হাত কালীর পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা ফিজিক্যাল কালচার এসোসিয়েশন। হাওড়ার শিবপুরের হাজার হাত কালীর অনুকরণে এখানকার মূর্তিটি রূপায়িত হয়। ক্লাবের এক সদস্য জানালেন  আমরা সব সময় মানুষের দুঃখ কষ্টে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকে। আমরা  আমাদের সদস্যদের হাজার হাজার হাত মানব সেবায় নিয়োজিত করতে থাকি তাই আমাদের এই ধরণের থিম। হাজার হাত নিয়ে দেবীর শান্ত রূপ। এবছর পূজাটি ৮৩তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবীকে খিচুড়ি, পোলাও,  লুচি, পাঁচরকম ভাজা, হালুয়া, লাবড়া, চাটনি, পায়েস ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়।  আখ, চালকুমড়া, বলি দেওয়া হয়। এখানে পরম্পরা বজায় রেখে  পূজা করা হয়।  ভোগ বা দেবীর অন্য কাজে  পুরুষরাই সব কাজ করে থাকে কোনো মহিলাকে এইসব কাজে অংশ নিতে দেওয়া হয় না।  মায়ের এক হাতে ত্রিশূল আর এক হাতে খাঁড়া থাকে। দেবীর গাত্রবর্ণ সবুজ। দেবী এখানে শিবের উপর দন্ডায়মান নয়, বাঘ চাল পরিহিত মহাদেবাদিদেব মহাদেব দেবীর পাশে বসে রয়েছে। এছাড়া এখানে দেবীর বাহন হিসেবে একটি সিংহকে দেখা যায়।   


লক্ষ্মী কালী  



লক্ষ্মীকালী হলেন দেবী লক্ষ্মী ও দেবী কালীর সম্মিলিত রূপ। লক্ষ্মীকালী পূজাটি পরিচালনা করে শাস্ত্রী রয়েল ক্লাব। এবছর পূজাটি ২৩তম বর্ষে পদার্পন করলো। এখানে দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, আলুরদম, পায়েস, নানারকম ফল, বিভিন্ন মিষ্টি দেওয়া হয়।  সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ মাকে  নিবেদন করা হয়।  এখানে কোনোরূপ বলি দেওয়া হয় না।  দেবী পদ্মের উপর দন্ডায়মান। দেবীর নীচে একটি শঙ্খের উপর দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা থাকে। দেবীর পাশে বাঘচাল পরিহিত দেবাদিদেব মহাদেব থাকেন। দেবী চতুর্ভূজা। 


চন্ড ঘন্টা কালী 



চেতলা হাট রোডের চন্ড ঘন্টা কালী পূজাটি পরিচালনা করে গীতাঞ্জলি স্পোর্টিং ক্লাব। এবছর তাদের পূজাটি ৪১তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবী চতুর্ভূজা। দেবীর মাথার দুপাশে দুটি করে মোট চারটি নরমুণ্ড রয়েছে। দেবী বাঘছাল পরিহিত অবস্থায়  মহাদেবের উপর দন্ডায়মান। এছাড়া দেবীর পাশে আর একটি মহাদেবের মূর্তি বিরাজিত। 


কৃষ্ণ কালী 



কৃষ্ণকালী হলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণ ও দেবী কালীর সম্মিলিত রূপ। চেতলা হাট রোডে অবস্থিত চেতলা সংঘ ক্লাবটি ১৯৬৬ সালে স্থাপিত হয়। এই ক্লাবটি প্রতিবছর নিয়ম করে এখানে কৃষ্ণ কালীর আরাধনা করে থাকে। দেবী এখানে চতুর্ভূজা।  দেবীর এক হাতে থাকে খাঁড়া, এক হাতে চাঁদমালা আর বাকি দুই হাতে দেখা যায় বাঁশি।  দেবীর পাশে দেবী লক্ষ্মী করজোড় অবস্থায় দন্ডায়মান। দেবীকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এখানে কোনো প্রকার আমিষ ভোগ দেওয়ার নিয়ম নেই।  এখানে চালকুমড়ো, আগ  বলি দেওয়া হয়। 

আদ্যামা 


 
দেবী আদ্যমা পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা বজরঙ বালক সমিতি। এবার পূজাটি ৫০ বছরে পড়ল। দেবীর উপরে রয়েছে রাধাকৃষ্ণ। দেবীর নীচে রয়েছে রামপ্রসাদ। দেবীকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়।  এখানে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়।  


দেবী কিরীটেশ্বরী 



কিরীটেশ্বর কালী পূজাটি পরিচালন করে চেতলা প্রণব সংঘ।  এবছর পূজাটি ২০তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, লাবড়ার তরকারি, পায়েস ইত্যাদি দেওয়া হয়।  চালকুমড়া, আখ, আমাদা বলি দেওয়া হয়। এই ক্লাবটি পূর্বে শ্যামা পূজা করতো। তারপর ৫১ পিঠের দেবী কিরীটেশ্বরকে দেখে ও মুর্শিদাবাদের ৫১ পীঠ কিরীটেশ্বরের প্রধান পুরোহিত শ্রী রক্ষাকর চক্রবর্তী মহাশয়ের আদেশ অনুযায়ী এখানকার শ্যামা পূজার পরিবর্তে দেবী কিরীটেশ্বররীর আরাধনা শুরু হয়। 

ছিন্নমস্তা



 ছিন্নমস্তা রুপী দেবী কালীর  আরাধনা করে থাকে চেতলা অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য পূজা কমিটি।  পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা ৮৬ পল্লী ক্লাব। এখানকার প্রতিমা প্রায় পনেরো ফুট উচ্চতার। প্রতিমার গাত্রবর্ণ টকটকে  লাল এবং মুন্ডহীন। নিজের কাটা মুন্ড নিজের হাতেই ধরা।  দেবীর ডান হাতে ধরা থাকে খাঁড়া। গলা থেকে ছিটকে আসা তিনটে রক্তের ধারা দেবীর কাটা মুন্ড  ও ডাকিনি  যোগিনী পান করে। মা দাঁড়িয়ে থাকেন কাম রতি  অর্থাৎ চিৎ ও শুয়ে থাকার নারী পুরুষ মূর্তির উপর।মূর্তি দুটি পদ্মের উপর থাকে।  সুদীর্ঘকাল ধরে এখানে মায়ের এই রূপের পূজা করা হয়। বহুকাল ধরে এখানে পূজাটি করার অন্যতম কারণ এখানকার ক্লাবের সদস্য ও পল্লীবাসীদের বিশ্বাস। ছিন্নমস্তা রুপী দেবীর পূজাটি এখানে শুরু হওয়ার পর অনেক ক্লাব সদস্যের চাকরি হয়েছে আবার কারো ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। এছাড়া ক্লাব সদস্য ও পল্লীবাসীদের অনেকের অনেক রকম উপকার হয়েছে বলে শোনা যায়।  সাধারণত ছিন্নমস্তা হলেন দশমহাবিদ্যার এক রূপ। দেবীকে এই রূপে পূজা করতে হলে যেমন বহুরকম নিয়ম পালন করতে হয় তেমন বহুরকম বিধিনিষেধও রয়েছে। পূজার সময় বাইরের কারোকে মণ্ডপে ঢুকতে দেওয়া হয় না।  উপোস করা  থাকলে তবে তাকে পূজার সময় মণ্ডপে ঢুকতে দেওয়া হয়। তান্ত্রিক ছাড়া সাধারণ কোনো পুরোহিত এই পূজা করতে পারেন না।  প্রতি বছর তারাপীঠ থেকে কোনো তান্ত্রিক এসে এখানকার পূজাটি করে থাকে। এই পূজায় পাঁঠা বলির নিয়ম রয়েছে। পাঁঠা বলির সাথে চালকুমড়া বলি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, পোলাও, পাঁচরকম ভাজা, পায়েস, লুচি, মালপোয়া, হালুয়া, মাছ ভাজা, মাংস দেওয়া হয়। 


জহুরা কালী 





চেতলা ব্রীজের ঠিক পাশে দেবী জহুরার আরাধনা করা হয়ে থাকে। পূজাটি পরিচালন করে চেতলা ইয়ং ফ্রেন্ডস। দেবী কালির অন্যান্য রূপে সাথে এই রূপে  নেই। এখানে দেবীরূপ বীভৎস। রক্তবর্ণ মুখ। এবছর পূজাটি ৪৮তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবীকে খিচুড়ি, পায়েস, পাঁচরকম ভাজা, লাবড়ার তরকারি, চাটনি ইত্যাদি দেওয়া হয়।  এখানে কোনো রকম আমিষ ভোগ দেওয়ার নিয়ম নেই।  বলি দেওয়া হয় চালকুমড়োকে। 


লেখা ও ছবির স্বত্ব সম্পূর্ণ লেখকের।

তারিখ :০৯-১১-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Friday, November 5, 2021

কাঁকুলিয়া কালীবাড়ি>P

কাঁকুলিয়া কালীবাড়ি

-সুদীপ্ত মুখার্জী 








বালিগঞ্জ অঞ্চলটি খুবই বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। ১৮ শতকে এই অঞ্চলটিতে ইউরোপীয়দের বাগান বাড়ি ছিল। শহরতলির রেলপথের দক্ষিণ শাখা চালু হওয়ার  পর যখন বালিগঞ্জে  একটা রেলওয়ে স্টেশন তৈরী হয় তখন থেকে এই অঞ্চলটিতে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বসবাস শুরু হয়। এই বালিগঞ্জ অঞ্চলের  মধ্যেই পরবর্তীকালে কাঁকুলিয়া নামক আর একটা  অঞ্চল গড়ে ওঠে। এই অঞ্চলটিও মধ্যবিত্তের  পাড়া  হিসেবে পরিচিত হয়।  



এই কাঁকুলিয়া অঞ্চলে রয়েছে একটা ভগ্নপ্রায় মন্দির।  আনন্দময়ী কালী মন্দির। যেখানে বহুবছর ধরে  দেবী কালীর  আরাধনা করা হয়ে চলেছে। দেখতে দেখতে তা আজ প্রায় ৮০ বছর  অতিক্রম করে গেছে। 


যোগীন্দ্রচন্দ্র দাশগুপ্ত মহাশয়ের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলায়। ১৯৩২ সাল নাগাদ তিনি ওখানে দেবী আনন্দময়ীর আরাধনা শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মণিমোহন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এই দাশগুপ্ত পরিবারের কুলগুরু। মণি বাবু ছিলেন দেবী আনন্দময়ীর নিত্য সেবক। ওপার বাংলায় যখন হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষ শুরু হয়। ভারতে তখন স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় দাশগুপ্ত পরিবার তাঁদের কুলদেবী  আনন্দময়ীকে নিজ গৃহ রাখতে ভরসা পাচ্ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের কুলগুরু শ্রী মণিমোহন বাবুকে অনুরোধ করেন যে দেবীমূর্তিটিকে পদ্মার জলে বিসর্জন দিয়ে দিতে। বিসর্জন পর্বের পর তিনি যেন ওই স্থান ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। মণিমোহন বাবু কিন্তু যোগীন্দ্রচন্দ্র দাশগুপ্তর কথায় রাজি হলেন না।  তিনি বললেন যদি এপার  বাংলা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতেই  হয় তাহলে তিনি দেবী আনন্দময়ীকে সাথে করে নিয়ে ফিরে যাবেন।  এই ঘটনার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি মা আনন্দময়ীকে সাথে করে পশ্চিমবাংলায়  চলে আসেন। তিনি তাঁর দেশের বাড়ি বর্ধমানে প্রথমে গেলেন। তারপর তিনি দেবী আনন্দময়ীকে সাথে করে নিয়ে কলকাতায় এসে কাঁকুলিয়াতে আস্তানা গড়লেন। সেই সময় কাঁকুলিয়া অঞ্চলটি একটি ট্রাস্টি বোর্ডের দ্বারা সরক্ষিত ছিল।  ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা প্রথমে দেবী আনন্দময়ীর জন্য একটি স্থান নির্দিষ্ট করে একটি কাঁচা ঘর নির্মাণ করে দিলেন। এই কাঁচা ঘরে মা আনন্দময়ী প্রতিষ্ঠিত হলেন। সালটা ছিল ১৯৪৮।তা আজ দেখতে দেখতে প্রায় ৮৪-৮৫ বছর হতে চললো। পরবর্তী সময় দাশগুপ্ত পরিবারের এক দৌহিত্র শ্রী অনিল দত্ত মহাশয় বর্তমান মন্দিরটিকে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। পরে তিনি মন্দিরের ঠিক সামনে একটি নাটমন্দির ও পাশে একটি শিব মন্দির তৈরী করে দিয়েছিলেন। ১৯৬৫-৬৬ সাল নাগাদ পুরো নাটমন্দিরটি ও শিব মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে যায় তখন এই অঞ্চলের অধিবাসী শ্রী রঘুনাথ মুখার্জী, শ্রী হীরেন চন্দ্র ও আরো কয়েকজন নতুন করে নাটমন্দির ও শিমন্দিরটিকে পুনরায়  তৈরী করে দেন। শুধু নাটমন্দির বা শিব মন্দির নয় তার সাথে তারা মন্দিরের পিছনে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বসবাসের উপযুক্ত ঘরও  তৈরী করে দিয়েছিলেন। 




কষ্টিপাথরের বিগ্রহটি উচ্চতায় ২২ ফুট। দেবী এখানে চতুর্ভূজা ও দেবাদিদেব মহাদেবের উপর দন্ডায়মান।  আষাঢ় মাসের অমাবস্যার দিন এই মন্দিরটিতে দেবী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।  সেই জন্য ওই দিন এখানে প্রতিবছর নিয়ম করে বাৎসরিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা, চক্ষুদান ও ঘটস্থাপন সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন নিত্যপূজা করা হয়ে থাকে। কালীপূজার দিন বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর কালীপূজার পূর্বে দেবীর অঙ্গরাগ সম্পন্ন হয়। এইদিন সকালে দেবীকে রাজবেশ পরানো হয়।  কালীপূজার দিন নিত্যপূজা অনুষ্ঠিত হলেও আমবস্যার সময় বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। 

এই বিশেষ দিনটিতে দেবীকে খিচুড়ি, সাদা ভাত, লুচি, তরকারি, পায়েস, চাটনি এবং নানারকম ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে দেবীকে নিবেদন করা হয়। এখানকার মন্দিরে যেহেতু শালগ্রাম শিলা রয়েছে তাই নিরামিষ ভোগ দেবীকে নিবেদন করা হয়।  পূর্বে এখানে বলিদান করা হত কিন্তু বহুকাল পূর্ব থেকে তা বন্ধ হয়ে গেছে।  পুরানো ঐতিহ্য বজায় রেখে আজও  মন্দিরে পূজাপর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 

মন্দিরের সেবায়েত জানালেন যে দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিনীর বিগ্রহটিকে যে নবীন ভাস্কর নির্মাণ করেছিলেন তারই চৌহিত্র এখানকার দেবীর বিগ্রহটিকে তৈরী করে দিয়েছিলেন।  
 
কিভাবে যাবেন : 

শিয়ালদহ থেকে দক্ষিণ শাখার  যে কোনো ট্রেন ধরে বালিগঞ্জ এসে নামুন। স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই মন্দিরটিকে পেয়ে যাবেন। এছাড়া যে কোন বাসে করে এসে গড়িয়াহাটে নামুন।  গড়িয়াহাটে কাউকে জিজ্ঞাসা করে কাঁকুলিয়া রোড-এ আসুন। এই রাস্তার উপর আনন্দময়ীর মন্দিরটি অবস্থিত। 

মন্দিরের ঠিকানা : 

১৪৭ নং কাঁকুলিয়া রোড, কলকাতা - ৭০০০২৯


তারিখ :০২-১১-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।