Tuesday, September 15, 2020

অতীতের ফাঁসি দেওয়ার গলিই আজ ফ্যান্সি লেন>P

অতীতের ফাঁসি  দেওয়ার গলিই আজ ফ্যান্সি  লেন  



আমাদের শহর হল এক আজব শহর।  যার পথে ঘাটে  রয়েছে রোমাঞ্চকর কত ঘটনার স্মৃতি কথা।  আজকের সুসজ্জিত কলকাতার অলিতে গলিতে লুকিয়ে আছে কত ইতিহাস। এই সব ইতিহাসের অনেকটাই আজও উদ্ধার হয়নি। পুরোনো কলকাতার ইতিবৃত্তের বহু উপাদান আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।  সেইসব ইতিহাস যে সবসময় গর্বের ইতিহাস, তা নয়।  বহু বেদনাদায়ক গ্লানিময় ইতিহাসও  রচিত হয়ে আছে।  আজ সেইরকম এক গলির কথা বলব।  

 ইংরেজিতে ফ্যান্সি শব্দটির অর্থ সৌখিন বা রুচি, তার সাথে জড়িয়ে রয়েছে একটা সৌখিনতার প্রলেপ।  কিন্তু আজ যে ফ্যান্সি কথাটির কথা বলবো তা হল শহর কলকাতার এক বেদনার অধ্যাযের  সাথে জড়িয়ে রয়েছে।  ফাঁসি শব্দটির সাথে ভারতবাসীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সমযে পরিচয় ঘটে।   সেইসময় ফাঁসির মঞ্চেই কত বিপ্লবের জয়গান রচিত হয়েছিল। এই ফাঁসি জেলের অন্দরে দেওয়া হত।

  তবে প্রকাশ্য দিবালোকে অপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হত।  সেই প্রকাশ্য ফাঁসির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে  আমাদের শহরের একটি গলি।  গলিটির নাম ফ্যান্সি লেন।   সেদিনের সেই ফাঁকা জায়গা আর বর্তমানে নেই।  আজ গলিটিকে খুঁজতে হলে বহু সুউচ্চ আধুনিক ভবনের দেওয়ালে ধাক্কা খেতে হবে।  বহু লেন বহু পথ পেড়িয়ে তবে আজকের এই গলিটির সন্ধান মিলবে। কলকাতার ওয়েলেসলি প্লেস থেকে কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট পর্যন্ত রাস্তাটি বিস্তারিত।  এককালে এই রাস্তাটিতেই ফাঁসির দঁড়িতে জীবন দিতে হয়েছিল স্বাধীনচেতা ইংরেজ বিদ্রোহী মানুষদের,  অবাধ্য নীলচাষীদের।  এই ফাঁসি দেওয়ার গলির নামকরণ হয় ফাঁসি লেন।  যখন  ফাঁসি দেওয়া হত তখন অবশ্য এখানে কোনো রাস্তা ছিল না। 

 ১৬৯০ সালে জোব চার্ণক শহরে পদার্পণ করেন। তখনকার ভৌগোলিক অবস্থান আজকের মতো একদমই ছিল না।  বৈঠকখানা সংলগ্ন সার্কুলার রোড  ছিল তখন খাল বা পরিখা।  এই খালটি বর্গীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য খনন করা হয়েছিল। খালটি বাগবাজার থেকে শুরু করে বৈঠকখানার পাশ দিয়ে গিয়ে চক্রাকারে খিদিরপুরের আদি গঙ্গায় মিশেছিল। শিয়ালদহ অঞ্চলে এই খাল থেকে আর একটা খাল বেরিয়েছিল, যা ক্রিক রো, ওয়েলিংটন স্কোয়ার, বেন্টিক স্ট্রিট হয়ে অধুনা ফ্যান্সি লেনের  পাশ দিয়ে গঙ্গায় মিশেছিল।  জোব  চার্নক এই খালের উপর একটা উপবন্দর তৈরী করেন। তখন বন্দরটি  ছিল বাগবাজার অঞ্চলে।  গঙ্গার সাথে খালটির যোগ থাকায় সকাল থেকেই বহু পণ্য বোঝাই নৌকো বাগবাজারে ও বৈঠকখানায় ভিড় জমাতো।  চলতো রমরমা বাণিজ্য।  বর্গীদের হামলা, লুঠতরাজ, খুন  খারাপি অবাধে চলতো। ব্যবসাদারা  ভয়ে জলপথে বাণিজ্য বন্ধ করে দিল।  এই বর্গী হাঙ্গামাযা শুধু ব্যবসাদার কেন সাধারণ মানুষও ছিল জর্জরিত। জোব  চার্ণক সকলের সুবিধার জন্য ও ব্যবসাদারদের বাণিজ্য যাতে অবাধে চলতে পারে সেই কারণে একদল সশস্ত্র রক্ষীদল গঠন করলেন এবং তারা খাল  বরাবর বাগবাজার থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত জলপথটিতে টহল দিত।  একদিন এই সশস্ত্র রক্ষীদের হাতে এক পর্তুগিজ দস্যু সর্দার ধরা পরে।  সে যেমন বহু অর্থ ও পণ্য লুঠ করেছে তেমন বহু মানুষকে খুনও করেছে। দস্যু সর্দারকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করে কারাগারে বন্দি করা হয়, কিন্তু সে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যায়।  পালাবার সময সে এক ফিরিঙ্গি মহিলার সামনে পরে।   সে ধরা পড়ার ভয়ে মহিলাটিকে  গলা টিপে মেরে ফেলে।  এই ঘটনায়   চারদিকে আবার হৈচৈ পরে যায়।  ব্যবসায়ীরা আবার আতঙ্কিত  হয়ে পরে।   সশস্ত্র বাহিনী দস্যু সর্দারটিকে খুঁজে পায়নি।  এই ঘটনায়  দস্যু সর্দার জোব  চার্ণকের উপর ক্ষিপ্ত হলেন।  একদিন সে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জোবের শোবার ঘরে পৌঁছে যায়।  জোব  তখন তার বাঙালি বধূকে নিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।  দস্যুর আক্রমনে  তাদের ঘুম ভেঙে যায়।  জোব যখন দস্যুর সাথে ধস্তাধস্তি করছেন তখন তার স্ত্রী বিপদ ঘন্টা বাজিয়ে দেন।  প্রহরীরা দৌড়ে আসে এবং দস্যুকে বেঁধে ফেলে।  চার্ণক তাকে প্রাণদণ্ড দেন।  চক্রাকার পরিখার মাঝামাঝি থেকে যে খালটি ভাগিরথীতে গিয়ে মিশেছিল, সেই খালের পাশে একটা বড় গাছের নিচে ফাঁসিকাঠ তৈরী করা হয়েছিল। সেই ফাসিঁকাঠে প্রকাশ্যে দস্যু সর্দারকে ঝোলানোই হয়।  এই ঘটনার পর ওই পথে দস্যুবৃত্তি অনেকটা কমে যায়।  ফলে সেই অস্থায়ী ফাঁসির মঞ্চ গুরুত্ত্ব হারায়।  মানুষ এই মঞ্চের কথা ভুলে যায়।   

তারপর বহু বছর কেটে গেছে।  দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন।  বণিকের মানদণ্ড তখন কোম্পানির রাজদণ্ডে পরিণত হয়েছে।  ইংরেজদের মানসিকতার বদল রয়েছে।  তারা তখন শোষকে পরিণত হয়েছে।  আমাদের দেশজ সম্পদ তখন জাহাজ ভর্তি হয়ে ইংরেজ মুলুকে চলে যাচ্ছে।  তাদের অত্যাচারে মানুষ তখন নাজেহাল। বিশেষ করে তাঁতিদের  উপর বেশি পরিমানে অত্যাচারের খাড়া নেমে এসেছে।  চাষিদের  নীলচাষ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।  অবাধে চলছে তাদের  উপর দমন-পীড়ন নীতি।  কখনো  কখনো অত্যাচারিত মানুষ সহ্য করতে না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। নীলচাষে অস্বীকৃত চাষিদের  জোবের দেওয়া এই ফাঁসির সময় প্রচুর লোক দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিল, কিন্তু পরে কোম্পানি ফাঁসি দিতো লোকচক্ষুর আড়ালে।  

 পরবর্তীকালে খাল সংলগ্ন ওই ফাঁসির  মঞ্চের নির্জন এলাকায় ধীরে ধীরে লোক বসত গড়ে উঠতে লাগলো।  ফাঁসির মঞ্চের ধার ঘেসে রাস্তা তৈরী হল,  তৈরী হল বাড়ি ঘর।  ফাঁসির মঞ্চকে কেন্দ্র করেই রাস্তাটির নাম হল ফাঁসি লেন।   ইংরেজদের মুখে ফাঁসি কথাটি হয়ে যায় ফানসি ।  আজ আর নেই সেই খাল।  সেই ফাঁসিকাঠ হারিয়ে গেছে। সেই ফানসি মানেই বিবর্তনের আবহে বিবর্তিত হয়ে আজ হয়েছে  ফ্যান্সি  লেন। 

গলিটি ইংরেজ বিদ্রোহী বহু মানুষ দেশকে ভালোবেসে এখানেই ফাঁসি কাঠে ঝুলেছিল।  তারাই নিশ্চিতভাবে আমাদের বুকে স্বাধীনতার বীজ রোপন করে দিয়েছিল। 
 
আজ সেই জোব  চার্ণক নেই, নেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।  ফ্যান্সি লেনে দেখা মিলবে না কোনো  ফাঁসির মঞ্চ। কিন্তু সেই নামের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে আমি আছি, ভয়ঙ্কর হলেও আজ আমি ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছি।  


ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  

তারিখ : 15-০৯-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 









Tuesday, September 8, 2020

ষ্টার থিয়েটার - এক চলমান ইতিহাস >P

ষ্টার থিয়েটার - এক চলমান ইতিহাস 



১৮৪৪ সাল। বাংলার রঙ্গালয়ের  ইতিহাসে দুটি যুগান্তকারী ঘটনার ঘটে গিয়েছিল। শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা রাধাকান্ত দেবের পৃষ্টপোষকতায় দুটি ইংরেজি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। এই বছরেই বাগবাজার বোসপাড়ায় ২৮শে ফেব্রুয়ারি  নীলকমল ঘোষ ও রাইমনি দেবীর দ্বিতীয় পুত্র গিরিশচন্দ্র জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।  সেই সময়  শহর কলকাতায় কয়েকটি স্থানে শখের রঙ্গালয়ে চালু ছিল।  ১৯৬৭ সালে নাগাদ রাধামাধব কর, গিরিশচন্দ্র   ও ধর্মদাস সুর এরকম কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা নাট্য দল তৈরী করলেন। তখন এরকম শখের নাটকের দল তৈরী করে নাটক  মঞ্চস্থ করা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। বাগবাজারে তাঁদের শখের দলটি তৈরী হয়েছিল। তাঁদের প্রথম পালা ছিল মাইকেল মধুসূদনের "শৰ্মিষ্ঠা" নাটকটি। ১৮৬৮ সালের দূর্গা পুজার সময় দীনবন্ধু মিত্রের সামাজিক প্রহসন "সধবার একাদশী" নাটকটি  গিরিশ ঘোষের নেতৃত্বে বাগবাজার আমেচার থিয়েটারে  মঞ্চস্থ হল। তাঁদের  পরের নাটক ছিল "লীলাবতী"। "সধবার একাদশী" ও "লীলাবতী" নাটক দুটি বিদগ্ধ মহলকে মুগ্ধ করেছিল। গিরিশ ঘোষের  নাম চারদিকে  ছড়িয়ে পরেছিলো।   প্রথমদিকে শ্যামবাজারে রাজেন্দ্র লাল পালের বাড়িতে একটা রঙ্গমঞ্চ তৈরী করা হয়েছিল।  সেখানেই নাটক দুটির অভিনীত হয়েছিল।  শুরু হয়েছিল বেশ কিছু  পেশাদারী নাট্য দল।  গিরিশ ঘোষ তার কর্মজীবনে বহুবার নাট্যদল বদলেছিলেন।  গিরিশের উদ্যোগেই  ষ্টার থিয়েটার একটা নিজস্ব ঠিকানা পেয়েছিলো।  

কথিত আছে ষ্টার থিয়েটারের ভীত শক্ত করতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি একটা গুদামঘরে বসে নাটক লিখেছিলেন।  বিনোদিনী নামে নতুন প্রতিভাকে রঙ্গমঞ্চে  এনে দিয়েছিলেন। সেই সময় বাংলা থিয়েটারের রশিটি প্রতাপ চাঁদ জহুরি, গুর্মুখ রায় প্রমুখ ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল।  

১৮৮৩ সাল গিরিশ ষ্টার থিয়েটার গড়ে তুলেছিলেন। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের মালিক অবাঙালি প্রতাপ চাঁদ জহুরি। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তারই অধীনে কাজ করত গিরিশ ঘোষ ও বিনোদিনী দাসী।  থিয়েটারকে তিনি ব্যবসা হিসেবেই দেখতেন। গিরিশের তা একদমই পছন্দ ছিল না।  তিনি চেয়েছিলেন নতুন একটা থিয়েটার তৈরী করে নাটক মঞ্চস্থ করতে কিন্তু একটা মঞ্চ তৈরী করা বহু টাকার ব্যাপার।  এত টাকা সে কোথায় পাবে। এদিকে গুর্মুখ রায় নামে অল্প বয়সী এক ব্যবসায়ী গিরিশকে থিয়েটার গড়ে তোলার জন্য অর্থ প্রদান করেন। সে বিনোদিনী দাসীর প্রেমে পাগল হয়ে উঠেছিলেন। ৫০ হাজার টাকায় সে বিনোদিনীকে কিনতে চায়।  থিয়েটারের থেকে বিনোদিনীর প্রতি তাঁর  আকর্ষণ বেশি ছিল। তিনি বিনোদিনীকে একান্তে আপন করে পাওয়ার জন্য তার নামে  থিয়েটার খুলতে আগ্রহী হন।  

৫৮ বিডন স্ট্রিটে একটা ফাঁকা জায়গা ইজারায় নেন গুর্মুখ রায়।  খোলা হয় থিয়েটার। তবে বিনোদিনীর নামে  নয়।  গিরিশ যুক্তি দিয়ে বোঝান বারাঙ্গনা বিনোদিনীর নামে থিয়েটারের নামে  হলে সামাজিক বাঁধা আসবে। গিরিশের যুক্তি মেনে নাম করা হয় "ষ্টার থিয়েটার"।  ৩১শে  জুলাই ১৮৮৩ সালে গিরিশের লেখা "দক্ষযজ্ঞ" নাটক দিয়ে প্রেক্ষাগৃহটির উদ্বোধন হয়। তবে বছর কয়েক পরে গুর্মুখ রায় থিয়েটারের শর্ত ছেড়ে দেন। অমৃতলাল মিত্র, হরিপ্রসাদ বসু ও দাসুচরণ নিয়োগী প্রমুখরা মাত্র ১১ হাজার টাকায় কিনে নতুন মালিক হন।  বিনোদিনী ষ্টার থিয়েটারেই রয়ে গেলেন।  ২১শে সেপ্টেম্বর ১৮৮৪ সালে "চৈতন্যলীলা" নাটকের প্রধান অভিনেত্রী বিনোদিনী দাসীর অভিনয় দেখতে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণই পরমহংসদেব এই থিয়েটারে প্রথম এসেছিলেন। বিনোদিনীর অভিনয়ে আপলুত হয়ে তিনি তাকে আশীর্বাদ করে যান। বলেন "তোর চৈতন্য হোক" । ১৮৮৭ সাল নাগাদ বিনোদিনী রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নেন, তার বিদায়ের অল্প  কিছুদিন পরে ষ্টার থিয়েটার বন্ধ হয়ে যায়।  মালিক পক্ষ মাত্র তিরিশ হাজার টাকায়  বিক্রি করে দেয় গোপাললাল শীলকে। তিনি এমারেল্ড থিয়েটার নাম একটা নতুন দল গঠন করেন। সেটি তিনি বেশিদিন চালাতে পারেননি। ৭৫/৩ কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে প্রেক্ষাগৃহ বিক্রির টাকায় ত্রিশ কাটা  জমি কেনেন। প্রায় সবাই হাল ছেড়ে দিলেও, গিরিশ ঘোষ হাল ছাড়েননি। তিনি নাট্য জগতে থেকে গেলেন। তিনি পুরোনো দল থেকে বোনাস হিসেবে পাওয়া টাকা ও আরো কিছু টাকা জোগাড় করে গিরিশ ঘোষ ষ্টার থিয়েটারের নতুন বাড়ি তৈরির কাজে হাত দিলেন।  নতুন থিয়েটারের জন্য "নাসিরাম" নামে  একটা নতুন নাটকও  লিখলেন। ২৫শে মে ১৮৮৮ সালে এই নতুন নাটক দিয়ে ষ্টার থিয়েটারের পথচলা শুরু হল। তার কিছুদিন পরে গিরিশ এই থিয়েটারে যোগ দিলেন।  থিয়েটারটি পেশাদার মঞ্চ হিসেবে তৈরী করা হয়েছিল। পেশাদার মঞ্চ হিসেবে আজ প্রায় শতবর্ষ উত্তীর্ণ করে গেছে। এই শতাধিক বছরে প্রায় ২৫০টি নাট্য প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয়েছিল। কত খ্যাতনামা অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয় এখানে হয়েছে। শিশির ভাদুড়ী, অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উত্তমকুমার, তরুণকুমার, প্রমুখ অভিনেতা আর সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, প্রভাদেবী, সরযূবালা প্রভৃতি অভিনেত্রীর অভিনয় সমৃদ্ধ ছিল রঙ্গমঞ্চটি। 

১২ই অক্টবর  ১৯৯১ সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ষ্টার থিয়েটার  সম্পূর্ণ ভষ্মীভূত হয়ে যায়।  আগুনের লেলিহান শিখা আস্তে আস্তে গ্রাস করে নেয় গিরিশ-বিনোদিনীর আত্ম্যত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যমন্ডিত রঙ্গমঞ্চটিকে। কলকাতা পুরসভা প্রেক্ষাগৃহটিকে নতুন করে গড়ে দেয়। প্রায়  ১২৫ বছর উত্তীর্ণ ষ্টার থিয়েটারের দ্বিতীয় দফায় পথ চলা শুরু হয় ২০০৪ সালে কলকাতা পুরসভার হাত ধরে। পরিকাঠামো ও অন্যান্য কারণে এখানে নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই পুর কর্তৃপক্ষ  ঠিক করে নাটকের বদলে এখানে  সিনেমা  প্রদর্শন করা হবে।  নাটকের বদলে রূপান্তরিত হয় চলচিত্র প্রদর্শনীর প্রেক্ষাগৃহ।  


ষ্টার থিয়েটার হলো কলকাতার এক স্বনামধন্য থিয়েটার ও এক ঐতিহ্যশালী বাড়ি। এটি  বাঙালি জাতির গৌরবময় ঐতিহ্যকে বহন  চলেছে। এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গর্ব।  এটি ব্রিটিশ আমলে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঢেউ এনেছিল। অন্যন্য থিয়েটার হলগুলোর সেই সময় উপস্থিতি সত্ত্বেও ষ্টার থিয়েটার অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল।  


ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  

তারিখ : ০৮-০৯-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 



Tuesday, August 25, 2020

ইঞ্জিয়ারের নামেই সেতু >P

ইঞ্জিয়ারের নামেই সেতু 





১৯৭৪ সাল।  আগস্ট  মাসের ২ তারিখ।  শহরে ঘটে গেলো এই নৃশংস হত্যাকান্ড। নিহত হলেন ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে জন্ম নেওয়া কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের তরুণ নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞ কুমার বসু।  তখন কসবা, বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, সন্তোষপুর এই অঞ্চলগুলো ছিল আজকের মতো জনপ্লাবিত নয়,  নিছকই কিছু এপার-ওপার বাংলার মানুষের বাস। অঞ্চলগুলোকে ঠিক শহর বলা চলে না।  শহর আর এই অঞ্চলগুলোর মাঝে একটা  রেল লাইন আছে। এই লাইনটি  শহর আর মফস্বলের  মধ্যে তফাৎ গড়ে দিয়েছিল। 

যাদবপুরের পূর্বদিকে সন্তোষপুর নামে একটা জায়গা আছে. সেই সময় জায়গাটা একদম নবীন একটা পল্লী হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। এই সন্তোষপুরেই ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসের ২ তারিখে তরুণ ইঞ্জিনীযার  তার বোনের বাড়িতে এসেছিলেন। কথা বলতে বলতে ঘড়ির কাঁটা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতে পৌঁছে গিয়েছিল।  তরুণ বাড়ি যাওয়ার জন্য যাদবপুর স্টেশনে এসে পৌঁছলো। সে তখন উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর অঞ্চলে থাকতো।  ঘড়িতে তখন রাত  ৯টা  বাজে। ট্রেন আসতেই সে উঠে পড়লো। রাত অনেকটা হয়ে যাওয়ায় গাড়িটা বেশ ফাঁকাই ছিল,  কিছু পুরুষ ও  কয়েকজন মহিলা কামরাটিতে ছিল।  ট্রেনটি যাদবপুর থেকে ছেড়ে ঢাকুরিয়া স্টেশনে এসে থামলো।  এখান থেকে কয়েকজন যুবক ট্রেনটিতে উঠলো। যথাসময়ে গাড়ি ছাড়লো। যুবকগুলো গেটের ধারে  দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। গাড়ি ছাড়ার সাথে সাথে তারা স্বমূর্তি ধারণ করল।  কেউ ছোড়া, কেউ ছুরি, কেউ বন্দুক উঁচিয়ে অতর্কিতে যাত্রীদের উপর আক্রমণ করতে আরম্ভ করল। মহিলা যাত্রীদের গহনা, পুরুষ যাত্রীদের মানিব্যাগ, ঘড়ি, আংটি ছিনিয়ে নিতে লাগলো। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলো না। তারা সব কিছু তাদের হাতে তুলে দিতে লাগল।  তরুণ ইঞ্জিনীযার বিজন কুমার বসু আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। তার শরীরে তখন এক তরতাজা যুবকের রক্ত টকবগ করে ফুটছে।    তিনি প্রতিবাদে সরফ হলেন।  ছিনতাইবাজরা বালিগঞ্জ স্টেশনে নামার উদ্যোগ নিল, কিন্তু তারা নামতে পারলো না। বিজন  বাবু তাদের কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন।  তার সাথে যাত্রীদের কেউ গলা মেলালো না।  চার পাঁচজন তরুনের সাথে মাত্র একজন কি করে পেরে উঠবে। যথারীতি  তিনি একা তাদের সাথে যুজঁতে পারলেন না।  আক্রমণকারীরা ছোড়া, ছুরির আঘাতে তাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করলো। চলন্ত গাড়ি থেকে তার দেহটিকে ছুড়ে ফেলে দিলো। পরের স্টেশনে ছিনতাইবাজরা নেমে গেলো।  সবাই চুপ করে বসে রইলো, কেউ কোনো প্রতিবাদ করলো না।  

গাড়ি যথাসময়ে শেয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছলো।  প্রতক্ষ যাত্রীরা সবাই নিজেদের গা বাঁচিয়ে নেমে চলে গেল।  এতবড় ঘটনার কথা কেউ পুলিশকে জানানোর প্রয়োজনটুকু অনুভব করলো না। কেউ  জানালো না।  যে যার বাড়ির পথে রওনা দিলো। একজন মাত্র বছর ছত্রিশের  তরুণ যাদের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিল  তারা তার প্রতি সামান্যতম সৌজন্য দেখানোর কথা ভাবল না, নিজেদের পিঠ বাঁচিয়ে চলে গেলো।  

সব মানুষ সমান হয় না।  বনগাঁর বাসিন্দা  এক বয়স্ক সাধু  নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেন না। সাধু  প্রভূচরণ দাস স্বচক্ষে যা দেখেছেন তা রেল পুলিশকে জানালেন। তিনি এও বলে গেলেন তদন্তের স্বার্থে যদি কোনো প্রয়োজন হয়,  তিনি সব সময় সাহায্য করতে আসবেন। 

সেই সময় শিয়ালদহ  রেল পুলিশের সুপার ছিলেন উমাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।  তিনি সব জেনে তৎক্ষণাৎ লাশ তুলে মর্গে পাঠালেন। খবর বাতাসের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়লো। পরের দিন শহরের বহুল প্রচারিত দৈনিকগুলোতে খবরটা প্রথম পাতায় মোটা হরফে ছাপা হল।  চারদিকে সোরগোল পরে গেলো।  তরুণ যেহেতু সি আই টির  কর্মচারী ছিলেন, তাই তার কার্যালয়ের কর্মীরা এটা খুন না দুর্ঘটনা এই নিয়ে প্রশ্ন তুললো।  তদন্তের দায়িত্ব নিলেন তৎকালী সিআইডির প্রধান জে  সি তালুকদার। তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কার রায়। তার সরকার নড়ে চড়ে বসল।   তদন্ত  তার নিয়মে চলতে লাগলো।  প্রচিলত সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বেশ কয়েকদিন ধরে বিজন বসু হত্যা রহস্য জায়গা করে নিয়েছিলো।  এইভাবে তদন্ত তার নিয়মে চলতে লাগলো। কেটে গেলো বেশ কয়েকটা বছর।  কিন্তু রহস্যের কোনো কিনারা হলো না।  ধরা গেলো না ঘাতকদের। অপরাধীরা শাস্তি পেলো না। 

 বছর ৪০ আগে ১৯৭৮ সালে বালিগঞ্জ রেল স্টেশানের পাশে একটা সেতু নির্মাণ করা হল।  সেতুটির নামকরণ করা হল সাহসী তরুনের নাম। সকলের সম্মতিতে  সেতুটিকে তার নাম উৎসর্গিত করা হলো।  হত্যাকান্ড ও সেতু নির্মাণের মাঝে এই  লাইন দিয়ে বহু ট্রেন চলে গেছে। পাল্টে গেছে বাংলার সরকার। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মধু দণ্ডবতের স্ত্রী প্রমীলা দণ্ডবতে ও পশ্চিমবাংলার তৎকালীন  মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু  সেতুটির উদ্বোধন করেছিলেন। 





 লেখা :  সুদীপ্ত মুখার্জী 

তারিখ : 25  আগস্ট, ২০২০ 

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪ ২০৭৫০ 

👉 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।  পরবর্তী লেখাগুলো পেতে বগতিকে ফলো করে রাখুন।  






Saturday, August 15, 2020

ভারতের জাতীয় পতাকার সাতকাহন >P

ভারতের জাতীয় পতাকার সাতকাহন 



পতাকা হলো কোনো দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আর জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। পৃথিবীর প্রত্যেক স্বাধীন দেশের একটা করে জাতীয় পতাকা থাকে। মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় পতাকা সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য।  পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো ভারতবর্ষেরও  একটি নিজস্ব জাতীয় পতাকা রয়েছে।  

 ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ব্রিটিশ সরকার ভারতকে ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দেবে বলে ঘোষণা করে। ভারত স্বাধীনতা পায় ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট। সেই থেকে ১৫ই আগস্ট  ভারতের সর্বত্র স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় পতাকা উত্তলন করা হয়। আমরা জানি ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল।  ভারতবাসীদের তীব্র ও দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বহু সংগ্রামীর জীবনের মূল্য দিয়ে এই স্বাধীনতা আমরা লাভ করেছিলাম। স্বাধীন ভারতের একটা নিজস্ব পতাকা হওয়া  উচিত বলে সবাই মনে করলেন। ১৯৪৭ সালের ২২শে জুলাই গণপরিষদের অধিবেশনে ভারতের বর্তমান পতাকার রূপরেখাটি গৃহীত হয়েছিল।  পরবর্তী সময়ে এই পতাকাটি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয়  পতাকার মর্যাদা লাভ করেছিল।  

ভারতের জাতীয় পতাকাটি হলো আয়তাকার। পতাকাটি ত্রিবর্ণরঞ্জিত। প্রস্থ হয় দৈর্ঘ্যের  দ্বিগুন।  পতাকায় তিনটি রঙের জায়গা সমান থাকে। পতাকার কেন্দ্রে থাকে চব্বিশটি দণ্ড বিশিষ্ট নীল রঙের অশোকচক্র। এই অশোকচক্রের উপরে গেরুয়া, মাঝে সাদা আর নিচে সবুজ রং থাকে। এই তিনটি রঙের আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। উপরের গেরুয়া রংটি হল ত্যাগের প্রতীক, মাঝের সাদা রংটি হল শান্তির ও পবিত্রতার প্রতীক আর নিচের সবুজ রংটি নির্ভীকতা, জীবনধর্ম ও তারুণ্যের প্রতীক।  মাঝের সাদা অংশটিতে একটি চক্র রয়েছে।  চক্রটি হলো সম্রাট অশোকের ধর্ম চক্রের অনুকরণে নির্মিত।  এই চক্রটিতে ২৪ টি স্পোক রয়েছে।  এই ২৪ টি স্পোকও ২৪টি অর্থ বহন করে।  এই স্পোকগুলির অর্থ হল ১) ধৈর্য্য, ২) আরোগ্য, ৩) শান্তি, ৪) ত্যাগ, ৫) অনুশাসন, ৬) সেবা, ৭) ক্ষমা, ৮) মৈত্রী, ৯) বন্ধুত্ব, ১০) সংগঠন, ১১) কল্যাণ, ১২) সমৃদ্ধি, ১৩) অধিকার, ১৪) কর্তব্য, ১৫) সহকার্য্য, ১৬) ন্যায়, ১৭) নীতি, ১৮) অর্থ, ১৯) সমতা, ২০) নিয়ম, ২১) ভালোবাসা, ২২) নিরাপত্তা, ২৩) সুরক্ষা, ২৪) উদ্যোগ।   

  পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া কৃত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের স্বরাজ পতাকার ভিত্তিতেই এই পতাকাটির নকশা প্রস্তুত করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন ভারতের জাতীয় পতাকার নকশাকার।  ১৯৫০ সালে ভারতীয় সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।  ১৯৫২ সালে ভারতীয়  মানক ব্যুরো  প্রথমবার জাতীয় পতাকা উৎপাদন সংক্রান্ত বিধি নিয়ম প্রকাশ করে।  ১৯৬৮ সালের ১৭ই আগস্ট পুনরায় এই নিয়মের কিছু সংশোধন করা হয়।  নিয়ম অনুযায়ী এই পতাকা একমাত্র খাদি নামক তাঁতবস্ত্রের কাপড়ে তৈরী করা হয়। তুলো, রেশম ও উল ছাড়া অন্যকিছু কাঁচা মাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
  
ভারতের জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি নিয়ম বেঁধে দেওয়া হযেছে। ভারতীয় মানক  ব্যুরো এই পতাকা উৎপাদনের পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন স্থির করে দিয়েছে।  জাতীয় পতাকা উৎপাদনের অধিকার কেবল খাদি উন্নয়ন ও গ্রামীণ শিল্প কমিশনের হাতে রয়েছে।  এই কমিশন বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে উৎপাদনের অধিকার দিয়ে থাকে।  ২০০৯ সালে তথ্য অনুযায়ী কর্ণাটক খাদি গ্রামোদ্যোগ সংযুক্ত সংঘ জাতীয় পতাকার একমাত্র উৎপাদক।  

 ভারতের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেছিলেন বাহাদুর শাহ জাফর।  ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়।  তার পতাকার রং ছিল সবুজ।  উপরের দিকে সোনালী রঙের পদ্ম  ছিল।   এরপর ভগিনী নিবেদিতা ১৯০৫ সালে একটি লাল রঙের একটি পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। পতাকাটির চারধারে ১০৮টি শিখা  আর মাঝখানে হলুদ রঙে বজ্র ছিল। বজ্রটির বাঁদিকে "বন্দে" আর ডানদিকে "মাতরম" কথাটি লেখা ছিল।  ১৯০৭ সালে ম্যাডাম ভিকাজী রুস্তম কামা বিদেশের মাটিতে প্রথম ভারতের পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন। ১৯১৭ সালে এনি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলক একটি নতুন পতাকার কথা ভেবেছিলেন।  ১৯২১ সালে গান্ধীজি প্রথম তাঁর পতাকা নিয়ে আসেন।  এই পতাকাটির উপরদিক থেকে তিনটি রং আড়াআড়ি ভাবে তিনটি সমান ভাগে ভাগ করা ছিল।  রংগুলো সাদা, সবুজ ও লাল ছিল।  মাঝখানে একটি রেখা আঁকা ছিল।  ১৯৪৭ সালের ২২ শে  জুলাই ভারতের জাতীয় পতাকা তৈরী করা হয়েছিল।  ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট মধ্য রাত্রে গণ পরিষদের  হাতে জাতির উদ্দেশ্যে পতাকাটি তুলে দেওয়া হয়। তারপরের দিন মাঝ রাতে ১৫ই আগস্ট জওহরলাল নেহেরু ভারতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দিল্লিতে জওহরলাল নেহেরু  স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রূপে কারও ভার গ্রহণ করলেন।  মাউন্ট ব্যাটন স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল হলেন। এই দিন সর্বপ্রথম দিল্লির লালকেল্লা থেকে জাতীয় পতাকাটি উত্তোলন কর হয়।  তার সাথে প্রত্যেকটি রাজ্যের রাজধানীগুলোতেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।  দিনটিকেএ সাদা দেশে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।  সরকারি বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানি এই দিন প্রতিবছর ছুটি থাকে। বহু জায়গায় পতাকা উত্তোলনের সাথে  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।   


 লেখা :  সুদীপ্ত মুখার্জী 

তারিখ : ১৫ই আগস্ট, ২০২০ 

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪ ২০৭৫০ 

👉 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।  পরবর্তী লেখাগুলো পেতে বগতিকে ফলো করে রাখুন।  


Saturday, August 8, 2020

অস্তাচলে রবি> P

অস্তাচলে রবি 

সুদীপ্ত মুখার্জী 



নিমতলা মহাশ্মশান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাধিস্থল 






"সম্মুখে দেখছি অপরাহ্নের সূর্য শেষ বিদায়ের পথ নিচ্ছে - ভাগীরথীর গৈরিক জলপ্রবাহে উঠেছে এক করুন তাপ - আজ সমস্ত বাংলার বুকে দীর্ঘশ্বাসের ওঠা-পড়া - বাতাসে হাহাকার - বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ আর নেই।  রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের জানি, কিন্তু তিনি বাঙালির রবিঠাকুর, বাঙালির গৌরব, বাঙালির প্রাণের প্রাণ, একটি আপনজন। - আজ সূর্যকে কি বিসর্জন দিয়ে চিররাত্রির অন্ধকারের মধ্যে বাঙালি জাতি আত্মগোপন করবে - না আবার সে নবসূর্যের আলোক সভাতলে জ্যোতির সমুদ্রে স্নান করতে পারবে ? সমগ্র বাঙালির মনে এই প্রশ্ন উঠছে বার বার, আজ তাই সকলের মনে এই প্রার্থনা জেগে উঠছে, হে কবি, হে পুরাতন, হে চিরনূতন - রাত্রির অবসান ক্ষণিক হোক - আগামীকালের নবপ্রভাতে নূতনরূপে তুমি দেখা দাও, - দেখা দাও আবার হে নুতন। "  - শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র 


বৃহস্পতিবার ৭ই আগস্ট, ১৯৪১ সাল  (২২শে  শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ঘড়িতে তখন দুপুর ১২টা  বেজে গেছে হঠাৎ সকলকে শোকাতুর করে চলে গেলেন বিশ্বের কবি, বাঙালির প্রাণের কবি। ৮০ বছর ৩ মাস বয়সে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। 
 
কবি তাঁর শেষ দিনগুলোতে খুবই ভুগছিলেন।  শান্তিনিকেতনে কবিরাজি ও এলোপ্যাথি উভয় পদ্ধতিতে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু কোনো চিকিৎসাতেই তিনি সুস্থ হচ্ছিলেন না। শরীরে একটা ছোট অস্ত্রপ্রচারের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কবিগুরুর মন একদমই চাইছিলো না শেষ বয়সে এসে এই কাটা ছেঁড়া করাটা। 

মৃত্যুর সপ্তাহ দুই পূর্বে ২৫শে জুলাই কবিকে শান্তিনিকেতন থেকে অসুস্থ শরীরে চিকিৎসার সুবিধার জন্য কলকাতায় নিয়ে আসতে হয়েছিল। কবিকে ছেড়ে আসতে  হয়েছিল তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ও শান্তিনিকেতনকে।  সেদিন দুপুর ৩টা ১৫ নাগাদ তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এসে পৌঁছলেন। ৩০শে জুলাই তাঁর অস্ত্রপ্রচার হওয়ার কথা। ৩০শে জুলাই  যথাসময়ে তাঁর  অস্ত্রপ্রচার হয়। সেইদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি অসুস্থ শরীরেই একটি বড় কবিতা লিখলেন ও তাঁর স্নেহের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে একটা চিঠিও  লিখলেন।  সকাল  ১১টা  নাগাদ তাঁকে অপারেশন টেবিলে নিয়ে আসা হলো, মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যে অপেরেশনটি  শেষ হয়ে যায়। অপারেশন করলেন বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক ডাক্তার ললিত ব্যানার্জী।  অপেরেশনের পর থেকে তাঁর শরীরটা আরো ভেঙে গেলো। শরীরে তাপমাত্রা ও ভারসাম্যের হেরফের হতে লাগলো। ৬ই আগস্ট ঠাকুরবাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড়। কবির শরীর আর ডাক্তারের আয়ত্তের মধ্যে থাকছিল না। কবির তখন হিক্কা উঠছিল।  ২২শে শ্রাবণ (৭ই আগস্ট) ভোররাত্রি থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে মোটর গাড়ির  আনাগোনা চলছিল।  নিকট আত্মীয়, বন্ধু,  প্রিয়জন সব দলে দলে আসছেন। সকাল  থেকেই ভক্তরা জোড়াসাঁকোর বাড়িতে জমায়েত হতে লাগল। বেলা ১২টা নাগাদ তাঁর নিঃশ্বাস কম হতে লাগলো। শরীরের উষ্ণতা কমে আস্তে লাগল। তাঁর শরীরের তখন  আরো অবনতি হল। ধীরে ধীরে শেষের সেই সময় আসতে লাগলো। ১২টা ১০ মিনিট, কবির শেষ  নিঃশ্বাস পড়লো।  একেবারেই তা থেমে গেলো। তিনি  চির বিদায় নিলেন।  বাংলার আকাশে সেই সময় হঠাৎই যেন সূর্যাস্ত হয়ে গেলো। সূর্য্যের মতোই যিনি জ্বলজ্বলে মূর্তিতে দীপ্যমান থেকে চিরকাল জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি  তাঁর লেখনীতে সকল বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করে গেছেন, এই সেই রবি যা আজ অস্তাচলে। রবি ঠাকুর অমৃতলোকে যাত্রা করলেন।  বাইরে জনতার কোলাহল শুরু হয়ে গেলো। সবাই একবার তাদের প্রাণের গুরুদেবকে শেষবারের মত  দেখতে চায়।

রানী চন্দ্রের বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই - "গুরুদেবকে সাদা বেনারসী  জোড় পরিয়ে সাজানো হল।  কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, পাট-করা চাদর গলার নীচ থেকে পা পর্যন্ত ঝোলানো, কপালে চন্দন, গলায় গোড়ে মালা, দুপাশে রাশি রাশি শ্বেতকমল রজনীগন্ধা। বুকের ওপর রাখা হাতের মাঝে একটি পদ্মকোরক ধরিয়ে দিলাম; দেখে মনে হতে লাগল যেন রাজবেশে রাজা ঘুমোচ্ছেন রাজশয্যার উপরে। ক্ষণকালের জন্য যেন সব তন্ময় হয়ে রইলাম। একে একে  এসে প্রণাম করে যেতে লাগল নারীপুরুষে।  ব্রহ্মসংগীত হতে লাগল এক দিকে শান্তকণ্ঠে। 

ভিতরে উঠোনে নন্দদা সকাল থেকে তাঁর নিজের কাজ করে যাচ্ছিলেন। নকশা এঁকে মিস্ত্রি দিয়ে কাঠের পালঙ্ক তৈরী করালেন। গুরুদেব যে রাজার রাজা, শেষ-যাওয়াও  তিনি সেইভাবেই তো যাবেন।
 
তিনটে বাজতে হঠাৎ এক সময়ে গুরুদেবকে সব্বাই মিলে  নীচে নিয়ে গেল।  দোতলার পাথরের ঘরের পশ্চিম বারান্দা হতে দেখলাম - জনসমুদ্রের উপর দিয়ে একখানি ফুলের নৌকো নিমেষে বাইরে ভেসে চলে গেল।"

 
শোকার্ত বিহ্বল মানুষের উন্মাদনা ব্যাথার আগুনে পরিণত হল।  দিকে দিকে জমাট বাঁধা কান্নার রোল উঠতে লাগল। জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে নিমতলা পর্যন্ত সমগ্র রাস্তা  জনসমুদ্রে পরিণত হতে লাগল। সূর্যের দাবদাহে তপ্ত হয়ে ওঠা প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে চলেছে শোকাতুর মানুষের মিছিল। অচিরেই রাস্তাগুলোতে তৈরী হয়ে উঠলো জনসমুদ্র।  ধীরে ধীরে ওই জনসমুদ্র অতিক্রম করে কবিগুরুর নশ্বর দেহ বিকেল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নাগাদ  নিমতলা শ্মশানঘাটে এসে পৌঁছলো।  উপস্থিত সকলের চোখে তখন বাঁধনহারা চোখের জল। সকলেই চোখের জলে নতমুখে কবিকে চিরবিদায় জানালেন।  

আকাশবাণী কেন্দ্র পনেরো মিনিট অন্তর  কবির অন্তিম যাত্রার ধারা বিবরণ দিচ্ছিল।   বীরেন্দ্রাকৃষ্ণ ভদ্র  তার আবেগঘন  কণ্ঠে এই দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমার লেখার প্রথম স্তবকে রয়েছে  আকাশবাণী থেকে প্রচারিত কবির শেষ যাত্রার বিবরণ। এই ধারাভাষ্যটি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দেওয়া। 

চিত্র ও লেখা " সুদীপ্ত মুখার্জী 
তারিখ : ২২শে শ্রাবণ , ১৪২৭ (ইং. ০৭-০৮-২০২০)
যোগাযোগ : ৯৮৩০৪ ২০৭৫০ 



👉 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।  পরবর্তী লেখাগুলো পেতে বগতিকে ফলো করে রাখুন।  

Sunday, August 2, 2020

রাখী পূর্ণিমা ও উৎসব >P

রাখী পূর্ণিমা ও উৎসব 


বাঙালি বরাবরই উৎসব প্রিয় জাতি। তাদের রন্ধে রন্ধে বিভিন্ন উৎসব জড়িয়ে রয়েছে। কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ।  শ্রাবণ মাসের শুক্লা একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে ঝুলন পূর্ণিমার উৎসব। ঝুলন সাজিয়ে ছোটরা এই উৎসবে সামিল হয়ে থাকে। ঝুলনযাত্রা পাঁচ দিন ব্যাপী চলে। এটা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের উৎসব।  এই উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে রাখী  উৎসবের  মধ্য দিয়ে।  এই উৎসবের পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। এই উৎসব কবে কিভাবে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে।  কিছু গল্পও  প্রচলিত রয়েছে।  

এই উৎসবটা সাধারণভাবে সর্বভারতেই উদযাপিত হয়ে থাকে। হিন্দু জৈন ও শিখরা এই উৎসবে সামিল হয়।  এটি  ভাই বোনের ভালোবাসা ও শুভ কামনার উৎসব।  এই দিন দিদি বা বোনেরা দাদা বা ভাইদের হাতে রাখী নামে  পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়।  এই সুতোর মাধ্যমে তারা  একে  ওপরের কাছে সারা জীবন রক্ষা নিজেদের করার শপথ গ্রহণ করে।

 মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে যে কোন এক যুদ্ধে কৃষ্ণের হাতে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হয়, সেই সময় পাণ্ডবদের স্ত্রী দৌপদী তার শাড়ির আঁচলের কিছুটা অংশ ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেয়।  এই ঘটনায় কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে দৌপদীকে তার ভগ্নি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তিনি তাকে এর প্রতিদান দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।  বহু বছর পর যখন কৌরবরা দৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে গেলে কৃষ্ণ তার সম্মান রক্ষা  করেন।  এইভাবেই রাখীবন্ধনের প্রচলন হয়।  

কথিত রয়েছে,  দৈত্যরাজা বলি বিষ্ণুর ভক্ত ছিলেন। বিষ্ণু বৈকুন্ঠ  ছেড়ে বলি রাজ্য রক্ষা করতে আসেন। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী তার স্বামীকেফিরে পাওয়ার জন্য সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে  বলিরাজার কাছে আসেন  এবং তাঁকে তার স্বামী নিরুদ্দেশ বলে জানান। তার স্বামী যতদিন না ফিরে আসবেন ততদিন তিনি রাজার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন।  রাজা তার প্রার্থনা মনজুর করেন।  এই শ্রাবন পূর্ণিমার শুভ তিথিতে তিনি রাজার হাতে পবিত্র রাখী বেঁধে দেন।  রাজা এই রাখী বাঁধার  কারণ জানতে চাইলে তিনি রাজাকে সব খুলে বলেন। রাজা তার কথায় মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে আবার বৈকুন্ঠে ফিরে  যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।  সেই থেকে রাখীবন্ধনের উৎসব পালিত হয়।   

চিতোরের রানী কর্ণবতী মুঘল  সম্রাট হুমায়ূনকে রাখী পাঠান।  সালটা ছিল ১৫৩৫। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর  আক্রমণ করলে বিধবা রানী ভয় পেয়ে যান এবং খুব অসহায় বোধ করেন।  সেই সময়  তিনি সম্রাট কাছে সাহায্য প্রার্থী হন এবং তাকে একটি রাখী পাঠান।  রানীর পাঠানো রাখী দেখে সম্রাট অভিভূত হয়ে যান  এবং তিনি চিতোর রক্ষা  করার জন্য সৈন্য পাঠান।  তবে সম্রাট সৈন্য পাঠাতে দেরি করায়  বাহাদুর শাহ চিতোরের দুর্গ জয় করেন।  ১৫৩৫ সালের ৮ই মার্চ রানী তার সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য জোহর ব্রত পালন করেনা এবং নিজেকে আগুনে আত্মহুতি দেন। এটি মধ্য সপ্তদশ শতকের লোকগাথা হিসেবে প্রচলিত আছে।  

বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধের কারণে ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ রাখী উৎসবটি প্রচলন করেছিলেন।  উনিশ শতকে বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম পর্যায় পৌঁছেছিল। ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার সিন্ধান্ত নিয়েছিল। ১৯০৫ সালের ১৯ শে জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময় সারা ভারতের সব নেতা এই সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে আন্দোলন  শুরু করেন। কলকাতায়  রবীন্দ্রনাথ হাজার হাজার হিন্দু মুসলমান ভাই ও বোনকে আহ্বান করেছিলেন। এই আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে তিনি একে  ওপরের হাতে রাখী পরিয়ে  দিতে বলেন।  প্রতিবাদস্বরূপ উৎসব পালন করেন।  তিনি তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন। এই দিন প্রতিবাদস্বরূপ কোনো বাড়িতে উনুন জ্বালানো হয়নি।   

রাখীবন্ধন  একটি জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। দামি, কম দামি, রঙিন রাখীর নিচে ঢাকা পড়ে  যায় আমাদের দীনতা, আমাদের লজ্জাবোধ। একটা সুতোর মারফত আমরা আমাদের সব কিছু ঢেকে সৌভাতৃত্বকে সামনে তুলে আনতে চেষ্টা করি।  গড়ে তুলি সৌহার্দ্যের বন্ধন।  




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ০২-০৮-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

👉 আমার এই লেখাটি ও ছবিটি যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন।  পরবর্তী লেখাগুলো পেতে বগতিকে ফলো করে রাখুন।  





Thursday, July 30, 2020

শতবর্ষের আলোকে সরবতের দোকান>P



শতবর্ষের আলোকে  সরবতের দোকান




সেই দিন হঠাৎ একটা বইয়ের খোঁজে কলেজ স্ট্রিট-এ গিয়েছিলাম।  গ্রীষ্মের প্রখর রোদ্দুর। এ দোকান সে দোকান ঘুড়তে  ঘুড়তে  বইটা অবশ্য পেলাম। বইটা পেলে কি হবে, তার সন্ধান করতে গিয়ে আমার অবস্থা খুবই কাহিল হয়ে পড়লো।  ঘেমে নিয়ে একাকার হয়ে গেলাম। শরীরটা  একটু গাছের ছাওয়ায় স্নিগ্ধ হাওয়ায় নিরিবিলিতে একটু বিশ্রাম পেতে চাইছিলো।  কলেজ স্ট্রিটে এরকম জায়গা পাওয়া তো দুস্কর। প্রথমে কলেজ স্কোয়ারে গিয়ে একটা ছাওয়ায় বসলাম।  জায়গাটায় ছাওয়া থাকলেও রোদের ঝলকানি আর সাথে গরম হাওয়া দিচ্ছিল। সেখানে বেশিক্ষন বসা গেলো না।  সেখান থেকে উঠে পড়লাম।  এবার চললাম কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত শরবতের দোকানে। ওখানে একটু ঠান্ডা শরবত খেয়ে প্রাণটা  জুড়ানোই উদ্দ্যেশ্য। 

 ওখানে ঢুকে দেখলাম বেশ ভিড় রয়েছে, তবে কয়েকটা খালি জায়গা রয়েছে।  ওদের বিখ্যাত ডাবের শরবত দেওয়ার জন্য বললাম।  বসে বসে দোকানের ইতিহাসটা ভাবছিলাম।  কি ঐতিহ্য দোকানটির।  প্রায় একশত বছর অতিক্রান্ত  এক দোকান। ভাবা যায় একটা শরবতের দোকানের বয়স  শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে। 

১৯১৮ সাল। অবিভক্ত বাংলার বরিশাল নিবাসী নীহাররঞ্জন মজুমদার কলকাতায় এসে দোকানটি  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি নাম দেন প্যারাডাইস। প্রতিষ্ঠানটা শুধু দোকান ছিল না।  দোকানের আড়ালে চলতো স্বদেশী আন্দোলনের কাজ কর্ম। নীহারবাবু নিজে ছিলেন একজন বিপ্লবী। এখানে তখন সতীন  সেন, বাঘাযতীন এরকম বহু স্বনামধন্য বিপ্লবীদের যাতায়াত ছিল।  এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও। শরবতের আড়ালেই চলতো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গুপ্ত সমিতির কাজকর্ম। ব্রিটিশদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চলতো  অনুশীলন সমিতির কাজ। কিন্তু তা বেশিদিন চালানো যায়নি।  তাদের কাজকর্মের খবর একদিন ব্রিটিশ সরকারের নজরে চলে আসে।  তারা এসে দোকানটিকে বন্ধ করে দেয়।  বেশ কিছু বছর পর দোকানটি আবার চালু করা হয়। সালটা ছিল সম্ভবত ১৯৩৭। তবে দোকানটির নাম পরিবতর্ন করে তখন করা হলো প্যারামাউন্ট। সেই থেকে এক রয়ে গেছে দোকানের চেয়ার-টেবিল।  শরবতেরও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, তার রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ আজও বহাল রয়েছে। চাওমিন, বিরিয়ানির যুগেও  বা কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডের যুগেও দোকানটি আট  থেকে আশি সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে।  


শরবতের যে কতরকম স্বাদ হতে পারে, কত রকম বৈচিত্র হতে পারে তা এখানে না আসলে জানা যায় না।  প্রত্যেকটির স্বাদই আলাদা, একের থেকে অন্যটি  ভিন্ন। কোকা মালাই, ম্যাংগো মালাই, কেশর মালাই, রোজ  মালাই, প্যাশন ফ্রউট, পাইনাপিল মালাই, ব্যানানা  মালাই, ভ্যানিলা মালাই ইত্যাদি নানারকম স্বাদের  শরবত    পাওয়া যায়।  এছাড়া নানারকম সিরাপও পাওয়া যায়।  

এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত শরবত হলো ডাবের শরবত। এই শরবত তৈরির নিয়ম আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নীহারবাবুকে বলে গিয়েছিলেন। তিনি কিভাবে ডাবের শাঁসের সাথে সিরাপ মিশিয়ে একটা সুস্বাদু শরবত বানানো যায় তা শিখিয়ে গিয়েছিলেন। এদের এই রেসিপিটি জগৎ বিখ্যাত। ভারতীয় বিজ্ঞান আচার্যের সেই রেসিপি আজও সমান ভাবে চলে আসছে। যা একশো বছর ধরে ব্যাট করে চলেছে। শোনা যায়,  প্রতিদিনই প্রায় তার ব্যাট থেকে দু-তিন শতক রানের বন্যা বয়ে চলে। এই ডাবের শরবতের স্বাদ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের পদধূলি বারংবার পড়েছে।  

এখানকার শরবতের টানে কাজী নজরুল ইসলাম, বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা, বিশিষ্ট লেখক শঙ্খ ঘোষ, স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়, শচীন দেব বর্মন,  মহানায়ক উত্তমকুমার, মহানায়িকা সুচিত্রা সেন, সিদ্ধার্থ শংকর রায়,  থেকে বহু ভারত বিখ্যাতরা  সুস্বাদু শরবতের টানে এখানে এসেছেন। বর্তমান দোকানের মালিকের সাথে কথা হচ্ছিল এঁনারা  টিভি বা কোনো কাগজ বা পত্রিকাতে কোনোরকম বিজ্ঞাপন দেন না , শতবর্ষ ধরে এদের বিজ্ঞাপন লোকের মুখে মুখেই  চলে আসছে। 

 
বাঙালির শরবত চর্চার ইতিহাসে, খাদ্য রসিক বাঙালির রসনা তৃপ্তির ক্ষেত্রে শতাব্দী প্রাচীন দোকানটি তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।  গরমের সময়  ক্লান্ত শরীরে  এখানকার শরবতে  এক চুমুকে চমক এনে দেয়। 




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৭-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০




➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 





Tuesday, July 14, 2020

শব্দসুরের জাদুকর>P



 শব্দসুরের জাদুকর  


পঞ্চাশের দশকের প্রায় শেষের দিকে পদার্থ বিজ্ঞানের এক ছাত্র গান শুনবেন বলে একটা ভালো মিউজিক সিস্টেম কিনলেন। ছাত্রটি তখন প্রবাসে ম্যাসাচুসেটস  ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়াশোনা করছেন। এই মিউজিক সিস্টেমে গান শুনে তার মন ঠিক মতো ভরছিল না।  কোনো অডিটোরিয়ামে বসে গান শোনা আর এই মিউজিক  সিস্টেমে গান শোনার মধ্যে অনেকটাই ফারাক সে অনুভব করতে লাগল। সে এই ফারাকটাকে ভরাট করার জন্য পদার্থ বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে গবেষণা শুরু করলো। পদার্থ বিদ্যার জ্ঞানকে সূত্র করে সে নতুন মিউজিক সিস্টেম তৈরী করতে লাগলো।

এই বাঙালি ছাত্রটির নাম অমর গোপাল বোস। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসেলভেনিয়ার ফিলাডেলফিলায়।  তার মা ছিলেন আমেরিকান কিন্তু বাবা ছিলেন বাঙালি। তার বাবা ননী গোপাল বোস একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী ছিলেন।  কয়েকবার কারাবাসও করেছেন।  ১৯২০ সালে গ্রেফতারের ভয়ে তিনি আমেরিকায় পালিয়ে যান। 

অমর গোপাল বোস পেনসেলভালিয়ার অ্যাবিংটন সিনিয়র হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি ম্যাসাচুসেটস  ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ভর্তি হন।  ১৯৫০ সালের শুরুতে তিনি সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংএ স্নাতক হন।  এরপর বোস নেদারল্যান্ডের এইডোভেন এ এনভি ফিলিপস ইলেক্ট্রনিকস এর গবেষণা ল্যাবে এক বছর কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ফুলব্রাইট রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসাবে দিল্লিতে এক বছর কাটান এবং এখানেই তার হবু স্ত্রী প্রেমার সাথে পরিচয় হয় (বর্তমানে তার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে)। তিনি এমআইটি থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি সম্পন্ন করেন; তার অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ছিল নন-লিনিয়ার সিস্টেমস। 

ছোটবেলা থেকেই  তিনি খুব কৌতূহলী ছিলেন। যেকোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে তার সম্বন্ধে জানার কৌতূহল ছিল তার সহজাত গুন।  

মাত্র তের বছর বয়সেই তিনি তার প্রতিভার পরিচয় দেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  চলাকালীন সময়ে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের যোগান দিতে তিনি তার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে মেরামতের একটি ছোট  ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন। লোকের বাড়িতে গিয়ে তারা নষ্ট হয়ে যাওয়া খেলনা ট্রেন ও রেডিও সারাই করে দিতো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তার বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।  তার পরিবার খুবই অর্থকষ্টে পড়ে। তখন তিনি তার পিতা  ননী গোপালকে বললেন বিভিন্ন দোকানে গিয়ে জানিয়ে আস্তে যে তারা পুরোনো রেডিও সারাই করে।    তার পিতা  সারাদিন দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে খারাপ  হয়ে যাওয়া রেডিও সারাই করার জন্য বাড়িতে নিয়ে আসতো। স্কুল থেকে ফিরে অমর সেই রেডিওগুলো সারাই করে দিতো।  এইভাবেই সে তার পারিবারিক আর্থিক অনটনের পিতার পাশে দাঁড়ান। যুদ্ধের পর অমর রেডার টিউব ও ট্রান্সফরমার দিয়ে একটা টেলিভিশন বানিয়ে ফেলে।  তার বুৎপত্তি দেখে পিতা  তাকে আমেরিকার সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় পোড়ানোর কথা ভাবলেন। কয়েকজনের কাছ থেকে  ঋণ  নিয়ে তিনি ১৯৪৭ সালে ম্যাসাচুসেটস  ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ছেলেকে ভর্তি করে দেন।  

 স্নাতক ও পরে স্নাতকোত্তর  সম্পন্ন করার পর অমর বসু এমআইটিতে  অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। তিনি একুইস্টিকস এ তার গবেষণা নিবদ্ধ করেন এবং ফলশ্রুতিতে তিনি এমন একটি স্টিরিও  লাউড স্পীকার আবিষ্কার করেন যা ঘরের ভেতর কনসার্ট হলের মত জোরালো প্রতিধ্বনিত শব্দক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ১৯৬৪ সালে তিনি উন্নত মানের স্পিকার বানানোর জন্য একটা  প্রতিষ্ঠানা গড়ে তোলেন। অন্য দেন "বোস কর্পোরেশন"। তাঁর উদ্ভাবন রাতারাতি বাজারে আলোড়ন ফেলে দিলো।  তার নির্মিত স্পিকারটি আসলে  ছোটো ও বড়ো কয়েকটির স্পিকারের  সমষ্টি। তিনি এই সমষ্টিতে রাখলেন উফারস টুইটার্স ছাড়াও একটি সক্রিয় ইকোয়ালাইজার দিলেন।  তার ফলে হল ঘরে দুই কোনে  দুটি স্পিকার বসিয়ে দিলে কনসার্টের মতো আমেজ পাওয়া যেতে লাগলো। তার এই আবিষ্কার তাঁকে  ও তাঁর বোস কর্পোরেশনকে বড়লোক বানিয়ে দিলো।  সেই থেকে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরতম ও শ্রেষ্ঠ স্পিকার সিস্টেমগুলো তাঁর প্রতিষ্ঠানই তৈরি হতে লাগলো।

তিনি শুধু বড় বড় হল ঘর নয় বাড়িতে বসেও যাতে লোকে সুন্দর শব্দ-সুধা পান করতে পারে তার ব্যবস্থা করলেন।  বিমানে বসে শোনার জন্য একপ্রকার হেডফোন আবিষ্কার করলেন। ১৯৮০ সালে তিনি গাড়িতে বসে গান শোনার কথা চিন্তা করলেন।  অচিরেই তিনি কার সিস্টেম আবিষ্কার করে ফেললেন। বর্তমানে সারা বিশ্বেই এখন বোস করপোরেশনের অফিস ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। প্রায় সাড়ে নয় হাজার কর্মী সেখানে কাজ করেন। আমৃত্যু নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তার কাজ তিনি নিজে করেছেন। তিনি ছিলেন প্রভূত সম্পদের অধিকারী। ২০১১ সালে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি।

৮৩ বছর বয়সে ২০১২ সালের  ১২ জুলাই  এই শব্দের জাদুকর মারা যান। এই শব্দসুরের জাদুকর দুটি বিবাহ করেন তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন প্রেম আর দ্বিতীয় স্ত্রী  ছিলেন উরসুলা। তাঁর ভানু বসু ও মায়া বসু নামে এই দুটি সন্তান রয়েছে। তিনি ব্যাডমিন্টন খেলতে আর বেহালা বাজাতে খুব ভালোবাসতেন।  





ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৭-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০


➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 

Sunday, July 5, 2020

এক রূপকথার গল্প>P

 এক রূপকথার গল্প 



ধুলায় মিশে যাওয়া জীবনকে কি করে সম্মানের আসনে বসাতে হয়, তা বোধহয় একমাত্র বাঙালি মেয়ে বেবীই  জানে।  বাবুর বাড়ি বাসন মেজে যার জীবন চলতো আজ তার লেখা বই বেস্ট সেলার হয়।  নাম তার বেবী হালদার। জীবন যুদ্ধে অমানুষিক লড়াই চালিয়ে আজ সে সব কিছুকে হারিয়ে দিয়েছে। এই যুদ্ধে তাকে বার বার হোঁচট খেতে হয়েছে। চলার পথের অলিতে-গলিতে কাঁকর বিছানো পথে  তাকে বার বার হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয়েছে। এই পড়া থেকে সে শিক্ষা গ্রহণ করে আবার চলা শুরু করেছে, নিজেকে পরিপক্ক করে তুলেছে। তার জীবন সংগ্রাম যেন এক রূপকথার গল্প।  

 বেবী ১৯৭৩ সালে কাশ্মীর উপতক্যায় জন্মগ্রহণ করে। তার বাবা সেনাকর্মী ছিলেন।  মদ্যপ অবস্থায় বাবা তার মার ওপর অত্যাচার করতো।  এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার মা তাকে ও তার বোনকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে তাদের মামার বাড়িতে চলে আসে। এখানে তার মা দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ছোট্ট বেবীর জীবন সৎ বাবার সংসারে ভালোই চলছিল।  যখন সে ক্লাস সিক্সে পড়ে সেই সময় তার বাবা তাকে বিবাহ দিয়ে দেয়,  হারিয়ে যায় তার স্বাদের লেখাপড়া, হারিয়ে যায় তার শৈশব।  বিবাহের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর আর তার স্বামীর বয়স ছিল ২৬।  বিয়ের প্রথম রাত  থেকেই তার ওপর অত্যাচার শুরু হয়।  তার স্বামী তাকে রান্না করা আর সন্তান ধারণ করা ছাড়া আর কিছু ভাবতো না।  এই ভাবেই বাঙালি মেয়েটি তার জীবন অত্যাচারের মাধ্যমেই ধারণ করতে লাগলো।  তার বয়স যখন বছর কুড়ি  তখন সে তিন তিনটি সন্তানের মাতা।  ১৯৯৯ সাল তার বয়স যখন বছর পঁচিশ তখন সে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দিল্লিগামী ট্রেনে  উঠে পরে। তার  সন্তানদের পিতৃপরিচয়ের কথা তোয়াক্কা না করে স্বামীর বাড়ির চৌকাঠ ছেড়ে চলে আসে। নিজের পরিচয় সন্তানদের বড় করার ব্যাপারে মনস্থির  করে নেয়। কোথায় যাবে কি করবে কিছুই তার জানা নেই, সে চায় না তার মতো তার সন্তানদের জীবন যেন না হয়।  সে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চায়।  

দিল্লিতে এসে পরিচারিকার কাজ নেয়।  বেশ কয়েকটি বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে লাগলো।  অল্প বয়সের যুবতী নানা রকম কুপ্রস্তাবও আস্তে লাগলো। এখানে সে ঘর ঝাড় দিয়েছে, বাসন মেজেছে অর্থাৎ একজন পরিচারিকার যা কাজ সবটাই করেছে। বহুজনের কাছ থেকে ভালো ও খারাব দুরকম ব্যবহার সে পেয়েছে।সন্তানদের কথা ভেবে কোনোদিন সেভাবে প্রতিবাদ করেনি, সব কিছু মেনে নিয়েছে।    সে তার কর্তব্যে স্থির থেকে এগিয়ে যেতে লাগলো।  এই ভাবে চলতে চলতে সে একদিন অধ্যাপক প্রবোধ কুমারের বাড়িতে কাজ পেলো। বেবি তাদের বাড়িতে থেকে সব কাজ করে দেবে।  বেবির সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে প্রবোধ বাবু রাজি হলেন।  প্রবোধবাবু মুন্সি প্রেমচাঁদের নাতি ও অধ্যাপক হওয়ায় পড়াশোনার ব্যাপারে তার অগাধ আগ্রহ ছিল। তার বাড়িতে বহু রকমের বই ছিল   তিনি ধীরে ধীরে বেবীকে নিজের মেয়ের মতো ভালো বাসতে  লাগলেন।  বেবীও তাঁকে পিতার মতো সম্মান করতে লাগলো।  তাঁকে  তাতুস বলে ডাকতো। তাতুস শব্দের অর্হ পিতা।  প্রবোধবাবুর বাড়িতে কাজে ঢোকার পর বেবীর  গতানুগতিক জীবন  একটু অন্য দিকে বাঁক নেয়। জীবনের কানা গলি থেকে বেরিয়ে যেন এবার সে সঠিক গলির  সন্ধান পেল।   

 বেবী বইয়ের তাক ঝাড়পোছ করতে করতে মাঝে মাঝে কোনো বই নিয়ে পাতা ওল্টাতো। বইয়ের কিছুটা অংশ পড়তো, আবার যথাস্থানে বইটা রেখে দিতো।  এই দৃশ্য গৃহকর্তা প্রবোধবাবুর দৃষ্টি এড়ায় নি। একদিন বইয়ের তাক ঝাড়তে গিয়ে সে  তসলিমা নাসরিনের "আমার মেয়েবেলা" বইটা  পায়।  তিনি বেশ আগ্রহের সাথে বইটা পড়তে লাগল। এ যেন তারই জীবন কাহিনী লেখা রয়েছে।  প্রমথবাবু বেবীকে খাতা ও পেন্সিল এনে দিয়ে বলেন রোজ এক দু পাতা করে লিখতে।  বেবী জানতে চায় কি লিখবো। তিনি বলেন তার যা মনে হয় তাই লিখতে বা তার জীবনের কাহিনীটাও লিখতে পারে। 

কাজের অবসরে বেবী রোজ এক পাতা দু পাতা করে লিখতে শুরু করে।  ধীরে ধীরে লিখলো  তার শৈশবের কথা, তার বিবাহের কথা, তার সন্তান ধরণের কথা, তার অত্যাচারিত হওয়ার  কথা।  এই সময় বেশ কিছুদিনের জন্য গৃহকর্তা দক্ষিণ ভারতে যান, ফিরে  এসে দেখেনবেবী  ততদিনে একশো পাতা লিখে ফেলেছে। লেখাটি পরে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান।  তিনি তার বেশ কয়েকজন বন্ধুকেও লেখাটি পড়ান। সবাই একবাক্যে লেখাটির তারিফ করে। তাঁরা অনেকে এনি ফ্রাঙ্কের ডায়েরির সাথে লেখাটিকে তুলনা করেছিলেন।  

প্রবোধবাবু নিজ উদ্যোগে লেখাটিকে বইয়ের আকারে প্রকাশ করেন। বইটির নাম হয়  "আলো -আঁধারি"।  এভাবেই দু- মলাটে তিনি বেবীর জীবনকে ধরে ফেললেন।  পরবর্তী কালে এই বইটা ইংরেজিতে ও আরো ১২ টি  ভাষায় অনুবাদ হয়।  .পরে তিনি "ইসস্থ রূপান্তর" ও "ঘরে ফেরার পথ" নামে  আরো দুটি বই লিখেছেন। সব কটা বইতেই সে  তার শৈশব ও কৈশোরকে অক্ষরবৃত্তে ধরেছেন। 

হটটকের  মতোই তার জীবনের গল্প বিক্রি হতে লাগলো।  তিনটি  বই বেস্ট সেলার হয়।  বেবী হয়ে ওঠে পরিচারিকা  থেকে লেখিকা। তার চলা শুরু হয় গলি পথ থেকে রাজপথে। 



লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ :০৫-০৭-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 






Sunday, June 28, 2020

জীবন ও জীবিকা (চতুর্থ পর্ব )>P

কুমোর  



"কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি"

- কবিগুরুর লেখা এই কথাগুলো  আজ  অতীত।  আজ আর মাটি দিয়ে তৈরী হতে দেখা যায় না বাসন-পত্র বা কলসি-হাঁড়ি  অর্থাৎ মাটির তৈরী  প্রয়োজনীয় সাংসারিক  জিনিসপত্র, যা এখন আর ব্যবহার হয় না।  তার পরিবর্তে ধাতু নির্মিত সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এসে গাছে।  তাই রবীন্দ্রনাথের উক্তিটি আজ আর প্রযোজ্য নয় বলা চলে।   পৃথিবীর সভ্যতা, বিজ্ঞান, জাতির কৃষ্টি কালচাররের উন্নতি যত বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে, তত অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু পুরোনো প্রথা, ঐতিহ্য ও নিদর্শন। 

মৃৎশিল্প হলো বিশেষ এঁটেলমাটি বা কাদামাটি অথবা চিনামাটি প্রভৃতির সাহায্যে হাঁড়ি -কলসী ও বিভিন্ন রকম নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র তৈরী করে তা উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়।  যারা এই কাজটি করে থাকে তাদেরকেই কুম্ভকার বা কুমোর বা মৃৎশিল্পী বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।  প্রথমে কাদাঁমাটিকে জিনিসের প্রয়োজন অনুযায়ী একটা রূপ দিতে হয় তারপর তা  আগুনে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। পোড়ানোর পর বস্তুটি র কাঠিন্য ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায় ও একটা স্থায়ী পরিবর্ত ঘটে।  ইতিহাস বলে মানুষের প্রাচীনতম আবিষ্কারের মধ্যে একটি হল মৃৎশিল্প। শোনা যায় নব্যপ্রস্তরযুগে চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রাভেতিয়ান সভ্যতার ডলনে ভোসনিসের খ্রীষ্টপূর্ব ২৯০০০ - ২৫০০০ আব্দের ভেনাসের প্রস্তরমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল।  চীনের জিয়াংঝিতে মাটির পাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০০ আব্দের। নব্য প্রস্তরযুগের প্রথমদিকের শিল্পকর্ম জাপানের যেমন (খ্রিস্টপূর্ব ১০৫০০). রাশিয়ার সর্ব পূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০০) সব-সাহারা দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া গেছে।  




কাদামাটি দিয়ে নির্মিত মৃৎশিল্পকে তিন ভাবে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।  মাটির পাত্র, পাথুরে পাত্র ও পোর্সেলিন। এগুলো নির্মাণ করার জন্য মাটি ও তাপমাত্রার হেরফের রয়েছে।  এই শিল্পে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।  সবচেয়ে বড়  ব্যাপার হলো প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদনের সময়ে দূষণমুক্ত  করা হচ্ছে ও বিষাক্ত পদার্থকে নির্গমন করা হচ্ছে। 

পূর্বে মৃৎশিল্পীদের হাতে নিপুণভাবে তৈরী হত মাটির হাড়ি-কলসী, আবার কেউ কেউ ঘর সাজানোর পুতুল ইত্যাদি নানারকম জিনিস তৈরী করত।  সারা বছর মোটামুটিভাবে চললেও নববর্ষ, অক্ষয় তৃতীয়া, শারদোৎসব সহ অন্যান্য পূজা পার্বনের সময় এদের মাটির হাড়ি, মালসা, ছোট-বড় প্রতিমার একটা ভালো বিক্রি বরাবরই ছিল, যা  আজও  রয়েছে। 


তবে কি মৃৎশিল্পী বা কুমোর আজ আর সেভাবে দেখা যায় না। যেটুকু দেখা যায়  তারা প্রায় সবাই প্রতিমা শিল্পের সাথে যুক্ত। কিছু কিছু কুমোরকে আজও  মাটির চায়ের ভার ও কুঁজো নির্মাণ করতে দেখা যায়। আধুনিক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা যত মাটির তৈরী বিভিন্ন জিনিসের ব্যবহার কমাচ্ছি তত কুমোরদের কপাল পুড়ছে। প্রতিমা নির্মাণে আজ মৃৎশিল্পীরা তাদের মুন্সিয়ানা দেখিয়ে চলেছে।  বংশপরম্পরায় তাদের এই কাজে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়।  

ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ :২৮-০৬-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 


Sunday, March 29, 2020

মহামারী ও কোয়ারান্টাইন>P

মহামারী ও কোয়ারান্টাইন

'মহামারী' এই শব্দটা শুনলেই মানুষ ভীত হয়ে ওঠে।  শব্দটি সত্যিই ভয়াবহ। সাধারণত কোনো সংক্রমণ রোগ দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে কোন দেশের জনসংখ্যার এই বৃহৎ সংখ্যক লোকের মধ্যে সংক্রমিত হয় তাকেই 'মহামারী' বলা হয়ে থাকে।  মহামারীর ভয়াবহতা বারবার বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।  আমাদের কল্লোলিনী কলকাতাকেও একাধিকবার ছিন্ন-ভিন্ন করেছে।  অষ্টাদশ-উনিশ শতকে কলকাতায় প্রায় প্রতিবছর মহামারী লেগে থাকতো।  সাবেক কলকাতায় প্লেগ, আমাশা, কলেরায় বহু সাহেবকে আমরা মারা যেতে দেখেছি।  সেই আমলের পত্র-পত্রিকাগুলোতে সেইসব বিবরণ ছাপার অক্ষরে বের হতো।  পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাবো মহামারী কিন্তু ঘুরে ঘুরে দেখা দেয়।  ২০২০ সালের প্রথম থেকেই 'কোভিড -১৯' নামাঙ্কিত এক ভাইরাস ধীরে  ধীরে পৃথবীর বুকে থাবা বসিয়ে চলেছে।  গোটা বিশ্বই কম বেশি সংক্রমিত।  ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে বহু মানুষের। ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। মহামারী প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় অতীতের কিছু ঘটনার কথা।  অসুখ থেকে দূরে রাখার তারিকাটি অর্থাৎ কোয়ারান্টিনে পাঠানোর ইতিহাসটি দীর্ঘদিনের।  এই পদ্ধতি নানা দেশে নানা সময়ে কাজে লাগতে দেখা গেছে।

১৩৪০ সাল।  মধ্য এশিয়া থেকে সিল্ক রুট ধরে ক্রিমিয়া হয়ে এক ভয়ঙ্কর রোগ ইউরোপে হানা দিল।  লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে মারা যেতে লাগলো।  রোগটির নাম 'বিউবোনিক প্লেগ', কিন্তু লোকেরা রোগটির  'ব্ল্যাক ডেথ' নাম দিল। দশকে পর  দশকে রোগটি ইউরোপে বার বার ফিরে আসতো। ১৩৭০ সালেও রোগটি এসেছিল। ১৩৭৩ সালে ভেনিসের কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছিল তাদের বন্দরে যেসব জাহাজ ভিড়বে সেইসব জাহাজে যদি কোন প্লেগ আক্রান্ত রুগী থাকে, তাকে ভেনিসে ঢোকার আগেই একটা দ্বীপে চল্লিশ দিন অপেক্ষা করতে হবে।  তারপর তাকে শহরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে।

১৭৯৩ সাল।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে এক ধরণের জ্বর দেখা দিল। এই জ্বরে শহরের মোট জনসংখ্যার  প্রায় দশ শতাংশ লোক মারা যায়।  জ্বরটির নাম 'ইয়োলো ফিভার'।  কারো কারো মতে এটা মশা বাহিত রোগ আবার কারো কারো মতে নাবিকদের থেকেই রোগটি ছড়াচ্ছে। ১৭৯৯ সালে স্থানীয় প্রশাসন ঠিক করলো শহরের বাইরে একটা বিশাল 'কোয়ারেন্টাইন সেন্টার' নির্মাণ করবে।  শহরে আসা জাহাজে যদি কেউ অসুস্থ থাকে প্রথমেই তাকে ওই সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

১৮৯২ সাল।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের এলিস আইল্যান্ডে রাশিয়া থেকে ইহুদিদের একটা জাহাজ এসে ভিড়েছিল।  জাহাজটিতে প্রায় জনা  সত্তর যাত্রী ছিল।  দেখা গেলো দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার ফলে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ফলে জাহাজটির বেশিরভাগ যাত্রীর সারা গায়ে থিক থিক করছে উকুন।  এই উকুন থেকে আবার অনেকে টাইফয়েড রোগেও আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইস্ট রিভার নদীর নর্থ ব্রাদার দ্বীপে   তাঁবু খাটিয়ে রুগীদের শহর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দেওয়া হয়।

১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল।  রোগ সংক্রমণের ভয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।  সেই সময়ে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার চার ভাগের একভাগ লোক মারা গিয়েছিল। আনুমানিক প্রায় ৫০ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।  ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমেরিকায় জনসমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি বিভিন্ন নথিতে ও সংবাদ মাধ্যমগুলো অসুখের ভয়াবহতা অনেকটা কম করে দেখিয়েছিল।   বিভিন্ন মাধ্যম  থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল স্পেনে এই রোগের প্রকোপ সব থেকে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।  সেই কারণে বিশ্ব জুড়ে রোগটির নাম দেওয়া হয়েছিল 'স্প্যানিশ ফ্ল'।

আর একটি ঘটনার কথা প্রসঙ্গক্রমে এসে যায়।  পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিনের জন্য কোয়ারান্টিনে কে ছিলেন ?

১৯০৭ সাল।  মেরী  ম্যালোন, পেশায় একজন পাচক ছিলেন।  জন্মসূত্রে আইরিশ হলেও তিনি মার্কিন নাগরিক ছিলেন।  তিনি এক সংক্রমক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যে সব বাড়িতে তিনি রান্নার কাজ করতেন প্রথমে সেই সব পরিবারের লোকদের মধ্যে রোগটি সংক্রমিত হয়েছিল।  পরবর্তীকালে বন্ধু -বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ও পাড়া-পড়শির মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।  প্রচুর মৃত্যুও ঘটে। মেরী ম্যালোন অবশ্য জীবিত ছিলেন।  স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাকে পাকড়াও করে তিন বছরের জন্য নিউ ইয়ার্কের নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডের কোয়ারান্টিনে পাঠিয়ে দেয়।  কোয়ারান্টিনে থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর পাচকের কাজ করবেন না, কিন্তু  ১৯১৫ সালে তিনি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।  তাকে কর্তৃপক্ষ আবার পাকড়াও করে সারা জীবনের জন্য ওই দ্বীপের কোয়ারান্টিনে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তিনি ২৩টা বছর বেঁচেছিলেন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম কোয়ারান্টিনে থাকার নমুনা হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র : এই সময় সংবাদপত্র (২২-০৩-২০২০)

ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ৩০-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন। 










  

Saturday, March 28, 2020

বেলা মিত্রের জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি>P

 বেলা মিত্রের  জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি  



মাত্র কয়েকটি চিঠিতেই স্বামীর ফাঁসি রদ করেছিলেন এক বঙ্গললনা। চিঠিগুলো অবশ্য বঙ্গললনা নিজে লেখেননি, তাঁর অনুরোধে মহাত্মা গান্ধী তৎকালীন ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ ভাইসরয়কে চিঠিগুলো লিখেছিলেন নেতাজি সুভাষ অনুগামী চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির আদেশ বন্ধ করার জন্য। সেই চিঠিগুলোর ফলে অবশ্য তাঁদের ফাঁসি বন্ধ হয়েছিল, ফাঁসির বদলে তাঁরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত  হয়েছিলেন।  ভাবছেন নিশ্চই কে এই বঙ্গললনা?  তিনি আমাদের রাজ্যের অর্থমন্ত্রী শ্রী অমিত মিত্রের মাতৃদেবী, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ভাইজি, সুরেশচন্দ্র বসুর কন্যা বেলা বসু। ওই চারজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর একজন হলেন হরিদাস মিত্র, যিনি ছিলেন বেলাদেবীর স্বামী।  ১৯৭২ সালে হরিদাসবাবু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হয়েছিলেন।  বাকি তিন বিপ্লবী হলেন পবিত্র রায়, জ্যোতিষচন্দ্র বসু  ও  অমর  সিং গিল।

১৯২০ সালে মাতুলালয় ভাগলপুরে জন্মেছিলেন বেলাদেবী।  তাঁর পিত্রালয় ছিল দক্ষিণ  ২৪ পরগনার কোদালিয়া গ্রামে। ১৯৩৬ সালে তিনি  আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগের অন্যতম প্রধান  যশোর নিবাসী হরিদাসের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিবাহের বছর দুয়েকের মধ্যে বেলাদেবী তাঁর শশুরবাড়িতে গড়ে তুললেন মহিলা সমিতি।  ১৯৪০ সালে কংগ্রেসের রামগড় অধিবেশন থেকে বেরিয়ে নেতাজি  আপস বিরোধী সম্মেলনের ডাক দেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সী বেলা সেই সম্মেলনের মহিলা শাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।  ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বেহালার বাড়ি থেকে তিনি ট্রান্সমিটার মারফত সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুনে নেতাজির সঙ্গে সংবাদ বিনিময়ের ব্যবস্থা করেন।  নেতাজির পাঠানো অস্ত্রশস্ত্র ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের উড়িষ্যার কোনারক মন্দিরের কাছে নিরাপদে অবতরণ করার জন্য বেলা ও তাঁর স্বামী প্রভূত সহায়তা করেন।  বেলা দেবীকে এজন্য নিজের প্রায় সমস্ত গহনা বিক্রয় করতে হয়েছিল, হয়েছিল তাঁদের জীবন বিপন্ন।

নেতাজি তখন বিদেশে। ৬এ বিপিন পাল রোডের বাড়িতে ব্রিটিশ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সুভাষ অনুগামী চার বিপ্লবীর  কার্য্যকলাপ চলতো।  তাঁরা এই বাড়িটিতে একটি টেলিগ্রাফ সেট বসিয়েছিলেন। এই টেলিগ্রাফ সেটের সাহায্যে তাঁরা সাংকেতিক ভাষায় গোপন খবর নেতাজিকে পাঠাতেন। মূলত এই কাজটি জ্যোতিষচন্দ্র বসু করতেন তাকে সহায়তা করতেন হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়।  ১৯৪৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর এই বাড়ি থেকেই গ্রেফতার হলেন জ্যোতিষচন্দ্র বসু।  তার কয়েকদিনের মধ্যে গ্রেফতার হলেন হরিদাস মিত্র, ওমর সিং গিল ও পবিত্র রায়। তাঁদের সকলকেই প্রথমে রাখা হয়েছিল লর্ড সিনহা রোডের গোয়েন্দা বিভাগের বাড়িতে।  নেতাজিকে সাংকেতিক ভাষায় জানানো বিভিন্ন সংবাদ জানার জন্য পুলিশ অকথ্য অত্যাচার চালাতো এই বিপ্লবীদের ওপর। কিছুদিন পরে অমর সিং গিল ও জ্যোতিষচন্দ্র কে রাখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলে আর হরিদাস মিত্র ও পবিত্র রায়কে রাখা হয়েছিল আলিপুর জেলে। অল্প দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর  চার বিপ্লবীর ফাঁসির আদেশ হল। জেলেরই এক কর্মীর পরামর্শে হরিদাস মিত্রের স্ত্রী ২২ বছরের বেলাদেবী  ও জ্যোতিষচন্দ্রের পিতা রঞ্জন বিলাস বসু পুনায় গিয়ে মহাত্মা গাঁধীর স্বরণাপন্ন হলেন। গাঁধীজি যদি ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ওভেলকে অনুরোধ করে পত্র দেন তাহলে এই চার বিপ্লবীর ফাঁসির হুকুম রদ হতে পারে এমনই তাঁদের ধারণা ছিল।  সত্যি সত্যি  একদিন সেই  অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। রদ হল  তাঁদের ফাঁসির আদেশ।  শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে  তাঁরা দণ্ডিত হলেন। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর চেষ্টায় শেষমেশ সবার মৃত্যুদণ্ড মকুব হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। 

আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপচর বিভাগের অন্যতম প্রধান  দায়িত্ব হরিদাস ও বেলা বহুদিন সামলেছেন  যখন হরিদাস যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে ছিলেন, তখন বেলা নিজ হাতে সব  কিছু সামলেছিলেন। শ্রী হরিদাস মিত্র স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের টিকিটে জিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হন।  কিন্তু বেলাদেবী স্বামীর মতো রাজনীতিরআঙিনায় পা রাখেননি।  ১৯৪৭ সালে বেলাদেবী আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসি রেজিমেন্টের (Rani of Jhansi Regiment)  আদর্শে তৈরী  করেন 'ঝাঁসি রানী বাহিনী'। যার সর্বাধিনায়ক তিনিই হন। স্বাধীনতার পর শিয়ালদহ ও অন্য কয়েকটি জায়গায় শরণার্থীদের ত্রাণকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালে বালি ও ডানকুনির মধ্যবর্তী জায়গায় অভয়নগর অঞ্চলে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের কাজে প্রাণপাত পরিশ্রম করেন। কঠিন পরিশ্রমের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়তে লাগলো। তিনি কঠিন রোগে পড়লেন।  অবশেষে ১৯৫২ সালের ৩১শে জুলাই মাত্র ৩২ বছর বয়সে এই মহিয়সী মহিলার জীবনাবসান হয়। চিরকালই তিনি পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে গেছেন। 

১৯৫৩ সালে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে অভয়নগর অঞ্চলের নামটির পরিবর্তন করে বেলানগর করা হয়।  ১৯৫৮ সালে ভারতীয় রেল ওই  অঞ্চলে একটা নতুন স্টেশন তৈরী করে তার নামে  নামাঙ্কিত করে।

এবছর অর্থাৎ ২০২০ সালে তার জন্মশতবর্ষ। কেউ আজ আর তাঁর নাম করে না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোথাও তাঁর জন্ম শতবর্ষের কথা শোনা যায় না।  কোথাও তাঁর একটা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও শুনিনি।  কত সহজেই এই মহিয়সী নারীকে আমরা ভুলে গেলাম।




ছবি ও  লেখার সত্ব  : সুদীপ্ত মুখার্জী  
তারিখ : ২৮-০৩-২০২০

যোগাযোগ : ৯৮৩০৪২০৭৫০

➧ আমার এই লেখাটি ও ছবিটি  যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে অবশ্যই আপনার মূল্যবান      মতামত কমেন্টের  মাধ্যমে জানাবেন। পরবর্তী লেখাগুলো  পেতে  ব্লগটিকে ফলো করে রাখুন।