Sunday, July 18, 2021

আজ স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি ছিয়াত্তরে পা রাখলেন >P

আজ স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি ছিয়াত্তরে পা রাখলেন 

- সুদীপ্ত মুখার্জী 



আজ ১৮ই জুলাই। ১৯৪৩ সালের আজকের দিনেই স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি শিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায় কলকাতার এক সমৃদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পরিবারে বরাবরই সংগীতের চর্চা হতো। খুব ছোট্ট বয়সেই তিনি তাঁর মাতৃদেবীর কাছে সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন।  পরবর্তী সময় তিনি সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ মোহাম্মদ সাগিরুদ্দিন খান, পন্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী, পন্ডিত লক্ষণ প্রসাদ জয়পুরওয়ালা ও পন্ডিত রমেশ নাদকার্নির কাছে শাস্ত্রীয়  সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন।  

পরবর্তীসময় তিনি "মেট্রো-মর্ফি কনটেস্ট" সংগীত প্রতিযোগিতায় তিনি বিজয়ী হন। অনিল বিশ্বাস নওশাদ, বসন্ত দেশাই ও সি রামচন্দ্রের মতো গুণী সংগীত পরিচালকরা সেই প্রতিযোগিতার বিচারকের আসন অলংকৃত করেছিলেন।  এই কন্টেস্টে বিজয়ী হওয়ার পর আরতি মুখোপাধ্যায়কে  আর পিছনে ফিরে  তাকাতে হয়নি।
  
১৯৫৮ সালে 'সাহারা' নামে একটা  হিন্দি সিনেমাতে প্লেব্যাক করার সুযোগ পান। এটাই তাঁর  সংগীত শিল্পী হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ। কিন্তু এই সিনেমার গানগুলো শ্রোতাদের মন ভরাতে পারেনি। তারপর 'গার্ল ফ্রেন্ড' নামে আর একটা সিনেমায় তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন কিন্তু সেই সিনেমাটি ফ্লপ হয়। তারপর 'কন্যা' নামে  একটি বাংলা সিনেমাতে তিনি গান গাওয়ার সুযোগ পান। এটাই তাঁর বাংলা সিনেমাতে প্রথম  সুযোগ পাওয়া। বাংলা সংগীত জগতে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তাঁর আসামান্য গায়কী ও সুমধুর কন্ঠস্বর সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়। 

১৯৬৬ সালে "গল্প হলেও সত্যি" নামে  বাংলা সিনেমাতে গান  গেয়ে তিনি সেরা মহিলা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে 'বিজেএফ' পুরস্কার পেয়েছিলেন। 'ছুটির ফাঁদে' সিনেমায় গান গেয়ে তিনি পুনরায় 'বিজেএফ' পুরস্কার পান। পরবর্তী সময় তিনি হিন্দি সিনেমা 'গীত গাতা চল' ও বাংলা 'হংসরাজ', 'অমরগীতি'র মতো সংগীত প্রধান সিনেমাতে গান গেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর গাওয়া বহু আধুনিক গান ও ছায়াছবির গান জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছিল।  ষাটের দশকের শেষদিক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তিনি বাংলা সংগীত জগতে মহিলা শিল্পী হিসেবে শীর্ষ স্থান অলংকৃত করেছিলেন। তিনি শুধু বাংলা বা হিন্দি নয় বহু ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছিলেন। তিনি রাগাশ্রয়ী, আধুনিক গান, ভজন, গজল ইত্যাদি গান বহুবার কলকাতা ও মুম্বাই রেডিওতে গেয়েছেন। আনুমানিক প্রায় ১৫০০০ গান তিনি গেয়েছেন। 'বন্য বন্য এ অরণ্য', 'এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে', 'লজ্জা মরি মরি একি  লজ্জা', 'মাধবী মধুপে হল মিতালি', 'তখন তোমার একুশ বছর', 'আমি মিস ক্যালকাটা' ইত্যাদি তাঁর খুবই জনপ্রিয় গান। ঋত্বিক ঘটক তাঁর 'যুক্তি তক্কো গল্প' সিনেমাতে আরতি মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইয়েছিলেন।  সম্ভবত তিনি সর্বপ্রথম হিন্দিতে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেছিলেন।  তিনি বহুবার বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হলেও তিনি সবসময় মনে করেন শ্রোতারাই তাঁকে অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়েছেন এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার।  বাংলায় যে কজন সংগীত শিল্পী এসেছেন তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন খুবই ভার্সেটাইল।  বিভিন্ন রকম গান তিনি অনায়াস ও সাবলীলভাবে গাইতে পারতেন। সব ধরণের সংগীতে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল।  

আজ আপনার জন্মদিন, আমার তরফ থেকে আপনাকে অফুরন্ত শুভেচ্ছা জানাই।  আপনি সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।  আপনার অগুনতি ভক্তরা আপনাকে সবসময় ঘিরে থাকুক।


তারিখ :১৮-০৭-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




Thursday, July 8, 2021

সহেলীর কৌতূহল (পর্ব ৫)

সহেলীর  কৌতূহল 

(পর্ব ৫) 


পূজার শেষ দিন অর্থাৎ দশমীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জনের পরে সন্ধ্যার সময় আমাদের পূজামণ্ডপে প্রতিবছর নিয়ম করে একটা যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতো। প্রতিবছর রথের দিন গ্রামের রবীন  কাকা যাত্রার দলকে বায়না করে আসতো। সাধারণত কলকাতার চিৎপুর অঞ্চল থেকে যাত্রাদলকে নিয়ে আসা হতো। সেইসব যাত্রাপালাগুলো বেশিরভাগ ছিল পুরাণের বা ইতিহাসের গল্প অবলম্বন করে তৈরী। পালাগুলো বেশ জমজমাট হয়ে উঠতো। যাত্রা দেখার জন্য আমাদের গ্রাম ছাড়াও আশপাশের গ্রাম থেকেও বহু দর্শক আসতো। সন্ধ্যার সময় গ্রামটা যেন কানায় কানায় ভরে উঠতো। আমাদের দেবীর বিসর্জনের ব্যাথা  কিছুটা হলেও কমতো।  

সহেলী জানিস, একবার একটা দারুন মজা হয়েছিল। সেবার 'সীতাহরণ' নামে একটা পালা মঞ্চস্থ হচ্ছিলো।  আমি খুব মন দিয়ে পালাটা  দেখছিলাম হঠাৎ আমার খুব বাথরুম পেয়ে গেলো।  বাথরুম করার জন্য প্যান্ডেলের পিছন দিকে গেছি।  ওখানে গিয়ে দেখি সাদা সিল্কের শাড়ি পরে একজন মহিলা বিড়ি টানছে।  সেটা দেখে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম।  আগে কখনো কোনো মহিলাকে এভাবে বিড়ি বা সিগারেটে টানতে দেখিনি, তাই এতটা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।  প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না ওই ভদ্রমহিলা আবার কোথা থেকে আসলো, আগে কখনও আমাদের গ্রামে বা আশপাশের কোনো গ্রামে দেখিনি, তাও আবার মহিলা হয়ে বিড়ি টানছে। এইসব ভাবতে ভাবতে  বাথরুম করে আমি আবার পালা দেখার জন্য ফিরে এলাম। তার একটু পরে দেখি ওই ভদ্রমহিলা মঞ্চে সীতার  ভূমিকায় অভিনয় করতে আসলো। তখন আমার বোধোদয় হলো। পরে অবশ্য বড়দের কাছ থেকে জেনেছিলাম ওটা মহিলা নয়, একজন পুরুষ ছিল। পুরুষ মহিলা সেজে অভিনয় করছিলো।  এই ব্যাপারটায় আমি বেশ মজা পেয়েছিলাম।  

উৎসব সব সময় সুখের হয়। আমার স্মৃতিপটে গ্রামের কত কথা ও গ্রামের দুর্গাপুজোর কথা গচ্ছিত রয়েছে। সেইসব স্মৃতি আজও আমি ভুলতে পারি না। অবসর সময়ে বসে বসে সেই সময়কার স্মৃতিগুলোকে রোমন্থন করি।  

দাদু, তুমি যে নবপত্রিকা ও মহাস্নানের কথা বললে আমি ঠিক বুজতে পারলাম না।  যদি তুমি এই দুটো সম্বন্ধে আর একটু বিশদে বলো তাহলে ভালো হয়। 

দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ঠ অঙ্গ হলো নবপত্রিকা। পৌরাণিক কাহিনীর থেকে জানা যায় প্রকৃতিরূপা দেবী মহামায়া নয়টি বিশেষ রূপে অবস্থান করেন নয়টি বৃক্ষে। প্রাচীনকালে উঁচু বৃক্ষতে দেব-দেবীর আবাসস্থল বলে কল্পনা করা হত।  এই সব বৃক্ষে সূর্যের আসন বা আশ্রয়রূপে ভাবা হতো।  নবপত্রিকা হলো দেবী দুর্গার প্রতীক অর্থাৎ গণেশের জননী।  দুর্গাপূজার ইতিহাস বলে বৃক্ষ, যূপ, স্তুপ ও  স্তম্ভের ভিতর দিয়ে প্রতীক পূজার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে। নবপত্রিকার অর্থ নয়টি পবিত্র গাছ বা গাছের শাখার একত্রীকরণ। মূলত একটা সপত্র কলাগাছের সাথে আটটি সমূল সপত্র গাছ একত্র করে একজোড়া বেল গাছে শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ির আবরণে বৌয়ের মত ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর সিঁদুর দিয়ে সপরিবার দেবী প্রতিমার ডান  দিকে ঠিক গণেশের পাশে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়। যেহেতু কলগাছকেই বৌয়ের আকার দেওয়া হয় তাই তাকে লোকে কলাবৌ বলে অভিহিত করে থাকে। সকলের ধারণা এই নয়টি গাছে দেবীর কুলোযোগিনীরা বাস করে যোগিনীদের বলা হয় দেবী দুর্গার লীলাসহচরী, সাঙ্গপাঙ্গ কিংবা দেবী নিজেই। নবপত্রিকার নয়টি গাছ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকস্বরূপ।  এই নয়রুপী দেবীকে একত্রে 'নবপত্রিকাবাসিনী' বলা হয়।  নবপত্রিকা আসলে দেবীর বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ প্রতীক। তাই ইনি নবপত্রিকাবাসিনী দূর্গা।  

  

নবপত্রিকা কৃষিসম্পদের প্রতীক। দেবী এখানে শস্যরূপে পূজিত হন। নবপত্রিকায় প্রত্যেকটি বৃক্ষকে দেবীর এক একটি রূপে কল্পনা করা হয়েছে। নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়। 


কলা গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন ব্রহ্মাণী। 
কচু গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কালিকা। 
হরিদ্রা গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন উমা। 
জয়ন্তী গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কার্তিকী। 
বিল্ব গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন  শিবা। 
দাড়িম্ব গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন রক্তদন্তিকা। 
অশোক গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন শোকরোহিতা। 
মানকচু গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন চামুন্ডা। 
ধান গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন লক্ষ্মী। 

দেবীপূজার পূর্বদিন অর্থাৎ ষষ্ঠীতিথিতে প্রথমে বিল্ববৃক্ষে দেবীর আবির্ভাব ও অধিষ্ঠান চিন্তা করে বিল্ববৃক্ষমূলে দেবী দুর্গার পূজা করা হয়।   অর্থাৎ মহাসপ্তমীর দিন সকাল বেলায় নিকটস্থ নদী বা অন্য কোনো জলাশযে নবপত্রিকাকে স্নান করানোর উদ্দেশ্যে পুরোহিত কাঁধে করে নিয়ে আসেন। পুরোহিতের পিছনে পিছনে ঢাকিরা ঢাক বাজাতে বাজাতে, মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিতে দিতে সঙ্গে যান।  স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে মণ্ডপে প্রবেশ করানো হয়।  দেবী তখন বৃক্ষ থেকে প্রতিমায় বা বৃক্ষরূপ থেকে দেবীমূর্তিতে রূপান্তরিত ও প্রতিষ্ঠিত হন পূজার জন্য। তারপর শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী পূজার কাজ শুরু হয়, শুরু হয় দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠানটির প্রথাগত সূচনা। 
 
 নবপত্রিকার আর এক নাম 'নবদুর্গা'।  দেবী দুর্গার পুত্র-কন্যা এবং মহিষাসুরের সাথে নবপত্রিকা  পূজা পান।  নবপত্রিকা কিভাবে দেবী দুর্গার সাথে মিশলো তা নিয়ে অনেক রকম মতামত রয়েছে।  নবপত্রিকা মণ্ডপে প্রবেশের পর দেবীকে দর্পণে মহাস্নান করানো হয়।  এরপর থেকে পূজার বাকি দিনগুলোতে নবপত্রিকা দেবীর সাথে পূজিত হয়ে থাকেন। এই নবপত্রিকা প্রবেশের পূর্বে দেবী চামুণ্ডার পূজা  করা হয়।  

(চলবে)


তারিখ :০৮-০৭-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Wednesday, March 17, 2021

সহেলীর কৌতুহল (পর্ব - ৪)

  সহেলীর কৌতুহল


(পর্ব - ৪)

আমাদের গ্রামে কয়েক ঘর মুসলিম পরিবার বাস করতো।   তারাও সমানভাবে  আমাদের সাথে পূজার আনন্দে  মেতে উঠতো। রহিম, আব্বাস ছিল আমার খুব ভালো বন্ধু। আব্বাস আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। রহিম এক ক্লাস উঁচুতে পড়তো।  আমাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান কোনো ভেদাভেদ ছিল না।  আমরা একসাথে খেলতাম, একসাথে ঘুরতাম, একসাথে স্কুলে যাতায়াত করতাম। পূজা এলেই সারা গ্রামে একটা সাজ সাজ রব উঠতো।  মাটির বাড়িগুলোতে  নতুন করে মাটির প্রলেপ দেওয়া হতো।  পাকা বাড়িগুলোতে বা বেড়ার বাড়িগুলোতে যার যেমন  ক্ষমতা তারা সেইভাবে  সারিয়ে নতুন রঙে রাঙাতো।  গ্রামটাও যেন নতুন সাজে সেজে উঠতো।  গ্রামের একমাত্র শিবমন্দিরটিকেও নতুন করে রঙের প্রলেপ দেওয়া হত।  গ্রামের চেহারাটাই পাল্টে যেত।  পূজায় নবীনদের সাথে গ্রামের প্রবীনেরাও সমানভাবে অংশগ্রহণ করত।  প্রতিবছর এই কটাদিন আমরা চুটিয়ে আনন্দ করতাম। সকাল থেকে রাত  পর্যন্ত আমাদের প্যান্ডেলেই কেটে যেত।  গ্রামের কাকা-জ্যাঠারা একজোট হয়ে গল্প-গুজব করত। তাঁদের মধ্যে  কেউ কেউ আবার শিব মন্দিরের চাতালে বসে তাস খেলত। গ্রামের  মেয়েরাও সবাই অনেকটা সময় প্যান্ডেলে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব ও খুনটুশি করে কাটাত। আমরা সব বন্ধুরা মিলে কখনো প্যান্ডেলে আবার কখনো দীঘির পাড়ে  বসে গল্প করতাম। আমাদের আনন্দের সীমা  ছিল না।  গ্রামের বাইরে যেসব দাদা-দিদি, কাকা-কাকিমারা  থাকতো তারাও এইসময় গ্রামে ফিরে আসত।  তারাও সমানভাবে সবার সাথে পূজার আনন্দে সামিল হতো।

ষষ্ঠীর দিন সকালে আমলকাকু একজন তরুণ সঙ্গীকে নিয়ে ঠিক সময় পূজা করার জন্য মণ্ডপে উপস্থিত হয়ে যেতেন। আমলকাকুর সঙ্গী নিবারণ দা ছিল আমলকাকুর ছেলে। সকলে বলে নিবারণদা  আমলকাকুর কাছ থেকে নাকি পূজার কাজের তালিম নিচ্ছে।

 ষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। মাতৃবন্দনার আনুষ্ঠানিকতা এই  দিন সকাল  থেকেই শুরু হয়ে যায়। অশুভ শক্তির বিনাশে মঙ্গলময়ী দেবী দুর্গার জাগরণে জগতের সুখ, শান্তি  প্রতিষ্ঠার জন্য প্রার্থনা করেন সকলে।   
 
 দুর্গাপূজা হল মহাপূজা। এই পূজা ষষ্ঠী থেকে দশমী এই পাঁচদিনের পূজা। যাকে  ঘিরে তৈরী হয় এক মহা উৎসব।  প্রথমে কল্পারম্ভ অর্থাৎ সংকল্প করা হয়। কল্প মানে কল্পনা আর আরম্ভ মানে শুরু।  এই সঙ্কল্পবর্তী মানুষকে পূজার নিয়ম পালনে নিয়োজিত করে। দেবীর পূজাতেই সংকল্প করতে হয় কিন্তু দুর্গাপূজার সংকল্প খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। বিভিন্ন হিন্দু পুরাণ ও নানারকম শাস্ত্রগ্রন্থে দেবীর সাতটি  কল্পের কথা বলা আছে। সেগুলো হল নবম্যাদিকল্প, প্রতিপদাদিকল্প, ষষ্ঠাদিকল্প, সপ্তম্যাদিকল্প, অষ্টম্যাদিকল্প,  অষ্টমীকল্প ও মহানবমিকল্প। কেহ কৃষ্ণনবমী, কেহ প্রতিপদ, কেহ ষষ্ঠী, কেহ সপ্তমী, কেহ অষ্টমী আবার কেহ শুধু কেবল মহাঅষ্টমী বা মহানবমীতে কল্পারম্ভ করে থাকে।  মহাষষ্ঠীর দিন সকালে মণ্ডপেও  ঘট স্থাপন করা হয় এবং সংকল্প করা হয়।  সেই সঙ্কল্পের সাক্ষী থাকে এই ঘটটি।  

মহাষষ্ঠী হল দুর্গাপূজার প্রথম দিন। এই দিনে দেবী দূর্গা সপরিবারে মর্তে আবির্ভূত হন।  বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দেবী মূর্তির আবরণ উন্মোচন করা হয়। সকালে বিলবৃক্ষে দেবীর মঙ্গল বোধন হয়।   বিল্ববৃক্ষকে বলা হয় শ্রীবৃক্ষ। প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত এই শ্রীবৃক্ষকে দেবীর প্রতীকরূপে উপাসনা করা হয়। বোধনের অর্থ জাগরণ বা উদ্দীপন অর্থাৎ বোধনের ফলে দেবী জাগরিত হন।  আমন্ত্রণ মানে দেবীকে আমন্ত্রণ করা।  বোধন, আমন্ত্রণের পর  সন্ধ্যায় অধিবাস করা হয়।  অধিবাস মানে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করা। নানারকম উপকরণ দিয়ে দেবীর অধিবাস সম্পন্ন হয়। এই উপকরণগুলোকে একটা থালায়  সাজানো থাকে।  সেই থালাটিকে  বরণডালা বলে অভিহিত করা হয়। ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়  সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। যা শারদীয়া দুর্গাপূজা নামে পরিচিত।  আনন্দময়ী দেবীর আগমনে পূজা মণ্ডপটি উৎসব মুখরিত হয়ে উঠতো।  ধূপ-ধুনোর গন্ধে আর কাঁসর-ঘন্টার সঙ্গে ঢাকের শব্দে ভক্তদের আরাধনায় একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরী হত।   

 মহাষষ্ঠীর লগ্ন পেরিয়ে আসে মহাসপ্তমী। এইদিন পঞ্জিকার সূচি অনুযায়ী শুরু হয় নবপত্রিকার প্রবেশ ও সপ্তমীর পূজা। ধুপ-ধুনো, বেল-তুলসী, বস্ত্র, নৈবেদ্য, পুষ্পমালা, চন্দনসহ মোট ১৬টা  উপাচার দিয়ে দেবীকে পূজা করা হয়ে থাকে। ত্রিনয়নী দেবীর চক্ষুদান করা হয়ে থাকে। সপ্তমীর  দিন ভোরে  অমলকাকু ও নিবারণদা একটা কলাগাছকে নিয়ে ঢাক বাজাতে বাজাতে রায়বাবুদের দীঘিতে স্নান করানোর জন্য নিয়ে আসতো। শাস্ত্রবিধি মেনে  স্নান করানোর পর  কলা গাছটিকে নতুন লাল পাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে ঘোমটা দেওয়া অবস্থায় ঢাক বাজাতে বাজাতে মণ্ডপে নিয়ে আসা হত। মণ্ডপে  কলাগাছটিকে গণেশের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। সমগ্র ব্যাপারটা আমি ও আমার বন্ধুরা বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখতাম।  সকলে ওটাকে কলাবৌ বলত, বড়রা আমাদের বলত ওটা নাকি গণেশের বৌ  আমি মনে মনে ভাবতাম মাটির মূর্তির বৌ কি করে একটা গাছ হয়, মাটিরই তো হওয়া উচিত। পরে অবশ্য জেনেছিলাম এটাকে নবপত্রিকা বলে। সপ্তমীর দিন প্রথমে নবপত্রিকা স্নান করিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ ও স্থাপন করা হয়। এই দিনই মৃন্ময়ী হতে দেবী চিন্ময়ীরূপে পূজিত হন।  নবপত্রিকার প্রবেশের পরে দর্পণে দেবীকে স্নান করানো হয়। একে মহাস্নান বলা হয়। এই মহাস্নানে ব্যৱহৃত হয় ১৯টি স্থানের মাটি আর ২১ রকমের জল।  মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে চক্ষুদানের মাধ্যমে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।  এরপর শুরু হয় কল্পারম্ভ ও মহাসপ্তমীর পূজা হয়। দেহ শুদ্ধি, অঙ্গ শুদ্ধি সেরে শুরু হয় পূজার্চ্চনা, বেজে ওঠে ঢাক-ঢোল-কাসর ।  ঘটে, প্রতিমায় দেবীর আবির্ভাব হয়।  দেবী মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীরূপে আবির্ভূত হন।     

পূজার তৃতীয় দিনে শুরু হয় মহাঅষ্টমীর পূজা। মহাঅষ্টমীর পূজা বিশেষ ভাবগম্ভীর্য ও মাহাত্ম্যপূর্ণ  পূজা। এইদিন সাধারণত পুষ্পাঞ্জলি, কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজা করা হয়।  মহাঅষ্টমীর দিনে সকালে ষোড়শ উপাচারে অনুষ্ঠিত হয় দেবীর পূজা।  ১০৮ টি পদ্ম ও প্রদীপ দিয়ে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়। কোথাও কোথাও এইদিন কুমারীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর শুরু হয় পুষ্পাঞ্জলি। এইদিন  উপোস করে স্নান সেরে শুদ্ধ মনে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য আমি মণ্ডপে উপস্থিত হতাম। আমাদের গ্রামের প্রায় সকলে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য এই সময়  মণ্ডপে হাজির থাকত। সারা গ্রাম যেন  ভেঙে পড়তো মণ্ডপে।  এতো ভীড়  হতো যে  মণ্ডপে ঠিকমত দাঁড়াবার জায়গা পাওয়া যেত না। 

অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে করা হয় সন্ধিপূজা।  অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট আর নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট মোট ৪৮ মিনিটকে  সন্ধিক্ষণ বলে ধরা হয়। সন্ধিক্ষণকেই শুভক্ষণ বলে ধরা হয়। এই সন্ধিক্ষণের মধ্যে সন্ধিপূজা সম্পন্ন করতে হয়। শ্রী শ্রী চন্ডী অনুযায়ী জানা যায়, এই মহাসন্ধিক্ষণেই অসুরদলনি দেবী দূর্গা অশুভ শক্তির প্রতীকরূপী মহিষাসুরকে দলন করেছিলেন। অন্যদিকে এই সন্ধিক্ষণেই  রামচন্দ্র কর্তৃক রাবন নিহত হয়েছিলেন বলে কথিত রয়েছে। সেই সন্ধিক্ষণেই অশুভ শক্তির প্রতীকরূপী পশুবলি দেওয়াই নিয়মে পরিণত হয়েছে।  সন্ধি কথাটির মধ্যেই এক গভীর ব্যঞ্জনা নিহিত রয়েছে।  সংঘাত ও সংঘর্ষের পরিণতিতেই যেমন সন্ধি তেমন মিলনের শুভ মুহূর্তও সন্ধি। তাই অষ্টমী ও নবমীর এই সন্ধিক্ষণেই সেই বিজয়ের দামামা বেজে ওঠে।  

মহানবমী হল দুর্গাপূজার শেষ দিন।  সন্ধিপূজার পর শুরু হয় মহানবমীর পূজা। এই দিনের পূজার অন্যতম অঙ্গ হল  বলিদান।  শাস্ত্র মতে ছাগ বা মহিষাদি বলির রীতি  আছে।  কিন্তু বর্তমানে আইনত পশুবলি করা যায় না। তার পরিবর্তে কুষ্মান্ড ও ইক্ষুদান বলি করা হয়।  তবে অনেক পারিবারিক পূজায় এই বলির সামগ্রীরও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।  এই দিন ষষ্ঠী থেকে যত দেব-দেবীর পূজা করা   হয়েছে তাঁদের প্রত্যেককে আহুতি দিতে হয়। এমনকি চৌষট্টি যোগিনীর আহুতি দিতে হয়। এইদিন অনেক জায়গায় কুমারী পূজাও অনুষ্ঠিত হয়।  

দাদু ,এই  যোগিনীরা আবার কে ?

 যোগিনীদের কথা তোকে পরে বলবো। 

 সন্ধিপূজার সময় বেশ ঘটা করে আমলকাকু নাচতে নাচতে সন্ধ্যা আরতি করতো। গ্রামের সকলে আমলকাকুর মনোমুগ্ধকর আরতি দেখার জন্য এইসময় মণ্ডপে হাজির থাকতো। আরতি সম্পন্ন হয়ে গেলে আমাদের মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ত কারণ পরদিন মাকে বিদায় জানাতে হবে। আমাদের আনন্দের দিনগুলো শেষ হয়ে যাবে,  শুরু হয়ে যাবে আবার লেখাপড়া, আবার শুরু হয়ে যাবে বাড়ির বড়দের চোখ রাঙানো। সেই গতানুগতিক জীবন চলতে থাকবে। মায়ের জন্য আবার একটা বছর আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। 
 
চারদিনের পূজার আনন্দের পর দশমী হল বিষাদের দিন। দশমীর পূজা শেষ করে মহাস্নানের যে দর্পণ  ছিল, সেটিতে মাকে  চিন্ময়ীরূপে বিসর্জন দেওয়া হয়।  বেজে ওঠে বিসর্জনের বাদ্যি।  মানুষের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। পূজার কটা দিনের আনন্দ উচ্ছাসের পরই  বিষাদের সুর নিয়ে আসে দশমী।  শাস্ত্র মতে পুরোহিত মায়ের বিসর্জনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ করার পর মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা। সিঁদুর, পান, সুপারি, মিষ্টি দিয়ে দেবীকে বরণ করা হয়।  দেবীবরণের মাধ্যমেই মাকে  জানানো হয় মনের কামনা-বাসনা। মায়ের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়।

 এইদিন কোথাও কোথাও দেবীর অভিন্ন মূর্তি অপরাজিতা পূজার রীতি রয়েছে। অপরাজিতা দেবী দুর্গার আর এক রূপ। বিজয়া দশমীর পর অপরাজিতা পূজা সম্পন্ন হয়। এই দিন দশমীর ঘট বিসর্জনের পর ঈশান কোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে তার ওপর অপরাজিতা লতা রেখে অপরাজিতা পূজার রীতি রয়েছে।দুর্গাপূজার সমস্ত রকম ত্রুটি নিরসনের জন্য ও বিজয় কামনায় এই পূজা করা হয়। দশমীর দিন একটি পরিষ্কার পাত্রে অপরাজিতা লতা রেখে তাতে দেবী দুর্গার অর্চনা করা হয়। পূজার শেষে ওই অপরাজিতা লতা টুকরো টুকরো করে কেটে শ্বেতসষর্প ও হলুদের সাথে হলদে রঙের  কাপড়ে ছোট ছোট পুটুলিতে বাঁধা হয়। হলুদ রঙের সুতোতে এক একটি পুঁটলিকে বেঁধে প্রত্যেকের ডান হাতে বেঁধে দেওয়া হয়।  দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনীর মতে চৌষট্টি যোগিনীদের অন্যতম। অপরাজিতা দেবীকে আবার মৎসোপুরাণে মাতৃকাগণের অন্যতম বলা হয়েছে। বামনপুরাণ অনুযায়ী দেবী অপরাজিতা গৌতম মুনি ও অহল্যার চার কন্যা জয়া, বিজয়া, অপরাজিতা ও জয়ন্তীর অন্যতমা। অপরাজিতা দেবীর মতো অপরাজিতা ফুল ও লতা দুর্গাপূজায় অপরিহার্য। 

বিজয়া বিষাদের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আছে সিঁদুর খেলার নিয়ম। দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হয়। এটা হল স্ত্রী-আচার। মানুষের বিশ্বাস দুর্গা মায়ের সিঁথির সিঁদুর নিয়ে মাথায় ঠেকালে সধবাদের সিঁথির সিঁদুর দীর্ঘস্থায়ী হয়। মাকে  সিঁদুর দানের পর সধবারা একে অন্যের সিঁথি সিঁদুরে রাঙিয়ে দেয়। ভালোবাসার বন্ধনে একে অপরকে আবদ্ধ করে। দেবীবরণের মাধ্যমে কয়েকদিনের আনন্দময় উৎসবের সমাপন ঘটে।  চারদিনের  প্রাণঢালা আনন্দ স্রোত পৌঁছে যায় শেষ লগ্নে। বিষাদ সিন্ধুতে ডুবে যাওয়ার আগে সিঁদুর খেলার মাধ্যমেই অন্তরের আবেগ উজার করে দেওয়া হয়। 

 
(চলবে)



তারিখ :১৭-০৩-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 






Saturday, March 6, 2021

সহেলীর কৌতুহল (পর্ব - ৩)

সহেলীর কৌতুহল


(পর্ব - ৩)

আমাদের গ্রামটা ছিল খুবই ছোট। সব মিলিয়ে মোটামুটি চারশো জনের মত লোকের বসবাস ছিল।  তার মধ্যে সবাই যে হিন্দু ছিল তা নয়। কয়েকটি মুসলমান পরিবারও বসবাস করত।  প্রধানত কৃষিভিত্তিক গ্রাম ছিল। তবে কৃষক ছাড়াও কামার, কুমোর, জেলে  প্রভৃতি পেশার লোকেরাও  বাস করত।

 গ্রামটা ছিল আমার প্রাণ। হৃদয় কাড়া গ্রামের সেইসব দৃশ্য, গ্রামের প্রকৃতি, গ্রাম্য জীবন আজও  আমার স্মৃতির মণিকোঠায় অবচেতন সময় হানা দেয়। ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে করলে এক পরম সুখ অনুভব করি ও মনে মনে খুব তৃপ্তি পাই,  কারণ আমাদের জীবনের একটা রঙিন অধ্যায় হল শৈশব।  সেই শৈশবকালটা আমার গ্রামেই কেটেছে।

আমাদের গ্রামের থেকে দু কিলোমিটার দূরে প্রতি সোমবার, বুধবার ও শুত্রুবারে একটা 'গ্রামীণ হাট' বসতো।  'হাট'  কি তুই সেটা জানিসতো?

সেরকমভাবে না জানলেও কিছুটা শুনেছি। রবীন্দ্রনাথের লেখা 'হাট' নামের একটা কবিতা ছোটবেলায় পড়েছিলাম।  কবিতাটা আমার  খুব ভালো লেগেছিলো।  কবিতাটার কিছু অংশ আজও  মনে আছে। 
 
"কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি 
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি 
গাড়ি চালায় বংশীবদন,
 সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন। 
হাট  বসেছে শুত্রুবারে  
বক্সীগঞ্জের পদ্দাপাড়ে।"


কবিতাতে বলা আছে হাট সপ্তাহে একদিন অর্থাৎ শুধু শুত্রুবার বসত আর তোমাদের গ্রামের হাট সপ্তাহে তিন দিন বসত, তাই তো। 

হ্যা, সপ্তাহে তিনদিন বসত কারণ আমাদের ও আশপাশের গ্রামগুলোতে সেরকম কোনো দোকান ছিল না। ওই হাটটাই ছিল আমাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর একমাত্র উপায়। এখানে দৈনন্দিন  প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যেমন পাওয়া যেত তেমন গৃহস্থালি দ্রব্যও  পাওয়া যেত।  এটাই ছিল ক্রয়-বিক্রয়ের উপযুক্ত স্থান।  এই হাটের উপর আমাদের নির্ভর করতে হত। শুধু আমাদের গ্রাম নয়,  দূর-দূরান্ত থেকে বহু লোক এই হাটে আসতো।  হাটটা ছিল পরস্পরের দেখা-সাক্ষাতের ও কুশল বিনিময়ের উপযুক্ত স্থান। এরকম গ্রাম্য হাট পল্লীজীবনের এক উপযুক্ত যোগাযোগ কেন্দ্র, তাই তার গুরুত্ব অপরিসীম। একে বাদ দিয়ে গ্রামের লোকেদের জীবনযাত্রা, গ্রামের অর্থনীতি ভাবা যায় না। এখানে  একদিকে যেমন কাঁচা বাজার অর্থাৎ শাক সবজি, মাছ, মাংস পাওয়া যেত তেমন অন্যদিকে চাল, ডাল, লবণ  প্রভৃতি শুকনো দ্রব্যাদি বিক্রি করা হত। হাটে গাছের বীজ ও সার বিক্রি হত।  কামার-কুমোর-ছুতোরের তৈরী জিনিসপত্র, জামা কাপড়ের দোকান বসতো। এছাড়া গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগিও বিক্রি হত।  

তোমাদের গ্রামে কোনো দোকান ছিল না? 

না, সেই সময় ছিল না।  পরে  অবশ্য কয়েকটা হয়েছে বলে শুনেছি। এখন দিনকাল অনেকটা পরিবর্তন হয়ে গেছে।  মানুষের  চাহিদা ও রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। দিনের সাথে সাথে গ্রামের চেহারাও অনেকটা বদলে গেছে।  

দূর্গাপুজোটা আমাদের দেশে শরৎ ঋতুতে করা হয়। বাংলায় বর্ষা গেলে আসে শরৎকাল। এই শরৎ ঋতুতে আমাদের দেশ শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠে, কৃষকদের ঘর ভোরে ওঠে। শরতের আছে নিজস্ব বর্ণ ও গন্ধ। এই সময়  প্রকৃতি সেজে ওঠে কাশফুল ও শিউলি ফুলে। মাতাল হাওয়া, নীল আকাশে যেমন দেখা যায় সাদা মেঘের ভেলা তেমন খাল-বিলের  জলে শাপলা ফুটতে দেখা যায়।চলতে থাকে সময়-অসময়ে শুভ্র-সফেদ মেঘের আনাগোনা আবার কখনো কখনো রোদের ঝিলিক। ক্ষনে ক্ষনে ঋতুরানির দুরন্তপনা উচ্ছল কিশোরীকেও যেন হার মানায়। এমন প্রকৃতিতে রঙের খেলায় মেতে উঠতে চায় মন।  তাই প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে সকল বাঙালির মনও  বদলে যায়। 
 আমার গ্রাম, গ্রামের পূজা আমার সুখ স্মৃতির সঞ্চয়। অবসর জীবনের খোরাক।  আমাদের গ্রামে মাত্র একটা দুর্গাপুজো হতো।  গ্রামের মাঝামাঝি জায়গায় ছোট একটা টিনের চালার শিব মন্দির ছিল।  এই মন্দিরে শিবরাত্রির দিন খুব ঘটা করে বাবা মহাদেবের পূজা করা হতো। গ্রামের মহিলারা এইদিন উপোষ করে মন্দিরে এসে বাবা মহাদেবের মাথায় জল ঢালতো। আমাদেরও সেই সময় কিছু প্রসাদ জুটে যেত। শিবরাত্রির  দিন শিবমন্দির চত্বরটা সকাল থেকেই বেশ গমগম করত।  লোকে-লোকারন্য হয়ে থাকতো।
 
এই শিব মন্দিরের বাঁপাশে ছোট একটা মাঠ ছিল।  ওই মাঠে বাঁশ-কাপড় দিয়ে  কালু  কাকা প্যান্ডেল তৈরী করে দিত। সেই প্যান্ডেলে ছোট একচালা প্রতিমায় পূজা করা হত।  প্রতিমাটা  আমাদের গ্রামের অরুণকাকু বানাতো।  রথের দিন থেকে কাকু প্রতিমার কাঠামো বানাতে শুরু করত।  আমরা রোজ স্কুল যাওয়ার সময় ও  স্কুল থেকে ফেরার সময় একবার করে অরুণকাকুর বাড়িতে ঠাকুর দেখতে যেতাম।  লক্ষ করতাম প্রতিমার কাজ কতটা এগোলো। আমার খুব কৌতূহল ছিল অসুরকে নিয়ে। অসুরের গোঁফটা  এবার কতটা মোটা হল, তার গড়নটা কতটা তাকরাই  হল  সেদিকে আমার সজাক দৃষ্টি থাকতো।  গড়ন ভালো না হলে ওরকম তেজস্বীনি মহিলার সাথে যুজঁতে পারবে না তো।   ভাবতাম একজন নারী হয়ে কি করে ওইরকম একজন বলবান পুরুষকে পরাস্ত করলো। আসলে তখন তো পৌরাণিক ব্যাখ্যাগুলো আমার জানা ছিল না। মায়ের চোখ তিনটিও আমায় খুব আকর্ষণ করতো। অরুণকাকু যখন মায়ের চোখ আঁকতো, তখন উপস্থিত থেকে সবটা দেখতাম। 

মাটি, বাঁশ, খড়  ইত্যাদি দিয়ে তৈরী হত দশ হাতের দেবী দূর্গা।  আমার চোখের সামনে আস্তে আস্তে তা গড়ে উঠতো। ছোটোবেলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম প্রতিমা তৈরী। প্রথমে খড়ের সাহায্যে দেবীর আকার তৈরি করা হতো। তারপর তাতে মাটি লেপা হত। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতো দেবীর সব অঙ্গ। গড়ে তোলা হত তাঁর পুত্র-কন্যাদের। শুধু তাই নয় দেখতাম সবার বাহনগুলোকেও নির্মাণ করতে।  মাটির কাজ শেষ হলে অরুণকাকু প্রতিমায় রঙের কাজ শুরু করতো। আস্তে আস্তে মাটির ঠাকুরগুলো  নানারকম রঙে রঙিন হয়ে উঠতো। কারো গায়ের রঙ হলুদ, কারো সবুজ।  তারপর দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীকে কাপড় ও কার্তিককে রাজবেশে আর গণেশকে ধুতি পরিয়ে সজ্জিত করা শেষ হলে তাঁদের নানারকম অলংকারে অলংকৃত করা হত। এইভাবে চলতে চলতে একদিন প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ হত।  দেবীর দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র  উঠতো। দেবীর অস্ত্র ভান্ডারে দেখা যেত  ত্রিশূল, খড়গ, চক্র, বাণ, ঢাল, ধনুক, ঘন্টা, নাগপাশ ইত্যাদি। ঠিক সময় ঠাকুর চলে আসতো কালু কাকার তৈরী মণ্ডপে। বড়দের সাথে ছোটোরাও মন্ডপে ঠাকুর আনার জন্য যেতাম। ঠাকুর মন্ডপে নিয়ে আসার পর অরুণকাকু  প্রতিমাগুলোতে অস্ত্র সজ্জায় সজ্জিত করতো। এই সময় প্রায় এক মাসের জন্য আমাদের স্কুল বন্ধ থাকত।  ঢাকের শব্দে একদিন সকালে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত।  বুঝতে পারতাম আজ ষষ্ঠী, আজ দেবীর বোধন।  আমরা তখন ছোট, আমাদের কাছে কোনো ধর্ম ছিল না, ছিল না কোনো জাত-পাত,  আনন্দটাই প্রধান ছিল। গ্রামের সবাই একসাথে আনন্দে মেতে উঠতাম।  মা বলত দেবী সরস্বতী বিদ্যার দেবী, তাঁকে ভক্তিভরে ডাকলে নাকি লেখাপড়া খুব ভালো হয়।  তাই আমি মায়ের কথা মত প্যান্ডেলে গিয়ে সবার প্রথমে দেবী সরস্বতীকে ভক্তিভরে প্রণাম করতাম। মা আরো বলতো 'মা' শব্দটি যেমন যে কোনো সন্তানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় শব্দ, ঠিক তেমন মা ও সন্তানের মিলনোৎসব হলো শারদীয়া দুর্গোৎসব।  এই উৎসব বাঙালি সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জীবনের সবচেয়ে বড় ও প্রিয় উৎসব।  
 
প্রতিবছর যে আমাদের নতুন জামা-কাপড় কেনা হত তা কিন্তু নয়, ধানের দাম মহাজন পূজার আগে ঠিকমতো মিটিয়ে দিলে সাধারণত নতুন জামা-কাপড় কেনা হত। যেবার মহাজন পূজার আগে দাম মেটাতে পারতো না, সেবার আর নতুন কিছু আমাদের কপালে জুটতো না। সেইসব বছরগুলোতে  আমাদের যে মন খারাপ হত না, তা বলব না, তবে সবকিছু ভুলে আমরা পূজার আনন্দে মেতে থাকতাম। ওই কটাদিন লেখা পড়া বন্ধ, শুধুই আনন্দ, শুধুই মজা। 


(চলবে) 



তারিখ :০৬-০৩-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 















Sunday, February 28, 2021

সহেলীর কৌতুহল (পর্ব - ২)

সহেলীর কৌতুহল

 
(পর্ব - ২)



প্রথমে তোকে আমাদের গ্রাম ও আমার ছোটবেলার কথা বলি। তাহলে তুই পল্লীগ্রামের পূজাটা  ঠিকমতো অনুভব করতে পারবি।  

আমাদের এখানে অর্থাৎ আমেরিকার প্রকৃতি বড়ই রুক্ষ, সেরকম গাছপালা  দেখা যায় না।  তালগাছের মত  সারিবদ্ধভাবে শুধু লম্বা লম্বা বাড়ির সারি।  পড়শির হাসি, পড়শির  কান্না, পড়শিদের কানে পৌঁছয় না।  রাস্তায় কোনো চেনা লোকের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে সে আগে তার ঠোঁটের ফাঁকের মাপ ঠিক করে নেয়। সে কতটা হাসবে বা কতটা কুশল বিনিময় করবে মনে মনে তার একটা হিসেবে কোষে নেয়। হাসি বা কুশল বিনিময় না করতে পারলে যেন তার পক্ষে সব থেকে ভালো হত  বলে মনে হয়। কিন্তু আমাদের দেশের লোকেদের চরিত্র  ঠিক তার বিপরীত। কুশল বিনিময় করাটা ভারতবাসীদের চরিত্রের একটা বড় গুন। 

আমার ছোটবেলা কেটেছে পল্লীগ্রামে। আমরা খুবই গরিব ছিলাম। আমাদের পরিবার কৃষিজীবি। কৃষিজীবী পরিবারের আয়টা  নির্ভর করে ধানের ফলন  ও বিক্রির উপর। মহাজনের দয়ার উপর অবশ্য কিছুটা নির্ভর করত। আমাদের জীবন, আনন্দ, উৎসব, সাহিত্য, হাসি-কান্না সবটাই ছিল পল্লীজীবনের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ। ফসল ফলানো মাঠ, অস্ত লাগা দিগন্ত, গঙ্গা ফড়িং-এর লাফালাফি, বর্ষায় গাছের পাতার ঝলমল, শাল, অশ্বত্থ, বটের মত যেমন বড় বড় গাছ ছিল, তেমন নানা রকম লতাপাতা, গুল্ফও ছিল আমাদের গ্রামে।  মাটির রাস্তা, সবুজ প্রান্তর, পুকুর-দীঘি, খড়ের চাল, মাটির দালান, গরু-মোষের গোয়াল ঘর, ছাগল চড়ানো, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ক্ষেতে  সোনার ফসল, পুকুরের মাছ, তাজা স্নিগ্ধ নির্মল বাতাস, পাখির ডাক এই ছিল আমাদের সম্বল। আমাদের বাড়িতে একটা ছোট সাদা-কালো টেলিভিশন অবশ্য ছিল। সন্ধ্যার সময় মা-কাকীমারা সেটা দেখতো। ছোটদের দেখার কোনো অনুমতি ছিল না। আমরা গাছের আম-জাম-কলা পেড়ে খেতাম। আমাদের গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ছিল আমাদের স্কুল।  এই রাস্তাটা প্রতিদিন পায়ে হেঁটে যেতে হত।  মাঝে মাঝে অবশ্য বাবার সাইকেল নিয়ে যেতাম।  আমাদের বিদ্যালয়ে  খুব ভালো লেখাপড়া হতো, খুব ভালো রেজাল্ট করতো। নিয়মিত পড়া করে স্কুলে যেতে হত, পড়া না পারলে মাস্টারমশাইদের কানমোলা বা বেতের বারি বাঁধা ছিল।  আমাদের গ্রামের থেকে কিছুটা দূরে রথের সময় একটা মেলা বসতো। ওই মেলায় আমরা মোরগের লড়াই দেখতাম, নাগরদোলা চড়তাম, সমগ্র মেলাটা বন্ধুরা একসাথে প্রতিদিন ঘুরে বেড়াতাম। ফুটবল খেলা ছিল আমাদের জীবনের অঙ্গ। এছাড়া এক্কাদোক্কা, পিট্টু, চোর-পুলিশ, লুডো এরকম কত খেলা আমরা খেলতাম। কিন্তু সন্ধ্যের আগে আমাদের বাড়ি ফিরে আসতে হতো। এই ব্যাপারটা আমাদের বাড়িতে খুব কড়াভাবে পালন করা হতো। 

 নাগরদোলার কথা মায়ের মুখে শুনেছি। কোনোদিন ওখানে গেলে নাগরদোলা চড়ার ইচ্ছে রয়েছে।  এক্কাদোক্কা, পিট্টু খেলার কথা কোনোদিন শুনিনি তবে লুডো খেলা, চোর-পুলিশ খেলার কথা শুনেছি। দাদু মোরগের লড়াইটা  কি ? ওটা তো জানি না।  

 মোরগ হল পুরুষ মুরগি। মোরগের লড়াই এক ধরনের খেলা। এতে দুই বা তার বেশি মোরগ অংশ নেয়। এই খেলোয়াড় মোরগকে তার মালিক খুব ভালোভাবে লালন-পালন ও পরিচর্যা করে। লড়াই করার উপযোগী করে তোলার জন্য তাকে রীতিমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোরগ প্রতিযোগিতায় একে-ওপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। তাদের মধ্যে চলে তুমুল লড়াই। এটা বহু প্রাচীন খেলা।   

আমাদের অবসর সময় কাটানোর জন্য তোদের মত  হোয়াটসআপ, ফেসবুক বা ইউটিউব ছিল না।  আমরা অবসর সময় খেলাধুলা বা  গল্পের বই পড়ে  কাটাতাম। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে গল্পের বই নিয়ে আসতাম। তুই হয়তো জানিস না আমাদের বাংলা সাহিত্য খুবই সমৃদ্ধশালী, বাংলা ভাষা কত মিষ্টি ভাষা।

জানি, দাদু জানি। বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে বহু কথা মায়ের মুখে শুনেছি। আমি তো কয়েকটা বাংলা গল্পের বইও পড়েছি। আমার মা বাঙালি হিসেবে যেমন গর্ব বোধ করতো তেমন  তাঁর মাতৃভাষা বাংলা বলে  খুব অহংকার ছিল। মা বলত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাদের বাংলা অক্ষর চিনিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের মাতৃভাষায় ভাবতে শিখিয়েছিলেন আর কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের প্রতিবাদের ভাষা শিখিয়েছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।  বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে ১৯৫২ সালে এগারো জন তরতাজা বাঙালি যুবক শহীদ হয়েছিলেন। ভাবা যায়, এতগুলো যুবক একটা ভাষার জন্য জীবন আহুতি দিয়েছিলেন। 

শুধু দুই বাংলা নয়, এইদিন সারা পৃথিবীতেই বাঙালিরা 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে দিনটা উদযাপন করে থাকে।  বাংলা ভাষা নিয়ে লেখা অতুলপ্রসাদের গানটা কি তুই শুনেছিস ?

কোন গানটা ?

তিনি লিখেছিলেন -
"মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।  
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা।।" 

তাই,পুরো গানটা তুমি জানোনা?

জানতাম। কিন্তু এখন আর মনে নেই।


সারা বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বের একমাত্র কবি যার কলমে দুটি দেশের জাতীয় সংগীত বাংলা ভাষায় লিখিত হয়েছে।  ইউনেস্কো বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর মিষ্টিতম ভাষার তকমা দিয়েছে বলে শুনেছি।  

জানো দাদু, কেউ যদি বাংলার সাথে ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে কথা বলে বা কোনো বাঙালি যখন বাংলা ভাষা ব্যবহার না করে অন্য বাঙালির সাথে  বিদেশী ভাষা অর্থাৎ ইংরেজি ভাষায় কথা বলে সেটা আমার মার খুব অপছন্দ ছিল।  মা সব সময়  বলতো নিজের ভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষা শেখা বা চর্চা করা কোনো দোষের নয়। তবে নিজের ভাষায় কথা বলার সময় অন্য ভাষার সংমিশ্রণ না করলেই মাতৃভাষার স্বার্থকতা। বাঙালি হয়েও বাংলায় কথা বলতে লজ্জা পাওয়া, ট্রেনে, বাসে বা আড্ডায় ইংরেজিতে কথা বলা নতুন প্রজন্মের কাছে বর্তমানে যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  জন্মসূত্রে মাতৃভূমির সঙ্গে গড়ে ওঠে মানুষের নাড়ির টান।  স্বদেশের জন্য ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মনেই জন্ম নেয় গভীর প্রীতি ও ভালোবাসা। যে ভালোবাসা অন্তর থেকে উৎসারিত হয়।  বড় হয়ে কর্মসূত্রে বা অন্য কোনো কারণে কেউ অন্য কোনো স্থানে বসবাস করলেও মাতৃভূমির মায়া সে কখনো ভুলতে পারে না।  জন্মভূমির প্রতি বা শৈশবের লীলাভূমির প্রতি মানুষের সীমাহীন আকর্ষণ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা আজীবন থেকে যায়। 

যেহেতু আমার জন্ম এই দেশে তাই  আমি বাংলার প্রতি হয়তো তোমাদের মত অতটা  টান অনুভব করি না। কিন্তু বাংলা ভাষায়  কিছু পড়তে বা বাংলা গান শুনতে আমার ভীষণ  ভালো লাগে।  

মা আরো বলতো, বাংলায় কথা বললেই কেউ বাঙালি হয় না। বাঙালি হয় চরিত্রে, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে। বাঙালির পৃথক একটা জাতিসত্তা আছে। বাঙালি হল জাতীয় সংগ্রামের চেতনাবাহী একটি জাতি।  যার আদর্শগত পুঁজি ও আবেগভাসী প্রেরণার উৎস হল রাজা রামমোহন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ, বিদ্যাসাগর  প্রভৃতি মনীষীরা।  


(চলবে)




তারিখ :২৮-০২-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 





















Sunday, February 21, 2021

সহেলীর কৌতুহল (পর্ব - ১)

সহেলীর কৌতুহল 

(পর্ব - ১)


সহেলী   দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর দিন তার বন্ধু ঋতুপর্ণার বাড়িতে এলো। ফর্সা রোগাটে চেহারায়  আজ সে হালকা রঙের একটা সুন্দর শাড়ি পড়েছে। তার সাথে রঙের সামঞ্জ্যস্য বজায় রেখে একটা ব্লাউজ পড়েছে।  চুলটা বেশ পরিপাটি করে বাঁধা রয়েছে।  সাধারণত অন্যদিন সে জিন্সের প্যান্ট ও টপ পরে আসে। কিন্তু আজ  একেবারে বাঙালি সাজে সজ্জিত হয়ে এসেছে। দেখতে তাকে  খুবই সুন্দর লাগছে। এতো সেজেগুজে আসলেও  মনটা তার একদমই ভালো নেই, খুব উতলা হয়ে আছে।   নানা প্রশ্ন তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।  সত্যি কথা বলতে, আজ সে তার বন্ধুর সাথে দেখা করতে আসেনি, সে এসেছে ঋতুর দাদু শ্যামল বাবুর সাথে গল্প করতে।  গল্পের মাধ্যমেই সে তার সব প্রশ্নগুলোর উত্তর  জেনে নেবে।  তার মনের ক্ষিদে মেটাবে।  দাদুর কাছ থেকে  সব প্রশ্নের উত্তর তাকে জানতে হবে।  সবকিছু জানতে পারলেই যেন তার মনের জ্বালা  মিটবে।  

শ্যামলবাবু অর্থাৎ শ্রী শ্যামল কুমার ঘোষ।  শ্যামলবাবু আদপে  পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মানুষ।  বর্তমানে আমেরিকাবাসী। তাঁর ছোটবেলা, লেখা-পড়া সবই কেটেছে বর্ধমান জেলা ও কলকাতাতে। তাঁদের বাড়ি বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে নবধেনু গ্রামে। জন্ম কৃষিজীবী পরিবারে।  তিনি গ্রামের স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হন।  কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।  তারপর গবেষণার কাজে আমেরিকায় চলে আসেন। সেই থেকে তিনি এখানে রয়ে গেছেন। দেখতে দেখতে তা আজ প্রায় বছর ৪০ পার হয়ে গেলো। ১৯৮০ সালে তিনি আমেরিকাতে আসেন। এখন  অবসর জীবন যাপন  করেছেন । 

সহেলী শ্যামলবাবুর কাছ থেকেই তাঁদের গ্রামের দুর্গাপুজো সম্বন্ধে জানতে চান, জানতে চান কলকাতার দুর্গাপুজো সম্বন্ধেও। সেই কারণেই আজ তার ঋতুপর্ণাদের বাড়িতে আসা। যেহেতু সে ঋতুকে না জানিয়ে এসেছে, তাই ভেবেছিল ঋতু হয়তো বাড়িতে নাও থাকতে পারে। কিন্তু  সে এসে ঋতুকে বাড়িতে পেয়ে গেলো। সামান্য কথা ঋতুর সাথে বলেই সে ছুট লাগালো দাদুর কাছে।  দাদুকে আগেই বলে রেখেছিল। দাদুও তার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঋতুকে সময় না দেওয়ায় অর্থাৎ এইভাবে ঋতুকে অবজ্ঞা করায়, ঋতু কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হলো।  সহেলী  ঘরে ঢুকেই প্রথমে দাদুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলো। দাদু বেশ অবাক হয়ে গেলো। 

তুই তো কোনোদিন প্রণাম করিস না, আজ হঠাৎ প্রণাম করলি?  

 দাদু একদিন পরেই আমাদের দেশে দুর্গাপুজো শেষ হয়ে যাবে। আসবে বিজয়া দশমী।  তাই তোমায় আগাম প্রণাম করে রাখলাম।  আজ তোমার কাছ থেকে দুর্গাপুজোর গল্প শুনবো বলেই তো আমার এখানে আসা।

 সহেলীর কথাগুলো শুনে শ্যামলবাবু বেশ অবাক হয়ে গেলেন।  ভাবতে লাগলেন দুর্গাপুজোর কথা ও  কি করে জানলো।  তিনি বললেন তুই তো কোনোদিন পশ্চিমবঙ্গে যাসনি। ভারতেও কোনোদিন যাসনি দুর্গাপুজোর কথা তুই কিভাবে জানলি ? 

দাদু, পৃথিবীটা তো এখন হাতের মুঠোয়। তুমি যা জানতে চাইবে আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় তাই অনায়াসে জানতে পারবে। 

সেটা  তো বুঝলাম কিন্তু তোর দুর্গাপুজো নিয়ে এতো আগ্রহ জন্মালো কি করে ? সেটা তো বল।  

আসলে আমি সেদিন  একটা বাংলা সিনেমা দেখছিলাম।  সিনেমাটার নামটা  ছিল "উমা"। সিনেমাটার প্রধান চরিত্রে ছিল একটা বাচ্চা বাঙালি মেয়ে, যে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করতো।  মাতৃহারা  বাচ্চা মেয়েটি মরণ রোগে আক্রান্ত। ডাক্তার মোটামুটি জবাব দিয়ে দিয়েছে। মেয়েটির মনোবাঞ্ছা  ছিল সে কলকাতায় গিয়ে সেখানকার দুর্গাপুজো অর্থাৎ বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসবটি নিজের চোখে দেখবে। মেয়েটির বাবা তার স্বপ্নপুরণের জন্য কলকাতায় অকালে একটা নকল দুর্গাপুজোর আয়োজন করলো। ছবিটা ছিল ভীষণ ইমোশনাল মুভি। ছবিটার শেষটা দেখে আমি আর থাকতে পারিনি, চোখে জল এসে গিয়েছিলো। মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ছবিটাতে পাঁচদিন ধরে চলা একটা দুৰ্গোৎসবকে দেখানো হয়েছিল। ওখানে যেমন বহুরকম নিয়ম-নিষ্ঠা দেখানো হয়েছিল তেমন  মানুষদের উচ্ছাস ও উদ্দীপনাও  দেখানো হয়েছিল।  সেই পুজোয় উমা খুব আনন্দ করে, সে খুবই উপভোগ করে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না।  অচিরেই তাকে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়তে হয়। এই সিনেমাটা আমায় ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়।  আমি ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছে  দুর্গাপুজোর  গল্প বহুবার শুনেছি।  মা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন নানারকম গল্পের মধ্যে কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলের কথা, দুর্গাপুজোর কথা মাঝে মাঝেই উঠে আসতো।  বিশেষ করে মায়ের মামাবাড়ি টাকির জমিদারদের দুর্গাপুজো ও ভাসানের কথা বলতো।  দেবী দূর্গা ও মা কালী ছিল মায়ের পরম ভক্তির জায়গা। 

দুর্গাপুজো বাঙালিদের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব অথচ আমি বাঙালি হয়ে কোনোদিন এই উৎসবে সামিল হতে পারিনি।  শুধু তাই নয়, কোনোদিন দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।  সিনেমাতে বাচ্চা মেয়েটির দুর্গাপুজো নিয়ে যে আবেগ, যে উচ্ছাস দেখলাম, তা আমায় কলকাতার দুর্গাপুজো দেখার ইচ্ছে আরো বাড়িয়ে দিলো।  দেবী দূর্গা ও তাঁকে কেন্দ্র করে যে  উৎসব তা জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিল। খুব ইচ্ছে করে, একবার ওখানে গিয়ে নিজেদের দেশটাকে দেখে আসতে।যে দেশে জন্ম নিয়েছে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, নেতাজির মতো মহান ব্যক্তিত্বরা সে দেশ দেখার জন্য আমার মনটা ব্যাকুল  হয়ে আছে।  

আমি তাই তোমার কাছে কলকাতার দুর্গাপূজা ও তোমাদের পল্লীগ্রামের দুর্গাপুজোর কথা যেমন জানতে চাই তেমন দূর্গাপুজো নিয়ে আমাদের শাস্ত্রে যা বলা আছে সেগুলোও জানতে সমান আগ্রহী। তুমি আমায় সবটা জানাবে। কোনো রকম ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবে না। 

আমি সবকিছু তো জানি না, তবে আমার যতটুকু জানা রয়েছে তোকে নিশ্চয়ই তা জানাবো।  ফাঁকি দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। তবে আরো অনেক কিছু আছে যা আমার জানা নেই।   আমি তো বহু বছর ওখানকার পুজোতে যাইনি তাই  বর্তমানে  ওখানকার পুজোর পরিবেশ তোকে হয়তো  ঠিক ভাবে বলতে পারবো না।  


(চলবে )


তারিখ :২১-০২-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Wednesday, February 3, 2021

বড়বাজারের পুঁটে কালী >P

বড়বাজারের পুঁটে কালী 





কলকাতার সঙ্গে দেবী কালিমাতার সম্পর্ক বহুদিন এবং তা খুবই ঘনিষ্ঠ। সবাই বলে থাকে,  দক্ষিণ কলকাতার শক্তিপীঠ কালীঘাট থেকেই শহরের গৌরবের শুরু।কালীঘাটের এই মন্দিরটি ছাড়া শহরের বহু জায়গায় বহু কালী মন্দির প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সেই সব মন্দিরে কোথাও  ডাকাত কালী, কোথাও  আদ্যা  কালী, কোথাও শ্মশান কালী আবার কোথাও  সিদ্ধেশ্বরী কালীর প্রতিমা বিরাজমান। রঘু ডাকাত, মনোহর ডাকাত ও চিতু ডাকাতের কালীপূজার গল্প সবার কাছে খুবই পরিচিত। কালীঘাটের মন্দির ছাড়াও  নিমতলার  আনন্দময়ী, বৌবাজারের ফিরিঙ্গি কালী,   বড়বাজারের পুঁটে কালী, বাগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী, টালিগঞ্জের করুণাময়ী এরকম বেশ  কয়েকটি  বিখ্যাত  কালী প্রতিমার স্থায়ী মন্দির আমাদের শহরে  রয়েছে। আমরা জানি যে ডাকাত ও তান্ত্রিকদের হাত থেকে দেবী কালীকে সর্বজনীন করে তুলেছিলেন শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।  যদিও তাঁর আরাধনার স্থল কলকাতায় ছিল না, তা ছিল  দক্ষিণেশ্বরে। 

শহরের বড়বাজার অঞ্চলটি ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্য।  এই অঞ্চলের পোস্তার  কাছে ২০ নম্বর কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রিটে রাস্তার উপরে একটি ছোট কালী মন্দির রয়েছে।  মন্দিরটি খুবই প্রাচীন। মন্দিরটি হল পুঁটে কালী মন্দির।  মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবী মূর্তিটির উচ্চতা মাত্র ছয় ইঞ্চি। পুঁটে কালী মূর্তিটি খুবই  ছোট, তাই সকলে এটিকে পুঁটে কালী বলে ডাকে। কিন্তু ভিন্ন আর একটা  ইতিহাস প্রসিদ্ধ কাহিনী রয়েছে।  খেলারাম বন্দ্যোপাধ্যায় নামক একজন তন্ত্রসাধক ছিলেন। কোনো এক সময় মন্দির লাগোয়া একটা খাল ছিল।  খালটি দিয়ে গঙ্গার ধারা বয়ে যেত।  তন্ত্রসাধক খেলারাম একদিন মন্দিরের সামনে বসে হোমযজ্ঞ করছিলেন।  সেই সময় খালটি থেকে একটা পুঁটি মাছ হঠাৎ লাফিয়ে এসে হোমাগ্নিতে পড়ে।  সাধক হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় প্রথমে  চমকে ওঠেন।  তিনি পরে পোড়া মাছটিকে হোমের  আগুন থেকে তুলে খালের জলে ফেলে দেন।  দেবীর কৃপায় অলৌকিকভাবে মাছটি তার প্রাণ ফিরে পায়। সেই  থেকে এই দেবী মূর্তি পুঁটি কালী বলে পরিচিতি পায়।  পরবর্তী সময় লোকমুখে প্রচার হতে হতে পুঁটি হয়ে যায় পুঁটে।  

হুগলীর ভরশুট গ্রামের বাসিন্দা মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক তন্ত্রসাধক।  তাঁকে সবাই 'রাজামানিক' নামে ডাকতো। ৯৬৪ সাল।  তখন সম্রাট আকবরের শাসন। এই সময় পঞ্চমুন্ডীর আসন পেতে তন্ত্রসাধক মানিকচন্দ্র একটি কালী মন্দির নির্মাণ করেন।  মন্দিরটি লম্বাকৃত ও তিনচালা বিশিষ্ট ছিল।  মন্দিরে অধিষ্ঠাত্রী শিলাময়ী বিগ্রহ ছিল।  এই মানিকচন্দ্রের উত্তর পুরুষ ছিলেন খেলারাম।  


বর্তমান মন্দিরের তিনটি চুড়াবিশিষ্ট। চক্র, ত্রিশূল ও পতাকা গাঁথা রয়েছে চূড়াগুলিতে। মন্দিরটির ভিতরে বর্তমানে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ রয়েছে। এই বিগ্রহটি পরবর্তী সময় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পূর্বের বিগ্রহটিকে বর্তমানে আর দেখা যায় না।  বর্তমান মন্দিরটি ১৯৫৮ সালে স্থাপিত হয়েছিল। অতীতকাল থেকেই নিত্যপূজা হয়ে আসছে। দেবীকে এখানে তন্ত্রমতে পূজা করা হয়। কালীপূজার দিন বিশেষ পূজার ব্যবস্থা করা হয়।  কালীপূজার রাতে দেবীকে স্বর্ণবেশে ভৈরবীরূপে পূজা করা হয়ে থাকে। কালী পূজার  পরের দিন কুমারীপূজা ও অন্নকূট উৎসব পালন করা হয়।  আমিষ ও নিরামিষ দুরকমের ভোগ মাকে নৈবেদ্য হিসেবে  নিবেদন করা হয়। নিরামিষ ভোগের  মধ্যে খিচুড়ি, পোলাও, লুচি, দুরকমের সবজি, চাটনি ও পায়েস থাকে।  আমিষ ভোগের  মধ্যে নিরামিষ পদগুলোর সাথে পুঁটি, রুই, বোয়াল, ভেটকি ও ইলিশ এই পাঁচ রকমের মাছ থাকে। বিশেষ উপাচার হিসেবে খাস্তা কচুরি আর চানাচুর থাকে। খেলারামের পরিবারই এখনও এখানকার সেবাকার্যে যুক্ত রয়েছে। কালী মূর্তির পাশে একটি শ্বেতপাথরের শীতলা  মূর্তিও রয়েছে।  এখানকার দেবী মূর্তি খুবই জাগ্রত হিসেবে পরিচিত। 










তারিখ :০৩-০২-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০





➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




      


Sunday, January 24, 2021

ফিরিঙ্গি কালী মন্দির >P

ফিরিঙ্গি কালী মন্দির 





বাঙালির কালী পুজোর ইতিহাস বহু  প্রাচীন। যদিও দুর্গাপুজোর মতোই কালী পুজো  ঠিক কবে থেকে প্রচলন হয়েছিল তা নির্ভুলভাবে বলা খুব কঠিন।  বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের  দ্বারা অনুমান করা হয়ে থাকে যে দুর্গাপুজোর পূর্বেই কালিপূজার প্রচলন হয়েছিল।  কালীক্ষেত্র হিসেবে শহর কলকাতার পরিচিতি বহু শতক পূর্বেই ঘটেছিলো। "কালী-কোলকাত্তাওয়ালী" এই প্রাচীন প্রবাদটি থেকে শহরের সাথে দেবী কালির সম্পর্কের প্রাচীনতা  অনুমান করা যেতে পারে।  বর্তমানে শহরের অলিতে-গলিতে বহু কালী মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

  



 মধ্য কলকাতার বৌবাজার অঞ্চলে একটা বহু প্রাচীন কালী মন্দির রয়েছে।  যার পোশাকি নাম  শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির কিন্তু লোকমুখে প্রচারিত ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি।  মন্দিরটি বিপিন বিহারি গাঙ্গুলি স্ট্রিট ও সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের জংশনে অবস্থিত। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী মন্দিরটি ৫০০ বছর অতিক্রম করে গেছে। এই মন্দিরটিতে শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতার মূর্তি রয়েছে। মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত পঞ্চমুন্ডি আসনে। ফিরিঙ্গি কালী বা সিদ্ধেশ্বরী কালিমন্দিরটি দক্ষিণমুখী।  দেবীমূর্তিটি সিমেন্ট ও মাটি দিয়ে নির্মিত।  দেবী এখানে চতুর্ভূজা ও ত্রিনয়নী।  মূর্তির উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট।  পায়ের নিচে শিব মূর্তি বিরাজমান। মূর্তিটির  দক্ষিণদিকে একটি অষ্টধাতু নির্মিত দুর্গামূর্তি রয়েছে।  এছাড়া দেবী শীতলা  ও দেবী মনসার মূর্তিও মন্দিরটিতে রয়েছে। এখানকার দেবী খুবই জাগ্রত। সেই সময় কোম্পানির ইংরেজরাও এখানে পূজা দিতেন। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ সেই প্রাচীন কাল থেকেই এখানে পূজা দিতে আসেন।  ১৮২০ থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত মন্দিরের পূজারী হিসেবে ছিলেন  শ্ৰীমন্ত পন্ডিত।  মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা সম্বন্ধে  কিছু জানা যায় না। 




এখানে চাল, মিষ্টি ও ফল দিয়ে মায়ের নিত্যপূজা হয়।  প্রতি মাসে দুবার বিশেষ অন্নভোগ দেওয়া হয়।  মন্দিরে প্রতি অমাবস্যায়  কালী ও প্রতি পূর্ণিমায় নারায়ণের পূজা হয়।  কার্তিকী কালীপূজা ও শারদীযা দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।  এই বিশেষ পুজোগুলোতে মায়ের ভোগে সাধারণত থাকে খিচুড়ি, পোলাও, পাঁচ রকমের সবজি, ভাজা, আলুরদম বা ফুলকপির তরকারি, আমসত্ব ও খেজুর অথবা আমস্বত্ব ও আলুবখরা কিসমিসের চাটনি থাকে। আখ, চালকুমড়া ও শশা বলি দেওয়া হয়।   

১৪৯৭ সাল।  জোব চার্ণকের  পদধূলি তখনও কলকাতার মাটিতে পড়েনি। কলকাতা তখন মহানগরী নয়। একটা গন্ড গ্রাম।   আজকের সেন্ট্রাল এভেনিউ দিয়ে তখন গঙ্গা বয়ে যেত। একটা নির্জন এলাকা। পাশেই  ছিল অরণ্য। তখন সেখানে ছিল সাপখোপ ও হিংস্র পশুর বিচরণ ভূমি।   এই অরণ্যতে ছিল একটা শ্মশান। শ্মশানে ছিল একটা চলা ঘর।  এই ঘরের মধ্যে ছিল একটা কালী মূর্তি।  ফিরিঙ্গি সাহেবরা এই নির্জন এলাকাতে বসবাস করতেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন কালীভক্ত কবিয়াল। উনিশ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত হ্যান্সম্যান এন্টোনি নামে একজন বসবাস করতেন। এন্টোনি সাহেব ওই চালা ঘরে শ্মশানকালীর কাছে নিয়মিত আসতেন।  সেখানে মায়ের কাছে বসে তিনি মায়ের পূজাপাঠ করতেন।  মাকে  একটার পর একটা গান শোনাতেন বলেও  কথিত রয়েছে।  তিনি ছিলেন সেইসময় বাংলার দাপুটে কবিয়াল। তিনি দিনরাত ডুবে থাকতেন হিন্দু ধর্ম ও বাংলার সংস্কৃতিতে। তাঁর ও ভোলা ময়রার গানের লড়াই ছিল খুবই বিখ্যাত। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে বহু স্রোত। অঞ্চলটি আজ কলকাতা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। বিভিন্ন লোকগাথা ও এন্টোনি ফিরিঙ্গির গল্পকথা নিয়ে শহরের বৌবাজার এলাকার এই প্রাচীন মন্দিরটি আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

তারিখ : ২৪-০১-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Friday, January 1, 2021

কল্পতরু উৎসব >P

কল্পতরু উৎসব 





ইংরেজি বছরের প্রথম দিন বাঙালিরা যেমন নতুন বছর পালন করে ঠিক তেমন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ  পরমহংসদেবের   অনুগামীরা দিনটিকে 'কল্পতরু দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে।  বিশেষত কাশীপুর উদ্যানবাটী ও রামকৃষ্ণ মহাশ্মশান, দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির, বেলুড়মঠ,  আদ্যাপীঠ সহ ঠাকুরের নামাঙ্কিত বেশ কিছু পীঠস্থানে এই দিন নানা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।   
 

 এই দিনই কল্পতরু উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে এখানে ভক্তদের ঢল নামতে দেখা যায়।  দক্ষিনেশ্বর কালী মন্দিরে ও হুগলির কামারপুকুরে ঠাকুরের জন্মস্থানেও বহু ভক্তের  সমাগম হয়।  এছাড়া   রামকৃষ্ণ মিশনের বিভিন্ন শাখায় প্রতিবছর  ইংরেজি বছরের প্রথম দিনটি খুব ঘটা  করে কল্পতরু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 

এখন প্রশ্ন হলো কল্পতরু উৎসবটি কি।  আজ থেকে বছর ৭৪ পূর্বে  অর্থাৎ ১লা জানুয়ারি ১৮৮৬   সালে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব  কল্পতরু রূপে ভক্তদের দেখা দিয়েছিলেন। তাঁর অনুগামীদের জীবনে  অভূতপূর্ব  তাৎপর্যপূর্ণ একটি  ঘটনা।  শুক্রবার ১১ই  ডিসেম্বর, ১৮৮৫ সালে ঠাকুর শুক্লা পঞ্চমীতে শ্যামপুকুর বাটি  থেকে কাশীপুরের বাগান বাড়িতে বসবাস করতে এসেছিলেন। তখন তিনি খুবই অসুস্থ।ঠাকুর সেই সময় দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।  তাঁর গলায় ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। তবুও শয়নে-স্বপনে তিনি ভক্তদের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন।   তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল। কলকাতার উত্তরের কাশীপুর অঞ্চলে একটা বাগানবাড়িতে তখন ঠাকুরকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই দিন ঠাকুর একটু সুস্থ বোধ করায়  তাঁকে বাড়িটির বাগানে হাঁটতে  নিয়ে আসা হয়েছিল।  সেই সময় তিনি তাঁর বিশেষ অনুগামী নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষকে জিজ্ঞাসা করেন "তোমার কি মনে হয় আমি কে?" গিরিশচন্দ্র তাঁকে বলেন তিনি বিশ্বাস করেন যে "মানবকল্যাণের জন্য মর্তে অবতীর্ণ ঈশ্বরের অবতার।" ঠাকুর গিরিশের কথা শুনে বলেন "আমি আর কি বলবো?  তোমাদের চৈতন্য হোক।" এর পর তিনি সমাধিস্থ হন এবং তার সমস্ত শিষ্যদের স্পর্শ করেন।  তাঁর অনুগামীরা মনে করেন এই স্পর্শে সেদিন সমস্ত অনুগামীদের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল।  ঠাকুরের অন্যতম শিষ্য রামচন্দ্র দত্ত বলেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস হিন্দু পুরাণে বর্ণিত কল্পতরুতে পরিণত হয়েছিলেন।  তিনিই এই দিনটিকে 'কল্পতরু দিবস' নামে নামাঙ্কিত করেন। পরবর্তী সময় কল্পতরু দিবসটিতে কল্পতরু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।  

ভোর বেলায় বিশেষ পূজার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়. ভোর থেকেই ভক্তদের ভিড় পরিলক্ষিত হয়।  বেলা যত বাড়ে ভক্ত সমাগম তত বৃদ্ধি পায়।  দক্ষিণেশ্বর ও কাশীপুর উদ্যানবাটীতে হাজার হাজার  ভক্তের সমাগম হতে দেখা যায়।  ভিড় সামাল দিতে প্রচুর সংখ্যায়  নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করা হয়।  ভক্তরা মনে করে এই দিন ঠাকুরের কাছে  যা মনোস্কামনা করা হবে তাই পূর্ণ হবে।  দক্ষিনেশ্বরে ভোর চারটের  সময় ভবতারিণী মন্দিরে ও রামকৃষ্ণদেবের ঘরে মঙ্গলারতির মাধ্যমে পূজা শুরু হয়।  সকালে জিলিপি ও বোঁদে প্রসাদ দেওয়া হয়।  দুপুরে ঠাকুরকে ভাত , মাছ, ও পাঁচ রকমের ভাজা ও মিষ্টি ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। কাশীপুর উদ্যানবাটীতে সকাল থেকেই মঙ্গলারটি কীর্তন ও ভোজন, বৈদিক মন্ত্রচারণ সহকারে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।  দিন দক্ষিনেশ্বর ও উদ্যানবাটী আলোক সজ্জায় সেজে ওঠে।  

তারিখ :০১-০১-২০২১

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 




      




Sunday, November 22, 2020

কলকাতার চীনা কালী মন্দির>P

কলকাতার চীনা কালী মন্দির




আমরা প্রায়ই চীনা  খাবার খেতে ট্যাংরার চায়না টাউনে  যাই, কিন্তু  ভুলেও কেউ দেখতে যাই না ওই পাড়ার বিখ্যাত চীনা কালী মন্দিরটিকে। শহরবাসীর কাছে অঞ্চলটি শুধু পানশালা ও মনোরম চাইনিজ খাবারের জন্য বিখ্যাত।  এই চীনা পাড়াতেই রয়েছে বহু প্রাচীন ও সুবিখ্যাত চীনা কালী মন্দির। এই মন্দিরে পূজিতা হন দেবী কালী, যা হিন্দুদের কাছে যেমন জাগ্রত ঠিক তেমন অঞ্চলের চীনা পরিবারগুলোর কাছেও সমানভাবে সমাদৃত। 

আমরা জানি শহর কলকাতার কাছে বজবজে প্রথম চীন দেশ থেকে টং অছি নামে  এক চীনা ভদ্রলোক একটা চিনি কল স্থাপন করেন।  তিনি তার কলে উৎপাদিত চিনি  বিক্রির উদ্দেশ্যে এই শহরে পাড়ি জমান।  চিনি শিল্পের হাত ধরে তার আগমন ঘটলেও চীনারা পরবর্তী সময়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন।  তারা বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মিলে মিশে যায়।  তারই ফলস্বরূপ এক চীনা অধিবাসী অধুনা চীনা পাড়ায়  গড়ে তোলেন এই চীন কালী মন্দিরটি। যা আজ প্রায় ষাট  বছর অতিক্রম করে গেছে।  




বছর ষাটেক পূর্বে স্থানীয় অধিবাসীরা একটি নিম  গাছের তলায় দুটি  কালো পাথরে সিঁদুর মাখিয়ে পূজা করতো। পরবর্তীকালে অঞ্চলে একজন চীনা অধিবাসী সেটিকে অনুসরণ করতে থাকেন।  তিনি জাতে ও ধর্মে ভিন্ন হলেও হিন্দু দেবতারূপে পাথরটিকে সমানভাবে মান্যতা দিতেন ও খুব নিষ্ঠা সহকারে পূজা করতেন।  ধীরে ধীরে আরো কয়েকজন চীনা অধিবাসী তাকে অনুসরণ করতে লাগলো। সব কিছু দেখে পরবর্তীকালে জনৈক চীনা ভদ্রলোক সেই গাছকে ও কালো পাথর দুটিকে নিয়ে একটি ছোট্ট মন্দির নির্মাণ করে দেন। 

 কথিত রয়েছে এক চীনা  দম্পতির সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।  তখন তারা ওই গাছের কালো পাথর দুটিকে ভক্তি ভরে আরাধনা করেছিলেন। সেই আরাধনার ফলে তাদের সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।  সেই বিশ্বাসে তাঁরা এখানকার এই মন্দিরটি নির্মাণ করে দেন ও মাটির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে দেন।  পরবর্তীকালে আবশ্য সেই মাটির মূর্তিটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুনভাবে মূর্তিকে অষ্টধাতুতে নির্মিত করা হয়েছে।  


মন্দিরে অবস্থিত রয়েছেন দেবী কালিকা  ও মহাদেব।  সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হিন্দু ধর্ম মতে এখানে নিয়মিত পুজার্চ্চনা করা হয়ে থাকে।  এখানকার দেবী আরাধনার দায়িত্বে রয়েছেন হিন্দু পুরোহিত। দীপাবলির দিন বহু চীনা ও বাঙালি ভক্তের সমাগম হতে দেখা যায়।  সকলেই পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে থাকে। এখানকার ভোগ হিন্দু  ও চাইনিজ সংস্কৃতির মিশ্রনে হয়ে থাকে। দেবীর নৈবেদ্যতে যেমন থাকে হিন্দুদের মতো খিচুড়ি, তরকারি, ফল, মিষ্টি তেমন চাউমিন ইত্যাদি কয়েকপ্রকার চাইনিজ খাবারও  থাকে। শোনা যায় মন্দিরে যে ধূপ ব্যবহার করা হয় তা চীন দেশ থেকে নিয়ে আসা হয়।  

আমাদের শহর বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র।  তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এই চীনা কালী মন্দিরটি। যা এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কলকাতার বুকে।  মা সবার, সবার তাকে আরাধনা করার অধিকার  রয়েছে। 

তারিখ : ২২-১১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Sunday, November 15, 2020

উত্তর কলকাতার গিন্নি>P


উত্তর কলকাতার গিন্নি 

- সুদীপ্ত মুখার্জী 




সনাতন ধর্ম মতে কালী বা কালিকা হলেন শক্তির দেবী।  হিন্দু দেবী।  দেবীর ওপর নাম শ্যামা। কাল শব্দিটির অর্থ হলো মৃত্যুরোধক অর্থাৎ মৃত্যুর সময় আসন্ন, বলা হয় মহাকাল এসে গেছে।  দেবীর নাম মহাকালী। শিবের ওপর নাম কাল।  কালী হচ্ছেন কাল কথাটির স্ত্রীলিঙ্গ বোধক।  কালী হচ্ছেন দেবী দুর্গার বা পার্বতীর ভয়াল রূপ।  তিনি কৃষ্ণবর্ণা ও ভয়ঙ্করা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবীর ভয়ঙ্করা রূপের পূজা করে থাকেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। তাঁর এই সংহারী রূপের পরেও আমরা তাঁকে মাতা হিসেবে সম্বোধন করে থাকি।  তিনি কল্যাণময়ী ও মঙ্গলময়ী মাতাও। তন্ত্র অনুসারে দেবী কালী হলেন দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী।  



কলকাতা শহরের উত্তর দিকের কুমারটুলি অঞ্চলটিকে  আমরা সবাই ঠাকুর তৈরির  পাড়া  হিসেবেই জানি।  কিন্তু এই পাড়াতেই  একটি বহু প্রাচীন কালী মন্দির রয়েছে। মন্দিরটি কত প্রাচীন তার কোনো হদিস আজও পাওয়া যায়নি।  আজ থেকে প্রায় ৪০০ - ৫০০ বছর পূর্বে উত্তর কলকাতার কুমারটুলি ও বাগবাজার অঞ্চলটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। তখন অঞ্চলটি সুতানুতি নাম পরিচিত ছিল। জঙ্গলের    চারদিকে বেত ও নানারকম গাছে ভরা, ঘুরে বেড়াতো ডাকাত ও ঠ্যাঙারের দল।  কোনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি।   সেই সময় উত্তর ভারতের হিমালয় থেকে  কালীবর নামাঙ্কিত এক তপস্বী সাধক স্বপ্নাদেশ পেয়ে দক্ষিণদিকে যাত্রা শুরু করেন। ভুলবশত তিনি গঙ্গার ধারে অর্থাৎ ভাগীরথীর তীরে আজকের বাগবাজার অঞ্চলে একটি মায়ের মূর্তি তৈরী করে গভীর সাধনায় নিমগ্ন হন, গড়ে তোলেন তার সাধনার পীঠ।  সাধনা করে তিনি সিদ্ধিলাভ করেন এবং মাতৃ দর্শন লাভ করেন। শোনা যায়, এই স্থানে তিনি বেত ও হোগলা পাতা দিয়ে একটি ঘরও  তৈরী করেন।  সেই ঘরে দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তাঁর সাধনার সময় ও মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় নিয়ে বহু মতান্তর রয়েছে। সেই সন্ন্যাসী  চলে যাওয়ার পর এক কাপালিক বিগ্রহটির পূজা শুরু করেন।   কথিত রয়েছে, সেই আমলে নাকি নন্দ ডাকাত নামে  এক ডাকাত এই অঞ্চলে দেবী কালির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মন্দিরটি তার আশ্রম  ছিল।  গোপবংশীয় ডাকাত নন্দরাম ঘোষ দেবী সিদ্ধেশ্বরীর সামনে নরবলি দিতেন।  ডাকাতের দলে ছিল হাড়ি, বাগদি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, মুসলমান সহ নানা রকম ধর্মের মানুষ।  দলের সকলেই মাতৃ আরাধনায় অংশ নিতো।    প্রায় প্রতিদিন ডাকাত তার মন্দিরে নরবলি দিয়ে তবে ডাকাতি করতে বেরতো। পরবর্তীকালে  ইস্ট ইন্ডিয়া  নরবলি বন্ধ করে দেয়।  পরবর্তী সময় এই অঞ্চলে তৎকালীন জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র ১৭৩০-৩১ সাল  নাগাদ একটি মন্দির নির্মাণ করে দেন। মন্দিরের চূড়া আজকের শহীদ মিনারের চেয়েও উঁচু ছিল।  ১৭৩৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সেটি ভেঙে পড়ে।  জমিদারের মন্দিরটিকে সাহেবরা "মিত্র প্যাগোডা" বা "ব্ল্যাক প্যাগোডা" বলে অভিহিত করতো। 

পরে কাঁটাপুকুর অঞ্চলের রামসন্তোষ ঘোষ নাম একজন সম্পন্ন ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এখানে এসে বসবাস শুরু করেন।  তিনি ডাকাতদলের নিত্যনৈমিত্তিক কাজে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন।  শোনা যায় , এক অমাবস্যার  রাতে দুটো বালককে বলি দেওয়ার জন্য ডাকাতদল ধরে নিয়ে এসেছিলো।  সিদিন সন্ধ্যে থেকে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতহচ্ছিল। রামসন্তোষের স্ত্রী শিবানী দেবী তার ঘরে পূজাতে বসেছিলেন সেই সময় দরজায় কেউ ধাক্কা দিতে থাকে। তিনি দরজা খুলে দেখেন সম্মুখে দুটি বালক দাঁড়িয়ে আছেন।  একটি বালক ঠক ঠক করে কাঁপছে আর একটি বালক তার পায়ে লুটিয়ে পরে আশ্রয় ভিক্ষা করছে।  বালকটি শিবানীদেবীকে বলল যদি আশ্রয় না দেওয়া হয় ডাকাতরা তাদের দুজনকে বলি দিয়ে দেবে।  কোনোক্রমে ডাকাতদের চোখ এড়িয়ে তারা পালিয়ে এসেছে।  সেই রাতে রামসন্তোষ তার স্ত্রীর কাছ থেকে সব ঘটনা শুনে পরদিন সকালে ডাকাত সর্দারকে ডেকে পাঠান। ডাকাত সর্দার নন্দ  তাকে পাত্তা দিলেন না, উপরন্তু তাকে হুমকি দিলেন। রামসন্তোষ পরদিন গ্রামের সকলকে ডেকে মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দেখলেন একটি মানুষের কাটা মুন্ডু  পড়ে  রয়েছে।  ডাকাতরা  আগেরদিন রাতে জনৈক কোনো ব্যক্তিকে বলি দিয়েছিল।  এরপরই রামসন্তোষের বাহিনী ডাকাতকে গুলি করে মারে।  তারপর থেকে অঞ্চলে উৎপাত বন্ধ হয়।   


বর্তমানে কুমারটুলি অঞ্চলে বাগবাজারের কাছে ট্রাম লাইনের পাশে  সুপ্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত। রবীন্দ্র সারণি ও মদন মোহনতলা স্ট্রিটের সংযোগস্থলে অবস্থিত মন্দিরটির  ঠিকানা হলো- ৫২০, রবীন্দ্র সারণি, কুমারটুলি, কলকাতা- ৭০০০০৫। মন্দিরটি খুবই ছোট।  রাস্তা থেকেই দেবী মূর্তি দেখা যায়।  মন্দির সংলগ্ন একটি দালান রয়েছে।  মূর্তি পশ্চিমাস্যা।  মন্দিরের বারান্দার নিচে ফুটপাতের উপরেই বলিদানের মঞ্চ রয়েছে।মন্দিরটিতে একটি  সুন্দর সিদ্ধেশ্বরী মাতার মূর্তি বিরাজিত। দেবী এখানে মৃন্ময়ী বসন ও স্বর্ণালংকারে ভূষিত। দেবীর পদতলে শ্বেত  মহাদেব শায়িত রয়েছে। প্রতিদিন নিত্যপূজা হয়। কালী পূজার দিন ও বিশেষ বিশেষ তিথিতে বেশ সমারোহে দেবী পূজিত হন। সেই সব দিনগুলোতে  এখানে প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। কালীপুজোর দিন দেবীর বিশেষ ভোগের ব্যবস্থা করা হয়।   সাধারণত তাতে  খিচুড়ি, সাদা ভাত, পাঁচ রকমের ভাজা, দুরকমের তরকারি, মাছের ঝোল, চাটনি ও পায়েস থাকে। এছাড়া নানারকম ফল ও  মিষ্টান্ন তো থাকে।  খুবই নিষ্ঠা সহকারে দেবী পূজিত হন। কার্তিকী অমাবস্যা, বুধ পূর্ণিমায় ফুলদল ও জ্যৈষ্ঠ মাসের ফোলহারিণী কালীপূজা সাড়ম্বরে পালিত হয়।  রাজা নবকৃষ্ণের নির্দেশে সেই কাল থেকে আজ মন্দিরের ভোগের জন্য শোভাবাজার বাজার থেকে সবজি আসে।  





কথিত রয়েছে শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব পরমহংসের পদধূলি এই দেবী মন্দিরে পড়েছিল। যখন কেশবচন্দ্র সেন  অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন ঠাকুর মায়ের কাছে ডাব  ও চিনি মানত করেন।  তিনি বলতেন  - "ওরে এই মা সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন, তোদের যা যা কামনা তাই তিনি পূর্ণ করতে পারেন"। একবার তিনি বসুমতি সাহিত্য মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন - "উপেন যা।  সিদ্ধেশ্বরীর কাছে মানত কর, তোর এক দরজা যেন শত দরজায় পরিণত হয়"।  নাট্য সম্রাট গিরিশ ঘোষ তার নতুন নাটক মঞ্চস্থ করার পূর্বে এখানে দেবী মূর্তির পায়ে নাটকটির পাণ্ডুলিপি ঠেকিয়ে নিয়ে যেতেন। নাটিকটিকে তিনি মায়ের পায়ে উৎসর্গ করতেন।  নাট্য সম্রাট মাকে  "উত্তর কলকাতার গিন্নি " বলে অভিহিত করে যান।  রামকৃষ্ণদেব ছাড়াও স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী সারদানন্দ প্রমুখেরা মায়ের পূজা অর্চনা করে গেছেন।  মাতা সারদা দেবীর পদধুলিও এখানে পড়েছে।  



নানান তিথিতে ও কালী পুজোর দিন ভক্ত ও ভক্তি মিলে-মিশে এক হয়ে যায়। দেবী সিদ্ধেশ্বরী সকলের  মনোবাঞ্ছা  পূরণ করেন বলে লোকের বিশ্বাস রয়েছে। দেবীর উপর মহিমায় "উত্তর কলকাতার গিন্নি" আজও মহিমান্বিত হয়ে  রয়েছেন।  


তারিখ :১৫-১১-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।