Tuesday, June 14, 2022

ঘূর্ণি

ঘূর্ণি পুতুলপট্টি 






পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার সদর শহর হল কৃষ্ণনগর। কালীভক্ত ও বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। শিল্পের প্রতি তাঁর  আগ্রহ ছিল।  তাঁরই নামানুসারে শহরটির নামকরণ করা হয়েছিল। পূর্বে জায়গাটির নাম ছিল রেউই।  কৃষ্ণনগরের একটি অঞ্চলের নাম ঘূর্ণি। এই ঘূর্ণির মাটির পুতুল ও মূর্তির খ্যাতি জগৎজোড়া। এখানকার মৃৎশিল্পীদের সূক্ষ্ম হাতের কাজ দেখার মত। এখানকার সূক্ষ্ম শৈলী কৃষ্ণনগর ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না।  এখানকার মাটির কাজ পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ কুটির শিল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।  কথিত আছে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে এখানে এই শিল্পের সূচনা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন বাংলাদেশের নাটোর প্রদেশ থেকে কয়েকজন মৃৎশিল্পী এখানে এসে মাটির পুতুল নির্মাণ শুরু করে। এরপর এখানে ধীরে ধীরে অন্যান্য জায়গা থেকে আরও মৃৎশিল্পী  এসে বসবাস শুরু করে। সেই থেকেই এখানে মৃৎ শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং ব্যাপকতা লাভ করে।  ক্রমেই এই শিল্প বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে পড়ে। 





কৃষ্ণনগর শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে জলঙ্গি নদী বয়ে চলেছে।  এই নদীর কাছেই ঘূর্ণির মৃৎশিল্পের উপনিবেশটি গড়ে উঠেছে। এই নদী তীরে মাটির নৌকা এসে ভেড়ে। সেই মাটি সংগ্রহ করে মৃৎশিল্পীরা বছরের পর বছর ধরে তাদের সুক্ষ্ম কারুকাজ ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বজায় রেখে চলছেন।   


এখানে মাটি খুব সহজলভ্য। কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা রাজমহলের মাটি নিয়ে কাজ করে। এখানে  বেলে  ও দো-আঁশ মাটির মিশ্রনের সাথে পরিমাণ মতো এঁটেল মাটি ব্যবহার করে পুতুলগুলো নির্মাণ করা হয়। এখানে ছাঁচের পুতুল ছাড়াও হাত দিয়ে তৈরী নানারকম পুতুল গড়া হয়ে থাকে।  মাটি ছাড়াও ফাইবারের তৈরী বিভিন্ন পুতুলও নির্মিত হয়। 


কৃষ্ণনগর পৌরসভা এলাকার তিনটে অঞ্চলে মৃৎশিল্পীদের সুদীর্ঘকালের বসতি গড়ে উঠেছে। শহরের উত্তর-পূর্ব  উপকণ্ঠে ঘূর্ণিতে, শহরের দক্ষিণে নতুনবাজার রথতলা অঞ্চলে আর তৃতীয়টি হল ঘূর্ণির সংলগ্ন কুমোরপাড়া-ষষ্ঠীতলা। এই শিল্পের সাথে এখানে প্রায় তিনশো জন নারী-পুরুষ ও কিশোর জড়িত রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় নব্বই শতাংশ জাতিতে কুমোর। এছাড়া বাকি দশ শতাংশ অন্যান্য জাতি  এই শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে। 





শুধু মাটির পুতুল নয় এখানকার দূর্গা প্রতিমাও খুবই বিখ্যাত। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল যারা তৈরী  করে তারা সাধারণত বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন।  শুধু আমাদের দেশ নয় তাঁদের অনেকেই বিশ্বের দরবারেও সম্মান অর্জন করেছে অর্থাৎ তাঁরা আন্তর্জাতিক স্তরে  সম্মানিত হয়েছেন। কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের মধ্যে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সম্মান ও পদক পান শ্রীরাম পাল। তাঁকে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্প শৈলীর আদিপুরুষ বলা হয়। পরবর্তীকালে শ্রী মতিলাল পাল, শ্রী সুবীর পাল  ও আরো অনেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। কৃষ্ণনগরের সবচেয়ে যশস্বী কারুকার ছিলেন যদুনাথ পাল।  যদুনাথ পালের পর সাফল্য ও জনপ্রিয়তায় উল্লেখযোগ্য ছিলেন গোপেশ্বর পাল। কিশোর বয়সেই তিনি অবশ্য কলকাতার কুমোরটুলিতে চলে আসেন।  এছাড়া কার্তিক পাল,  বাদল পাল,  শংকর সরকার, গৌতম পাল ইত্যাদি কয়েকজন আজও এখানকার ঐতিহ্যমন্ডিত মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন।   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায় ও গগনেন্দ্রনাথ  ঠাকুর এখানকার মৃৎশিল্পীদের সমাদর করেছেন। তাঁরা এই শিল্পের গুনগ্রাহী ছিলেন।  

কিভাবে যাবেন : 

শিয়ালদহ  স্টেশন থেকে কৃষ্ণনগর লোকাল ধরে কৃষ্ণনগর স্টেশনে নামুন। সময় লাগবে ঘন্টা আড়াই। কৃষ্ণনগর  স্টেশন থেকে টোটো গাড়ি করে ঘূর্ণি পুতুলপট্টিতে চলে আসুন। 





তারিখ :১৫-০৬-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 





Wednesday, April 27, 2022

এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শিব লিঙ্গ

এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ  শিব লিঙ্গ 

সুদীপ্ত মুখার্জী 






কলকাতা থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে নদীয়া জেলায়  মাজদিয়া নামে  একটা ছোট্ট গ্রাম রয়েছে। গ্রামটির পরিচয়  বেশিরভাগ পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে অজানা। এই গ্রামে গেলে দেখা মিলবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ শিবলিঙ্গের। শিবনিবাস বাংলার ইতিহাস খ্যাত ও পুরাকীর্তি সমৃদ্ধ এক প্রাচীন স্থান।    কেউ কেউ শিবনিবাসকে পশ্চিমবঙ্গের কাশী  বলে থাকে। 

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়  এই অঞ্চলে বহু প্রাচীনকালে নসরৎ খাঁ নামে এক দুর্ধর্ষ ডাকাত বাস করতো। সেই  ডাকাতের নাম থেকেই অঞ্চলটির নাম হয়েছিল নসরৎ বেড়। নসরৎ ডাকাতের উৎপাতে অঞ্চলের সকলেই অত্যাচারিত হত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেই ডাকাতকে দমন করার জন্য মাজদিয়ার জঙ্গলে উপস্থিত হন। সেই ডাকাতকে দমন করার পর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র  পরদিন সকালে  নিকটবর্তী নদীতে মুখ ধুতে গেলে নদীর স্রোতে  ভেসে  আসা একটা  রুই মাছ লাফিয়ে মহারাজার পায়ের ওপর এসে পড়ে। এই ঘটনায় মহারাজার এক আত্মীয়ের কাছে ঘটনাটা খুব শুভ বলে মনে হয়েছিল। বাংলায় যখন বর্গী আক্রমণ ঘটেছিল সেই সময় মহারাজ সাময়িকভাবে তাঁর রাজধানীকে মাজদিয়ায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। কেউ কেউ বলে থাকেন মহারাজ তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগরকে বর্গীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিলেন।  মহারাজ এই স্থানে একটি শিব মন্দির স্থাপন করেন। তিনি মন্দিরে কষ্টিপাথরের নির্মিত একটা সুবিশাল শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা করেন।  



১৭৫৪ সালে অর্থাৎ ১৬৭৬ শকাব্দে  মাজদিয়ায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি রাজ রাজেশ্বর মন্দির নামে পরিচিত হয়। কথিত রয়েছে, মহারাজ তাঁর প্রথম স্ত্রীর জন্য নাকি  এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন।

 মন্দিরটি একটা উঁচু ভিত্তিবেদীর ওপর স্থাপিত। মন্দিরটি আটকোনা।  খাড়া দেওয়ালের        প্রতি কোনায় মিনার ধরণের আটটি থাম রয়েছে। মিনার বিশিষ্ট এই মন্দিরটির চূড়া সমেত  উচ্চতা ১২০ ফুট।  মন্দিরের সুউচ্চ চূঁড়াটি নদীর ঘাট থেকে দেখতে পাওয়া যায়। প্রবেশদ্বারে খিলান ও অবশিষ্ট দেওয়ালে একই আকৃতির ভরাট করা নকল খিলান পরিলক্ষিত হয়।  মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ যার উচ্চতা ৯ফুট এবং প্রস্থ ২১ ফুটের মতো। এই সুউচ্চ শিবলিঙ্গের নাম রাজ্ রাজেশ্বর। গর্ভগৃহে ঢুকে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে তবে দেবাদিদেব মহাদেবের মাথায় জল বা দুধ  ঢালা যায়। ভক্তরা একদিকের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে জল বা দুধ ঢালে আর অন্যদিকের সিঁড়ি   দিয়ে নেমে দেবমুর্তিকে প্রদক্ষীণ  করে  থাকে। গ্রামবাসীরা অবশ্য এই মন্দিরটিকে বুড়ো শিব মন্দির বলে থাকে। এই মন্দিরের ছাদ ঢালু এবং গম্বুজ রয়েছে।  ঐতিহ্যবাহী বাঙালি কাঠামো অনুসরণ করে এটা নির্মিত না। এই মন্দিরে যেমন রয়েছে পোড়ামাটির কাজ তেমন রয়েছে ইসলামিক ও গোথিক কাজের নিদর্শন। 

এই অঞ্চলে মহারাজ সেই সময় নাকি ১০৮টি শিব মন্দির নির্মাণ করেছিলেন যা কালের গর্ভে আজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে পাশাপাশি তিনটি মন্দির দেখা যায়  রয়েছে।  রাজ্ রাজেশ্বর মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে চার চালা  বিশিষ্ট একটি (দ্বিতীয়) মন্দির। মন্দিরটির নাম রাঙ্গীশ্বর মন্দির। এই মন্দিরটির উচ্চতা  ৬০ ফুট।  এই মন্দিরটির ভিতরে রয়েছে ৭ ফুট উচ্চতার  শিবলিঙ্গ।  এই মন্দিরটির পাশে দেখা যায় রাম-সীতার মন্দির। এই মন্দিরটিও ১৭৪৩ সালে মহারাজ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য নির্মাণ করেছিলেন। পশ্চিমমুখী মন্দিরটি ভিত্তিবেদীর উপর অবস্থিত। মন্দিরটির  উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট। এই মন্দিরের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে কালো কষ্টিপাথরের রামচন্দ্র, অষ্টধাতুর নির্মিত দেবী সীতা ও শ্রীরামচন্দ্রের অনুজ লক্ষণ।  




 
এখানে সারাবছর দর্শনার্থীদের দেখা মিললেও শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার এখানকার শিবলিঙ্গে জল ঢালার জন্য লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়।  প্রতি বছর  ভীম একাদশীতে এখানে মেলা বসে এবং তা চলে শিবরাত্রি পর্যন্ত।  শিবনিবাস মন্দিরে যাওয়ার জন্য পথে পরে চূর্ণী নদী।  চূর্ণী নদীর উপর বাঁশের  তৈরী একটা সাঁকো রয়েছে। সাঁকোটা পার হয়ে মন্দিরে যেতে হয়। এই সাঁকো ও তার আশপাশ অঞ্চলটি খুবই মনোরম।  ছবি তোলার জন্য খুবই আদর্শ।  

পূর্বেই বলেছি শিবনিবাসকে বাংলার কাশী বলা হয়, যদিও এখানে কাশীর মতো গঙ্গা নদী বয়ে যায় না, এখানে মন্দিরের পাশ দিয়ে চূর্ণী নদী প্রবাহিত হয়। 





কিভাবে যাবেন : শিয়ালদহ থেকে গেদে  লোকাল ধরে মাজদিয়া স্টেশানে পৌঁছান। সময় লাগবে আড়াই ঘন্টা। স্টেশান  থেকে টুকটুকি (টোটো)  গাড়ি করে শিবনিবাস গ্রামে  চলে আসুন । ভাড়া নেবে ১০ থেকে ১৫ টাকা।এখান  থেকে পায়ে হেঁটে একটা বাসের সাঁকো পার হয়ে যেতে হবে।  এই সাঁকো পার হওয়ার জন্য যাওয়া ও আসার ভাড়া  জন প্রতি  ৪ টাকা লাগবে।  


তারিখ :-২৭-০৪-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Sunday, April 10, 2022

কাশীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী অন্নপূর্ণা



কাশীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী অন্নপূর্ণা

সুদীপ্ত মুখার্জী 


কাশী হল হিন্দুদের পবিত্র তীর্থভূমি এবং পৃথিবীর প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। বহু প্রাচীনকাল থেকেই পূণ্যকামী মানুষদের এই তীর্থে বারে বারে ছুটে আসতে দেখা যায়।প্রাচীন  শৈব্যতীর্থ এই কাশীর আধুনিক নাম হয়েছে বারাণসী।  হিমালয়ের বুকে উত্তরকাশীর দুপাশ দিয়ে বয়ে আসা দক্ষিণে অসি ও উত্তরে বরুণা  নদী। বরুণা ও অসি এই দুই নদী প্রবাহিত হয়ে এসে কাশীর গঙ্গায় মিলিত হয়েছে। বরুণা ও অসি নদীর নাম একত্র করে বারাণসী নামের সৃষ্টি। পতিতপাবনী, জীবনদায়িনী ও স্রোতস্বীনি পবিত্র গঙ্গার তীরেই হিন্দুতীর্থ বারাণসীর অবস্থান। কাশী-বারাণসী নিজেই নিজের তুলনা। প্রাচীনত্বের নিরিখে কাশীর খ্যাতি জগৎজোড়া। এই তীর্থভূমিতে যেমন আছেন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের প্রথম  লিঙ্গ বিশ্বনাথজী ঠিক তেমন রয়েছেন কাশীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা অন্নপূর্ণা। 

এখানকার বিশ্বনাথ মন্দির ও অন্নপূর্ণা মন্দির হিন্দুধর্মের পীঠস্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম  ও খুবই জনপ্রিয়। গঙ্গাতীরে দশাশ্বমেধ ঘাট মানেই কাশী, কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির, মা অন্নপূর্ণা হল কাশীবাসীদের কাছে সব।  জনশ্রুতি অনুসারে এই স্থানেই বাবা বিশ্বনাথের সাথে দেবী অন্নপূর্ণার সহাবস্থান রয়েছে। এখানে বাবা বিশ্বনাথ মন্দিরের ঠিক পাশে রয়েছে দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির। দূরদূরান্ত থেকে অগণিত ভক্ত প্রতিদিন কাশীধামে আসেন এবং দেবী অন্নপূর্ণার প্রসাদ গ্রহণ করে থাকেন। 

 
অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণা বা অন্নদা দেবী যিনি দেবী দুর্গার এক রূপ। মূলত দেবী দ্বিভূজা  হয়ে থাকেন। দ্বিভূজা দেবীর বামহস্তে অন্নপাত্র এবং ডানহাতে থাকে দরবিও অর্থাৎ চামচ বা হাতা।  প্রতিবছর চৈত্র মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে দেবী অন্নপূর্ণার বিশাল আয়োজনে পূজা করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন হিন্দু পুরাণে আমরা দেবী অন্নপূর্ণার উল্লেখ দেখতে পাই। আধ্যাতিক সাংস্কৃতিক নগরী কাশীর জগন্মাতা হলেন রাজরাজেশ্বরী  অন্নাপূর্ণা।  দেবী অন্নপূর্ণাকে ঘিরে নানারকম কাহিনীর কথা শোনা যায়।  এইসব কাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাসদেবের কাশী প্রতিষ্ঠার উপাখ্যানও । 

আমরা জানি মুঘল আমলের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সম্রাট কাশীর একাধিক মন্দির চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে গেছেন। পরবর্তীকালে তা আবার কেউ না কেউ গড়ে দিয়েছেন। কথিত আছে, বাবা বিশ্বনাথ হলেন কাশীক্ষেত্রের নির্মাণকর্তা, কালভৈরব হলেন দ্বারপাল আর মা অন্নপূর্ণা হলেন কাশীক্ষেত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বিশ্বনাথ মন্দিরের ঠিক পাশে ও ঢুন্ডিরাজ গণেশের পরে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে ডানদিকে পড়ে দেবী অন্নপূর্ণা মন্দিরের প্রবেশদ্বার। রূপোর কারুকার্য করা বিশাল দরজা হল প্রধান ফটক। এই প্রধান ফটক পেরোলেই মন্দিরসহ বিরাট নাটমন্দির অবস্থিত। গর্ভগৃহে রুপার আসনে উপবিষ্ট দেবী অন্নপূর্ণা। অপূর্ব মূর্তি। সোনার মুকুটে এখানে দেবী স্বর্ণময়ী, স্বর্নোজ্জ্বলা।  সুন্দর শাড়ি পরে ফুলের মালায় ঢাকা মা উপবিষ্ট রয়েছেন। বেশ উজ্জ্বল মুখমন্ডল, টানা টানা চোখযুগল। ১৭২৫ সালে দক্ষিণের রাজা বিষ্ণুপন্থ গাজাবেদী পূর্বেকার মন্দিরটি ভেঙে নতুন মন্দিরটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। নতুন মন্দিরের তুলনায়  পূর্বের মন্দিরটা বেশ ছোট ছিল।  বিগ্রহটি সোনার পাত দিয়ে মোড়া। দেবী অন্নপূর্ণার পাথরের আদি বিগ্রহটি অতি  জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় এখন সর্বদাই মূর্তিটি ঢাকা থাকে সোনার আবরণে। মন্দির চত্বরে আরো কয়েকটি মন্দির রয়েছে।  মূল মন্দিরের বাঁদিকে কুবেরেশ্বর, ডানদিকে সূর্যদেব। এছাড়া গণেশ, যন্ত্রেশ্বর বিগ্রহ রয়েছে।  যন্ত্রেশ্বর বিগ্রহটির মাথায় খোদিত রয়েছে সুন্দরদেবী-যন্ত্রম। এটা খুবই প্রাচীন লিঙ্গ। এর পশ্চিম দিকে রয়েছে হনুমানজী দেবী মন্দিরের ঠিক সামনেই একটা আলাদা দালানের উপর রামচন্দ্রের মূর্তি। তীর্থযাত্রীদের নিকট যা সত্যনারায়ণ নামেই পরিচিত। এছাড়া ভবানীশঙ্করের একটা প্রাচীন মন্দির দালানে রয়েছে। কুবেরেশ্বররের ঠিক ওপরের ঘরে পূর্বেকার সোনার অন্নপূর্ণা বিগ্রহটি স্থাপিত রয়েছে। এই মূর্তিটি সবদিন দেখা যায় না, বিশেষ বিশেষ দিনে মূর্তিটিকে ভক্তদের দেখতে দেওয়া হয়। এই মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ নিষেধ। তবে বিদেশী ও অহিন্দুদের জন্য নহবতখানা ঠিক উল্টোদিকে একটি ঝোলানো বারান্দা রয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে তারা দেবী অন্নপূর্ণাকে দর্শন করতে পারেন।  

কাশীতে তৈরী হয়েছে "কাশী অন্নপূর্ণা অন্নক্ষেত্র ট্রাস্ট"। বিনা খরচে  খাবার, অবৈতনিক  শিক্ষা ও  চিকিৎসা জনগণকে দেওয়া হল এই ট্রাস্টের প্রধান উদ্দেশ্য।  এই ট্রাস্টের মাধ্যমেই দেবী অন্নপূর্ণাকে অন্ন উৎসর্গ করা হয়।  তারপর সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা  হয়। এখানকার ভোগ মন্দিরে বসেই খেতে হয়, তা মন্দির চত্বরের বাইরে আনা  যায় না।   

হিন্দু বিশ্বাস যে বাবা বিশ্বনাথের কাশীতে মা অন্নপূর্ণার কৃপায় কখনো কেউ অভুক্ত থাকে না। এই অন্নদায়িনী দেবী অন্ন  দিয়ে  দীন-দরিদ্র সকলেরই দুঃখ দূর করেন।   দেবী অন্নপূর্ণার এক নাম ভবানী।  কাশীতে ঘোরতর সংসারী হলেন বাবা বিশ্বনাথ। তাঁর স্ত্রী হলেন দেবী ভবানী। দেবী ভবানী বা অন্নপূর্ণা কাশীর নিত্যদেবী। কাশীতে ফুল-মালা, দীপ, ধূপ  ও নৈবেদ্য সহকারে অর্চনা করলে সংসারে কোনোদিন খাদ্যের অভাব ঘটবেনা বলে বিশ্বাস রয়েছে।  


পুরাণে  বলা আছে, যে মহাদেবের সাথে দেবীর মতবিরোধ হওয়ার জন্য তিনি কৈলাশ ত্যাগ করেন।  তাঁর কৈলাশ ত্যাগের  কারণে চারদিকে মহামারি ও খাদ্যাভাব দেখা দেয়। সেই সময় ভক্তদের ঠিক রাখার জন্য মহেশ্বর ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু দেবীর মায়ায় তাঁর ভিক্ষার অভাব ঘটে। তখন দেবাদিদেব মহাদেব জানতে পারেন যে কাশীতে এক নারী রয়েছেন যিনি সকলকে অন্ন দান করেন। এই কথা শুনে মহাদেব তাঁর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে কাশীর  উদ্দেশ্যে  রওয়ানা দিলেন।  এখানে তিনি দেবীর নিকট থেকে ভিক্ষা গ্রহণ করে ভক্তদের বিপদ থেকে রক্ষা করলেন।  


তারিখ :১০-০৪-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 







Monday, March 14, 2022

বইমেলা ও নতুন লেখক

বইমেলা ও নতুন লেখক 


সুদীপ্ত মুখার্জী 





মেলা কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল মিলনোৎসব। বহু শতক ধরে সভ্যতার ঐতিহ্যকে  বহন করে চলেছে  মেলা । মেলাতে মানুষ একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করে থাকে। বইমেলা হল বইয়ের মহোৎসব।বইমেলা একটা স্বতন্ত্র প্রকৃতির মেলা যা বইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক মিলন ক্ষেত্র।  যেটা  প্রকাশক, পাঠক ও লেখকদের মিলনোৎসব। বইমেলাতে পরস্পরের অর্থাৎ প্রকাশক, পাঠক ও লেখকের যোগাযোগ স্থাপন ও ভাব বিনিময় হয় বইয়ের মাধ্যমে। প্রকাশকরা তাদের প্রকাশিত নতুন ও পুরানো বইযের সম্ভার নিয়ে এখানে দোকান সাজিয়ে তোলেন। পাঠকরা নানা রকম বইয়ের সম্ভার থেকে  পছন্দের বইটা সংগ্রহ করে নেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  বলে গিয়েছিলেন 'বই হলো অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেয়া সাঁকো'।  বই ছাড়া শিক্ষিত জ্ঞান পিপাসু মানুষের জীবন প্রায় অচল বলা চলে। বই মানুষের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার নির্ভরযোগ্য উপাদান বলা চলে। ইরানের বিখ্যাত  কবি ওমর খৈয়াম বলেছিলেন  'রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,  বই, সেতো অনন্ত যৌবনা'। এই অনন্ত যৌবনা বইগুলোর সন্ধান বইযের মহোৎসবেই সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। বইমেলা আজ আমাদের ঐতিহ্যের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বইযের এই উৎসবেই যেন বাঙালি অবগাহন করে পুণ্যস্নানে। 

গত ৮ই নভেম্বর ২০২১ সরকারের তরফ থেকে  ২০২২ সালের 'কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা' হবে বলে জানানো হয়। তবে অবশ্যই যাবতীয় বিধি মেনে। সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে মেলাটি করা হবে।করোনা অতিমারীর কারণে গতবার মেলার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তাই বইপ্রেমীদের মন একদম ভালো ছিল না। শুধু বইপ্রেমী কেন প্রকাশকদের ও লেখকদের মনও ভালো ছিল না। প্রকাশকরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। তাই প্রকাশক, লেখক ও পাঠক সকলেই এই খবরে খুবই উল্লসিত হয়ে ওঠে। অনেক আক্ষেপ, অনেক হতাশা, অনেক অপেক্ষার যেন অবসান হল। 

আমরা জানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন বইমেলাটি  প্রতিবছর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কলকাতার মেলাটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলা বলা হয়।  প্রতিবছর আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও 'অমর একুশ গ্রন্থমেলা' বলে একটা বইমেলার আয়োজন করা হয়। আমাদের তিলোত্তমার মেলাটি  প্রায় ৫০ বছরের একটা মেলা।  প্রতি বছর মেলাটি সুবিশাল আকারে আয়োজিত হয়। মেলাটা প্রকাশক, লেখক ও পাঠকদের গন্ডী ছাড়িয়ে আজ একটা সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। 


কলকাতা শহরে প্রতিবছর নিয়ম করে পাবলিশার্স ও বুক সেলার্স গিল্ড আয়োজন করে থাকে একটা  আন্তর্জাতিক বইমেলা। এই মেলাটি সর্বপথম ১৯৭৬ সালের ৫ই মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতা ময়দান এলাকাতে। তখন অবশ্য নাম ছিল 'কলকাতা পুস্তকমেলা'। বিশিষ্ট প্রকাশকরা মেলাটির আয়োজনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। সেই সময় মেলাটি অবশ্য আন্তর্জাতিক মেলায় পরিণত হয়নি। ১৯৮৪ সালে মেলাটি প্রথম আন্তর্জাতিক মেলায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে যেমন মেলার আয়তন বৃদ্ধি পায়  তেমন জনসমাগমও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭৮ সালে আয়োজিত তৃতীয় বইমেলা থেকে মেলাটি খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি ১৯৮৩ সালের মেলায় একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এসে একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের প্রাক্তন সম্পাদক অশোক কুমার সরকার মহাশয় মেলা প্রাঙ্গনেই অসুস্থ হয়ে প্রয়াত হন। ১৯৮৪ সাল থেকে প্রতিবছর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে 'অশোককুমার সরকার স্মৃতি বক্তিতা'র আয়োজন করা হয়। এই বছরেই মেলাটি জেনেভার ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স এসোসিয়েশনের সদস্য হয়ে বইমেলার আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে স্থান করে নেয়। ১৯৯৭ সাল কলকাতা পুস্তক মেলার একটা স্মরণীয় বছর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এই বছর  মেলার থিম ছিল 'ফ্রান্স'। তারপর থেকে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের নামে থিম করা হয়ে থাকে। সেই বছরই এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পুরো মেলাটি অগ্নিদগ্ধ হয়ে যায়। প্রচুর ক্ষতি হয় ও কয়েকজন দর্শনার্থীর মৃত্যুও হয়। ২০০১ সালে 'কলিকাতা পুস্তকমেলা' নামটি পরিবর্তন করে 'ক্যালকাটা বুক ফেয়ার'  রাখা হয়। পরিবেশের কারণে ২০০৭ সালে মেলাটি যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে,  ২০০৮ সালে পার্ক সার্কাস ময়দানে ও ২০০৯ সালে মিলনমেলা প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। এই বছর থেকে 'কলিকাতা বুক ফেয়ার' নামটি আবার পৰিবৰ্তন করে করা হয় 'আন্তর্জাতিক কলিকাতা বইমেলা'। মিলনমেলা প্রাঙ্গনটি মেরামত করার জন্য বর্তমানে মেলাটি বিধানগরের সেন্ট্রাল পার্কে আয়োজিত হচ্ছে। এই মেলায় গ্রন্থসম্ভারের পাশাপাশি চিত্রশিল্পী, খাবার, তথ্য প্রযুক্তি ও লিটিল ম্যাগাজিনের জন্য আলাদা স্থানের ব্যবস্থা করা হয়।  

কলকাতা বইমেলায় বই ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে আয়োজিত হয় বিভিন্ন সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান। বইমেলাতে প্রতিবছর নিয়ম করে বহু লেখকের নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বই প্রকাশে বেশিরভাগ প্রকাশক প্রাধান্য দিয়ে থাকেন পুরানো ও খ্যাতনামা লেখকদের। পরিচিতির আড়ালে থাকা স্বগুণ থাকা স্বত্তেও বহু নতুন লেখক বা কবি আড়ালেই থেকে যান । লক্ষ্য করলে দেখা যায় খ্যাতনামা পরিচিত লেখকের বা কবির বই এই ধরনের মেলায় হু হু করে বিক্রি হয় কিন্তু নতুনদের পরিচিতি না থাকায় তাদের লেখা বইয়ের বিক্রী সেরকম হয় না। তাই প্রকাশকরা নতুনদের লেখা যতই ভালো হোক তাঁদের কাছে নতুনদের  সেরকম কোনো গুরুত্ব থাকে না। নতুন লেখকদের মধ্যে  অনেকের  ভালো ভালো লেখা শুধুই তাঁদের খাতায় বন্দী হয়ে রয়ে যায়।  প্রকাশকের অভাবে পাঠকের কাছে তা আর পৌঁছতে পারেনা। খ্যাতনামা পরিচিত লেখকদের ভিড়ে হারিয়ে যায় অপরিচিত খ্যাতিহীন লেখকরা। কালের গর্ভে  ধীরে ধীরে বিলীন  হয়ে যায় তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা। থেমে যায় এইসব নবীনদের কলম। তাঁদের মেধা ও মনন দিয়ে যে ভাবনার জন্ম তাঁরা দিয়েছেন তা আর পৌঁছয় না পাঠক মহলে। 



বইমেলা যেমন খ্যাতনামা লেখকদের সঙ্গে প্রকাশক ও পাঠকের গাঁটছড়া বাঁধতে সহায়তা করে তেমন নবীন লেখকদের সাথেও প্রকাশকদের ঐকান্তিক চেষ্টায় পাঠকদের মিলনক্ষেত্র হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রকাশকদের লাভের অংশ একটু কম হবে। লাভের অংশ একটু কমিয়ে দিয়ে প্রতি বছর তাঁদের কয়েকজন নতুন লেখক ও কবির লেখাকে গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত। তবে অবশ্যই তা ভালো বিষয় ও  ভালো লেখা হতে হবে।

আজকাল আবার শোনা যায় নামী-অনামী বহু প্রকাশকের প্রবণতা নাকি নতুন লেখক অর্থাৎ অনামী লেখকদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে বই প্রকাশের কথা। এই ধরণের ঘটনা ঘটে কিনা আমার ঠিক জানা নেই। তবে এই ধরণের ঘটনা যদি সত্যি ঘটে থাকে সেটা অবশ্যই কাম্য নয়। অর্থের বিনিময়ে বই প্রকাশের এই সংস্কৃতি পাঠকদের কাছ থেকে নতুন লেখককে দূরে সরিয়ে দেবে। একজন লেখক হলেন মেধার পরিবেশক। তাই প্রকাশকদের লেখককে গুরুত্ব না দিয়ে অবশ্যই লেখাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নতুন লেখকদের কাছে সবটাই হতাশা নয়, কিছু প্রকাশক ভালো লেখাকে নিশ্চয় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে কোনো লেখক যদি সত্যি ভালো লিখে থাকেন তাহলে সেই প্রতিভা কখনোই চাপা থাকবে না, একদিন তা পাঠকদের হাতে নিশ্চিতভাবে পৌঁছবে। খ্যাতনামা লেখকদের পাশাপাশি নতুন বা অপেক্ষাকৃত নতুন লেখকরা কতটা উঠে আসতে পারছে সেইদিকে সরকার ও মেলা কর্তৃপক্ষেরও  তীক্ষ্ণ নজর রাখা উচিত। 



কিছু লোকের ধারণা নতুন প্রজন্মের বইয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই।  তারা তাদের অবসর সময়টা ফেসবুকে ও হোয়াটস্যাপে কাটাতে নাকি বেশি ব্যস্ত থাকে। একথা কিছুটা মেনে নিলেও লক্ষ্য করলে বহুক্ষেত্রে দেখা যায় এটা সঠিক নয়। নতুন প্রজন্ম টেক সেবি।  তারা এখন সব কিছুই অনলাইনে কিনতে অভ্যস্থ। তাদের বেশিরভাগের হাতে অত সময় থাকেনা যে তারা কলেজে স্ট্রীটে গিয়ে বা অন্য কোনো জায়গায় গিয়ে বই কেনার। তাই তাদের জন্যই গড়ে উঠেছে ভার্চুয়াল বইমেলা। শুধু নতুন প্রজন্ম নয় আজকাল  বয়স্করাও অনলাইনে বই কিনতে ধীরে ধীরে অভস্থ্য  হয়ে পড়ছে।  কচিগুলো আবার এখন বাংলা পড়ে  না, তারা সব ইংরেজিতে পড়তে অভ্যস্থ। ইংরেজিতে পড়লেও তারা হ্যারি পটার বা টিনটিনের ইংলিশ ভার্সান মোবাইলে পড়ে বেশি আনন্দে পায়। পূর্বের মতো ক্ষীরের পুতুল, নীলকমল-লালকমল আর তাদের টানে না। এছাড়া রহস্য, ভিনগ্রহের প্রাণী, অলৌকিকতা সম্বন্ধীয় বই যুবক-যুবতীদের বরাবরই টানতো। এখনো এই ধরণের বইয়ের বেশ ভালো বিক্রি আছে।  বইয়ের চাহিদা  হয়ত কিছুটা কমলেও বিক্রি কিন্তু বেশ ভালোই হচ্ছে। যদি সেরকম বিক্রি না হতো তাহলে যেমন  নতুন নতুন প্রকাশক গজিয়ে উঠতনা তেমন নতুন নতুন অনলাইন বিক্রেতাও আসতো না।  

এবছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবর্ষ। ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর এবং ভারত-বাংলাদেশের মৈত্রীর সুবর্ণজয়ন্তীর কথা মাথায় রেখে এবারের মেলার থিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে মনোনীত করা হয়েছে।  আশাকরি  করোনা অতিমারী পর্ব পেরিয়ে এবছরের আয়োজিত বইমেলা তার  নিজস্ব ছন্দ ফিরে পাবে। তার পুরানো ঐতিহ্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে। তবে অবশ্যই সবাইকে  গিল্ডের ও সরকারের দেওয়া করোনাবিধিকে মেনে চলতে হবে।   
 



তারিখ :১৪-০৩-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Tuesday, February 15, 2022

সাবর্ণ সংগ্রহশালায় অনুষ্ঠিত  আন্তর্জাতিক ইতিহাসের আসর


সুদীপ্ত মুখার্জী


অনুষ্ঠান মঞ্চ 



আমাদের প্রাণের শহর কলকাতা। সেই তিলোত্তমার এক প্রাচীন পরিবার হল সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। এই পরিবার প্রতিবছরই নিজেদের বাড়িতে এক ইতিহাস উৎসবের আয়োজন করে থাকেন। বর্তমানে সেই উৎসব আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং দূর-দূরান্ত থেকে অগণিত ইতিহাসপ্রেমীরা ভিড় করেন এই বাড়ির ইতিহাস উৎসবে। প্রতিবারের মতন এবারও বড়িশার সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের বড়বাড়িতে সাবর্ণ সংগ্রহশালার আয়োজনে শুরু হয়ে গেল ষোড়শ আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব। গত ১৩ তারিখে  সকাল ১০টায় এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন হল, চলবে আগামী ১৬ তারিখ অবধি। সাধারণ মানুষজনের বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার রয়েছে তবে প্রবেশের ক্ষেত্রে মানতে হবে কোভিড বিধি।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক শ্রীযুক্ত দেবর্ষি রায় চৌধুরীর সাথে আমি 



এই বিষয়ে কথা হল সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক তথা সাবর্ণ সংগ্রহশালার কিউরেটর দেবর্ষি রায় চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জানালেন এবার এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো সিন্ধু সভ্যতার ১০০ বছর উদযাপন। এছাড়া এবার  তাঁরা সর্বপ্রথম স্বনামধন্য অভিনেতা রবি ঘোষকে সম্মান জানাচ্ছেন।  রবিবাবুর  ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রদর্শনীতে রেখেছেন। প্রখ্যাত অভিনেতার ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, পেন, টুপি, ব্যাগ ইত্যাদি রাখা হয়েছে সাবর্ণদের প্রদর্শনীতে। এছাড়া তিনি জীবনে যে সমস্ত সম্মান পেয়েছেন তার কিছু অংশও রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক এই ইতিহাস উৎসবে। এবারের এই উৎসবের থিম ক্যান্ট্রি শ্রীলঙ্কা এবং ফ্রান্স। সেখানকারও নানান উপাদান সাজানো রয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

সিন্ধু সভ্যতায় ব্যবহৃত জিনিসপত্র



এছাড়া অন্যান্য ঐতিহাসিক উপাদানের পাশাপাশি এবার সাবর্ণদের ইতিহাস উৎসবের মূল আকর্ষণ হল সিন্ধু সভ্যতা (হরপ্পা) আবিষ্কারের ১০০ বছর উৎযাপন। যে সভ্যতা প্রায় ৫০০০ বছরেরও প্রাচীন তা ১৯২১ সালে দয়ারাম সাহানি এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। এই সিন্ধু সভ্যতার ইট, মাটির পাত্র, পুতুল ইত্যাদি নানান ঐতিহাসিক উপাদান রাখা হয়েছে সংগ্রহশালার প্রদর্শনীতে। এইসব জিনিস আমরা এতদিন শুধু ছবিতে দেখে এসেছি।  এখানে এসে তার সামান্য কিছু আমার চাক্ষুস করার সৌভাগ্য হল।
 
কিংবদন্তি শিল্পী রবি ঘোষের উল্টোরথ পুরস্কার

এবারে তাঁরা অভিনেতা রবি ঘোষের সাথে বিখ্যাত গায়ক ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কেও সম্মান জানাচ্ছেন। এই মহান শিল্পীর যেমন বেশ  কিছু দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডস এই প্রদর্শনীতে স্থান  পেয়েছে। তেমন শিল্পীর বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবিও রয়েছে।  

শিল্পী ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডস্


সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের বিভিন্ন জনের  ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা রয়েছে প্রদর্শনীতে। এছাড়া এই পরিবারের প্রথম জমিদার লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরীর জীবনের কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাস উৎসবে।  এছাড়া দুই আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি এই পাঁচ মহাদেশের পুতুল সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে সংগ্রহশালার প্রদর্শনীতে।

আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে নতুন ভাবে প্রকাশিত ‘লক্ষ্মীকান্ত’ বইটির উদ্বোধন করছেন সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় এবং সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরী


আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে নতুন ভাবে প্রকাশিত 'লক্ষীকান্ত' বইটি পুনঃ প্রকাশিত হল। বইটির  উদ্বোধন করেন রাজ্যসভার সদস্য মাননীয় সুখেন্দু শেখর রায়।  

 প্রতি বছরের ন্যায় এবছর এই ইতিহাস উৎসব বেশ শিক্ষণীয়।  প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এই উৎসব দর্শন করা উচিত। 



তারিখ :-১৫-০২-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Friday, February 4, 2022

সোনামুখীর দে বাড়ির সরস্বতী পুজো >P

শতবর্ষ উত্তীর্ণ ব্যতিক্রমী ও অভিনব সোনামুখীর দে বাড়ির সরস্বতী পুজো 



সুদীপ্ত মুখার্জী 


সোনামুখী হল বাঁকুড়া জেলার একটা সুপ্রাচীন জনপদ। সোনামুখীর নামকরণ হয় দেবী স্বর্ণময়ী  থেকে। এই অঞ্চলের জমিদার অধরচন্দ্র দে মহাশয় বর্ধমানের মহারাজার কাছ থেকে সোনামুখীর জমিদারি পান। তাঁরই বদান্যতায় ১৯০৬ সালে সোনামুখীতে একটি দেবী সরস্বতীর মন্দির স্থাপিত হয়। তিনি নারী শিক্ষার প্রচলন ও প্রসারের উদ্দেশ্যে দেবী সরস্বতীর আরাধনা শুরু করেন। কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন তিনি মকর সংক্রান্তির দিনে এক স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  এই পূজাটি দেখতে দেখতে আজ ১১৬ বছরে পদার্পন করলো। এখানে পূজাটি দুদিন নয়  চারদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 
সরস্বতী মন্দির 


সোনামুখী জমিদার বাড়ীর  কন্যা শ্রীমতী  নিলয়া দে জানালেন যে অধরচন্দ্রের  আট  সন্তান ছিল।  তাঁর সন্তানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখার উদ্দ্যেশে এক চালায় তিনি দেবী সরস্বতীর সাথে তাঁর ভাই ও বোনের পূজা শুরু করেন। আজও এখানে সেই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হতে দেখা যায়না।   সেই প্রাচীন নিয়ম মেনে এখানে বাগ্দেবীর আরাধনা চলে আসছে।  ডাকের সাজে সজ্জিতা দেবীকে পরিবারের সোনার গহনা দিয়ে সাজানো হয়। 
জমিদার অধরচন্দ্র দে 


শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার সাথে পরিবারের রান্নাপূজা ও অন্যান্য নিয়ম কানুন পালিত হয়।  পূজার প্রথম দিন পরিবারের নারায়ণ ও দেবী লক্ষ্মীকে দামোদর মন্দির থেকে সরস্বতী মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত ও পূজা করা হয়।  তারপর দেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। সরস্বতীর অঞ্জলি দেওয়ার পর পারিবারিক রীতি  মেনে পেঁয়াজ, রসুন ছাড়া মাছ রান্না করে খেতে হয়। দ্বিতীয় দিন মন্দিরের লাগোয়া পরিবারের বাড়িতে দেবী ষষ্ঠীর পূজা করা হয়।  এইদিন ষষ্ঠী দেবীকে ভোগ হিসেবে মাছের পদ ও গোটা সেদ্ধ দেওয়া হয়। তৃতীয় দিন দেবী সরস্বতী ও অন্যান্য দেব-দেবীকে সন্ধ্যায় লুচি ও মিষ্টান্ন দেওয়া হয়।  এই ভোগ স্থানীয় এক ময়রার কাছ থেকে আসে।  এই ময়রার বংশধররা বংশ পরম্পরায় প্রথম থেকে দেবীকে এই ভোগ নিবেদন করে আসছে। চতুর্থ দিন সকালে নারায়ণ ও লক্ষ্মীকে পরিবারের দামোদর মন্দিরে ফেরত নিয়ে  আসা হয়। এইদিন দেবীকে চিড়ে, খৈ, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টান্ন ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়।  এছাড়া এইদিন পরিবারের ও পাড়া-প্রতিবেশী সকলের জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে রন্ধন করা হয় খিচুড়ী, চাটনি, তরকারি ও মিষ্টি। এই খিচুড়ী ভোগ অবশ্য দেবীকে প্রদান করা হয় না।  প্রতিদিন সন্ধ্যায় দেবীকে শীতল ভোগ নিবেদন করা হয়ে থাকে।  চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় শোভাযাত্রাসহ দেবীকে স্থানীয় পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়।  বিসর্জনের সময় বিভিন্ন প্রকার আতস বাজি পোড়ানো হয়। 

গৃহলক্ষ্মী হাতে পরিবারের কন্যা নিলয়া দে 


  পারিবারিক রীতি মেনে পূজাটি প্রতি বছরের মত  এবছরও  অনুষ্ঠিত হবে। তবে অবশ্যই  করোনার সরকারি বিধি নিষেধ মেনে পূজাটি করা  হবে।


তারিখ :০৪-০২-২০২২

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Wednesday, December 8, 2021

পেঁচার দেশ নতুনগ্রাম>P

পেঁচার দেশ নতুনগ্রাম 

- সুদীপ্ত মুখার্জী 





পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার একটি ছোট্ট স্টেশন হল অগ্রদ্বীপ। অগ্রদ্বীপ গ্রামটি খুবই প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম।  ব্যান্ডেল কাটোয়া লাইনের স্টেশন হল এই অগ্রদ্বীপ। এই স্টেশনের দক্ষিণ দিকে কিছুটা দূরে আর একটি গ্রাম রয়েছে যার নাম 'নতুনগ্রাম'। এটি খুবই ছোট্ট একটা গ্রাম। গ্রামটি ছোট হলেও শিল্পসুষমায় ভরপুর। বাংলার এক ঐতিহ্যের পীঠস্থান। বাংলার লোকশিল্পের জগতে গ্রামটির যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। বঙ্গীয় ঘরানার কাঠের পুতুলের জন্য গ্রামটি বিখ্যাত। বৈষ্ণব প্রভাবিত অগ্রদ্বীপ গ্রামের সন্নিহিত হওয়ার জন্য এখানকার শিল্পের মধ্যে একটা বৈষ্ণবীয় ধারার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।   




নতুনগ্রাম হল কাঠ খোদাই শিল্পের আঁতুরঘর। গ্রামটির একেকটা বাড়ি শিল্প সৃষ্টির আকর। আমরা বাংলার বিভিন্ন স্থানে মেলায় কাঠের তৈরী বিভিন্ন পুতুল দেখি  তার বেশিরভাগই এই  গ্রামে তৈরী  হয়। নতুনগ্রামে প্রায় ৫০টি পরিবার বাস করে। প্রায় প্রত্যেকটা পরিবারেই কাঠ খোদাইয়ের কাজ হয়।এখানকার শিল্পী স্বর্গীয় শম্ভুনাথ ভাস্কর মহাশয় ১৯৬৬ সালে তদকালীন রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর থেকেই এখানকার শিল্পের কদর বহুগুন বেড়ে যায়।  




 কাঠ খোদাই করে এখানকার শিল্পীরা বিভিন্ন পুতুল তৈরী করে থাকে। বিস্ফারিত চক্ষুর পেঁচা, রাজা-রানী, হাত তোলা গৌড়-নিতাই এই  তিন ধরণের পুতুল এখানকার ঐতিহ্য। এছাড়া কাঠের পেঁচা দিয়ে বসার টুল, কাঠের টেবিলের উপর পেঁচা আঁকা, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, পেঁচার আদলে তৈরী রাজা-রানী। এছাড়া  গৃহসজ্জার সম্ভার  হিসেবে কাঠের তৈরী  বিভিন্ন পুতুল ও দেব-দেবীর মূর্তিও তারা তৈরী করে। আয়নার ফ্রেম, কলমদানি, মোবাইল স্ট্যান্ড, ইজিচেয়ার, টেবিল ল্যাম্পও তাঁরা তৈরী করে। এখানকার কাঠ খোদাই করে নির্মিত বিভিন্ন মাপের পেঁচা জগৎ বিখ্যাত। এখানকার তৈরী প্রত্যেকটা জিনিসেই এখানকার শিল্পীরা একটা নিজস্ব শিল্পরীতির ছাপ রাখে। 
 

নতুনগ্রামের সূত্রধর জাতিরা প্রথম দিকে পাথর খোদাইয়ের কাজ করতেন। বর্ধমান রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাথর খোদাই কাজের একসময় এই অঞ্চলে  রমরমা ছিল।  বর্ধমান রাজার পতনের পর এখানকার পাথর খোদাইয়ের কাজ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এখানকার কারিগরদের অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাব হতে থাকে।   সেই সময় এখানকার শিল্পীরা এই কাজ ছেড়ে দারুশিল্প শুরু করে। 

 কোনো শিল্প গড়ে ওঠার পিছনে কিছু ভৌগোলিক, সামাজিক বা ধর্মীয় পটভূমি থাকে। এইসব পটভূমির জন্যই সেখানকার শিল্পের খ্যাতি একচেটিয়া হয়ে ওঠে। নতুনগ্রামের সূত্রধর জাতির প্রথমদিকে পাথর খোদাইয়ের কাজ করতেন। বর্ধমান রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাথর খোদাই কাজের একসময়  রমরমা ছিল। বর্ধমান রাজার পতনের পর এখানকার পাথর খোদাইয়ের কাজ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এখানকার কারিগরদের অর্থনৈতিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাব হতে থাকে।   সেই সময় এখানকার শিল্পীরা এই কাজ ছেড়ে দারুশিল্প শুরু করে। 

নতুনগ্রামের নানা আকারের কাঠের তৈরী পেঁচা বিশ্ববন্দিত। এখানকার কাঠ খোদাই করা পেঁচার উৎস সন্ধান করলে দেখা যায় এইসব অঞ্চলগুলো পূর্বে কৃষিপ্রধান ছিল। এখানকার শিল্পীরা প্রথমদিকে সাধারণত কাঠ দিয়ে গরুর গাড়ির চাকা বানাতো। এইসব অঞ্চলে পূর্বে  বছরে বার তিনেক লক্ষ্মীপূজা হতো। পৌষ, চৈত্র ও ভাদ্র মাসে লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হত। দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। পূজার  বিধান অনুসারে এক সের ধানের চারদিকে  চারটি পেঁচা রাখার নিয়ম ছিল। সেইসব পেঁচাগুলো পুরুষ শিল্পীরা নিজেরা বানিয়ে দিতো। বাড়িরই বাচ্চাদের আবদারে তারা কাঠ খোদাই করে তাদের বিভিন্ন পুতুল বানিয়ে দিতো।  পরবর্তীকালে তাদের সেইসব শিল্পকলা ছড়িয়ে পরে বিভিন্ন স্থানে। সময়ের তাগিদে চাহিদা বাড়ে। মানুষের রুচি বদলায়। তাই শুধু পুতুলেই আজ আর আটকে নেই নতুনগ্রাম। সেই কারণে উঠে আসে রাজা-রানী, গৌড় নিতাই, কৃষ্ণ ইত্যাদি মূর্তির  ভাবনা। বর্ধমান রাজ্যের কৃপাধন্য হয়ে পরে তাঁরা রাজা-রানীর মূর্তি নির্মাণ করে। এখানকার তৈরী প্রতিটা জিনিসেই রয়েছে শিল্পের সুষমা।এখানকার পুতুলগুলো রঙিন হওয়ার ফলে বেশ মনোগ্রাহী হয়।  বর্তমানে এখানকার এই শিল্প ধরে রাখার জন্য বেশ কয়েকবছর ধরে সরকার ও বেশ কয়েকটা সংস্থা বিভিন্ন জায়গায় মেলার আয়োজন করছে। সেইসব মেলায় এখানকার পুতুলের একটা আলাদা চাহিদা রয়েছে।শুধু পশ্চিমবঙ্গ সরকার নয়  ভারত সরকার ও ইউনেস্কো থেকেও এখানকার শিল্পীদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। 

বিংশ শতাব্দীর এক গোড়ার দিকে বাজারে প্লাস্টিক নির্মিত বিভিন্ন পুতুল চলে আসে।  প্লাস্টিক পুতুলের সম্ভার যত বাজারজাত হয়েছে তত এখানকার কাঠের খোদাই করা পুতুলের কদর কিছুটা হলেও কমেছে। এখানকার লোকশিল্পীদের ইতিহাস কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে। ১৯৫৫ সাল নাগাদ এখানকার কাঠ খোদাই শিল্প ভারত সরকারের নজরে আসে।  

এখানকার শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিল্প গরিমায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।  আধুনিকতার কাছে তাঁরা হয়তো কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়ছে তবুও তাঁরা তাঁদের শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিচ্ছে। তাঁদের নিখুঁত হাতের স্পর্শে  এখানকার শিল্প কর্ম আজ বিশ্বের কাছে বাংলার ম্যান ও সম্মান অনেকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। 


 

কিভাবে এখানে আসবেন :


নিজের গাড়িতে আসতে পারেন। এছাড়া হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে কাটোয়া লোকাল ধরে অগ্রদ্বীপ স্টেশনে নেমে অটো বা টোটো ধরে খুব সহজেই আসতে  পারবেন। 


তারিখ :০৯-১২-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 






Monday, November 8, 2021

কালীপুজায় চেতলা অভিযান >P

কালীপুজায় চেতলা অভিযান 


- সুদীপ্ত মুখার্জী 



দক্ষিণ কলকাতার আদি গঙ্গার দুধারে দুটি অঞ্চল রয়েছে।  পূর্বধারে রয়েছে কালীঘাট  আর পশ্চিম ধারে রয়েছে চেতলা নামক একটা জনপদ। কলকাতার অন্য অংশের মতো চেতলা অঞ্চলটিও বেশ ঘন বসতিপূর্ণ।  

কালিপূজায় মহানগরীর দুটো অঞ্চল বরাবরই একে অপরকে টেক্কা দিতো। অঞ্চল দুটি হল মধ্য কলকাতার আমহার্টস স্ট্রীট ও দক্ষিণ কলকাতার চেতলা। আমহার্টস স্ট্রিটে পরপর বেশ কয়েকটা বড় বড় পূজা হয়ে থাকে। বড় মণ্ডপ, বড় প্রতিমা এখানকার বৈশিষ্ট্য। এখানকার পূজায় লাইটিংয়ের খেলাও বিশেষত্ব। এখানে কোনো দিন কোনো থিম দেখা যায় না। সাবেকি প্রতিমায় দেবীর আরাধনা করা হয়। অঞ্চলের পূজাগুলির মধ্যে ফাটা কেষ্টর পূজা ও সৌমেন মিত্রের পূজা খুবই বিখ্যাত। এককালে এখানে জনসমুদ্র দেখা যেত।
 
চেতলার পূজা মানেই বর্ণময়। চেতলায় বরাবরই দেখা যায় দেবী কালীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এখানে শুধু শাস্ত্রমতে বর্ণিত রূপ নয়, এই অঞ্চলটিতে বাইরে থেকে নানা রকম রূপের দেবীকে  আমদানি করা হয়। এখানে কোনো পূজায় সেরকম বড় প্যান্ডেল বা বড় প্রতিমা সাধারণত দেখা যায় না।  লাইটের খেলাও খুব একটা দেখা যায় না।  এখানে কোথাও দশমহাবিদ্যা, কোথাও চামুন্ডা কালী আবার কোথাও দেখা যায় হাজার হাত কালীর। এই বৈচিত্রই চেতলা অঞ্চলের কালীপূজাকে দর্শনীয় করে তুলেছে। এখানেও এককালে জনসমুদ্র দেখা যেত। শুধু চেতলা অঞ্চলটি ঘুরলেই দেবীর সব রকমের রূপ দর্শন হয়ে যায়। 

আজ কালীপূজার দিন। এই দিন সকালে আমার মায়ের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দর্শনের উদ্দেশ্যে চেতলা অভিযান।  এখানে আমি আপনাদের দেখার জন্য মায়ের বিভিন্ন রূপের ছবি দেবো।  


দশ মুন্ড কালী 




রাবনের মতো দশ মুন্ডের কালী প্রতিমায় এখানে পূজা হয়। বলা হয় দশমুণ্ড কালী। দেবী অষ্টভুজা। উচ্চতায় প্রায় পনেরো ফুট। মহাদেবের উপর দেবী দন্ডায়মান। এই পূজাটি দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে করা হচ্ছে। পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা রূপান্তর ক্লাব। পূজাটি চেতলার শংকর ঘোষ রোডের সি.আই. টি পার্কে করা হয়।  এখানে তান্ত্রিক মতে পূজা করা হয়। দেবীকে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, পায়েস, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে নিবেদন করা  হযে থাকে। আখ, চালকুমড়া, শশা ও কলা বলি দেওয়া হয়। 


 শ্বেত কালী 




দেবী এখানে শ্বেত শুভ্র অর্থাৎ দেবীর গাত্রবর্ণ শ্বেত। পূজাটি পরিচালনা করে আলিপুর এ.বি.এস. স্পোর্টিং ক্লাব।  এবছর এখানে ৪৭ তম বর্ষের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেবীমূর্তি মাহেশ্বরী রুপি। দেবী চতুর্ভূজা। দেবীর এক হাতে রয়েছে ত্রিশূল, এক হাতে ডুগডুগি,  এক হাতে চাঁদমালা, ও অন্য হাতে থাকে মাটির নরমুণ্ড। দেবীর বিশেষত্ব হলো দেবীর পাদদেশে শিয়ালের বদলে থাকে শ্বেত ষাঁড়।  খিচুড়ি, লুচি, তরকারি, পাঁচরকম ভাজা, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে মাকে নিবেদন করা হয়। এখানে কোনো প্রকার আমিষ ভোগ দেওয়ার প্রথা নেই।  


সিংহবাহিনী কালী 



দেবী সিংহবাহিনী কালীকে পূজা করে থাকে আলিপুর শীতল স্মৃতি সংঘ। এবছর তাদের পূজাটি ৫৩তম বর্ষে পদার্প করলো।  দেবীকে পোলাও, খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, মাছ, মাংস, চাটনি, পায়েস, ফল মিষ্টি ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়।  এখানে বলি দেওয়ার কোন নিয়ম নেই।  এখানকার মূর্তিটি রাজপুরের  বিপদতারিনী মায়ের আদলে তৈরী করা হয়।  প্রতিমাটির উচ্চতা প্রায় ১২ ফুটের মত। দেবী সিংহের উপর দন্ডায়মান।  দেবীর পাশে ত্রিশূল হাতে মহাদেব বসে রয়েছে।


শিব কালী 




শিবকালী হলেন দেবাদিদেব মহাদেব ও দেবী কালীর সম্মিলিত রূপ। শিবকালী পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা বালক সংঘ। পূজাটি এবছর ৪১তম বর্ষে পদার্পন করলো। এখানে দেবীর অর্ধেক অংশ দেবাদিদেব মহাদেব আর বাকি অর্ধেক অংশে দেবী কালী। দেবী এখানে পদ্মের উপর দন্ডায়মান। দেবীর নীচে বাহন হিসেবে শেয়ালকে দেখা যাচ্ছে। দেবী চতুর্ভূজা। দেবীর এক হাতে থাকে ত্রিশূল, এক হাতে খাঁড়া, এক হাতে চাঁদমালা, আর এক হাতে থাকে নরমুণ্ড। মাকে এখানে খিচুড়ি, পায়েস, আলুরদম, ফল ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। এখানে কোনোরূপ বলি দেওয়া হয়না।  কোনো এক ভক্তের আঙ্গুল কেটে সামান্য রক্ত দেবীপূজায় মাকে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। 

চামুন্ডা কালী 




আমরা জানি দশমহাবিদ্যার প্রথম ও আদি রূপ হল কালী। রামায়ণে আমরা দেখেছি বশিষ্ঠ মুণি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন দক্ষিণাকালী রুপী কালীকে আরাধনা করে।  আদ্যাশক্তি মহামায়ার আটটি রূপ - দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, কৃষ্ণকালী, মহাকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী এবং চামুণ্ডাকালী।  এখানে দেবী কোরালবদনা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা, নরমুণ্ডমালা বিভূষিতা। চেতলা দুর্গাপুর  সেতুর পাশে রয়েছে আলিপুর আরাধনা সমিতি। এই সমিতির তত্ত্ববধানে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় চামুন্ডা কালীর পূজা। ষোলো ফুট উচ্চতার দেবী চামুন্ডার পাশে থাকে দশ ফুট উচ্চতার শিব ঠাকুর। দেবীর দুপাশে থাকে ভয়াল চেহারার ডাকিনি-যোগিনী ও কঙ্কাল। মণ্ডপে লোহার ট্রলিতে দেবীমূর্তি বিরাজিত। বিসর্জনের সময় এই ট্রলিকে ঠেলে বাবুঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। দেবী বিসর্জনে পর ট্রলিটিকে ফেরত নিয়ে আসা হয় এবং সেটাকে যত্ন সহকারে রেখে দেওয়া হয়। এই ট্রলিটিকে সারাবছর দেবীর কাঠামো হিসেবে পূজা করা হয়। কাঠামোটিকেই দেবী বলে গণ্য করা হয়। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার কাঠামোকে পূজা করা হয়।  এছাড়া প্রত্যেক অমাবস্যায় কাঠামোকে ভোগ দেওয়া হয়। এবছর ৭৪তম বর্ষের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খিচুড়ি, পায়েস, পাঁচরকম ভাজা, আলুরদম, পোলাও, সুজি, পাঁচরকম মিষ্টি, চাটনি দেবীকে ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। এখানে কোনো প্রকার আমিষ ভোগ  দেবীকে নিবেদন করা হয় না।  বলি দেওয়া হয় না।  বৈষ্ণব  মতে পূজা করা হয়। পুজোর দেবীর পূজার সময় দেবীকে মানব দেহের রক্ত ও কারণ সুধা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।  রক্ত ছাড়া চামুন্ডা কালির পূজা হয় না। 


দুর্গাকালী 




দুর্গাকালী হলেন দেবী দূর্গা ও দেবী কালীর  সম্মিলিত রূপ। পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা সৎ সংঘ  ক্লাব। এবছর ৩০তম পূজাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই ক্লাবটিতে পূর্বে শ্যামা মায়ের, তারপর অজন্তা কালীর  আরাধনা করা হত।  এখন দুর্গাকালীর আরাধনা করা হয়। এখানকার ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ।  খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, তরকারি, আলুরদম, শাকের ঘন্ট, পায়েস, ফল-মিষ্টি দেওয়া হয়।  চালকুমড়া, আখ, শশা, কলা, বাতাবি লেবু বলি দেওয়া হয়।  প্রথমে ১০৮টি পদ্ম দিয়ে দেবী দুর্গার পূজা করা হয়, তারপর দেবী কালীর পূজা করা হয়।  
 

হাজার হাত কালী 



হাজার হাত কালীর পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা ফিজিক্যাল কালচার এসোসিয়েশন। হাওড়ার শিবপুরের হাজার হাত কালীর অনুকরণে এখানকার মূর্তিটি রূপায়িত হয়। ক্লাবের এক সদস্য জানালেন  আমরা সব সময় মানুষের দুঃখ কষ্টে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকে। আমরা  আমাদের সদস্যদের হাজার হাজার হাত মানব সেবায় নিয়োজিত করতে থাকি তাই আমাদের এই ধরণের থিম। হাজার হাত নিয়ে দেবীর শান্ত রূপ। এবছর পূজাটি ৮৩তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবীকে খিচুড়ি, পোলাও,  লুচি, পাঁচরকম ভাজা, হালুয়া, লাবড়া, চাটনি, পায়েস ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়।  আখ, চালকুমড়া, বলি দেওয়া হয়। এখানে পরম্পরা বজায় রেখে  পূজা করা হয়।  ভোগ বা দেবীর অন্য কাজে  পুরুষরাই সব কাজ করে থাকে কোনো মহিলাকে এইসব কাজে অংশ নিতে দেওয়া হয় না।  মায়ের এক হাতে ত্রিশূল আর এক হাতে খাঁড়া থাকে। দেবীর গাত্রবর্ণ সবুজ। দেবী এখানে শিবের উপর দন্ডায়মান নয়, বাঘ চাল পরিহিত মহাদেবাদিদেব মহাদেব দেবীর পাশে বসে রয়েছে। এছাড়া এখানে দেবীর বাহন হিসেবে একটি সিংহকে দেখা যায়।   


লক্ষ্মী কালী  



লক্ষ্মীকালী হলেন দেবী লক্ষ্মী ও দেবী কালীর সম্মিলিত রূপ। লক্ষ্মীকালী পূজাটি পরিচালনা করে শাস্ত্রী রয়েল ক্লাব। এবছর পূজাটি ২৩তম বর্ষে পদার্পন করলো। এখানে দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, আলুরদম, পায়েস, নানারকম ফল, বিভিন্ন মিষ্টি দেওয়া হয়।  সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ মাকে  নিবেদন করা হয়।  এখানে কোনোরূপ বলি দেওয়া হয় না।  দেবী পদ্মের উপর দন্ডায়মান। দেবীর নীচে একটি শঙ্খের উপর দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা থাকে। দেবীর পাশে বাঘচাল পরিহিত দেবাদিদেব মহাদেব থাকেন। দেবী চতুর্ভূজা। 


চন্ড ঘন্টা কালী 



চেতলা হাট রোডের চন্ড ঘন্টা কালী পূজাটি পরিচালনা করে গীতাঞ্জলি স্পোর্টিং ক্লাব। এবছর তাদের পূজাটি ৪১তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবী চতুর্ভূজা। দেবীর মাথার দুপাশে দুটি করে মোট চারটি নরমুণ্ড রয়েছে। দেবী বাঘছাল পরিহিত অবস্থায়  মহাদেবের উপর দন্ডায়মান। এছাড়া দেবীর পাশে আর একটি মহাদেবের মূর্তি বিরাজিত। 


কৃষ্ণ কালী 



কৃষ্ণকালী হলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণ ও দেবী কালীর সম্মিলিত রূপ। চেতলা হাট রোডে অবস্থিত চেতলা সংঘ ক্লাবটি ১৯৬৬ সালে স্থাপিত হয়। এই ক্লাবটি প্রতিবছর নিয়ম করে এখানে কৃষ্ণ কালীর আরাধনা করে থাকে। দেবী এখানে চতুর্ভূজা।  দেবীর এক হাতে থাকে খাঁড়া, এক হাতে চাঁদমালা আর বাকি দুই হাতে দেখা যায় বাঁশি।  দেবীর পাশে দেবী লক্ষ্মী করজোড় অবস্থায় দন্ডায়মান। দেবীকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এখানে কোনো প্রকার আমিষ ভোগ দেওয়ার নিয়ম নেই।  এখানে চালকুমড়ো, আগ  বলি দেওয়া হয়। 

আদ্যামা 


 
দেবী আদ্যমা পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা বজরঙ বালক সমিতি। এবার পূজাটি ৫০ বছরে পড়ল। দেবীর উপরে রয়েছে রাধাকৃষ্ণ। দেবীর নীচে রয়েছে রামপ্রসাদ। দেবীকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়।  এখানে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়।  


দেবী কিরীটেশ্বরী 



কিরীটেশ্বর কালী পূজাটি পরিচালন করে চেতলা প্রণব সংঘ।  এবছর পূজাটি ২০তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, লাবড়ার তরকারি, পায়েস ইত্যাদি দেওয়া হয়।  চালকুমড়া, আখ, আমাদা বলি দেওয়া হয়। এই ক্লাবটি পূর্বে শ্যামা পূজা করতো। তারপর ৫১ পিঠের দেবী কিরীটেশ্বরকে দেখে ও মুর্শিদাবাদের ৫১ পীঠ কিরীটেশ্বরের প্রধান পুরোহিত শ্রী রক্ষাকর চক্রবর্তী মহাশয়ের আদেশ অনুযায়ী এখানকার শ্যামা পূজার পরিবর্তে দেবী কিরীটেশ্বররীর আরাধনা শুরু হয়। 

ছিন্নমস্তা



 ছিন্নমস্তা রুপী দেবী কালীর  আরাধনা করে থাকে চেতলা অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য পূজা কমিটি।  পূজাটি পরিচালনা করে চেতলা ৮৬ পল্লী ক্লাব। এখানকার প্রতিমা প্রায় পনেরো ফুট উচ্চতার। প্রতিমার গাত্রবর্ণ টকটকে  লাল এবং মুন্ডহীন। নিজের কাটা মুন্ড নিজের হাতেই ধরা।  দেবীর ডান হাতে ধরা থাকে খাঁড়া। গলা থেকে ছিটকে আসা তিনটে রক্তের ধারা দেবীর কাটা মুন্ড  ও ডাকিনি  যোগিনী পান করে। মা দাঁড়িয়ে থাকেন কাম রতি  অর্থাৎ চিৎ ও শুয়ে থাকার নারী পুরুষ মূর্তির উপর।মূর্তি দুটি পদ্মের উপর থাকে।  সুদীর্ঘকাল ধরে এখানে মায়ের এই রূপের পূজা করা হয়। বহুকাল ধরে এখানে পূজাটি করার অন্যতম কারণ এখানকার ক্লাবের সদস্য ও পল্লীবাসীদের বিশ্বাস। ছিন্নমস্তা রুপী দেবীর পূজাটি এখানে শুরু হওয়ার পর অনেক ক্লাব সদস্যের চাকরি হয়েছে আবার কারো ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। এছাড়া ক্লাব সদস্য ও পল্লীবাসীদের অনেকের অনেক রকম উপকার হয়েছে বলে শোনা যায়।  সাধারণত ছিন্নমস্তা হলেন দশমহাবিদ্যার এক রূপ। দেবীকে এই রূপে পূজা করতে হলে যেমন বহুরকম নিয়ম পালন করতে হয় তেমন বহুরকম বিধিনিষেধও রয়েছে। পূজার সময় বাইরের কারোকে মণ্ডপে ঢুকতে দেওয়া হয় না।  উপোস করা  থাকলে তবে তাকে পূজার সময় মণ্ডপে ঢুকতে দেওয়া হয়। তান্ত্রিক ছাড়া সাধারণ কোনো পুরোহিত এই পূজা করতে পারেন না।  প্রতি বছর তারাপীঠ থেকে কোনো তান্ত্রিক এসে এখানকার পূজাটি করে থাকে। এই পূজায় পাঁঠা বলির নিয়ম রয়েছে। পাঁঠা বলির সাথে চালকুমড়া বলি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। দেবীকে ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, পোলাও, পাঁচরকম ভাজা, পায়েস, লুচি, মালপোয়া, হালুয়া, মাছ ভাজা, মাংস দেওয়া হয়। 


জহুরা কালী 





চেতলা ব্রীজের ঠিক পাশে দেবী জহুরার আরাধনা করা হয়ে থাকে। পূজাটি পরিচালন করে চেতলা ইয়ং ফ্রেন্ডস। দেবী কালির অন্যান্য রূপে সাথে এই রূপে  নেই। এখানে দেবীরূপ বীভৎস। রক্তবর্ণ মুখ। এবছর পূজাটি ৪৮তম বর্ষে পদার্পন করলো। দেবীকে খিচুড়ি, পায়েস, পাঁচরকম ভাজা, লাবড়ার তরকারি, চাটনি ইত্যাদি দেওয়া হয়।  এখানে কোনো রকম আমিষ ভোগ দেওয়ার নিয়ম নেই।  বলি দেওয়া হয় চালকুমড়োকে। 


লেখা ও ছবির স্বত্ব সম্পূর্ণ লেখকের।

তারিখ :০৯-১১-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।